মালতী’র সাথে কথোপকথন

কথা বলেছেন সোহিনী রায়।

একটা সময় ছিলো যখন প্রায় প্রতিদিন বিকেলবেলায় একবার করে ঢুঁ মারতাম সেলিমপুর-ঢাকুরিয়া রেলকলোনির এ ঘরে-ও ঘরে। যে মেয়েটির হাত ধরে এই কলোনিতে ঢুকেছিলাম, ধরা যাক তার নাম মালতী। ২০০৯ সালের শেষের দিকে আমার সাথে মালতীর যখন আলাপ হয় তখন তার বয়স সাতাশ। রোগা, ফ্যাকাশে, লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করে। একবার কথা বলতে শুরু করলে থামতে চায় না। আর সারা মুখে কয়েক লক্ষ ওয়াটের আলো জ্বালিয়ে হাহা করে হাসে। ওর ঐ হাসিটা দেখে একবার জিগ্যেস করেছিলাম  ‘নাচ করো?’ বলেছিলো  ‘হ্যাঁ”। তারপর তো শুনি ওর মাঝে মাঝেই রিহার্সাল থাকে। এক-দুবার ওর নাচ দেখতেও গেলাম। আর মাঝে মাঝেই দেখি ওর সেই হাসিটা থাকে না। নাচও বন্ধ থাকে। একটু টোকা মারতেই আগল খুলে গিয়েছিল। বর মারে। সন্দেহ করে। নাচ করতে দেয় না। সংসারে টাকা দেয় না।  ছেলেকে একাই দেখে। এইসব নানা কথা। বন্ধুত্ব হয়ে গেল প্রবল। ২০১৬ সালের পুজোর সময় উলুবেড়িয়ায় মিতা দাসের রক্তাত, ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায় শ্বশুরবাড়িতে। মিতার সেই ক্ষতবিক্ষত ছবিগুলো ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। মিতার সেই ছবিগুলো দেখিয়ে মালতীকে বলেছিলাম ‘কি বীভৎস না! কীভাবে মেরেছে?’। উত্তর দিয়েছিল ‘মারে যখন এভাবেই মারে। ওকে কি আর মেরে ফেলবে বলে মেরেছে! পিটিয়ে মেরে ফেলেছে’। তারপর স্বভাবসুলভ অনায়াস ভঙ্গীতে ঝরঝর করে বলে গেল নিজের কথা।

“আমি বিয়ে করেছিলাম ১৬ বছর বয়সে। বরের বাড়ির লোকেরা  আমাদেরই একটা বাড়িতে ভাড়া থাকত। বিয়ে হওয়ার পর আমি, আমার বর, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, ননদের ছেলে, দেওর সবাই একটা ঘরে থাকতাম। রাতে আমি আর আমার বর শুতে আসতাম আমার এক দিদির বাড়িতে। দিদি, জামাইবাবু, ওদের এক ছেলে আর এক মেয়ে শুতো খাটের ওপরে আর আমরা দুজন শুতাম খাটের নীচে। আমার বর ক্যাটারিং-এর কাজ করত। ঘরে কোনো টাকা-পয়সা দিত না। আমার শাশুড়ি তাই নিয়ে আমাকে খুব কথা শোনাত। আমি বলতাম ‘আমাকে কেন বলছ? ওকে বল’। ও ঘরে এলে কিন্তু কিছু বলত না। বিয়ের দু-তিন মাস পর থেকেই আমি লোকের বাড়ি কাজ করতে শুরু করি। বিয়ের পর পর আমার বর আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দিত না। আমার বাড়ির লোকদের সাথে কথা বলতে দিত না। কথা বলতে দেখলেই কী মার মারত! আমার বাবা-মা কিছু বলত না। বলত ‘ও নিজে বিয়ে করেছে ও নিজে বুঝবে’! তারপর পাড়ার লোকজন মা-বাবাকে বলল যে, ‘তোমরা কিছু বল, মেয়েটা তো এবার মরেই যাবে’। পাড়ার লোকজনের সামনে, ওদের ঘরে ঢুকে মারত। দিদির বাড়ি গিয়ে ওদের টিভি দেখলে চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে তুলে নিয়ে আসত। আমি যখন বিয়ে করেছিলাম তখন আমি ক্লাস এইট-এ পড়ি। বিয়ের কিছুদিন পর আবার পড়াশুনো শুরু করেছিলাম। আমি পড়তে বসলেই বর আমাকে মারত। বলত আমি আওয়াজ করে পড়ি, তাতে ওর অসুবিধা হয়। অন্যদের বাড়ি গিয়ে পড়লেও মারত। তারপর একসময় পড়াশুনো ছেড়ে দিলাম। ভাবলাম যদি মারটা কমে! একজন ব্যাটাছেলে আরেকজন ব্যাটাছেলেকে যেমন মারে তেমন মারত। বুকে, পেটে। আমার ছেলে পেটে ছিলো যখন তখন পিছন থেকে এসে বাঁশ দিয়ে মেরেছিল। আমি সামনের দিকে পড়ে গিয়েছিলাম। কাউকে বলিনি। ডাক্তারও দেখাই নি। সেই ব্যাথা আমার এখোনো হয়। নীচু হয়ে কাজ করলে কোমর সোজা করতে পারি না। ছেলের বয়স এখন দশ। এত মারত, এত মারত যে মাঝে মাঝে নিজেরই মনে হত মরেই যাব বুঝি। কেন যে এত রেগে যেত, কেন যে এত রেগে থাকত বুঝতেই পারতাম না কোনোদিন। বেশীরভাগ সময়েই মদ খেয়ে এসে মারত। পা টলত। পরে বলত ওর নাকি তখন মাথা কাজ করে না। আমি কিন্তু একটা জিনিস বুঝে গেছিলাম। ও যেখানে মদ খেত, মানে কোনো বন্ধুর বাড়ি হোক, বা কোনো মদের ঠেক হোক বা যাই হোক, মদ খেয়ে সেখান থেকে ঠিক রাস্তা চিনে বাড়ি যখন চলে আসতে পারে তার মানে বাড়িতে এসে ও যেটা করে সেটা নাটক। ওই নাটকটা ও করতে চায় তাই করে, মদের ঘোরে করে এরকম নয়। রাস্তার লোকদের ধরে ধরে তো মারে না! এতটা বাড়ি এসে আমাকেই মারে! আর তো কাউকে মারে না! পাড়ার লোকরা বলাতে আমার বাবা আসত মাঝে মাঝে, আমাকে বাঁচাতে। সবই তো আমাদের গায়ে গায়ে বাড়ি ছিলো। সবাই সবই জানত। আমার বাবার একটা পা কাটা ছিলো। ট্রেনে কেটে গিয়েছিল। বাবা আমার বরকে খুব বেশী আটকাতে পারত না। একসময় আমার মা পুলিশে গিয়ে কম্‌প্লেন করে; আমার বর, ভাশুর দু’জনেই গা ঢাকা দেয়। পুলিশ এসে কয়েকবার ঘুরে যায়। তারপর আবার আমার বররা ফিরে আসে। আমার সব যেমন চলছিল তেমনি চলে কিন্তু মারটা কিছুদিনের জন্য বন্ধ ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা আমাদের বাড়িতেই উঠি। আমার মাও একা ছিল। ভাই বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকত। মার কাছে চলে আসার পর মারটা প্রায় বন্ধই হয়ে যায় কিন্তু রাগটা থেকেই যায়। সবসময় আমার আর মার ওপর আমার বর রেগে থাকত। মাকে মাঝেই মাঝেই ঘুরিয়ে গালাগাল দিত। একদিন ওরকম গাল দিচ্ছিল খুব আমি ওর জিনিসপত্র সব বের করে দিলাম ঘরের বাইরে, বললাম ‘তুই বেরো, বেরিয়ে যা’। ও আমার মাকে কাঠের তক্তা নিয়ে মারতে গেল। আমি আটকালাম। মা আর আমি তারপর সেই তক্তা নিয়েই গেলাম থানায়। সেই যে ঘর থেকে বেরিয়েছে আর আমাদের ঘরে ঢোকেনি। প্রায় দেড় বছর হয়ে গেছে। পাড়ার লোকদের কাছে শুনি খুব দু:খ করে। পাড়ার লোকরা আমাদের কাছে বলতে আসে। বলে মিটমাট করে নিতে। বলে ‘আমরা তা’লে একসাথে মিলে একটা মীমাংসা করি’। আমি বলে দিয়েছি ‘একসাথে বসে আবার মীমাংসা কিসের? ঝামেলা তো আমি একা সামলাব। আমি যা ঠিক করেছি, তাই করব। ওকে ঘরে আমি থাকতে দেব না। আমি ওর ঘর করবও না। আমি এই ভালো আছি। নিজের মত আছি’। পাড়ার লোকজন আমাকে বোঝায় ‘তোকে সারাজীবন কে দেখবে বল?’ আমি ভাবি আমাকে এতদিন কে দেখেছে? আমার এখন বয়স তেত্রিশ। আমায় এই সতেরো বছর কে দেখলো, বিয়ের পর থেকে?”

মালতীর ডিভোর্স কেস সবে শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই ছেলেকে ঘিরে ওর সাথে ওর শ্বশুরবাড়ির টানাটানি শুরু হয়ে গিয়েছে। ও আরো রোগা হয়ে গিয়েছে। মুখের আলোর তেজ অনেক কমে এসেছে। খাটাখাটনি, দুশ্চিন্তা সবই অনেক বেড়ে  গিয়েছে। তবে তার জন্য ওর মুখ থেকে কোনোদিন কোন খেদ আমি শুনি নি। কোনো কিছু পেতে গেলে তার জন্য প্রচুর মূল্য চোকাতে হয়। আত্মসম্মান, স্বাধীনতা, নিজের জীবনের রাশ নিজের হাতে রাখা, ইত্যাদির মনে হয় কোন বিকল্প নেই। তাই কীসের মূল্যে মালতী কী পাচ্ছে , সেটা বোধ হয় মালতীর থেকে বেশী ভালো কেউ জানে না! 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s