সহজ পাঠ

লিখেছেন সর্বজয়া ভট্টাচার্য।

 

আমাদের বয়স তখন দশ কিংবা তার কাছাকাছি। পুজোর ছুটি পড়ে গেছে, পাড়ার প্যান্ডেল অর্ধেক তৈরি হয়ে পড়ে আছে, স্টেজ খাটানো চলছে তখন। তারই পাশাপাশি, যে ঘরে প্রতিমা রাখা হবে সেই ঘরটাকে সাজানো হচ্ছে। আমরা সকাল থেকে হাজির। কাকিমা-মাসিমারা আলপনা দিচ্ছেন, পাড়ার দিদিরা কাগজ কেটে কেটে নিমেষে তৈরি করে ফেলছে বিচিত্র ডিজাইন। আমরা হাঁ করে দেখছি। দেখছি ওদের মধ্যে একজন মোমবাতির শিখায় গরম করে নিচ্ছে সরু ছুরি, আর দ্রুত চালাচ্ছে থার্মোকলের পাতের ওপর দিয়ে। বেরিয়ে পড়ছে একেকটা অক্ষর। দেখছি কেউ হাতে তুলে নিচ্ছে রঙের ভাঁড় আর তুলি – কলসির গায়ে আঁকা হয়ে যাচ্ছে ফুল, লতা। আমরা বসে আছি, যদি ছিঁটেফোঁটা কোনো কাজ আমাদের দিকেও এসে পড়ে – কেউ যদি ডেকে বলে আঠা লাগাতে কাগজের পেছনে, বা সাজিয়ে দিতে বলে কাগজের ফুল – তাহলে সেই কাজের মধ্যে দিয়ে বড়দের দলে নাম লেখানো হয়। বড়দের দলে মানে দিদিদের দলে। দিদিদের আলাদা দল আছে। ওরা সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়ির সামনের বেঞ্চিতে বসে গল্প করে। দল বেঁধে ফুচ্‌কা খেতে যায়। এমনকি, সিনেমাতেও যায়। আমরা অবাক চোখে দেখি – ওদের বিনুনি থেকে হাই হিল জুতো পর্যন্ত – সব কিছু কেমন স্বপ্নের মত ঠেকে। আমরাও একদিন ওরকম হব! ভাবলেই পেটের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, বুকের শব্দ গুম্‌ গুম্‌ করে কানে বেজে ওঠে।

সেই শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ শোনা যায় অমুক কাকিমার গলা। “ছিঃ ছিঃ! লজ্জা করে না? এই অবস্থায় ঠাকুরের জিনিসে হাত দেওয়া?” তাকিয়ে দেখি, মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে দিদিদের একজন। সবাই কাজ থামিয়ে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু কেউ বলছে না কিছু। আমরাও কিছুটা হতবাক। কী এমন হল হঠাৎ? কিছু কী করে ফেলেছে? ভুল কিছু? ভেঙে ফেলেছে বা নষ্ট করেছে কোনো জিনিস? এদিক ওদিক তাকাই। কই না তো। সবই তো ঠিক আছে। যেরকম ছিল সেরকমই আছে সব কিছু। তাহলে? তাহলে বকা খাচ্ছে কেন? কাকিমা রাগ করলেন কেন হঠাৎ? আমরাও ভয়ে ভয়ে উঠে যাই ওইখান থেকে।

উঠে যাই বটে, কিন্তু প্রশ্ন তো থেকে যায়। বন্ধুদের একজন নিচু গলায় বলে, ” এ মা! বুঝতে পারিসনি তোরা?” কী? কী? প্রচন্ড কৌতূহল নিয়ে আমরা তাকিয়ে থাকি তার দিকে। “শরীর খারাপ হয়েছে ওর।” শরীর খারাপ? তাহলে কাকিমা এমন করে বকলেন কেন? আরো তো খারাপ লাগবে ওর। ছোঁয়াচে কিছু বোধহয়। তাই বুঝি সরে যেতে বললেন। “ধুর্‌, কিস্যু জানিস না তোরা। এটা সেরকম শরীর খারাপ নয়। অন্যরকম। শুধু মেয়েদের হয়।” শু-উ-ধু মেয়েদের হয়?! বিশ্বাস হয় না আমাদের। এ আবার কিরকম কথা? মেয়েদের আলাদা শরীর খারাপ? শুধু মেয়েদের? কেন? শুধু মেয়েদের কেন? আরো একরাশ প্রশ্ন জড়ো হয় আমাদের মনে। উত্তর পাই না।

পরের দিন প্যান্ডেলে গিয়ে দেখি, সেই দিদি নেই। আরেকটু খেয়াল করে দেখি, ঘর সাজানোর কাজে দিদিদের ভূমিকাই বেশি – আলপনা, কাগজ কাটা, রঙ করা, ছবি আঁকা – এই সমস্ত কাজ দিদিদের। কিন্তু যখন মই চেপে সাঁটতে হবে সেসব কাগজ, তখন আর দিদিরা নয়, ডাক পড়ে দাদাদের। দাদাদের আলাদা দল আছে। ওরা বিকেলবেলা ফুটবল খেলে, সন্ধ্যেবেলা পার্কের রেলিঙে বসে গল্প করে। ওদের নাচের ক্লাস, গানের ক্লাস নেই। ওদের আলাদা কোনো শরীর খারাপ আছে কিনা, আমরা জানি না। পুজোর হুল্লোড়ে আমাদের এসব প্রশ্ন ধামাচাপা পড়ে যায়।

কয়েক মাস পর, ইস্কুলে একদিন পাশের বেঞ্চের বন্ধু ক্লাসের মাঝখানে কেঁদে ফেলে। নীল টিউনিকের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠছে ছোপ ছোপ দাগ। কী ব্যাপার? কী ব্যাপার? আমাদের চল্লিশ জোড়া চোখ ঘুরে যায় ওর দিকে। আশেপাশে কয়েকজনেরও চোখ ছলছল। ও কী মরে যাচ্ছে? কেউ কী মেরেছে ওকে খুব জোরে? কারণ এখন বোঝা যাচ্ছে, নীল জামার ওপর স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এখন লাল লাল রক্তের দাগ। দিদিমণি তাড়াতাড়ি এসে ক্লাস থেকে ওকে নিয়ে যান। ডাক্তার ডাকতে হবে নিশ্চয়ই। বাড়ির লোককে খবর দিতে হবে। কিছুক্ষণ পর দিদিমণি ফিরে আসেন। একা। আমাদের জিজ্ঞাসু চাহনির উত্তরে নিজেই মৃদু স্বরে বুঝিয়ে বলেন আমাদের, ওর আসলে শরীর খারাপ। শরীর খারাপ! ক্লাস শেষ হলে এবার আর অসুবিধে হয় না। এক বন্ধু এসে বুঝিয়ে দেয় সব। মেয়েদের, এটা শুধু মেয়েদেরই শরীর খারাপ। প্রত্যেক মাসে হয়। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখিসনি? আমাদের সব্বার হবে। এর মানে, বড় হয়ে গেছি আমরা।

বড় হয়ে গেছি? এই ঘটনার মাস কয়েক পর আমিও যখন বাথরুমে রক্ত দেখে শিউরে উঠেছি, তখন প্রথমেই কানে বেজে উঠেছে কাকিমার বকুনি, শরতের রোদে ম্লান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়াতুতো দিদির মুখ ভেসে উঠেছে চোখের সামনে। এইবার, এইবার তাহলে দিদিদের দলে নাম লেখানো যাবে। সবাইকে বলে দেওয়া যাবে, বড় হয়ে গেছি আমি! প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে আমার ভালোই লাগে এবার। নিজেকে বেশ কেউকেটা মনে হয়। বড় হয়ে গেছি!

কিন্তু দেখা গেল, এই বড় হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ঢাক পিটিয়ে রাষ্ট্র করার মত ব্যাপার আদপে নয়।  এই যে মনে হচ্ছে কেউ একটা পেটে ছোরা ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে দিচ্ছে পাকস্থলী, পা চ্যাট চ্যাট করছে ঘামে, পা লোহার থামের মত ভারি, পেট ফুলে যাচ্ছে, মাথা ব্যাথা করছে – এসব চেপে রাখতে হবে। প্রত্যেক মাসে। যেমন ঢেকে রাখতে হবে স্কার্টে রক্তের দাগ, বিছানার চাদরে রক্তের দাগ, প্যান্টে রক্তের দাগ, চেয়ারে রক্তের দাগ। শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াকে বলে যেতে হবে শরীর খারাপ। নিজেকে নোংরা ভাবতে হবে ওই ক’দিন। “নোংরা। “অপবিত্র”। তাই লুকনো দরকার।

 দিদিরা সব কলেজে উঠল, অনেকে পাড়া ছাড়ল, অনেকে শহর, অনেকে চাকরি পেল, অনেকে বিয়ে করে চলে গেল। আমরা বেঞ্চি দখল করলাম। সেখানেও লুকোতে শিখলাম। বড় হওয়ার প্রথম নিয়ম। কাউকে বলা যাবে না, কাল সন্ধ্যেবেলা কার চোখ টি-শার্ট ভেদ করে পৌঁছে গেছে বুক অব্দি। বলা যাবে না কার হাত ঘোরাফেরা করেছে কোমরের কাছে। চেপে যেতে হবে। জেনে যেতে হবে, ‘শরীর খারাপ’-এর সময় পুজোর জিনিসে ভুল করেও হাত দিতে নেই। হাত দিলে পাড়ার প্যান্ডেলে সবার সামনে বকুনি খেতে হবে। বকুনি খেতে খেতে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কারণ ওটাই নিয়ম। মেয়ে হওয়ার ওটাই নিয়ম। এতদিন মেয়ে নয়, অন্য কিছু ছিলে। এখন তোমার শরীর মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত। অতএব মেয়ে। আর মেয়ে হওয়ার একমাত্র নিয়ম, চুপ করে থাকা। দোকানে গিয়ে চুপিচুপি বল কী দরকার, কালো প্যাকেটে মুড়ে ঠিক পৌঁছে যাবে তোমার হাতে, বাকি খদ্দেররা খানিক সরে যাবে, রাস্তা করে দেবে, দেখেও ভান করবে না দেখার। কথা যদি বলতেই হয় এইসব নিয়ে, তাহলে বল শুধু মেয়েদেরই সাথে, আর বল মৃদু স্বরে। ট্যাক্স দাও ১২%, কিন্তু কথা বোলো না। তুমি বড় হয়ে গেছ। মেয়ে হয়ে গেছ তুমি।

আমরা বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনটাও ভাগ হয়ে গেল কাঠের বেঞ্চি আর পার্কের রেলিঙে। ওরা যখন পার্কে ফুটবল খেলে, আমরা তখন রেলিঙের আশেপাশে, দোলনার পেছনে ঘোরাফেরা করি। ওদের খেলা শেষ হয়, আমরাও গুটিগুটি পায়ে বেঞ্চিতে এসে বসি। ওরা পার্কের রেলিঙে পা ঝুলিয়ে বসে। আড্ডা দেয়। ওরা আড্ডা মারে, আমরা গল্প করি। আমাদের আর ফুটবল খেলা নেই, রেলিঙে পা ঝোলানো নেই, আড্ডা নেই। ওরা মানে ছেলেরা। বড় হওয়ার দ্বিতীয় পাঠ। ছেলেরা কখনো বন্ধু হয় না। কাল অব্দি যার সাথে তুমুল মারপিট করেছ, মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছ, গলা জড়িয়ে বাড়ি ফিরেছ যার সাথে, আজ থেকে সে তোমার বন্ধু নয়। কারণ তোমরা এখন বড় হয়ে গেছ। আসলে ব্যাপারটা এক দিনে হয় না কখনো। হয় আস্তে আস্তে। আমাদেরও হল। যাদের সাথে রোজ খেলতে না পেলে দিনটাই অন্ধকার হয়ে যেত, আস্তে আস্তে তারা দূরে সরে গেল। প্রথমে বন্ধ হল খেলা – সে বাড়ির ভেতরেই হোক আর বাইরে। খেলা থেকে গল্প, গল্প থেকে হাসি, হাসি থেকে মোলাকাত – সব ফুরিয়ে এলো। তখন চোখে চোখ পড়ে গেলে তড়িৎ গতিতে নামিয়ে নিতাম চোখ – লজ্জায়? নাকি এই ভয়ে, যদি আবার গল্প করে ফেলি? যদি আবার হেসে ফেলি, যদি চোখে চোখ রাখলে মনে পড়ে যায় সব কিছু? তাহলে বড়দের দল থেকে বাদ। বড় হলে ছেলেরা আর মেয়েরা শুধু বন্ধু থাকে না। থাকতেই পারে না। আর যদি বা বন্ধু থাকে, একগাদা নিয়মটিয়ম উপেক্ষা করে, তাও সতর্ক থাকতে হবে সবসময়।

বোধহয় কতকটা এই যুক্তিতে আর কতকটা বন্ধুদের কাছে হিরো সাজার অছিলায় মেয়েদের স্কুল ব্যাগে জমা পড়তে লাগল প্রেমপত্র। পাড়ার কাকিমা, হিন্দি সিনেমা, বাংলা সিরিয়াল, দাদা, দিদি, বাড়ি শুদ্ধু সব্বাই বুঝিয়ে দিয়েছে, অনেকে সোজাসুজি, অনেকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যে ছেলে আর মেয়েরা বড় হয়ে গেলে তাদের মধ্যে ‘প্রেম’ হয়। প্রেম শব্দটাও তখন নিচু স্বরে বলতে হত। কখনো একা একা জানলার ধারে কিংবা রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে দেখেছি, বেশ একটা ভয় ভয় ব্যাপার। যেন নিষিদ্ধ কিছু। যদিও শুনেই চলেছি, বড় হলে ছেলেরা আর মেয়েরা প্রেম করে, যদিও চারদিকে সব্বাই মিলে এটাই বুঝিয়েছে যে প্রেম এক প্রকারই এবং তা পুরুষ ও নারীর মধ্যে এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি বিয়ে – তাও ভাবতে কেমন ভয় করে না? যদিও দেখেছি স্কুল বাসের পেছেনে কোনো কোনো দাদা আর দিদি হাত ধরাধরি করে বসে আছে, দেখেছি গলির বাঁকে চকিতে মিলিয়ে যেতে পাড়াতুতো দিদির প্রেমিক যার মুখ এক মুহূর্ত আগে… দেখেছি। তবু ওসব ভাবলেই বুকের ভেতর ডানা ঝটপট করে কোনো পাখি, পা ভারি হয়ে আসে। তাই স্কুল ব্যাগে প্রেমপত্র জমা হতে থাকলে প্রথমে ভয় করে। যদি কেউ জেনে ফেলে? কী হবে কেউ জেনে ফেললে, এই প্রশ্নটাও নাড়াচাড়া করে দেখেছি খানিক। জেনে ফেললে সবাই ভাববে, আমি আস্কারা দিয়েছি। আমিই কিছু করেছি যে কারণে আমাকেই পাঠানো হয়েছে এই চিঠি। কই, আর কাউকে তো পাঠায়নি? আর যদি পাঠিয়েও থাকে, সেই মেয়েটার মত হবে নাকি? কোথায় বইতে মুখ গুঁজে লেখাপড়া করবে, তার বদলে প্রেমপত্র! এসব অভিযোগের বিরুদ্ধ যুক্তিও মনে মনে সাজিয়ে নিয়েছি। ভেবেছি চিৎকার করে বলব, বলে দেব সবাইকে যে এতে আমার কোনো দোষ নেই। আমি চাইনি। আমি চাইনি ও আমাকে ভালবাসুক, আমি চাইনি ওর আমাকে ভালো লাগুক। আমার তো লাগে না ভালো। আমি তো কখনো ভাবিইনি ওকে নিয়ে। আমি ওর চিঠি পেয়ে দলা পাকিয়ে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু তাও পরের দিন ঠিক ব্যাগের ভেতরে পাওয়া গেছে গোলাপি খাম। সবাই চোখাচোখি করেছে। দেখেছে আমার মুখ নিচু হয়ে গেছে। ভেবেছে লজ্জা পেয়েছি। বোঝেনি, লজ্জা নয়, ভয় নয়, অভিমান নয়, আসলে ভেতরে ভেতরে জমা হচ্ছে রাগ, জমা হচ্ছে প্রচন্ড চিৎকার। যেকোনো মুহূর্তে আমি ভেঙে দিতে পারি বড় হওয়ার, মেয়ে হওয়ার সমস্ত নিয়ম।

কিন্তু ভেঙে দেওয়া অত সোজা নয়। তাই যারা যারা সাহস করে বলল, “আমরা এসব চাই না”, তাদেরকে স্কুল বলল চুপ করতে, কারণ তারা বড় মেয়ে, আর বড় মেয়েরা এসব কথা জোরে জোরে বলে না; অনেকে বলল, “এতে রাগ করার কী আছে? তোমাদের ভালো দেখতে, তাই তোমরা প্রেমপত্র পাও। কত্ত মেয়ে পায় না। তাদের কথা ভাবো!” ছেলেরা বলল, “এদের দেমাক বেশি। একটু পাত্তা পেয়েছে কি পায়নি, অমনি মাটিতে আর পা পড়ছে না। এদের সাথে কথা বলারই দরকার নেই। এদের একটু শিক্ষা দেওয়া হোক।”

এসব থেকে আমরা কী শিক্ষা লাভ করলাম?

আমরা শিখলাম ভালো দেখতে হওয়ার মাপকাঠি – রোগা চেহারা, ভারি বুক, ফর্সা রঙ, টানা চোখ, টিকোলো নাক। আমরা শিখলাম, ভালো দেখতে হওয়া মানেই হাঁ করে তাকিয়ে থাকা চোখ, গিলে খাওয়া দৃষ্টি, হাত-পা-আঙুল-কনুই-কাঁধ যা দিয়ে পারবে ছুঁতে থাকবে হাত-পা-পিঠ-বুক-কোমর যা পাবে। 

আমরা শিখলাম খারাপ দেখতে হওয়া অপরাধ। তাই যেভাবে পারো চেষ্টা করো সুন্দর হয়ে ওঠার। বিজ্ঞাপন থেকে শিক্ষা নাও, বিনোদন থেকে শিক্ষা নাও, বাড়ি থেকে, পাড়া থেকে শিক্ষা নাও। শেখো কোন মশলা কতটা গুঁড়ো করে কতটা দুধে মেশালে চামড়া ফর্সা হবে। শেখো কত গ্রাম দইয়ের সাথে কতগুল ডিম মিশিয়ে কত ঘন্টা মাখিয়ে রাখতে হবে চুলে। শেখো অ্যান ফ্রেঞ্চ অথবা ভীট। শেখো দুপুর বেলা এক হাতা ভাত খেয়ে লুকিয়ে গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি। শেখো না খেয়ে থাকা।

আসলে শেখো মেয়ে হওয়া অপরাধ। মেয়ে হয়ে জন্মানো অপরাধ। জন্মানো অপরাধ।

আমরা শিখলাম ছেলেদের কাছে পাত্তা পাওয়া বড় হওয়ার, মেয়ে হওয়ার, অথবা বড় মেয়ে হওয়ার নিয়ম। যদি পাত্তা না পাও, তাহলে তুমি বড় হওনি, অথবা মেয়ে হওনি। পাত্তা না পেলে তাই ডিপ্রেশান শেখো।

শেখো, বিয়ে হলে তুমি আর ধর্ষিতা হতে পারবে না কারণ তোমার শরীর আর তোমার নেই, তোমার স্বামীর, তাই সে তা ভোগ করতে পারে ইচ্ছেমত, তাই তোমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনো প্রশ্ন নেই, তাই বিবাহিতা নারীর ধর্ষণ আসলে ধর্ষণ নয়, আসলে ধর্ম। পুরুষের ধর্ম। শেখো একটা শব্দ যার উচ্চারণে ভেঙে যেতে পারে বৈবাহিক সম্পর্ক এক লহমায়। কারণ ধর্ম পুরুষের ধর্ম। আইন পুরুষের আইন।

শেখো, যদি পাত্তা না দাও ছেলেদের, যদি কথা না শোনো, যদি না মানো নিয়ম,  আর যদি দাও-ও পাত্তা, যদি কথা শোনো, যদি মেনেও থাকো সমস্ত নিয়ম, তাহলেও শহরের মাঝখানে হোক বা গ্রামে, রাস্তায় হোক কিংবা বাড়িতে কিংবা স্কুল বা কলেজে বা কাজের জায়গায়, কিংবা বাসে, কিংবা গাড়িতে, দিনের বেলায় হোক অথবা পড়ন্ত বিকেলে অথবা গভীর রাত্তিরে – তোমার শরীর অধিকার করবে পুরুষ, পুরুষের সহজাত অধিকারে। আর আমরা বলব, “বেশ হয়েছে। শিক্ষা পাওয়া দরকার।” বলব, “কী দরকার ছিল অত রাতে ওখানে থাকার?” বলব সাজানো ঘটনা, বলব নষ্ট মেয়েছেলে, বেশ্যা বলব কারণ বেশ্যা বললে মাপ হয়ে যায় ধর্ষণের অপরাধ, আসলে বেশ্যা বলবা না, বলব খান্‌কি, বলব খান্‌কি মাগি তোর এত বড় সাহস, বলতে বলতে কপাল ফাটিয়ে দেব, আগুন ধরিয়ে দেব গায়ে, যোনিতে ঢুকিয়ে দেব লোহার রড, ত্রিশূল, পাথর, বালি যা পাব হাতের কাছে, চোখ রাঙিয়ে বলব ফেরত যা রান্নাঘরে, বলব বিছানায় চল, বলব দু’ ঘন্টার টাকা নিয়েছিস কিন্তু খদ্দেরকে খুশি করিসনি, বলব তোকেও বেঁধে দেব আর্মি জিপের সামনে, মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারব, গুজরাত, গুজরাত করে দেব, কুনান পোশপোরা, মণিপুর বাস্তার…

আর যদি আমারই ভালো লেগে যায় কাউকে? তখন? তখন কী হবে? তখনও নাকি চুপ করে থাকাই নিয়ম? খারাপ লাগলেও বলা যাবে না, ভালো লাগলেও বলা যাবে না। কাউকে ভালো লেগেছে, অমনি সেটা মুখ ফুটে বলতে হবে? ভাববে কী লোকে? কী? কী ভাববে? ভাববে, তর সইছে না। ভাববে, শরীর, শরীর। ভাববে, মন নেই। আর যদি নাই বা থাকে? হতেই পারে না। ভদ্র ঘরের মেয়ে হয়ে জন্মেছ যখন, তখন মনটাই আছে তোমার, আর শরীরটা নেই। ভারতবর্ষের কত শতাংশ নারী যেন নিজেদের গোটা জীবনটা কাটিয়ে দেন অর্গ্যাজ্‌ম অনুভব না করেই? বিদ্যাসাগর কেন বিধবাদের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন জানো? অল্প বয়সী বিধবাদের যৌনতাকে তক্কে তক্কে রাখার জন্য। ভেবে দেখো একবার, যুবতী বিধবা মেয়ে, সে যদি শরীরের জ্বালায় নিজে কিছু করে বসে? ধ্বসে পড়বে না সযত্নে রক্ষিত সমস্ত সংস্কার, পরিবার, মূল্যবোধ? তার থেকে বরং বিয়ে দেওয়া ভালো। তবে বিয়ে করলেই যে ব্যাপারটা মিটে গেল, তা তো নয়। শারীরিক সুখ নয়, সঙ্গম শুধু (পুত্র) সন্তান উৎপাদনের জন্য। আর সব সঙ্গম আইনত নিষিদ্ধ। সুখ বলে কিছু নেই, চাহিদা বলে কিছু নেই, পারলে বলতাম যৌনতা বলেই কিছু নেই, কিন্তু তা তো বলতে পারি না। কারণ আসলে শেখাতে হবে লিঙ্গ দুই প্রকার ও যৌনতা এক প্রকার। বাকি সব অস্বাভাবিক। বাকি সব প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। ধর্ম-বিরুদ্ধ। বে-আইনি।

এইসব বিরুদ্ধতার বাইরে ‘অবাধ্যতামূলক বে-আইন’ চালাবার কিছু সঙ্গীও জুটে যায়। সেই ছোটবেলা থেকেই। আমরাও সেই ছোটবেলা থেকেই নিজেদের অজান্তে এই অবাধ্যতামূলক বে-আইন চালাই – খুব ছোট ছোট ক্ষেত্রে। আমাদের সেই পাড়ার দিদি, পরের দিন সে প্যান্ডেলে আসেনি দেখে পাড়ারই একজন ডেকে আনে তাকে, একরকম জোর করে তাকে দলে টেনে নেয় অনেক চোখ রাঙানি অগ্রাহ্য করে। আমরাও কিছুটা সাহস পাই তার থেকে। তাই এর বেশ কিছু বছর পর আরেকবার এই ঘটনা আরেকটি ছোট মেয়ের সঙ্গে ঘটবার সময়, আমরা আর চুপ করে থাকি না। আমাদের মৃদু কন্ঠস্বর একসাথে জোরালো হয়ে ওঠে। আর তার সামনে মাথা ঝোঁকাতেই হয় স্থবিরতাকে। আমাদের গানের ক্লাসে ভর্তি হয় পাড়ার এক ছেলে। একজনই। কিন্তু সেটাও যে অনেক, এটা আমরা তখন না হলেও, বুঝতে পেরেছি পরে। বুঝতে পেরেছি, গানের ক্লাস থেকে ফেরার পথে কী কী শুনতে হয়েছে তাকে, কী কী গোপন ইঙ্গিত ভেসে এসেছে আড়াল থেকে। ওর খারাপ লেগেছে নিশ্চয়ই, কিন্তু গানের ক্লাসে আসা বন্ধ করেনি। আমরাও মই বেয়ে উঠতে শুরু করি, ছেলেরা আলপনা দেয় – কাজ ভাগ করে নিতে শিখি নিজেদের পছন্দ মত। বাড়িতে দেখি, মা থাকলেও, একেকদিন বাবা রান্নাঘরে মাছের ঝোল চাপাচ্ছেন। কদিনই বা? মাসে দু’দিন হয়তো। কোনো মাসে আরেকটু বেশি। আমি অনায়াসে ছোট করে কেটে ফেলি চুল। সেলুনে গিয়ে বলতে হত, ‘বয়েজ্‌ কাট্‌’। সত্যিই তো, আমার ছোট চুল দেখে শুধু সেলুনের দিদিরা নয়, বাইরের অনেকেও তো বলত, “ছেলেদের মত”। আর কলেজে উঠে ছেলেরা যখন ঝুঁটি বাঁধতে শুরু করল তখন তাদেরও তো বলা হত যে তাদের মেয়েদের মত চুল! কিছুটা শ্লেষ দিয়েই বলা হত কথাগুলো। সেই ছোটবেলাতেও। কখনো কখনো আমাদেরও গায়ে লেগেছে নিশ্চয়ই। বিশেষত ‘মেয়ে’ হয়ে ওঠবার তীব্র যন্ত্রণার সময় তো হয়েইছে। শরীরের আর কোনো অংশকে বদলাতে পারি বা না পারি, চুল তো বদলানো সম্ভব। কিন্তু বাড়ির শাসনে সেই গিয়ে কেটে আসতে হত। আর প্রত্যেকবার সেই এক মন খারাপ। আসলে এক গোছা চুল কপালে এসে পড়লেই আমাদের যে হিড়হিড় করে সেলুনে টেনে নিয়ে যাওয়া হত, তার কারণ ছিল মূলত প্র্যাক্টিকাল। চুল লম্বা হলে তার যত্ন নিতে হবে – তেল মাখাতে হবে নিয়ম করে, শুকোতে হবে, বাঁধতে হবে – এত সময় কোথায়? তার চেয়ে কেটে দেওয়া হোক – ওতে ঝামেলা অনেক কম। এই যুক্তিতেই কাটা হত চুল, আমরা জানতামও সেটা। কিন্তু এর মধ্যে দিয়েই আমরা শিখলাম মেয়েদের ছোট চুল থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। দেখতামও আশেপাশে বড়দের অনেকেও ছোট করে চুল কাটেন। এমনকি ইস্কুলের দিদিমণিও। তাই দেখে আমরাও ভরসা পেতাম। চুল কাটা অথবা না কাটার রাজনীতি সম্পর্কে জেনেছি অনেক পরে। আমাদের ছোটবেলাতে বাংলা সাহিত্যের সেই বিধবা পিসিমা চরিত্রটি পরিবার থেকে অবলুপ্ত হয়েছিলেন। নইলে আমাদের মনেও গেঁথে থাকত, বিধবা মানে ন্যাড়া মাথা বা ছোট চুল। ওই জন্যেই ছোট চুল খারাপ, ন্যাড়া হওয়া তো অকল্পনীয়। এর পাশাপাশি ছিল লম্বা, ঘন, কালো চুলের প্রশস্তি। এবং শুধু সাহিত্যেই নয়। নতুন শতাব্দী আসবার ঠিক আগে, শাবানা আজমি আর নন্দিতা দাস যখন ন্যাড়া হলেন, তখনো বোঝার বয়স হয়নি আমাদের, দুই মেয়ের চুল কাটার ঘটনা কেন পৌঁছে যায় খবরের কাগজে।

একদিকে ছিল ঘরের উদাহরণ, অন্যদিকে তেমন ছিল বাইরেরও। আর ছিল নিজেদের ভেতর থেকে উঠে আসা ‘অবাধ্যতা’। সমস্ত চুপ করে যাওয়া, সমস্ত চুপ করিয়ে দেওয়া, সমস্ত আদেশ, নির্দেশ, সমস্ত হুমকি, সমস্ত ধাক্কা, সমস্ত জোর করে ছোঁয়া – এই সব, সব কিছুর বিরুদ্ধে আমাদের নিজেদের সহজাত, স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। জোর করে ধরা হাত এক ঝট্‌কায় সরিয়ে নিয়েছি আমরা, তোমরা না শেখালেও। তোমরা শেখাওনি, তবু চোখে চোখ রেখেছি নিজে নিজে। রাস্তা দিয়ে মাথা উঁচু করে হেঁটেছি। কাঁধ থেকে জামা দু ইঞ্চি সরে গিয়ে ব্রা-এর স্ট্র্যাপ দেখা গেলে লজ্জা পাইনি। নিজের ইচ্ছেমত, পছন্দমত সেজেছি। পোশাক পরেছি নিজেদের ইচ্ছেমত। নিজের বন্ধু নিজেরাই বেছে নিয়েছি। আমরা ফুটবল খেলেছি, বক্সিং করেছি, সাঁতার কেটেছি, গান গেয়েছি, নাচ করেছি, নাটক করেছি, পার্কের রেলিঙে বসে পা দুলিয়েছি, চা-এর দোকানে আড্ডা মেরেছি, ট্রাক চালিয়েছি। এসব যে করতে পারি তা জানাই ছিল আমাদের। তোমরা ভুলিয়েছিলে। ভোলাবার চেষ্টা করেছিলে। কিন্তু আমাদের মনে পড়ে গেছে। মনে পড়ে গেছে, কোনো কিছু ভালো না লাগলে কী করতে হয়। মনে পড়ে গেছে, ‘না’ বলার অধিকার।

 একেকটা ‘না’ ধাক্কা খেয়ে খেয়ে ঘুরে ফিরে অনেক গুলো না একসাথে মিলিয়ে দিয়েছে আমাদের হাত, বেঁধে দিয়েছে অদৃশ্য সুতোয়। আর হাতে হাত রেখে আমরা হ্যাঁ বলেছি। দাবি জানিয়েছি। মনে করিয়ে দিয়েছি সাবিত্রীবাই ফুলে’র নাম। মনে করিয়ে দিয়েছি রোকেয়ার কথা। ফরাসি বিপ্লবের পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমরাই প্রশ্ন তুলেছি তোমাদের জয়ের স্লোগান নিয়ে – কেন, শুধু ভ্রাতৃত্ব কেন? কেন আর কোনো বন্ধন নয়? কেন সেই বহু প্রতিশ্রুত সমতা, কেন এই রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা শুধু পুরুষের? আমরাই ভোটাধিকারের দাবি করেছি নানা দেশে, নানা সময়ে।ছিনিয়ে নিয়েছি ভোটাধিকার।যখন তোমরা কলম দিতে চাওনি আমাদের, আমরা গোপনে কবিতা লিখেছি, বেনামে গদ্য। আমরা প্রেমিকার ঠোঁটে এঁকে দিয়েছি আদরের চিহ্ন তোমাদের রক্তচক্ষু, তোমাদের হাঁড়িকাঠ, তোমাদের জেলখানা উপেক্ষা করে। তোমাদের বন্দুকের সামনেও আমরা ভালোবেসেছি অন্য ধর্মের মানুষ। আমরা অন্তর্বাস পুড়িয়েছি প্রকাশ্য রাস্তায় প্রকান্ড দাবানলে। আমরা রাত্রিবেলা আলো ঢেকে অভ্যাস করেছি অক্ষর। আমরা গড়ের মাঠে ঘোড়া হাঁকিয়েছি। আমরা ল্যাবরেটরিতে, মহাশূন্যে, রান্নাঘরে, অফিসে; লোকাল ট্রেনে আমরা, আমরা মেট্রোতে, বাসে, এরোপ্লেনের ককপিটে; আমরা কলেজে, ইস্কুলে, কারখানায়, চা বাগানে; আমরা শোয়ার ঘরে, মিছিলের সামনে, রাস্তায়, ক্ষেতে, সমুদ্রে; কাশ্মীরে, মণিপুরে, ছত্তিসগড়ে, দিল্লিতে, কলকাতায়, ব্যাঙ্গালোরে, তেলেঙ্গানায়, সোনারপুরে, ভাঙড়ে, ইরানে, কুর্দিস্তানে, বাংলাদেশে, আসামে, ফ্রান্সে, প্যালেস্তাইনে, সিরিয়ায়, আফ্রিকাতে, আমেরিকায়, গ্রীসে, এভারেস্টের চূড়ায়, নর্থ পোলে – আমরা শুধু আমাদের ইচ্ছে মত বাঁচার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, নতুন দিনের জন্য, সাম্যের জন্য লড়াই করছি। 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s