দৈনন্দিনতার প্রতিরোধ ও মিশেল দি সার্তো

–লিখেছেন সুজান মুখার্জি। 

খোঁজ নিলে জানা যাবে ওদের এই নিরন্তর চলাফেরার পেছনে ভ্যালিড কারণ খুব কম। বেহালা থেকে শালা হয়তো বড়বাজারে ধনে-র টন কত করে যাচ্ছে জানতে বেরিয়ে পড়ল। এবং যাবিই যখন স্ট্রেট চলে যা। তা না ল্যাওড়া হয়তো রাসবিহারীতে নেমে বাঁদিকে ভাঁজ মেরে গলি-গলতায় ঢুকে পড়ল।

নবারুণ ভট্টাচার্য, মসোলিয়ম

মিশেল দি সার্তোর ল’ইনভেন্‌শঁ দ্যু কোতিদিয়াঁ বইটি প্রথম ফরাসীতে প্রকাশিত হয় ১৯৮০-তে। পূর্ণাঙ্গ ইংরাজি অনুবাদ বেরোয় আরো চার বছর পর। স্টিভেন রেণ্ডলের ১৯৮৪-তে প্রকাশিত দ্য প্রাক্‌টিস অব এভ্রিডে লাইফ -এর মাধ্যমেই আমাদের অনেকের প্রথম পরিচয় দি সার্তোর সাথে। বইটি দি সার্তো উৎসর্গ করেন এক “সাধারন মানুষ”-কে। এই বেনামী নায়ক ও তাঁর দৈনন্দিনতার চর্চা বইটির ও দি সার্তোর বৃহত্তর ইতিহাস-রচনা প্রকল্পের কেন্দ্র। তাঁর ব্যাপারে লেখক বলছেন–

অনুচ্চস্বরে এঁরাই সমাজকে ব্যক্ত করেছে যুগযুগান্তর ধরে, টেক্সটের পূর্বে এঁর স্থান। বিজ্ঞানের মঞ্চের মাঝখানে যেন বসে থাকতে দেখা যায় উবু হয়ে। ফ্লাডলাইট ক্রমশ সরে এসেছে নাটকের নায়কদের উপর থেকে–যারা বিখ্যাত, যাঁদের সমাজের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। সরে এসেছে কোরাস ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক চরিত্রদের থেকে। আলোকিত হয়েছে এতদিনকার দর্শকবৃন্দ।

তবে দি সার্তোর ইতিহাস প্রণালীতে এই ব্যক্তির (individual) অথবা পৃথক ব্যক্তিত্বের আলাদা স্থান নেই। তাঁর লেখার বিষয় সাধারণ মানুষের (এক্ষেত্রে অবশ্যই ইয়োরোপিও) দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় ক্রিয়াকলাপ, যা এতই “সাধারণ” ও সর্বত্র বিদ্যমান যে আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে। অন্যান্য শিল্পের মতই আমরা সাধারণ চলাফেরা ও সমাজের সাথে বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়েও আত্মবিকাশ, আত্মপ্রকাশ করে থাকি।

শিল্পচর্চার একদিকে রয়েছেন শিল্পী এবং সংলগ্ন প্রযুক্তি। সাহিত্যের ক্ষেত্রে লেখকের সাথে সম্পাদক ছাড়াও মুদ্রাকর, দপ্তরী, ডিস্ট্রিবিউটর, আরও অনেকে রয়েছেন। অন্যদিকে রয়েছেন গ্রাহক অথবা পাঠক। কিন্তু গ্রাহকের ভূমিকা কি একেবারেই নিষ্ক্রিয়? কোন বই বা টিভি সিরিয়াল দুজন ব্যক্তি একভাবে উপলব্ধি করেন না তা আমরা সকলেই জানি। তার মানে সেই পড়া বা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও বৈশিষ্ট্য আছে। লেখকের অভিপ্রেত মানে ছাড়াও অন্য অনেক মানে করে নেওয়া সম্ভব। ক্রিয়েটিব রীডিং-এর কিছু উদাহরণের সাথে আমরা সকলেই পরিচিত – প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা যেমন জে এম কুত্‌জীর ফো (১৯৮৬) প্রকাশিত হবার কিছু বছর আগেই দি সার্তোর আলোচ্য উপন্যাস, রবিন্সন ক্রুসো-র এমন এক পাঠ করেন যা বইটির প্রচলিত ব্যাখ্যার থেকে একেবারে আলাদা। এই ধরণের নিত্যনতুন পাঠ-ভঙ্গি হয়ত অনেক সময়ে আমাদের মধ্যেই থেকে যায়, প্রকাশ পায় না।

কিন্তু বই হাতে পেলে যে আদৌ পাঠ করতেই হবে, এরকম কোন কথা আছে কি? পুরনো সিডি যেমন অনেকের বাড়িতেই চায়ের কাপ রাখার কোস্টারে পরিণত হয়েছে, বইয়ের ব্যবহারও নানাবিধ। ট্রেনে যেতে যেতে খবরের কাগজ দিয়ে নিজেকে হাওয়া করা, পাঠ্যপুস্তক দিয়ে বুক-ক্রিকেট খেলা – বইয়ের এই জাতীয় ব্যবহারকে ঐতিহাসিক লিয়া প্রাইস  বইয়ের “নন-টেক্সটচুয়াল ইউস” বলে বর্ণিত করেছেন।অর্থাৎ পাঠ করা বাদ দিয়ে বইয়ের অন্যান্য ব্যবহার। দি সার্তো এই সমস্ত ক্রিয়া-কলাপের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা সৃজনশীলতা তুলে ধরতে চেয়েছেন। যাদের কাজ বই, সঙ্গীত, সিনেমা, থিয়েটার আকারে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাঁরাই কিন্ত সমাজে সংখ্যালঘু।  দৈনন্দিন সৃজনশীলতা সংস্কৃতিচর্চার চোখে প্রান্তিক, যদিও এই ধরণের “শিল্পী” আমাদের সকলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ সংস্কৃতির আওতায় আনতে চাইলে প্রথমেই নির্ভুল ভাবে তাদের সনাক্ত করা প্রয়োজন। দি সার্তো স্বীকার করেছেন সেই কাজ খুবই কঠিন। 

দ্য প্রাক্‌টিস অব এভ্রিডে লাইফ পড়া যায় একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাঁর বইয়ের ইচ্ছাকৃত আংশিক অথবা ভুল ব্যাখ্যা করলে দি সার্তো বোধ হয় ঈষৎ খুশিই হবেন। মূলত দু-ধরনের “প্র্যাক্টিস” ও তার বিশ্লেষণ দি সার্তো তাঁর প্রবন্ধমালায় তুলে ধরতে চেয়েছেন – একদিকে “টেক্সটচুয়াল প্র্যাক্টিস” অন্যদিকে “স্পেশিয়াল”, অর্থাৎ স্থান-সংক্রান্ত প্র্যাক্টিস। বিষয়গুলি পৃথক নয় এবং মেটাফরের মাধ্যমে লেখক বারবারই এক ধরণের প্র্যাক্টিস আলোচনা করতে করতে স্বাচ্ছন্দে অন্যটির কথায় চলে গেছেন। (শহরে চলাফেরা করার কথায় লেখক একজায়গায় বলছেন, গ্রীসে আজও যানবাহনকে মেটাফরা বলা হয়। “মেটাফর” শব্দটি গ্রীক থেকে লাতিন ও ফ্য়েরাসি হয়ে ইংরাজি শব্দকোষ প্রবেশ করে পঞ্চদশ শতাব্দির শেষের দিকে। আক্ষরিক অর্থে এর মানে “স্থান বদল”।)

আমরা বইটিতে উল্লিখিত অনেক টেক্সটের সাথেই ওয়াকিবহাল। মজার ব্যাপার, বইটি পড়তে গিয়ে লক্ষ্য করলাম টেক্সটের সাথে পরিচিতি থাকলেও তিনি যে টেক্সটচুয়াল প্রাক্টিসের প্রেক্ষাপটে বইগুলি আলোচনা করেছেন, তার সাথে আমার নিজের অভিজ্ঞতা ঠিক মেলাতে পারছি না। বরঞ্চ যে সব শহরের বিষয়ে দি সার্তো লিখছেন, সেই শহরকে না হলেও, সেই সব জায়গা যে সমস্ত নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত – অর্থাৎ সেই সব জায়গার স্পেশিয়াল প্র্যাক্টিস আমার নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে অনেক সহজে চিনতে পারছি।

আমরা সাধারণভাবে স্থান বা ক্ষেত্র বলতে যা বুঝি দি সার্তো ঠিক তা বোঝাতে চান নি। ক্ষেত্রমিতি বা জ্যামিতির সাহায্যে আমরা জায়গা নির্ধারণ করে থাকি। লেখক যে “স্পেসে”-র কথা বলতে চাইছেন, তার গঠনের পিছনে কিছু সামাজিক, নৃতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ও শক্তি বিদ্যমান। ৬০-এর দশকে অঁরি লেফেব্র এই ধরণের স্পেসের বর্ণনা করেছিলেন একাধিক প্রবন্ধে। দি সার্তো দেখাতে চেয়েছেন এই সমস্ত ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তি যতই মানুষের ব্যবহার ও কাজ-কর্ম তার নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করুক, কোন না কোন কায়দায় দৈনন্দিন বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়েই মানুষ নিজের বিশেষত্বের, নিজের ব্যক্তিত্বের প্রমাণ রেখে যায়। আমরা হয়তো তা লক্ষ্য করতে অভ্যস্ত নই।

“স্ট্র্যাটেজি” ও “ট্যাক্টিক” – গোড়াতেই দি সার্তো দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যাখ্যা করে তাদের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলায় শব্দগুলির সঠিক পরিভাষা দুর্লভ। কৌশল বলতে আমরা দুইই বোঝাই। কোন প্রতিষ্ঠান যখন তার নির্দিষ্ট, নিজস্ব অবস্থানে (le lieu propre) দাঁড়িয়ে তার সাথে বাইরের জগতের সম্পর্কের নিয়মাবলী রচনা করার চেষ্টা করে, দি সার্তো বলছেন তা “স্ট্র্যাটেজি”-র ব্যবহার – এক ধরণের বলপ্রয়োগ। এই ধরণের ক্ষমতা স্বাধীন। সেই নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাইরের জগতের দিকে দৃষ্টিপাত করা সম্ভব, মিশেল ফুকোর প্যানঅপ্টিকনের মত। বাস্তবকে সে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই কেবল দেখবে, বাস্তবের নিজস্বতাকে অগ্রাহ্য করে।

রবিন্সন ক্রুসোর বেঁচে থাকার “হিরোইক” লড়াইয়ে দি সার্তো লক্ষ্য করেছেন প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্র্যাটেজির তিনটি দিক – জনশূন্য দ্বীপ যার মধ্যে ক্রুসো নিজের জায়গা আলাদা করে নিচ্ছে; নিয়ন্ত্রণকারী এক ব্যক্তিত্ব, যে সকলের সাথে ও সকলের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম বেঁধে দিচ্ছে; তৃতীয়ত, স্বাধীন প্রকৃতিকে মানুষের ব্যবহার্য্য সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা। এইরকম প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্র্যাটেজির প্রয়োগে সাম্রাজ্যবাদের গন্ধও প্রকট। 

“ট্যাক্টিক” বলতে দি সার্তো বোঝাতে চেয়েছেন এমন এক কৌশল যার উৎস স্থানহীনতায়। বৃহত্তর কোন স্ট্র্যাটেজির সম্মুখীন হয়ে আমরা যখন ট্যাক্টিকের সাহায্যে তার মোকাবিলা করার চেষ্টা করি, সাধারণত আমরা সেই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে বা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকেন্দ্রের বাইরে অবস্থিত। ভৌগলিক অর্থে আমাদের স্থান-বদল না হলেও ব্যক্তি হিসাবে তাদের মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয় নিজেদের কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে এসে। দুই অসম শক্তির মধ্যে যুদ্ধে বলশালী সৈন্যদল রাজপথ দিয়ে আক্রমণ করে। তাদের স্ট্র্যাটেজিতে বা মানচিত্রে যে সমস্ত জায়গা চিহ্নিত নয়, তারই আশ্রয় নেয় গেরিলা বাহিনি। স্থানহীনতাই তাদের ট্যাক্টিকাল অস্ত্র।  

এই ‘ভিতর’ ও ‘বাহির’ কিন্তু বাইনারি নয়। কেবল বাইরে থেকেই ট্যাক্টিক প্রয়োগ করা যাবে এমন কোন কথাও নেই। প্রতিষ্ঠিত স্ট্র্যাটেজির মধ্যেও কিছু নিয়ম ভাঙার সুযোগ থাকতে বাধ্য, এবং সেইখানেই মানুষ নানা রকমের ট্যাক্টিক কাজে লাগায় প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে তার নিয়ম-কানুন বদলে ফেলতে।  দি সার্তো হয়ত কলকাতার যানবাহনের সাথে পরিচিত ছিলেন না। রোম বা নেপ্লস শহরের ড্রাইভাররা তাঁকে বিস্মিত করে – অন্যান্য গাড়ি, রোড ডিভাইডার বা ট্র্যাফিক আইনের ফাঁক দিয়ে – অর্থাৎ শহরের চলাফেরার নিয়ম-কানুন অগ্রাহ্য করে – তাঁরা গাড়ি চালানোর কী আশচর্য দক্ষতার পরিচয় দেন। তার মর্ম উপলব্ধি করার রসবোধ বলশালী প্রতিষ্ঠানের থাকা সম্ভব নয়। পথচারী হিসাবে যে আমাদের তাতে অসুবিধা হয় না, তা নয়। তবে এই সমস্ত নিয়ম ভাঙার স্পেশিয়াল প্র্যাক্টিস স্টাডি করলে হয়ত নতুন কোন আত্মপ্রকাশের ভাষা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

বই থেকেই উদাহরণ দিই – ফরাসী শব্দ লা  পেরুক, অর্থাৎ পরচুলা। আমরা সকলেই কোন না কোন সময়ে লা পেরুক-এর আশ্রয় নিয়ে থাকি। এই প্রবন্ধটিও লেখা হয়ে উঠত না লা পেরুক ছাড়া! ফরাসিরা, স্বভাবতই, এই কৌশলটির নাম দিয়েছেন। কোনো কর্মী যদি তার মালিকের জন্য কাজ করার নাম করে নিজের কাজ সেরে ফেলে, তাকেই বলে লা পেরুক। এটা ঠিক চুরি নয়। কোনো বস্তু তো চুরি করা হচ্ছেই না। কর্মী কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত। মেলভিল সাহেবের ছোটগল্পের নায়ক মুন্‌শি বারটেলবী যেমন নম্র অথচ  অবিচলিত কণ্ঠে বলে, “আমার করার ইচ্ছে নেই”, এই কর্মী তাও করছেন না। দি সার্তোর পক্ষে সেই মডার্নিস্ট স্বপ্ন দেখা বা দেখানো বোধহয় সম্ভবও না।

ক্ষমতা এবং ক্ষেত্র – এই দুই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দি সার্তো টেক্সটচুয়াল উপমা হামেশাই ব্যবহার করেছেন। ভাষার সাথে স্পেসের সম্পর্ক ও সাদৃশ্য ফিরে এসেছে বারবার – যেমন ব্যাকরণের ক্ষেত্রে মন্তব্য করেছেন, “ব্যাকরণের কাজ হল নজরদারি করা যেন প্রতিটি শব্দ বাক্যের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্য কোথাও না বসে।” অবিহিত অলংকরণ অথবা চলতি, কথিত ভাষার হাত থেকে সঠিক, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাকে রক্ষা করা আবশ্যক। প্রতিষ্ঠান মাত্রেই চেষ্টা করবে তার সমস্ত কর্মীদের যথাস্থানে রাখার। সেই স্থানে রাখবার ক্ষমতাও যেমন প্রতিষ্ঠানের রয়েছে, অন্যদিকে বলা যায় যে, তার কর্মীদের বিশেষ স্থানে নিবদ্ধ রাখার সার্থকতাই ক্ষমতার উৎস। 

দি সার্তো যে ইতিহাস প্রণালীর কথা লিখেছেন, বাস্তবে তার প্রমাণ একবার দেখে নেওয়া যাক। বিখ্যাত একটি প্রবন্ধাংশে তিনি নিউ ইয়র্ক শহর বর্ণনা করেন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১১০ তলার উপর থেকে। কুয়াশার ফাঁক দিয়ে নিউ ইয়র্ক শহর দেখা যাচ্ছে, কোন এক দ্বীপের মত। বিরাট উঁচু উঁচু বাড়িগুলো যেন ঢেউয়ের পিঠে চেপে চলেছে ওয়াল স্ট্রীটের দিকে। গ্রেনিচের কাছে একটু বিনত, আবার বীরদর্পে মাথা তুলছে মিডটাউনে। নিস্তব্ধে সেন্ট্রাল পার্ক পেরিয়ে, ঢেউ খেলে মিশে যাচ্ছে হার্লেমের কাছে।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দি সার্তো উপলব্ধি করতে পারেননি প্রকাণ্ড এই নিউ ইয়র্ক শহরের দৈর্ঘ। তিনি নিজেই যেন ডুবে ছিলেন অট্টালিকা, ল্যাম্পপোস্ট, গাড়ি-ঘোড়ার ধাঁদায়। শহর যেন তাঁকে গ্রাস করেছিল। অথচ ১১০ তলার উপর থেকে সিটিস্কেপ উপলব্ধি করতে অসুবিধাই হল না দি সার্তোর। তিনিই যেন মনুষ্যনির্মিত এই প্রকাণ্ড নাগরিক টেক্সট-টিকে গ্রাস করলেন, মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললেন অতি সহজেই। 

টেক্সট পড়া ও লেখার মেটাফর দিয়ে দি সার্তো বলছেন যে, যারা ক্ষমতাশালী তাঁরা এই সর্বগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। কিন্তু এমন মানুষও রয়েছেন যারা তাঁদের দৈনন্দিন ট্যাক্টিক ব্যবহার করে আধুনিকতার এই আক্রমণের হাত থেকে পালিয়ে, অগ্রগতির মাস্টার-টেক্সট অগ্রাহ্য করে, নিজেদের বিচিত্র সব কাহিনী আঁকিবুঁকি কেটে লিখে রেখে যান শহরের বুকে। হাঁটলে আমরা কোন নির্দিষ্ট স্থান দখল করতে পারি না – আমরা স্থিতিহীন।দি সার্তো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই নাগরিক টেক্সট রছনা করছিলেন আরও কত পথচারীর সাথে, খেয়াল না করেই। সেই জায়গা থেকে তাঁর পক্ষে টেক্সটের মানে বোঝা সম্ভব হয় নি। শতসহস্র মানুষের পৃথক ভাবে লেখা প্রকাণ্ড কালেক্টিভ টেক্সট তিনি পড়তে সক্ষম হলেন ১১০ তলা উপর থেকেই।

 আমরা এখন এমন এক ধরণের অগ্রগতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছি যা সর্বদাই চেষ্টা করছে আমাদের ভাষা, ভাবনা-চিন্তা, লেখা, এমন কি হাঁটা-চলাও সুস্পষ্ট না হলেও সুক্ষ্ম নিয়ন্ত্রনের অধীনে নিয়ে আসবার। শহরের বিভিন্ন অংশ নির্ধারিত হচ্ছে বিশেষ কিছু ধরণের কাজ-কর্মের জন্য, কোন বিশেষ শ্রেণীর মানুষদের জন্য। পুরনো স্টেট বাসের লম্বা এক-টানা সীটে ৬ জনের জায়গায় ৭ জন চাপাচাপি করে বসতে পারত, আবার কেউ  হয়তো ফাঁকা বাসে তার উপরেই শুয়ে জিরিয়ে নিত। নতুন সীটের ব্যবহার-বৈষম্য নেই। আমাদের সামাজিক ব্যবহারের সাথে শরীর এবং শারিরিক অঙ্গভঙ্গি অতি সাধারণ ছলে অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

নবারুণের লেখায় যে সমস্ত নাগরিকদের সাথে মোলাকাত হয় পাঠকের, সেই সমস্ত নাগরিকদের আন্‌তাব্‌ড়ি চলা-ফেরা আসলে নিজের নির্দিষ্ট স্থানকে ছাপিয়ে যাওয়া। নির্দিষ্ট স্থান মানে হয় গন্তব্য স্থল, নয়তো যাত্রার উৎস-স্থল, আর নয়তো একমুখ উপযুক্ত ট্রেন অথবা বাস হতে পারে। একান্ত হাঁটতে হলে গুগ্‌ল ম্যাপের “ফাস্টেস্ট রূট” অবলম্বন করাই বাঞ্ছনীয়। মহিলা বা মেয়েদের ক্ষেত্রে এই স্থান আরও কঠিন নিয়মে বাঁধার প্রচেষ্টা চলছে সারাক্ষণ। লেখা, আঁকা, সঙ্গীতচর্চা বা নৃত্যের মত হাঁটার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে নানা রকমের রচনাশৈলী। নিজের খেয়ালে উদ্দেশ্যহীন ভাবে  হেঁটে বেড়ানো অলিখিত কোন নিয়ম ভঙ্গ করার সমান। একটু ভাবলেই দেখা যায় কলকাতা শহরের মধ্যেই নতুন যে সমস্ত রাস্তা তৈরি হচ্ছে, ক্রমশ তাতে পায়ে হাঁটা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। কলকাতার প্রথম বড় রাস্তা, চিৎপুর রোডের সাথে তুলনা করে দেখুন রাজারহাট বাইপাস।

কিন্তু এই অনিয়ম চলাফেরার মধ্যে দিয়েই কিন্তু আমরা শাসকের দৃষ্টি এড়াতে পারি। ১১০ তলা কেন, প্যানঅপ্টিকনের মত হয়ত কোন কল্পিত zero বা বিদেহী স্থান থেকে আমরা দেখবার চেষ্টা করছি রাস্তায় মানুষের চলার অভ্যাস, নির্ণয় করতে চাইছি কতগুলি নিয়ম যা দিয়ে আমরা সহজে বুঝতে পারব কোন প্যাটার্ন লুকিয়ে আছে কি না। কিন্তু যদি সকলেই অনিয়মে চলাফেরা করতে থাকে, বৃহত্তর মানচিত্রের সাথে সকলের মাইক্রো মুভমেন্ট-এর উপর নজরদারি করা অসম্ভব।  সাহিত্যে, ইতিহাসে একটি এইরকম ম্যাপের সন্ধান পাওয়া যায়। হর্গে লুই বর্হেস “অন এক্স্যাক্টিচিউড ইন সায়েন্স” প্রবন্ধে কল্পিত এক হারানো সভ্যতার কথা বলেন যারা ম্যাপ-নির্মানে পারদর্শী ছিল। এমনই ছিল তাদের পারদর্শিতা, যে নিজেদের সাম্রাজ্যের মানচিত্রটির মাপ ছিল কোণায় কোনায় সাম্রাজ্যের ভৌগলিক মাপের সমান। নিঁখুত অনুপাত। কিন্তু মুশকিলটা হল, এই নিঁখুত অনুপাতে আঁকা প্রকান্ড মানচিত্রটার তলায় চাপা পড়ে গেল গোটা সাম্রাজ্যটাই, তাই মানচিত্রটা দেখার বা পড়ার আর কোনো উপায় থাকল না। 

আজকের দিনে আলাদা করে দি সার্তোর নতুন ধরণের (সেই সময়ে দাঁড়িয়ে) ইতিহাস-প্রণালীর গুরুত্ব ব্যক্ত করার প্রয়োজন নেই।  আমরা হয়ত আর ই এম কূলহাসের প্রস্তাবিত সেই “জেনেরিক সিটি”-র দিকেই এগিয়ে চলেছি – সমস্ত শহরই হরেদরে বিমানবন্দরের প্রতিক্ষালয়ের মত দেখতে হয়ে উঠবে। সমস্ত কিছুই যথা স্থানে। কিন্ত মানুষের সমস্থ ক্রিয়াকর্ম, আচার-আচরণ ম্যাপ করা কি আদৌ সম্ভব? নিত্যনতুন স্ট্র্যাটেজির মোকাবিলা করার জন্য নতুন সব আজগুবি ট্যাক্টিক খাড়া করবে মানুষ। আর নয়ত বর্হেসের গল্পের মত, মানচিত্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকবে মরুভূমির বুকে।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s