চেনা-অচেনা গোর্খাল্যান্ড

লিখেছেন ভাবনা থীং তামাং, সুমেন্দ্র তামাং।

 

দার্জিলিং, ডুয়ার্স, তরাই অঞ্চলের মানুষ আবার সরব হয়েছেন গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে৷ ভারতের মধ্যে এই স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি অনেকদিনের৷ স্বাধীনতার আগে থেকেই এই দাবি তোলা হচ্ছে৷ ভারতের সংবিধানের 3নং ধারা মেনে এই গণতান্ত্রিক দাবি কয়েক প্রজন্ম ধরে অধরা রয়ে গেছে৷ যতবার এই দাবি জোরালো হয়েছে, রাষ্ট্র তার আধা-সামরিক বাহিনীর সাহায্যে তা দমন করেছে৷ অথবা তৈরি করা হয়েছে GTA অথবা DGHC-এর মত সংগঠন, যা মূল দাবিকে ঠেকিয়ে রেখে আপাত সমাধানের পথ দেখায়৷ এই জাতীয় সংগঠনের ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেছে৷ আরো জোরালো হয়েছে গোর্খাল্যান্ডের দাবি৷

২০১৭-র জুন মাসে আবার শুরু হয় আন্দোলন৷ তার কিছুদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছে, ইস্কুলে বাংলা ভাষা হবে অবশ্যপাঠ্য৷ মূলত এই ঘোষণার প্রেক্ষিতেই আবার নতুন করে শুরু হয় আন্দোলন৷ বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক করা আসলে এক ধরণের সংস্কৃতির আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। পাহাড়ের যে নিজস্ব রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক বাতাবরণ রয়েছে, তা নষ্ট করে দেওয়া। এই বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলোই একসাথে মিলে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে সরব হয়। অসংখ্য সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, করে চলেছেন। তাই আক্ষরিক অর্থেই এটি ‘সাধারণ মানুষের আন্দোলন’। এই আন্দোলন কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতায় আসতে চায় না যা তাদের অধিকারকে খর্ব করবে, বা গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে অগ্রাহ্য করবে।

দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে পাহাড়ে বন্‌ধ চলছে। খুন হয়েছেন ১১ জন, গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকে। কানে আসছে বন্দি অবস্থায় অত্যাচারিত হওয়ার খবর। মাথার দিকে তাক্‌ করে গুলি চালানো, অনেক সময় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে – এই জাতীয় আচরণে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ। এ তো গণতান্ত্রিক অধিকারের সামনে প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দেওয়ার সমান! লাঠি চার্জ, ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারিং, কাঁদুনে গ্যাস, বাড়িতে ভাড়িতে পুলিশের হানা – এসব তো নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে দু’মাস হল পাহাড়ে ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ। এর ফলে মানুষের মনে আতঙ্কেরও সৃষ্টি হয়েছে, কারণ কোনো খবর তাঁদের কাছে এসে পৌঁছচ্ছে না।

রাষ্ট্রের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিদিন দার্জিলিং পাহাড়ের রাস্তা প্রত্যক্ষ করছে অসংখ্য মানুষের প্রতিরোধ। সই সংগ্রহ করা হচ্ছে – যাতে তা পৌঁছে দেওয়া যায় ক্ষমতাশালীদের কাছে। ট্যুইটার এবং অন্যান্য সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করারও চেষ্টা করা হয়েছে। ৩০শে জুলাই প্রায় ১০০টি দেশ মিলিয়ে একটি মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। সারা পৃথিবী থেকে গোর্খারা এবং গোর্খাল্যান্ডের সদস্যরা নিজেদের শহরের মিছিলে যোগ দেন। দেশ-বিদেশের নানা শহরে কিছু টিম বানানো হয়েছে যারা গোর্খাল্যান্ডের দাবি সম্পর্কে মানুষদের সচেতন করছেন। পাহাড়ের খবর পৌঁছে দিচ্ছেন। Pahal Sanskritik Abhiyan নামের একটি দল গড়ে তুলছে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। পাহাড়ের রাস্তায়, গ্রামে, শহরে হচ্ছে পদযাত্রা। সেখানে গান হচ্ছে, হচ্ছে পথনাটিকা, কেউ কবিতা পাঠ করছেন। চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে এই প্রতিরোধকে অন্য শহরেও নিয়ে যাওয়া যায়, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালের মত জায়গায়। গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলনে যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের পরিবারের জন্য অনেকে বাড়িয়ে দিয়েছেন অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত। চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলির জন্যও অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মনে রাখা দরকার, গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলন কোনো একটি বিশেষ কমিউনিটির বিরুদ্ধে নয়। এবং এও মনে রাখা প্রয়োজন যে, যে করেই হোক, বজায় রাখতে হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এই অবস্থায়, পিপ্‌লস কালেক্টিভ এবং অন্যান্য সংগঠন নানা নতুন উপায় তাদের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

দার্জিলিং-এর গল্প মানে শুধু সুন্দর, ছোট্ট একটা পাহাড়ি শহরে বেড়াতে যাওয়ার গল্প নয়। এর একটা অন্য বাস্তব আছে। সেই বাস্তবে রয়েছে অর্থনৈতিক শোষণ, পরিচিতি সত্ত্বার রাজনীতি, এবং রাজনৈতিক ডিস্ক্রিমিনেশান। দার্জিলিং-এর সমকালীন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, অ্যাক্টিভিস্টরা নানা ভাবে চেষ্টা করছেন সেলফ ডিটারমিনেশান নিয়ে কথা বলতে। গোর্খা বলতেই আগে যে ‘বীর গোর্খা’-এর ছবি ভেসে উঠতো, তাকে ভেঙে ফেলা হচ্ছে – তৈরি হচ্ছে আধুনিক পরিচিতি – যা প্রগ্রেসিভ এবং ইঙ্কলুসিভ। এই প্রতিরোধের ভাষ্যে উঠে আসছে চা-বাগানের শ্রমিকদের অবস্থার কথা। ২০১৭ সালের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন আরেকটি প্রজন্মকে অধৈর্য করে তুলছে গোর্খা নামের এই স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচিতির একটি চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য। পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে এই রাজনৈতিক পরিচয়ের স্থানটি ফাঁকা থেকে গেছে বলে দেখা যায়, যদিও তাঁরা গণতন্ত্রকে তাঁদের ভিত্তি বলে মনে করেন।

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s