আখ দলীলা ওয়ান

লিখেছেন অভীক মন্ডল।

 

They chose him because they knew that they had to put their faith in fragility, stick to the smallness. Each time they parted, they extracted only one small promise from each other.

-Naaley? (Tomorrow)

-Naaley. (Tomorrow)

They knew that things could change in a day. They were right about that.

The God of Small Things

একদিনে সত্যি সব পাল্টে গেল। নকশালবাড়ি, জামুই, লোহানদিগুড়া, আদিলাবাদ, গাদচিরোলি, দান্তেওয়াড়া, গোপীবল্লভপুর, শ্রীকাকুলাম – হো, ওড়াওন, কোল, সাঁওতাল, মুন্ডা, গোন্দ-রা বিপ্লব ঘোষণা করেছে বহুবার, বহু শতাব্দী ধরে। সব আন্দোলন শাসক জুতোর তলায় পিষেছে নিমেষে, তবু ওদের ঔদ্ধত্য, ওদের জেহাদ পিষতে পারেনি। ১৯৭০-এর একদিন পাল্টে দিল সবকিছু আমার জন্যও, যে আমি জন্মেছি কয়েক দশক পরে।

“কারা এত রাতে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে…”

দন্ডকারণ্য, ২০১০। ইন্দ্রাবতী নদীর ধারে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা, যাকে পুলিশের সেনা বলে ‘পাকিস্তান’। গ্রামগুলি জনশূন্য, মানুষ নিয়েছে আশ্রয় প্রাচীন বনানী মাঝে। বন্দুক হাতে পাহারা দেয় ডেরা। যে ডেরার দেওয়াল জুড়ে লেখা “আমরা ২ টাকা/কিলো চাল ব্যবহার করি। দারিদ্রের তলানিতে এসে ঠেকেছে আমাদের জীবনযাত্রার মান।” যে শান্তি বা বালাকৃষ্ণা গেছে চাষে, কুয়ো পরিষ্কার করতে, যে গোন্দ বা মুন্ডা ছাগল চড়াতে গিয়ে বুকে পুলিশের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়বে মাটিতে, তাকেই বাঁচানোর জন্য এরা নিজেরাই তুলেছে বন্দুক। এরা ‘মাওবাদী’। পিপ্‌লস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পি এল জি এ) তৈরি হয় ২০০০ সালে। বেতন পায় না কর্মীরা। ৪৫% মহিলা ক্যাডার। পিপ্‌লস ওয়ার গ্রুপ (পি ডব্লু জি) আরেকটি সংগঠন। আছে আদিবাসী মহিলা সংগঠন এবং অন্যান্য। এরা বন্দুকের লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে লাল পতাকার তলায়। জঙ্গলের ১০টি জনতন সরকার রক্ষা করতে। কমরেড কমলা ফসলের ক্ষেতের দিকে আঙুল তুলে অদ্ভুত এক হাসিমুখে বলছেন, “জনতন সরকারের মাঠ। আমরাই পুঁতেছি বীজ, ফসল ফলিয়ে এখন সবাই মিলে ভাগ করে ভরপেট খাব।” বন্দুক হাতে ‘গ্রাম স্বরাজ’ হয়তো এক বিকল্প দিশা এই ভীষণ দ্রুত নয়াউদার রাজ্যে। ভিয়েতনামের ন্যাশানাল লিবারেশন স্ট্রাগলের আদলে গড়ে ওঠা জনতন সরকারের কর্মীরা ন’খানা বিভাগের দায়িত্বে আছেন – কৃষি, বাণিজ্য উদ্যোগ, অর্থনীতি, ন্যায়, প্রতিরক্ষা, হাসপাতাল, জন-সম্পর্ক, ইস্কুল-রীতি-রেওয়াজ এবং জঙ্গল। INSAS, SLR, AK-47 হাতে তারা মোকাবিলা করে রাষ্ট্রের অত্যাধুনিক, fully automated ভারী নলের। বাস্তারের তেঁতুলের মিষ্টি গন্ধে আর ভূমকাল নাচে মেতে উঠেছে দন্ডকারণ্য। ভূমকাল মানে ভূমিকম্প। ভূমকাল বিপ্লব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কোয়া-দের বিপ্লব। আনে মুক্তি শতপ্রাণে। কমরেড লেং। ‘লেং’ মানে জনগণের স্বর, তাদের আওয়াজ। আরো আছেন কমরেড সুশীলা, কমরেড নীতি। অন্যদিকে, ভূমকাল নাচে মেতে উঠবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে POSCO, MONSANTO’র মত মাল্টি-ন্যাশানাল কোম্পানি। চাই বক্সাইট, মাইকা, ইউরেনিয়াম, গ্রানাইট, ডলোমাইট। বিরাট কনভেয়ার বেল্ট। খাদান-ক্রাশার। হবে স্টীল প্লান্ট। খুঁড়ে বের করবে খনিজ সম্পদ। সিলিকোসিস এবং নানা হৃদরোগে আক্রান্ত হবে আদিবাসী সমাজ। এরই এক গালভরা নাম – ডে-ভে-ল-প-মে-ণ্ট। উন্নয়ন। ‘অসভ্য’-দের জঙ্গল দেখবে ‘সভ্যতার’ আগ্রাসন।

“আধা নাঙ্গা দান্‌তন দাদা, দাকোনিলে

মাভা কোয়ারটুকু বেহাত দাদা, দাকোনিলে।”

[“আমরা অর্ধনগ্ন এ জীবন চাই না দাদা।”]

পথের বাঁধা জনতন সরকার। POSCO-এর চোখ রাঙানিতে ভারত সরকারের অভিযান অপারেশান গ্রিন হান্ট আবার চালু। বের কর স্নিফার কুকুরদের, বারুদ-বোমা, ঘর-ছাড়া করো গ্রামবাসীদের, জঙ্গলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলে তাড়া করো ওদের। “সুগুনা”-কে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতেই হবে। কোথায় সুগুনা? সুগুনা রেবতী মাসেই’র কমরেড। ‘কমরেড’ মানে জানেন? দাঁড়ান, রেবতীর চিঠি পড়ে শোনাচ্ছি,

In the forest, everyday police is burning killing raping poor people. Outside there is you people to take up the fight and take up issues. But inside there is only us. So I am returned to Dandakaranya to live and die by my gun.

কুত্তা লেলিয়ে ঠেকানো যাবে না যে আদর্শ, তাকে ঠেকাতে জোগাড় করেছে মিডিয়া, খবরের কাগজ, ভুয়ো তথ্য, পুলিশের ‘শহীদ’-এর তালিকা, স্পেশাল ইকোনোমিক জন (S.E.Z) অ্যাক্ট। রেবতী-দের বক্ষের নীচে ইলেকট্রিক শক্, ধর্ষণ বারে বারে, এ আর এমন কি? ওরা মাওবাদী, যেমন ৭০-এ ছিল নকশাল। কংগ্রেসি পুলিশ লেলিয়ে সরোজ দত্তর গলা কাটা হলো, আজও নিখোঁজ সে পুলিশের ডায়েরির পাতায়। কাস্তে-হাতুড়ি-তারার কসম, কমরেড লেং, রেবতী, তোমরা চলে গেলেই তো সুবিধে। দন্ডকারণ্য ধ্বংস করবে POSCO, MONSANTO। আসলে, সবাই মনে রাখে কীভাবে দান্তেওয়াড়াতে মাওবাদীরা মেরেছে চুতিয়া কংগ্রেস বা বিজেপি’র পোষা কুত্তাদের, পুলিশদের; কেউ মনে রাখে না, ওই একই রাতে ৪৫ জন বাচ্চাকে কুপিয়ে খুন করেছে ওই পুলিশ, রক্তস্রোত বয়েছে গ্রামবাসীদের। হয়তো সুগুনা একজন বাচ্চাকে বাঁচাতে পেরেছিল সেই রাতে। হয়তো যে ৫ জন পুলিশ ধর্ষণ করেছিল রেবতীকে, এ তাদেরই একজনের বাচ্চা। অরুন্ধতী রায়ের মিনিস্ট্রি অফ্আটমোস্ট হ্যাপিনেস  উপন্যাসের শেষে যার ছোট্ট পায়ে পথচলা শুরু। হয়তো তার কাছেই আছে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি। এখনো দীর্ঘ পথ যদিও, এখনো দীর্ঘ অপেক্ষা।

যেবার ভুল ইনফর্মেশন পেয়ে, সি আর পি এফ-এর ভ্যানে বোমা মেরে ওড়ানোর সময় ৫ জন গ্রামবাসীও আহত হন, ১১ জন মারা যান, সেবারও পি এল জি এ তাদের মুখপত্রে নিজেদের ভুল স্বীকার করে; বারংবার করে এসেছে। মাওবাদীরা, নকশালরা বন্দুক তুলেছে। ‘হঠকারী হিংসা’র রাজনীতি? আসলে, গান্ধীর ‘অহিংস’ আন্দোলনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ইংরেজদের দালালি, সাভারকারদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছিল না কোনো ভূমিকা, হিটলার-এর সরাসরি পক্ষে থাকা লোক ওনারা। মমতা-জয়ললিতাদের, ভোট ব্যাঙ্কের স্বার্থে  পপুলিস্ট পলিটিক্স, বি জে পি – কংগ্রেস – আর এস এস – ভি এইচ পি -দের শোষণের রাজনীতি, নৃশংস হত্যার রাজনীতি, উগ্র হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি, প্রকৃতার্থে ‘হিংসা’র রাজনীতি। আর তারাই এখন ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে কেবল সংসদীয় রাজনীতি শেষ অব্দি কতটা কার্যকরী হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থাকে। কারণ, শুধু রাষ্ট্রকাঠামো দখলের লড়াই নয়, চাই রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকৃত বিপ্লব ঘোষণা। শাসকের মুখ বদলালেই শোষণ হবে নিশ্চিহ্ন – এমনটা ভাবা অপরাধ। মাওবাদীরা, নকশালরা ভুল হোক, ঠিক হোক, সব তর্ক সরিয়ে রেখে মূল কথাটা এই যে আমাদের ভুয়ো ‘গনতন্ত্র’-র ধারণাকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে শেখায় এদের সশস্ত্র আন্দোলন। মানুষ বড় অসহায়, মানুষ বড় ক্ষুধার্ত। এই শত মানুষের আর্তনাদ, তাদের না-পাওয়া এবং প্রকৃতার্থে তাদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই নকশালবাড়ি – গোপীবল্লভপুর – ডেবরা – শ্রীকাকুলাম। শাসকের চোখ রাঙানির বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা ক’রে সর্বহারার লড়াই যদি এ না হয়, তবে জানি না কি! ভারতবর্ষ ক্রমশ একটা বুর্জোয়া গনতন্ত্র থেকে পরিণত হচ্ছে ফ্যাসিবাদী ডিকটেটরশিপ-এ। কীভাবে, কিকরে এই কালো রাত হবে শেষ – এই সময়ে এইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উত্তর হল লাল ফৌজ।

থাক না হাজার অযুত বাধা, দীর্ঘ দূর যাত্রায় কীসের ভয়?

কীসের ভয়, সাহসী মন, লাল ফৌজের?

লাফিয়ে হই পার।

চেয়ারম্যান মাও লিখেছিলেন, ‘War can only be abolished through war, and in order to get rid of the gun it is necessary to take up the gun.’ রাষ্ট্র যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মানুষের ওপর। তাই, রাতের আঁধারে এক নকশাল লুকিয়ে লুকিয়ে কোনো এক এঁদো গলির দেওয়ালজুড়ে সেঁটে চলেছে পোস্টার – ‘বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস’। পুলিশ নিয়েছে পিছু। কাল আর এই নকশাল থাকবে না, দেওয়াল জুড়ে থাকবে পোস্টার। ‘রাজনৈতিক’ শব্দটি পোস্টারে লেখা হল না, কেন? – দেওয়ালে গুলি আর ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ সেই রাজনীতি মানুষের কাছে ঠিক পৌঁছে দেবে, এই দৃঢ় বিশ্বাসে। ধর্ষক যখন রাষ্ট্র নিজেই, হঠাৎ আঁধারের বুক চীরে ছোট্ট রাহেলের চিৎকার কানে এলে বিচার চাইবেন কোথায়? কে বিচারপতি? দেশভাগ। যশোর রোড। কাদা-মাটি-জল। কুনান পোশপোড়া, নেল্লি, গোধরা, দণ্ডকারণ্য, বাস্তার, – সুগুনাদের দোহাই, এই আর্থসামাজিক ব্যবস্থার সংস্করণ নয়, চাই ধ্বংসস্তূপ। তবেই তো লাল সূর্য, তবেই তো বিচার, শান্তি। উলঙ্গের, নিরন্নের দেশ – ‘তুমি পোশাক ছেড়েছ, তার অপরাধ’ – মুণ্ডহীন ধরগুলি আহ্লাদে চিৎকার করে। দাদা, এ দেশে ভাত নেই, পাথর রয়েছে। সেই পাথরটুকু বাঁচানো অপরাধ। কমরেড লেং, রেবতী, সুগুনা, এরা তাই অপরাধী। মাওবাদী বলে নয়, জল – জঙ্গল – জমির লড়াইয়ে সমর্পিত প্রাণ বলে। আজ যদি সেনা না-ও করতে পারে খতম তোমায় ‘দোপদী’, কথা দিলাম – ‘naaley’… মনে রাখবেন শুধু, ভূমকাল মানে ভুমিকম্প।

“আধা নাঙ্গা দান্‌তন দাদা, দাকোনিলে

মাভা কোয়ারটুকু বেহাত দাদা, দাকোনিলে।”

[“আমরা অর্ধনগ্ন এ জীবন চাই না দাদা।”]

আজও দণ্ডকারণ্যে একটা ঝলসানো ইঁদুরের মাংস নিয়ে কাড়াকাড়ি করে বাচ্চারা, গাছে উঠে বিষাক্ত লাল পিঁপড়ে ধ’রে মাখিয়ে খায় ঝাল লঙ্কার স্বাদ পেতে। এ দারিদ্রের কোনো সৌন্দর্য নেই, নেই রোমান্টিকতা। আছে নিদারুণ খিদে, রুক্ষ নগ্ন বাস্তবতা।

But at times like these, only the Small Things are ever said. Big Things lurk unsaid, inside.   ( The God of  Small Things )

 

“Akh daleela wann. Tell me a story.”

কাশ্মীরের গল্প। কাশ্মীর – আজাদির পক্ষে বা বিপক্ষে যে নানান তর্ক, কূটকাচালি চলে প্রত্যহ, সেই কাশ্মীর। নেহরু, জিন্না, কংগ্রেস, বি জে পি, পি ডি পি, মুফ্‌তি, আকসাই চিন, গিলগিট বালতিস্তান, সাক্‌সগাম উপত্যকা, রাজতরঙ্গিনী, কশ্যপ মুনি, হরি সিং, লাদাখ ট্যুরিসম, ৩৭০ ধারা, কাশ্মীর চুক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিজবুলকে আতঙ্কবাদী সংগঠন ঘোষণা করা, মাউন্টব্যাটেন সাহেব, তাঁর সাধের ব্যাটন, প্রমিস্‌ড প্লেবিসাইট – কোনোটাই এই প্রবন্ধের বিষয় নয়। অরুন্ধতী রায়ের উপন্যাসের কাশ্মীর। কাশ্মীরের বাস্তব। মুসার কাশ্মীর।

জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ন্যাশানাল লিবারেশান ফ্রন্ট (JKNLF) গঠন করে আমানুল্লাহ খান, মাকবুল ভাট। মাকবুল ভাটের ফাঁসি দেয় রাষ্ট্র তিহার জেলে। বলাই বাহুল্য, ফাঁসি দেওয়ার প্রক্রিয়া খুব একটা স্বচ্ছ ছিল না। যে সংগঠন চাইত না কাশ্মীর পাকিস্তান বা ভারতের অধীন হয়ে থাকবে, চাইত প্রকৃতার্থে ‘আজাদি’, সেই সংগঠন উভয় দেশেরই শত্রু – এটাই তো স্বাভাবিক। তায় আবার সেক্যুলার দল। কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশ যুদ্ধ খেলায় মাতবে দীর্ঘ দিন ধরে; দেশের মানুষ না জেনে, না বুঝেই গদগদ দেশপ্রেমে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনির “শহীদ”-দের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবেন, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলির কুম্ভীরাশ্রু, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাধান চায় না তারা, জিইয়ে রাখবে এই কনফ্লিক্ট নিজেদের মুনাফার স্বার্থে – এসবের থেকে অনেক দূরে, বহু দূরে, ঝিলম নদীর ধারে, একলা চিনার গাছ দাঁড়িয়ে থাকে কাশ্মীর উপত্যকার এক কোণে। মুসার কাশ্মীর। গুলরেজ – গুলকাকের কাশ্মীর। JKNLF- এর সদস্যদের একে একে খতম করে, সংগঠনটাকে পঙ্গু করে রাষ্ট্র কাশ্মীর খেলায় বাজিমাত করতে পেরেছে ১৯৯৬ পরবর্তী সময়ে। পার্টির সেক্যুলার আউটলুকটা দুই রাষ্ট্রের জন্যই খুব ক্ষতিকর ছিল। এখন দেখুন, একটাই স্লোগান ওদের মুখে – ‘আজাদি’। কিন্তু কেমন ‘আজাদি’? কেউ ভেবেছে? আর আজাদির পর? সংখ্যাগুরু কী করবে সংখ্যালঘুর ওপর? কাশ্মীরী পন্ডিত চলে গেছে আগেই। এখন মূলত মুসলমান। সালেফিরা বারেলভিদের ওপর, বা সুন্নিরা শিয়াদের ওপর যে আক্রমণ করবে, তা ঠেকানো যাবে? লাদাখের বৌদ্ধদের কী হবে? আর জম্মুর হিন্দুদের? জম্মু ও কাশ্মীর তো শুধু কাশ্মীর নয়। আছে জম্মু, কাশ্মীর, এবং লাদাখ। কোনো সেপারেটিস্ট দল ভেবেছে এগুলো? লস্কর বা হিজবুল ভেবেছে? আজাদি পেয়ে কি পাকিস্তানের অংশ হতে চাইবে এরা? আরো আছে – চিনের জুজু। JKNLF এই স্ট্রাগলের নেতৃত্বে না থাকায় এখন যত মত তত পথ। উল্টোদিকে, কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে আছে রাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতা, তাদের নৃশংসতার দাপট।

রাষ্ট্র এই উপন্যাসে বিপ্লব দাসগুপ্ত। কী পরিহাস! বিপ্লবের সারভেইলেন্স এড়িয়ে, অরওয়েলিয়ান ভঙ্গিতে তিলোত্তমা ঠিক পৌঁছে যায় কমরেড গুলরেজের কাশ্মীরে। ডাল লেকের শিকারাতে গোপনে দেখা হবে মুসা আর তিলোর। ভারতীয় সেনার আমরিক সিং ‘স্পটার’ তক্কে তক্কে আছে ইতিমধ্যে, কবে মুসা ওরফে কমরেড গুলরেজকে খতম করবে। অথচ এসবের তোয়াক্কা করে না কমরেড। খাঁ-খাঁ করছে উপত্যকা। চারিদিকে মুন্ডহীন লাশ বাচ্চাদের, তারই মধ্যে মুসা কাঙ্গড়ির নিচে বন্দুক জড়িয়ে কুপওয়াড়া পাড়ি দিচ্ছে নির্ভয়ে। পাপা টু, মামা টু, শিরাজ সিনেমার কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স ( বি এস এফ) -এর টর্চার ডরায় না মুসা ইয়েসভিকে এক মুহূর্তের জন্যেও। তিলো মুগ্ধ হয়ে মুসার গল্প শুনবে সারা রাত, বিপ্লব তা জেনে গেছে। রাষ্ট্রের নজরদারি সর্বত্র। তবু মুসা তিলোর সঙ্গে দেখা করবে বলে পেরিয়ে যাচ্ছে মাজার-এ-শোহদ্দা – শহীদদের কবরখানা; মুসা ও আরিফা ইয়েসভির ৩ বছরের সন্তান জেবীনের কবর। ছোট্ট সিনার এপার দিয়ে ঢুকে ওপারে মা’র সিনা ফুঁড়ে প্রস্থান করেছিল বুলেট। মানে যেভাবে মৃত্যু হয় কাশ্মীরীদের। ‘কর্ডন অ্যান্ড সার্চ’-এ মৃত্যু উপত্যকার নিত্যনৈমিত্তিক একটা প্রসিডিওর মাত্র। মাজারের বাইরে খোদাই করা – “We gave our todays for your tomorrows“। মাজারের ভেতরে ছোট্ট জেবীনের কবরে লেখা – “Akh daleela wann” – “Tell me a story“। আর কিছুদিন পরেই মুসা, গুলকাকেরও হবে একই পরিণতি। যদিও কেবল অরুন্ধতী রায়-ই জানেন যে কমরেড গুলরেজ কীভাবে দু’বার মৃত্যুবরণ করবে।”Some soldiers die twice“। যেভাবে করেছে উপন্যাসের এস মুরুগেসন। উপত্যকার সৈনিক। শহীদ বলে যার মূর্তি গড়া হয় গ্রামে; আবার চামার বলে সেই মূর্তি ভেঙে ফেলে গ্রামের উচ্চ-জাত, উচ্চ-বর্ণেরা। কেবল তার মেয়ে এসব কিছুই বোঝে না। কতটুকুই বা বয়স ওর! গর্দানহীন মূর্তির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে বলে চলে সে, “আপা…আপা আপা…। যেখানে ছোট ছেলেমেয়েদের পেলেটবিদ্ধ করা হয়, যেখানে ভারতীয় সেনা শক্তি প্রদর্শন করবে বলে মহিলাদের ধর্ষণ করে, যেখানে আফ্‌স্‌পা’র দোহাই দিয়ে জিপের সামনে নগ্ন করে এক কাশ্মীরিকে বেঁধে সারা গ্রাম টহল দেয় সি আর পি এফ, যেখানে কাশ্মীরিদের মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না, ক্ষমতার আস্ফালনই যেখানে সেনাপ্রধানদের শেষ কথা, সেখানে পালটা গুলিবর্ষণ করবেই কমরেড গুলরেজ, বুরহান ওয়ানিরা। উঠবেই স্লোগান আজাদির। লস্কর, হিজবুল বা অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে যতই ভেদাভেদ থাকুক না কেন, উঠবেই সমস্বরে স্ব-শাসনের দাবি। “ইন্ডিয়া গো ব্যাক” – তাই লেখা থাকে দেওয়ালে দেওয়ালে।

জিস্‌ কাশ্মীর কো খুন সে সিঁচা, উয়ো কাশ্মীর হামারা হ্যয়!

অন্য তরফে রাষ্ট্রের যুক্তি – “জঙ্গি”-রা যে ভারত সেনার ওপর প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে, তার বেলা? তার উত্তর তো দিলামই। আঘাত, তাই পালটা আঘাতে জর্জরিত কাশ্মীর। সম্প্রতি আল জাজিরা নিউজের একটি ভিডিওতে দেখলাম কীভাবে আহ্‌মেদ বলে ভারতের একজন গরীব মুসলমানকে রাষ্ট্র বিচার পদ্ধতির মাধ্যমে জঙ্গী প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। বিস্তারিত সাক্ষাৎকার আছে আহ্‌মেদের। যখন সি বি আই এবং অন্যান্য ব্যুরোরা তাতে বিফল হয়েছে, তখন আহ্‌মেদকে জোর করে গুপ্তচর হিসেবে পাঠানো হয় কাশ্মীরে এবং তারপর পাকিস্তানে। এই কাজটা করতে রাজি না হলে আহ্‌মেদের ছিল দুটোই রাস্তা – যাবজ্জীবন তিহার জেল, নইলে ফেক এনকাউন্টার। কাজেই “জঙ্গী”, “আতঙ্কবাদী”, বা “টেররিস্ট” – এই জাতীয় শব্দ বিনা বিবেচনায় আলগা ভাবে ব্যবহার না করাই কাম্য। যেমন ধরুন আমেরিকা আর আই এস আই এস। আমেরিকা তার জন্ম দিল। পরম যত্নে তার লালন পালন করা সত্ত্বেও ছেলে এখন রেবেল হয়েছে খুব। বাবা-মা’র খুব চিন্তা। আমেরিকা তাই শক্ত হাতে এই “আতঙ্কবাদী” সন্তানকে ঘরে ফেরাতে চায়। সারা বিশ্বে সত্যিই আই এস আই এস মাথাচাড়া দিচ্ছে। খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায় বোম্ব ব্লাস্টে মানুষের রক্তাক্ত ছবি। হাঙ্গেরি, প্যারিস, লন্ডন, ইস্তান্‌বুল, আরো অনেক – প্রায় সবকটারই দায় স্বীকার করেছে আই এস আই এস। ট্রাম্পের সাথে মোদির ঘনিষ্ঠতা ক্রমে বাড়ছে। এই মওকায় মোদিও ঘোষণা করেছেন, ২০২২-এর মধ্যে ভারত জঙ্গীমুক্ত করবেন তাঁরা। ইতোমধ্যে অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ করে ১০০’র বেশি শিশুকে খুন করে সেই জঙ্গীদমনের কাজ জোর কদমে শুরু করেছে সরকার বাহাদুর। সাংবিধানিকভাবে ধর্মসম্পর্কহীন এই রাষ্ট্রের “সেক্যুলার” সৈনিক গোরখপুরের যোগী আদিত্যনাথ।

“মূর্খ, কোনো আস্থাই নেই মন্ত্রীর আশ্বাসে,

 শিশুরা শুধুই মরতে ভালোবাসে।”   [নবারুণ ভট্টাচার্য]

আমার মাথায় খালি অন্য একটা প্রশ্ন আসে। যে রাষ্ট্র জনশূন্য, পরিত্যক্ত একটা বরফের টুকরো আগলে রাখবে বলে লেফ্‌টেনেন্ট-কর্ণেল তানভীর-দের সিয়াচেনে -৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, অমানবিক পরিস্থিতিতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, ভারতীয় বায়ু সেনার MIG বিমানগুলোর জন্য সস্তায় অকেজো পার্টস কিনে বিমানচলকদের খুন করে ট্রেনিং রুটিনে, তারা সৈনিকদের মৃত্যুতে কতটা ব্যথিত হতে পারে? উগ্র জাতীয়তাবাদীরা ভারতের অভ্যন্তরীন পিপ্লিয়ামান্ডিতে রাষ্ট্র যন্ত্র ব্যবহার করে কৃষকের ওপর গুলি চালায় যখন, শ্রমিকরা ন্যূনতম বেতন থেকে বঞ্চিত, যখন ‘God of Small Things’-এর ভেলুথা বা ‘আন্‌টাচ্‌বল’-এর বাখা’র মত রোহিথ ভেমুলাদের অছ্যুৎ, চামার বলে খুন করা হয়, জে এন ইউ’র নিখোঁজ ছাত্র নাজীবকে আমাদের highly efficient জঙ্গী দমনকারী সরকার কয়েক মাস পরেও খুঁজে বের করতে পারে না, “গুজরাট কে লালা”-রা যখন দাঙ্গায় মেতেছে সারা দেশজুড়ে, নয়া নয়া অর্থনৈতিক ভেলকি দেখিয়ে গরীবের সর্বস্ব শুষে নিচ্ছে রোজ, তখন ৫৬ ইঞ্চির ছাতিতে ঐ জাতীয় পতাকায় মোড়া সৈনিকের মৃতদেহ নিয়ে গদগদ “দেশপ্রেমের” বুলি মানায় না আপনাকে মন্ত্রীমশাই। তা সত্ত্বেও, দেশের ৩৩% মানুষের ভোট পেয়ে আজ আপনি প্রধানমন্ত্রী। কারণ আদানিদের লক্ষাধিক টাকার জোরে আপনি “দেশ” আর “রাষ্ট্র” – এই দুটোকে সমার্থক শব্দে পরিণত করতে পেরেছেন। “দেশভক্তি” আর “রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য” – এই দুইয়ের মধ্যে অনেক ফারাক আছে। যদি আনুগত্যের দোহাইও দেন, তাও জেনে রাখবেন, বিনা প্রশ্নে রাষ্ট্রের অনুগত হয়ে থাকার ব্যাপারটা অত্যন্ত গোলমেলে। দেশ বলে যদি কিছু থাকে, এবং তার অর্থ যদি হয় মানুষ, তবে আমি তাদের পাশে, তাদের উপর নেমে আসা রাষ্ট্রযন্তের এক্সেসের বিপক্ষে। আপনার গো-রক্ষক আর অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড-এর আর এস এস, ভি এইচ পি-রা অনায়াসে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় হত্যালীলায় মেতেছে – “প্রজাতন্ত্রের” মানুষগুলোকে আরেকবার সতর্ক করতেই আমার এ গুজরাট কে লালা বিরোধী বিজ্ঞাপন “জনহিত মে জারী”। আসলে, বাস্তার-দন্ডকারণ্যে দেশের মানুষ সরকারি লুঠ থেকে জন-জঙ্গল-জমি বাঁচাতে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে বলে রাষ্ট্রের heavy machinery’র প্রয়োগ। আর কাশ্মীরে রাষ্ট্রযন্ত্রের এক্সেসের সাফাই পেশ করতে খাড়া করা হয়েছে ভুয়ো দেশপ্রেম। কাশ্মীর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ সরিয়ে রেখে তিলোত্তমার মত মুসার পাশে হাঁটু গেড়ে বসতে ইচ্ছে করে খানিক্ষণ। মুসারা আসলে কী চায়? এত মৃত্যু, এত ক্লান্তি, এত যুদ্ধ কিসের জন্য? শুধু আজাদি? না। ওরা তো জেনেই গেছে যে বন্ধুকের গুলি অথবা পেলেটে ওদের প্রাণ যাবে। তবুও আজাদি ছিনিয়ে নিতে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর পথ কেন? যাতে ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা লজ্জিত বোধ করি। আমাদের রক্ত-পিপাসু মন যাতে শান্ত হয়। ঔদ্ধত্যের এই রক্তাত ইতিহাস থেকে যেন নিজেদের মাফ না করতে পারি কখনো। ১০ হাজার, ২০ হাজার, ৩০ হাজার…গুনতে গুনতে এখন উপত্যকায় মৃতের সংখ্যা ২ লক্ষ প্রায়। এরপরেও মুসাদের, গুলকাকদের জান কবুল আছে।

“Death flies in, thin bureaucrat, from the plains.”

ছোট্ট জেবীন শুধু গল্প শুনতে চেয়েছিল। আখ দালীলা ওয়ান। Tell me a story .

 

“Mussalman ka ek hi sthan! Qabristan ya Pakistan!”

তাই ষোলো বছরের জুনায়েদ আজ কবরে। একে একে ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে ধর্মের নামে হত্যা করা হয়েছে গত ২ বছরে। খুলে-আম্‌ বীচ সড়কে। রাতের আঁধারে, বা আমাদের অগোচরে ক’জন হয়েছে শেষ, তার সরকারি হিসেব দেয়নি এখনো আর এস এস এবং উগ্রহিন্দুত্ববাদীরা। গুজরাটের দাঙ্গায় বেঁচে গিয়েছিল উপন্যাসের অঞ্জুম। দয়া করে যে তাকে মারা হয়নি, এমনটা ভাববেন না।

Saali Randi Hijra!…Nahi yaar, mat maro, Hijron ka maarna apshagun hota hai“। হিজড়েদের মারলে জাত যাবে। বেঁচে থাকা তো দূরের কথা, মরারও অযোগ্য হল অঞ্জুম, জন্মেছিল যে আফ্‌তাব হয়ে। একে মুসলমান, তায় আবার হিজড়া। অঞ্জুম – অঞ্জুমন মানে মেহ্‌ফিল। সমাজে স্থান নেই তার। আছে খোয়াব্‌গাহ্‌। দিল্লির শাহজানাবাদের খোয়াব্‌গাহ্‌। খোয়াব্‌গাহ্‌ মানে স্বপ্নের আস্তানা। অঞ্জুম, কুলসুম বাঈ, অহ্‌লম বাজি, বিসমিল্লা, নিম্মো গোরখপুরীদের খোয়াব্‌গাহ্‌। সমাজের প্রান্তিক মানুষ, হিজড়েদের আশ্রয়।

They had built themselves up, bit by bit, humiliation by humiliation.

উর্দু-এ-মোহল্লা-এ-শাহজানাবাদ। আগে সৈন্যদের ক্যান্টনমেন্ট ছিল এখানে, শাহজাহানের সময় থেকে এই মহল্লাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বাজার। দিল্লি বাজার। ভাষার অবাধ মেলামেশা। তার কাছাকাছি আজও মির্জা গালিবের বাড়ি। অঞ্জুম উর্দুতে কথা বলত। উর্দুতে সব কিছুর একটা gender আছে – Masculine কিংবা Feminine। কিন্তু অঞ্জুমদের জন্য সেই ভাষায় মাত্র দুটোই শব্দ – হিজড়া আর কিন্নর। “But two words do not make up a language“। শিদ্দৎ সে দিল-এ-হাল বঁয়া করনা তো দূর কি বাত রহি।

হিন্দুত্ববাদী সরকার যেভাবে পাঠ্যপুস্তক থেকে উর্দু শব্দ বাদ দিতে চায়, সেভাবেই সমাজ বাদ দিয়েছে, ঠেলে দিয়েছে অঞ্জুম, আহ্‌লম বাজিদের। উর্দু কেবল মুসলমানদের জুবানি নয়। ভাষা কারুর বাপের সম্পত্তি নয়। কাজেই যে যুক্তিতে এই ভাষা খারিজ করার চেষ্টা চলছে তা ভিত্তিহীন, যুক্তিহীন। একচেটিয়া হিন্দি ভাষার আধিপত্য, হিন্দুত্ববাদের জিগির, মুসলমান-দলিত বিদ্বেষ – ঘৃণ্য এই কর্মকান্ডকে ভাষায় ব্যক্ত করতে পারব এমন আলফাজ্‌ই নেই আমার। আচ্ছা বলুন তো, এই উপন্যাসের দু’টি শব্দ – “লাল সেলামালেকুম” – কোন ভাষা?

ভারতবর্ষের একমাত্র বা বিরলতম বাসস্থান নয় খোয়াব্‌গাহ্‌। একবালপুর, বীরেশ গুহ স্ট্রিট – কলকাতার মধ্যেই এমন অনেক খোয়াব্‌গাহ্‌ আছে। তবে অঞ্জুমদের জন্য এই খোয়াব্‌গাহ্‌ও ক্ষণিকের আশ্রয়। চিরস্থায়ী নয়। তাদের অন্তিম আশ্রয় জন্নত গেস্ট হাউস – শহরের কোনো পরিত্যক্ত কবরখানা – Ministry of Utmost Happiness। এই কবরখানা, এই জন্নতেই ঠাঁই নিতে আসে সমাজের প্রান্তিক, বর্জিত মানুষেরা। তাদের শেষ ঠিকানা। এখানেই বড় হয়ে উঠবে কমরেড রেবতীর মেয়ে উদয়া। এখানেই মাজ্‌হার-এ-শোহদ্দা আর জন্নতের দরজার ফাঁক দিয়ে নিষিদ্ধ আলোয় তিলোত্তমা মুসাকে দেখতে পাবে এক মুহূর্তের জন্য। এই মুহূর্তেই জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা আবছা করে দেন অরুন্ধতী। পরমুহূর্তে তাকে ডেকেও আর সাড়া পাওয়া যাবে না। ভাসতে ভাসতে কোথায় যেন চলে যাবে।

“পড়ে থাকে শুধু জোড়া দুটো হাঁটু, দুব্‌লা একটা কাঁধ আর আড়ষ্ট লম্বা হাত। সরকারি সাজার কানুন-মাফিক। পাঁচিল আর বেয়নেটের গোল একটা জালের ভেতর।” [ কমুনিস]

এই ধ্বংসস্তুপের মধ্যেই উদয়া তার ছোট্ট হাত মুঠো করে, আসমানের বুক চিরে বলতে শিখবে লাল সেলাম। গুব্‌রে পোকা গুই কিয়োম আগলে রাখবে তাকে, আগলে রাখবে এই পৃথিবী।

কুলসুম বাঈ, অঞ্জুম, বা বিসমিল্লাদের দুর্বিষহ জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম কোনোদিন ‘সভ্যতার’ একচেটিয়া ইতিহাসে স্থান পায় না। অরুন্ধতীর উপন্যাসে আছে এই প্রান্তিক মানুষদের অস্তিত্বরক্ষার লড়াই, অন্ত্যজদের জেহাদ ঘোষণা এই অকেজো সমাজ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। লাল কেল্লার দেওয়ালে সরকারের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো। দু’শো বছরের মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস পাঠ। সেই রেকর্ডিং-এ, মধ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর মহম্মদ শাহ রঙ্গিলার শাসনকালে তাঁর দেওয়ান-ই-খাস দরবারে এক মুহূর্তের জন্য শোনা যায় এক হিজড়ার আধচাপা হাসি।

Audible, deep, distinct, rasping, coquettish giggle of a court eunuch…There! That is us…The moment passed in a heartbeat. But it did not matter. What mattered was that it existed.

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s