নাটক জারি হ্যায়

লিখেছেন সোনালি ব্যানার্জি।

‘বোল মজদুর হল্লা বোল’– ক্রমশ, আরেকটু স্পষ্ট– ‘হল্লা বোল- হল্লা বোল’- আরেকজন, আরো একজন, একে একে আরো অনেকগুলো গলার স্বর একজোট – কারো হাতে প্ল্যাকার্ড – ‘ন্যূনতম বেতন ১০৫০ টাকা দিতে হবে’, কিংবা ‘ছাঁটাই, লক আউট বন্ধ করো’- লাল নিশান উড়তে থাকে, ঘুরতে থাকে এ’হাত ও’হাত- বিক্ষোভ চলে, বিক্ষোভ, নাকি নাটক? পুলিশে’র হুমকির প্রত্যুত্তরে শোনা যায়- ‘নাটক করছি’।

‘এই-এই-এ কী হচ্ছে? নাটক করো, নাটক। এসব শ্লোগান টোগান চলবে না’। – হুমকি আবারও, আবারও, যথারীতি সেসব উপেক্ষা করে শুরু হয় নাটক, চলতে থাকে নাটক, নাটক, নাকি বিক্ষোভ?

***

এই চলতে থাকা পথনাটিকার বিষয়বস্তু, অতএব, দেখা যাচ্ছে আরেকটা পথনাটিকা, যার মূখ্য বিষয় আবার ( বুঝে নেওয়া যায় ) -একদল চরিত্রের ঘুরে দাঁড়ানো, যারা এই চলতি কাঠামোয় ঠিক খাপে-খাপে আঁটেনি! এখন, নাটকের বিষয় হিসেবে এজাতীয় কাহিনী বেছে নেওয়া কি নিছক সিদ্ধান্ত? নাকি এর বিশেষ কোনো তাৎপর্য্য আছে? আবার উল্টোদিক থেকে ভেবে ফেললে, এ ধরনের কাহিনীর উপস্থাপনার জন্য, পথনাটিকা – এই মাধ্যমই বেছে নেওয়া হল কেন?

নাটক এগোতে থাকার সাথে সাথে দর্শক বা স্পেকটেটরকে খানিক বিব্রত করে তোলে এসমস্ত গোল-গোল প্রশ্ন- যার উত্তরের সূত্র খুঁজতে খানিক পিছন দিকে যাওয়া ছাড়া গতি নেই ; বিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই ফিরে যেতে হবে এবং তার সাথে আগে ভাগেই দিয়ে নিতে হবে একটি বিশেষ বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : উত্তরের সূত্র পাওয়া গেলেই স্বস্তি পাওয়া যাবে এরকমটা বলা যাচ্ছে না, বরং অস্বস্তির পারদ চড়ে যেতে পারে আরো কয়েক মাত্রা, এবং নির্লজ্জভাবে বলে ফেলছি, সেরকমটাই উদ্দেশ্য।

 ***

১৯১৭ পেরিয়েছে; বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত। লাল ফৌজের নেতৃত্বে সোভিয়েতের সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই অত্যাচারী জার’কে প্রত্যাখ্যান করেছে, হিড়হিড় করে টেনে নামিয়েছে মসনদ থেকে। ঠিক এইরকম পটভূমিতে একদল বিচিত্র মানুষের দেখা পাওয়া যেতে লাগল রাস্তা ঘাটে। শুধু বড় রাস্তা নয়, হাটে বাজারে, খামার বাড়ির উঠোনে, বন্দরে, কলকারখানার গেটে, সব জায়গায় হানা দিতে লাগল এরা। এরা কারা? কী এদের উদ্দেশ্য? আপাতভাবে বোঝাই যাচ্ছে, এদের উদ্দেশ্য সোভিয়েতবাসীর রোজকার জীবনযাপনে’র গন্ডিতে ঢুকে পড়তে চেষ্টা করা; যার মাধ্যম হিসেবে এরা বেছে নিলো পথনাটিকাকে,  আজ্ঞে হ্যাঁ, এরা সকলেই নাট্যকর্মী! চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ টপকে থিয়েটার নেমে এল রাস্তার মোড়ে।প্রোসেনিয়াম থিয়েটারে’র আদল আর খাটল না এইখানে; পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়িয়ে, কাজের জায়গায় হাজির হয়ে এরা দর্শকদের খুঁজে নিতো; অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত নীরব-অদৃশ্য নয় এইসব দর্শক, নাটকে মনোনিবেশ করার জন্য তৈরিও নয়, এদের নজর কেড়ে, দর্শক হিসেবে এদের গড়ে-পিটে নিতে তাই বদলে নিতে হল নাটক পরিবেশনার প্রাথমিক উপকরণগুলো; বলাই বাহুল্য, প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের মতো সেট-এর ব্যবহার থাকতো না এই ধরনের নাটকে। থাকতো না অভিনেতাদের সাজ-পোশাক বা মেক আপ-এর কোনো আড়ম্বর, আড়ম্বরবিহীনতাই এক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজি বলে ধরে নেওয়া যায়, বাহ্যিক কৃত্রিম আড়ম্বর যত ঝেড়ে ফেলা যায়, ততই দর্শকের সাথে আরো বেশি করে মিলেমিশে যাওয়া যায়, আরেকটু বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা যায় তাদের কাছে; কিন্তু এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কী? শুধুই দর্শকের  মনোরঞ্জন নয়, নয়- তার সপক্ষে যুক্তি খুঁজতে গিয়ে শুরুতেই নাটকের বিষয়বস্তুর দিকে চোখ ফেরানো যায়; যা দেখা যায় তা জনৈক সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ওঠা-পড়া’র বিবরণ, যেখানে আকাশ-কুসুম স্বপ্নের হাতছানি নেই, আছে রক্ত-ঘাম ঝরানো কঠোর বস্তুবাদী রোজনামচার গল্প। মনোরঞ্জনই মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে থাকলে বিষয় নির্বাচনের ব্যাপারটা যে খানিক আলাদা হত সেকথা বলাই বাহুল্য।

অক্টোবর বিপ্লবের প্রথম বর্ষপূর্তিতে মায়াকভস্কির মিস্ট্রি বুফে নাটকটি, সিটি স্কোয়ারে প্রায় কয়েক হাজার দর্শকের সামনে পরিবেশন করলেন মায়ারহোল্ড; বিপ্লবের কবিতা সমেত সার্কাস (Tent show)এর বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে এই প্রযোজনাকে করে তোলা হয় আকর্ষণীয় ; ফলে সহজেই দর্শকের মননে প্রবেশ করে এই ধারার থিয়েটার; যার উদ্দেশ্য, মায়ারহোল্ডের মতে, মানুষের কাছে নির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া, ‘the first concern of all those concerned in the theatre is the clarity of message’!

***

স্বাধীনভাবে, স্বচ্ছলভাবে হেসে খেলে বাঁচতে চাওয়া স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। এই চাওয়া ন্যায্য, কোনো অন্যায় নেই। কিন্তু গোল বাঁধে অন্য জায়গায়, যখন রাষ্ট্র আমাদের হকের পাওনায় থাবা বসায়, তখনও আমরা ভালো থাকতে চাই, চেয়েই যাই, একইভাবে এবং নিশ্চিতভাবেই তখনও এই চাওয়া অন্যায্য নয়, কিন্তু সমস্যা এই যে, এইরকম পরিস্থিতিতে ভালো থাকার উপকরণগুলো রাষ্ট্রের কবল থেকে ছিনিয়ে আনার জন্য শিরদাঁড়া টানটান করতে হলে প্রাথমিক শর্ত হিসেবে যতটুকু খারাপ থাকতে হয়, আমরা সেটুকুতেও রাজি নই। আমাদের এই অসহায় চাহিদার সুযোগ নেয় রাষ্ট্রই অতএব- না! আমাদের ভালো থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয় না, কারণ সেরকমটা হতে পারে না, আমাদের কেবল ভাবতে শেখানো হয় আমরা ভালো আছি। ঝলমলে বুর্জোয়া প্রচার মাধ্যম একটা দুর্দান্ত এস্কেপ রুটের সন্ধান দেয়, রঙিন দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে যেতে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি শ্রমিক ছাঁটাই নেই, কৃষক আত্মহত্যা নেই, ছাত্র খুন নেই, মূল্যবৃদ্ধি নেই, দাঙ্গা নেই, খিদে নেই, কিচ্ছু নেই- কিচ্ছু থাকে না- বিকিয়ে যায় সব- এই অন্তঃসারশূন্য সত্ত্বাকে আঘাত করার জন্যই এই ধারার নাটকে বিষয় হিসেবে তুলে আনা হয়  বাস্তবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এইসব উপকরণ । মনোরঞ্জন নয়, বরং স্পেকটেটর বা দর্শককে বিরক্ত করার, চোখের ঠুলি সরিয়ে ক্রমাগত অপ্রিয় বাস্তব চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোই তাই উদ্দেশ্য। স্পেকটেটরের ব্যক্তিগত স্পেসে প্রবেশ করে, অভিনয় ও নানারকম আনুষঙ্গিক কৌশল ব্যবহার করে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠে, স্পেকটেটরের দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শনকে প্রভাবিত করা হতো- অস্বস্তিতে ফেলা হত তাদের, বিব্রত করা হত, রাগিয়ে দেওয়া হত; রাগ বা ‘এজিটেশন’ থেকেই এই ধারার পথনাটিকা ক্রমে পরিচিত হল ‘এজিট-প্রপ’ (Agitational Propaganda) থিয়েটার হিসেবে।

এজাতীয় থিয়েটারের বক্তব্যের উপস্থাপনার ক্ষেত্রে দৃশ্য বা ভিস্যুয়ালের গুরত্ব ছিলো বিশেষ। অল্প শিক্ষিত বা প্রায় নিরক্ষর আপামর সোভিয়েতবাসীর কাছে পৌঁছনোর জন্যে নাটকের দৃশ্যগুলো করে তুলতে হত আকর্ষণীয়, নানান রকম নতুন নতুন কৌশল নেওয়া হত; একদল থিয়েটার কর্মী যেমন খবরের কাগজ পাঠ করে জুটিয়ে নিতো তাদের দর্শক, খবরের কাগজ’ই এক্ষেত্রে প্রধান উপকরণ; নানা ধরনের টেকনিক, যেমন রংচঙে পোষাক, অ্যাক্রোব্যাট, কার্টুন স্টাইল, জোকার, এইসব ব্যবহার করে, গানবাজনা সমেত ব্যবহার করে মন্তাজের বিভিন্ন রীতি, চেঁচিয়ে পাঠ করা হতো রোজকার খবর, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো নানান রাজনৈতিক তথ্য, নানান গুরুত্বপূর্ণ বার্তা – ‘ব্লু হাউস’ নামক ( নামকরণ হয় তাদের ইউনিফর্ম থেকে, যা হল শ্রমিকের পরিধেয় নীল জামা-প্যান্ট) একটি ট্রুপ এই সময়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে এই কৌশল ব্যবহারের ক্ষেত্রে। অনেক সময় এই ‘এজিট-প্রপ’ থিয়েটারের অভিনেতারা সরাসরি দর্শকের সাথে নাটকের সম্পর্ক গড়ে নেওয়ার কারণে দর্শকের শারীরিক উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে, নাটকের অংশ করে তুলতো তাদের। বিশ শতকে বাংলায় যে থার্ড থিয়েটারের উদ্ভব হয়, এই কৌশল সেখানেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়; বাদল সরকারের নাটক ‘প্রস্তাব’এর শেষে দর্শকদের একটি দড়ির গিঁট খুলতে দেওয়া হয়, নাটকের উপকরণের সাথে দর্শকের এই সরাসরি শারীরিক যোগাযোগের ফলে দর্শক নাটকের বিষয়বস্তুর সাথে একাত্ম হয়ে পড়ে, সহজেই!

***

কাট-টু-একুশ শতক।

চারিদিকে ধুন্ধুমার কান্ড। সকাল থেকে রাত অব্দি, বাচ্চা থেকে বুড়ো অব্দি, কেউ কোথাও দাঁড়াচ্ছে না, সবাই সবাইকে ঠেলে সামনের দিকে ছুটছে কেবল, গন্তব্য জানা নেই, শুধু জানা আছে পাশের জনকে টপকাতে হবে, হারাতে হবে, যেকোনো মূল্যে। ছুট, ছুট, ছুট – কাশ্মীরে আরেক দফা – ল্যাকমির আইকনিক কাজল – জয়ললিতার প্রেতাত্মা – ক্রমাগত নামতে থাকে ফেসবুক হোম পেজ; ফোনের মডেল বদলে যায় এক মাস অন্তর, বাজারের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে থাকে প্রযুক্তি, প্রাণপণ ছুটতে থাকে সবাই একসাথে, কিন্তু এক্কেবারে একা – এ এক বিধ্বংসী দৌড়। হাতের কাছে একখানা চৌকোনো যন্ত্র থাকলেই গোবরডাঙায় বসে যখন চোখের সামনে নড়ে-চড়ে কথা বলে বেড়ায় লস এঞ্জেলাস-এর আত্মীয়, কিংবা তৃতীয় বিশ্বের প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে বসে শুনে নেওয়া যায় নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট-এর বাণী, এইরকম একটা মার কাটারি সময়ে পথানাটিকা – এই মাধ্যম বা ফর্মটির গুরুত্ব মুখোমুখি হয় প্রশ্নচিহ্নের, স্বাভাবিক সেরকমটাই। সেরকমটাই স্বাভাবিক? আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নিঃসন্দেহে, পথনাটিকা- এই ফর্মটি ইদানীং সময়ে, বেশ কিছু বাস্তব সমস্যার মুখে পড়ছে, কিন্তু, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এর অনুকূল নয় বলেই, একে বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া যায় কি? এর উদ্ভবের কারণের আড়ালে থাকা যুক্তিক্রম খতিয়ে দেখলে বলতে হয়, শেষ প্রশ্নের উত্তর, সম্ভবত না; বরাবরই তো এ মূল স্রোতের উল্টোদিকে সাঁতরেছে। রাষ্ট্র যখন সুচতুর পরিকল্পনা মাফিক আমাদের লড়িয়ে দেয় একে অন্যের সাথে, একা করে দেয়, টুকরো টুকরো করে দিতে চায় আমাদের, তখন একজোট হবার, সংগঠিত হবার এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক মাধ্যম যে আঘাতপ্রাপ্ত হবে তা আর আশ্চর্য্য কী?

***

উনিশ-বিশ শতক নাগাদ আমাদের দেশে যে ধারার পথনাটিকা চালু হয় তা এই ‘এজিট-প্রপ’ থিয়েটার গোত্রীয়। এরা, উত্তপ্ত সময়ে চারপাশের মানুষকে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান পৌঁছে দিতে থাকে দিকে দিকে। নাট্যকর্মী সফদর হাশমি ভারতের পথনাটিকার পরম্পরা সম্পর্কে মন্তব্য করেন,

If street theatre has any definite tradition in India, it is the anti-imperialist tradition of our people forged during the freedom movement. In other parts of the world it is the peoples’ struggle for a just social and economic order.

সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতাকে একইসাথে বিষয়বস্তু এবং উদ্দেশ্য হিসেবে বেছে নিয়েই শুরু হয় পথ চলা। সুতরাং, পথ চলার অনুপ্রেরণা, স্পষ্টতই, বিশেষ রাজনৈতিক সচেতনতা; সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ উৎখাত করবার লড়াই-এ অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে এই মাধ্যম। এইখানে, বলে নেওয়া জরুরি, এরমধ্যেই বহুবার ‘মাধ্যম’ শব্দটা গোদাভাবে ব্যবহার করে ফেলেছি, এইবার আরেকটু সচেতনভাবে এর মানে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা যাক; ‘মাধ্যম’ – যা মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে দু’পারে থাকা দু’টি অবজেক্টের মধ্যেকার দেওয়া-নেওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখন, একদিকে নাট্যকর্মী অন্যদিকে দর্শক এইরকম একটা সরল ইক্যুয়েশন ধরে নিয়ে বলা যায়, এক্ষেত্রে নাট্যকর্মীর দর্শন চেষ্টা করে দর্শকের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে; নির্দিষ্ট মতাদর্শগত বোঝাপড়া, জীবনবোধ দর্শকদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে। মাধ্যমের স্বার্থকতা তাই অনেকাংশেই নির্ভর করে দর্শকের আর্থ-সামাজিক, মানসিক, ও দার্শনিক অবস্থানের উপর (বলাই বাহুল্য, এই তিন ধরনের অবস্থান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত!); সামগ্রিকভাবে এই দেওয়া নেওয়ার প্রক্রিয়া যত সক্রিয় হয়, তত ফোকাল পয়েন্টে এসে পড়ে দর্শক।

গৃহযুদ্ধের সময় স্পেনে, জাপানী, ফরাসী ও আমেরিকান আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ৪৫ বছরব্যাপী দীর্ঘকালীন সংগ্রামের সময় ভিয়েতনামে, বিপ্লবের পরপরই কিউবায়, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে গোটা লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা জুড়ে পথ-নাটিকা’র এই ধারা আত্মপ্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রে, মূলত মেক্সিকোর কৃষিকর্মী এবং কৃষ্ণাঙ্গ দর্শকদের কেন্দ্র করে সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে এই ধারা। অন্যদিকে, বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ, ‘আধুনিক থিয়েটার’ চিনে প্রবেশ করলে, গণফৌজ-এর সাথে গাঁটছড়া বেঁধে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরতে থাকে দলবল সমেত কিছু মুক্তাঙ্গণ নাট্যগোষ্ঠী; দর্শক হিসেবে যারা নজর কাড়ে এ সময়ে তারা অধিকাংশই আবার নব-গঠিত কমিউনিস্ট পার্টির ছাতার তলায় সংগঠিত শ্রমিক-কৃষকদের জমায়েত।ঠিক যেমন, ১৯৪৯ সাল নাগাদ কলকাতার হাজরা মোড়ে অভিনীত হয় পথনাটক ‘চার্জশিট’, দর্শক বলতে, সেখানেও, প্রায় হাজার খানেক শ্রমিক; এখন, নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক বৈষম্যমূলক সমাজ কাঠামোর তলানিতে অবহেলায় পড়ে থাকা এই অংশের  প্রতিনিধিরাই দেখা যাচ্ছে, প্রতি ক্ষেত্রে জুটে যাচ্ছে দর্শক হিসেবে। যেহেতু, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই নির্দিষ্ট অংশের মানুষের জড়ো হওয়ার ঘটনা কাকতালীয় নয়, একথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, তাই এ বিষয়েও বিশেষ সন্দেহের অবকাশ থাকে না, যে, আদতে এই ধারার পথ-নাটিকার একদল টার্গেট স্পেকটেটর রয়েছে – অর্থাৎ, রয়েছে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি অভিমুখ।
শত্রুশিবির এই উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; ফলে উল্টো স্রোতের প্রচার-মাধ্যম হিসেবে এই ফর্ম, সরাসরি রাষ্ট্র-শক্তির রোষের মুখে পড়ে!

***

১৯৭০ পরবর্তী ভারতবর্ষ। যুদ্ধপরিস্থিতি।

যুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে সোভিয়েত থিয়েটার পৌঁছে যেত আনাচে-কানাচে, সেই সব জায়গায়, যেখানে যেখানে আশ্রয় নেয় মানুষ। যুদ্ধক্ষেত্রে, ট্রেঞ্চের ভ্যাপসা গরমে, জঙ্গলে, অট্টালিকার ভগ্নস্তূপে, যুদ্ধজাহাজে, লরি’র ওপর, এমনকি হাসপাতালে- সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষের বেশি নাটক অভিনীত হয় । অষ্ট্প্রহর মাথার ভিতরে বোমারু-বিমান, আশঙ্কায় জড়জড়িত, ঘর নেই, প্রিয়জন নেই, শুধু বারুদ আর পোড়া মাংসের গন্ধ চারদিকে, এমনই সময়ে সোভিয়েত থিয়েটার যেন দমকা হাওয়ার মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যেতে থাকে, উদ্দীপিত করতে থাকে সাধারণ দেশবাসীকে, ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস যুগিয়ে যায় – এইভাবে, এইভাবেই প্রায়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, এগোয় এই ধারার পথনাটিকা। আমাদের দেশেও ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে জনগণকে কাছে টানতে দানা বাঁধে এই ধারা, তৈরি হয় গণনাট্য সংঘ – গনতন্ত্র রক্ষার, অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য ঘোচানোর উদ্দেশ্যে লড়তে থাকা শক্তিগুলোর হাতে হাত রেখেই এর পথ চলা, পথ চলা মানুষকে কেন্দ্র করে, গণনাট্য সংঘের সিম্বল বা লোগো-তেই তাই দেখা যায় সাদা-কালো নাগাড়া-বাদক; নাগাড়া – প্রাচীনতম যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর অন্যতম। গণনাট্যের সাথে যুক্ত হওয়ার অনুভূতি বর্ণনা প্রসঙ্গে নাট্যকার উৎপল দত্ত বলেছিলেন

সংঘের যে দিকটি আমায় সবচেয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল সেটি হল খোলা আকাশের নীচে, বিনা রঙ্গমঞ্চে বিনা আড়ম্বরে রাস্তার পথচারীদের জড়ো করে তাদের সামনে অভিনয়। এর মধ্যে দেখলাম নাটকের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হবার সম্ভাবনা, বিশেষ করে আমাদের মত দরিদ্র, অশিক্ষিত দেশে মুকুন্দ দাস যাত্রাকে সর্বোপদেশের হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন, এ তারই আধুনিক পকেট সংস্করণ।

গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-শহরতলিতে বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে ছুটে বেড়াতে থাকে গণনাট্য সংঘের নাট্যকর্মীরা এ’সময়ে। উৎপল দত্ত, পানু পাল, ঋত্বিক ঘটক ও মমতাজ আমেদের সহায়তায় পরিবেশিত হয় পথনাটিকা ভোটের ভেট (১৯৫২)। শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রচার নয়, সামগ্রিকভাবেই রাজনৈতিক মতাদর্শ বিলিয়ে দেওয়ার কাজে লাগানো হল এই মাধ্যমকে। বহু নতুন নতুন নাটক নির্মিত হতে থাকে, ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পানু পালের কত ধানে কত চাল নাটক রচিত হয়, উঠে আসে, একে একে – ল্যাবরেটরি, হোমিওপ্যাথি, নবান্ন, জবানবন্দী, সংকেত, জনান্তিক, নয়ানপুর, ঢেউ, ডাক সহ বহু নাটিকা। মঞ্চের সাথে সাথে এই নাটকগুলো অভিনীত হতো কখনো গাছতলায়, কখনো কৃষকের বাড়ির দাওয়ায়, কখনো কারখানার গেটের সামনে চৌকি পেতে! সজল রায়চৌধুরির বক্তব্য থেকে জানতে পারা যায় যে, আসলে, গণনাট্যের ছোটো নাটকগুলি সমস্তই পথনাটকের আঙ্গিকেই লেখা, যাতে যেকোনো অবস্থায়, যেকোনো জায়গায় উপস্থাপিত করা যায়; জনান্তিক বা সংকেত জাতীয় নাটিকা’র প্রযোজনার ধারাটাই এমন ছিলো যে যেকোনো জায়গায় করা যায়। গণনাট্য সংঘ ছাড়াও এ’সময়ে অন্যান্য বহু প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়; ‘ভিন্ন প্রথার থিয়েটার’ নামে সত্তরের গোড়া থেকে কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ পার্কে পথনাটকের অভিনয় হতে থাকে। প্রতি শনিবার নাট্যাভিযানে অংশ নিত সিলোয়েট, শতাব্দী, বরানগর থিয়েটার ওয়ার্কশপ, তমলুকের রাইট ফিউচার, নিরীক্ষণ, শিল্পীফৌজ, সি পি এ টি প্রভৃতি। ক্রমে এই প্রয়াস সুরেন্দ্রনাথ পার্কের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার, শহীদ মিনার, বিবিডি বাগ, হাজরা পার্ক, শিয়ালদা স্টেশন সহ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে।

ডিজিটাল প্রচারমাধ্যম নয়, একেবারে রক্তমাংসের মানুষগুলোর সাথে দেশবাসীর এই সরাসরি মোলাকাত, সামনাসামনি, হাতে কলমে তাদের ক্ষেপিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগে, ক্ষেপে ওঠারই কথা রাষ্ট্রের, হলও সেরকমটাই!

কেন্দ্রে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার- ইমার্জেন্সি! যত ঝড়-ঝাপ্টা’র প্রকোপ বাড়ল, তত শক্ত করা হল মাস্তুল এপারে, অঘোষিত যুদ্ধ – রাষ্ট্রশক্তি বনাম দেশবাসী, এপার থেকে জমি আঁকড়ে লড়াই চলল, চলল যুদ্ধ — যুদ্ধের বিরুদ্ধে। বুর্জোয়া মাধ্যমের সহায়তায় নয়, সরাসরি রাস্তায় নেমে এই লড়াইয়ের অংশ হয়ে ওঠার জন্য নাট্যকর্মীদের উপর যে আঘাত নেমে এল, তা ভয়াবহ – এমনকি দিনে দুপুরে খুন হয়ে গেলেন ‘থিয়েটার ইউনিট’ এর আশিষ চ্যাটার্জী, ‘সিলোয়েট’ এর প্রবীর দত্ত সহ  আরো বহু কর্মী; বন্ধ হল ‘ভিন্ন প্রথার থিয়েটার’!

ওরা ভয় পেলো! ওরা যত ভয় পায়, তত দাঁত নখ বের করে, তত বেরিয়ে পড়ে আসল চেহারা, আর এটাই, ঠিক এটাই ওদের দুর্বলতা। ঠিক জায়গায় ঘা দিতে পেরেছিলো এই নতুন ধারার নাট্য আন্দোলন, সুতরাং। নির্ভয়ে, মাথা উঁচু করে চলল এই অভিযান, আরো বেশি করে ছড়িয়ে পড়ল, গ্রামে-গঞ্জে, মফঃস্বলে, শহরের রাস্তায়, অলিতে-গলিতে, শ্রমিক-পট্টিতে, নিষিদ্ধ এলাকায়! দক্ষিণ ভারতে তৈরি হল ‘সমুদয়’, এর বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে পরল কর্ণাটকের বিভন্ন অঞ্চলে। নাটকের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পেলো সমাজের অবদমিত অংশের হাহাকার, বিহারের দলিত গণহত্যা’র ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি ‘সমুদয়’এর প্রোডাকশন বেলচি চতুর্দিকে সাড়া জাগায়, তৈরি হয় ‘কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদ’, অন্ধ্রপ্রদেশে’র ‘প্রজা নাট্য মাঞ্জলি’, মধ্যপ্রদেশের ‘মুখোটা’, গুজরাটে’র ‘নিশান্ত’, ‘দিশা’ ও ‘জগর’ মুম্বাই’তে।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় তথাকথিত ‘দ্বিতীয় লিঙ্গে’র উপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয় এই ধারার পথনাটিকা’র বিষয়বস্তু, শুধু তাই নয়, নাট্যকর্মী হিসেবে রাস্তায় নেমে মহিলারাই সোচ্চারে বলার সুযোগ পায় তাদের নিজেদের সমস্যা। শিক্ষিত কলেজ পড়ুয়াদের সাথে মিলেমিশে যায় সমাজের নীচুতলার মহিলাদের কন্ঠস্বর, তৈরি হতে থাকে এহেসাস, আওরাত আউর ধরম, ওম স্বাহা, পরিবার কি গাড়ি’র মতো একাধিক নাটক । পরবর্তী সময়ে মহিলাদের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থিয়েটার ফেস্টিভালের চল দেখা যায়, মাইসোরের ন্যাশনাল ওম্যান থিয়েটার ফেস্টিভাল ‘আক্কা’,হায়দ্রাবাদের থিয়েটার ট্রুপ যবনিকা আয়োজিত, মুম্বাই’এর পৃথ্বী থিয়েটার আয়োজিত ফেস্টিভাল।

সর্বত্র যখন কন্ঠরোধ করা হয় গণতন্ত্রের, পথনাটিকা তখন সোচ্চারে কথা বলার প্ল্যাটফর্মস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়; শোষিত মানুষের কন্ঠস্বরে চাপা পড়ে যেতে থাকে রাষ্ট্রের ভুলিয়ে দেওয়ার, গুলিয়ে দেওয়ার প্রয়াস!

                                                                              ***

পুলিশ আবার ধমকে ওঠে ‘প্রেম-মহব্বৎ চালাও, প্রেমিক-প্রেমিকার খেল দেখাও, নাচা-গানা লাগাও, মস্করা ওড়াও। কিছু এই, কিছু ওই। কী বুঝলে?’ অর্থাৎ, ভুলিয়ে ভালিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে, প্রতিবাদ চলবে না, চলবে না কোনো ধরণের এজিটেশন- শত্রুপক্ষের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েই চলল তবু, এই নাটকে’র মধ্যেকার নাটক, নাটক – জননাট্য মঞ্চের হল্লা বোল! ১লা জানুয়ারী, সাল-১৯৮৯, বেলা এগারোটা নাগাদ শুরু হয় নাটক। কংগ্রেসের আঞ্চলিক নির্বাচনী প্রতিনিধি মুকেশ শর্মা দলবল নিয়ে হাজির হন, রাস্তা পরিস্কার করে দিতে বলেন, এপার থেকে উত্তর আসে অপেক্ষা করতে বা অন্য রাস্তা ধরতে। রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে হক কথা বলার পরিনাম যা হতে পারে, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না, শারীরিক আক্রমণ নেমে আসে কমরেড সফদরের উপর, ধরাধরি করে নিকটবর্তী সি-টু’র কার্য্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে; সেইখানে চলে আরেকপ্রস্থ মারধোর, জনমের কর্মীদের, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লড়ে চলা মানুষের, সর্বোপরি দেশের গণতন্ত্র-প্রিয় সাধারণ মানুষের অসহায় হাহাকার বাঁচাতে পারেনা তাদের কমরেডকে, খুন হন নাট্যকর্মী সফদর হাশমি। কিন্তু এইখানেই শেষ নয়! সফদরের সাথে সাথে সেদিন আক্রান্ত হয় বিপুল সংখ্যক দর্শক, হ্যাঁ, লোহার রড, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগ করা হয় তাদের উপর। কিন্তু তাদের অপরাধ? অপরাধ নয়, সাফল্য! এই বিপুল সংখ্যক দর্শক তাদের সামনে ঘটে চলা অভিনয়ের অংশ হয়ে ওঠে কখন, তাদের নিজেদের অজান্তেই, কখন তারা কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়, নাট্যকার অভিনেতা দর্শক সবাই মিলেমিশে যায়, সংগঠিত হয়, ব্যারিকেডের এপাশে জড়ো হয় সকলে, একসাথে তর্জনী তুলে ধরে রাষ্ট্রের দিকে।

নাটক চলাকালীনই তাই সফদরের সাথে সেদিন খুন হয় ঝান্ডাপুরের শ্রমিক পট্টির জনৈক বাসিন্দা রামবাহাদুর; কিন্তু কার্যসিদ্ধি হয়না, রামবাহাদুররা যে মরে না, সফদররাও! মেরুদন্ডহীন রাষ্ট্র মেরুদন্ডের নাগাল পায় না। নাটক জারি থাকে; উড়তে থাকে লাল ঝান্ডা- ঘুরতে থাকে এ’হাত ও’হাত।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s