একটি জনপ্রিয় শাস্তি ও রাষ্ট্রের জেলুসিল

লিখেছেন সায়ন্তন সেন। 

 
The sleep of reason produces monsters
 
– Francisco de Goya
 
 
ফাঁসি চাই, কেননা 
 
‘আমাদের আলোচনার বিষয় ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’– এইভাবে লেখাটা শুরু করা যায়। কিন্তু একটু অন্য ভাবে শুরু করা যাক। এমনিতে তো, আমাদের আটপৌরে বেঁচে থাকায় এমন বেখাপ্পা ঘটনা বড়ো দাগ কাটে না। তবু, ক’দিন হলো নির্ভয়া-কাণ্ডে সাব্যস্ত অপরাধীদের শাস্তি ঘোষণা হয়েছে, সেই ইস্তক ঢিঢি পড়ে গেছে এবং আমরা খুব প্রেডিক্টেবল্ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে উঠতে পেরেছি। অর্থাত্, নির্ভয়ার ধর্ষক ও খুনিদের ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট, যার ডাকনাম ‘ডেথ পেনাল্টি’, দেওয়া হয়েছে সে খবর আমরা রাখি এবং আমরা দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে যেতে পেরেছি। ব্যাপারটা সহজ। একদল ফাঁসির পক্ষে। আরেকদল ফাঁসির বিরুদ্ধে। ফাঁসির পক্ষে যাঁরা, তাঁদের যুক্তি সাজালে মোটামুটি এই দাঁড়ায়:
 
(এক) ওদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই, তাই ওদের মেরে ফেলা হোক।
 
(দুই) ওরা যে ধরণের অপরাধী, তাতে ওদের সংশোধন অসম্ভব। যেহেতু সংশোধন সম্ভব না তাই ওদের বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই।
 
(তিন) যেহেতু আমরা রাষ্ট্রের খবরদারি আপাতত, অন্তত আপাতত, মেনে নিতে বাধ্য, এবং কিছুদূর পর্যন্ত এই খবরদারির অধিকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে আমরাই দিয়েছি, তাই শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের আছে।
 
(চার) রাষ্ট্রের শাস্তি দেওয়ার অধিকার যদি স্বীকৃত হয়, তাহলে সেটা যাবজ্জীবনের ক্ষেত্রেও খাটে, ফাঁসির ক্ষেত্রেও। ফাঁসি দেওয়ার অধিকার যদি রাষ্ট্রের না থাকে, কোনো শাস্তি দেওয়ার অধিকারই তবে তার নেই। যদি, ‘রাষ্ট্র কেন?’— এটাই আপত্তি হয়, তাহলে সেই আপত্তি যে-কোনো শাস্তির ক্ষেত্রেই উঠতে পারে। তাহলে তো রাষ্ট্রকর্তৃক শাস্তি ব্যাপারটাই তুলে দিতে হয়!
 
(পাঁচ) ফাঁসির এখনো কোনো বিকল্প নেই, যতদিন বিকল্প নেই, ততদিন ওদের মেরে ফেলা হোক।
 
(ছয়) আমার নিকটজনের সাথে এরকম ভয়ানক কিছু হলে আমি নিশ্চয়ই ফাঁসি চাইতাম, তাই ফাঁসি দেওয়াই ভালো।
 
 
কেন চাই মৃত্যুদণ্ড?
 
এইবার নির্ভয়ার নাম ভুলে যাওয়া যাক। কিছুক্ষণের জন্য। ভুলে যাওয়া যাক মুকেশ সিংহ বলে আমরা কাউকে কখনো চিনতাম। ভারতবর্ষ নামের কোনো ভূখন্ডের অস্তিত্বও অস্বীকার করা যাক আপাতত। রাষ্ট্রের অধিকার বা অনধিকারের বাইরে, কোন্ কোন্ দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চল আছে বা নেই সেই পরিসংখ্যান থেকে দূরে সরে এসে, কোন্ কোন্ মহাপুরুষ এর পক্ষে অথবা বিপক্ষে খুব সুচারু বক্তব্য রেখেছেন, তার খতিয়ান হাজির না করে, একবার, নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো যেত যদি, বড়ো ভালো হতো। যাঁরা অপরাধে, খুব ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধে রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে, তাঁদের যুক্তিগুলো মোটের উপর উল্লিখিত ছ’দফার আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে।
 
কথা শুরুর আগে, এই ছ’দফার বাইরে এসে আরও কিছু আটপৌরে প্রশ্ন সাজিয়ে নিতে হবে। যাঁরা  মৃত্যুদণ্ড চান, তাঁরা কি সাফারার বা ভিক্টিমের জন্য ন্যায়বিচারও চান? তাঁদের সকলেই চান? যে ক’জন চান, তাঁরা কেবল সেটুকুই চান? নাকি আরও কিছু চান? যাঁরা মৃত্যুদণ্ড চান না, তাঁরা কেউই কি আক্রান্তের জন্য ন্যায়বিচার চান না? একজনও না? এবং আসলে কি আমরা, এই খন্ডিত আমরা, এই বিক্ষত আমরা, এই দ্বিধাবিভক্ত আমরা যারা পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছি ক্ষোভে, অসন্তোষে, বিরুদ্ধতায়, শেষতক্ আমরা সকলেই কি এই অপরাধের, এই ভয়ঙ্কর, বীভত্স অপরাধের অবসান চাই না? “আমরা ধর্ষণ, খুন, গণহত্যা চাই না। অপচয়িত রক্তপাত আর অসহায় মৃত্যু চাই না।” – এই বিষয়ে অন্তত আমরা একমত তো? যদি সেটুকু হতে পারি, সেই ন্যূনতম সাধারণ অঞ্চল থেকেই আলোচনা শুরু হতে পারে।
 
শুরুর আগে দুটো কথা, আকাদেমিয়ার সুরম্য অঞ্চলে ডিসকোর্স করবার ইচ্ছে এই লেখার নেই। দুই, যুক্তির কাছে বিনম্র আত্মসমর্পণ না করতে পারলে, সব আলোচনাই হবে বৃথা।
 
 
অপরাধ, শাস্তি এবং সরলরেখা
 
“যুক্তির কাছে বিনম্র আত্মসমর্পন না করতে পারলে, সব আলোচনাই হবে বৃথা।”– এই কথাটা আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। কথা যে, ধরা যাক, আমরা সামগ্রিক ভাবেই রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকারের বিরুদ্ধে। তার হাজারো যুক্তি থাকতে পারে। ‘আমাদের’ যুক্তি ‘ওদের’ থেকে ঢের বেশি জমকালো আর ঝাঁঝালোও হতে পারে, কিন্তু ‘ওরা’ মূর্খ, অথবা অসংবেদনশীল, অথবা হিংস্র, সেডিস্ট, জিঘাংসায় উন্মত্ত ও লোলুপ – এই ধারণাটা আমাদের ছাড়তে হবে। হিংসার ইতরবিশেষ পেটের ভিতর তৈরি হয় না। পরিস্থিতি বিশেষে মানুষ হিংসক ও ক্রুদ্ধ হয়। ঠিক একইভাবে, যারা রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে, সেই আরেক ‘আমরা’ যদি ভেবে বসে, তাদের ‘ওরা’রা ছদ্ম-মানবতাবাদী, নিজের মানবপ্রেমী ইমেজ নিয়েই কেবল ভাবিত, অপরাধীর উপর আদৌ ক্রুদ্ধ নন এবং ন্যায়বিচার চায় না, তাহলেও খুব মুশকিল। অতঃপর যুক্তি যেখানে ঘুমিয়ে থাকে, সেখানেই দানবের জন্ম… এবং ইত্যাদি। আমাদের পরম যত্নে আর নিষ্ঠায় মুখোমুখি বসা প্রয়োজন। বসে ভাবা প্রয়োজন, যদি, ধরা যাক, আহত বা নিহত বা নির্যাতিত মানুষটি আমার নিকটজন হতো তাহলে আমি হয়তো, হয়তো কেন, নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডই চাইতাম। কিন্তু আমার সেই ব্যক্তিগত ঘাতজ স্মৃতি (traumatic memory) এবং অন্তরঙ্গ চকিত প্রতিক্রিয়া কি রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে? আমার সেই চাওয়া কি হবে বিচারের মানদণ্ড? তাহলে তো সমূহ বিপদ! কার চাওয়া গুরুত্ব পাবে? খোদ ভিক্টিমের? যেখানে সে অনুপস্থিত, সেখানে তার দাদা নাকি কাকা, বা বাবার, অথবা মায়ের? যদি তাঁরা, ধরা যাক, চান যে অপরাধীকে বেকসুর খালাস করা হোক, তাহলেই সেটাই কি হবে ন্যায়বিচার? যদি মনে করেন যে প্রতিদিন একটি করে প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হোক শরীরের, তাহলে তাতেই সঠিক সাজা হবে? যেমনটি তাঁরা চান, ঠিক তেমন মেনে নিলেই যদি ন্যায়বিচার হয়, যাতে ‘আমার’ শান্তি হয় (যদি আমি আক্রান্তও হই), তাই যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা হয় – তাহলে একই অপরাধের জন্য কারও ফাঁসি হতে পারে, কারও যাবজ্জীবন হতে পারে, কারও মাথা কেটে নেওয়া হতে পারে, কারও ইলেক্ট্রিক চেয়ার প্রাপ্তি হতে পারে এবং বিবিধ শাস্তিপ্রণালির বিচিত্র সমাবেশে একদিন এই পৃথিবী অপরাধীমুক্ত হয়ে যেতে পারে, কিন্তু শাস্তি দিয়ে অপরাধ কমেছে এমন ঘটনা ইতিহাসে দেখা যায়নি। কথাগুলো বলা হলো কেননা অনেকেই রাষ্ট্রের ফাঁসি দেওয়ার পরিবর্তে পাবলিকের হাতে ব্যাপারটা ছেড়ে দিতে চান, কেউ আরও নির্দিষ্ট ভাবে ভিক্টিমের বা তাঁর আত্মজনেদের হাতে ছেড়ে দিতে চান। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডটা তাঁদের ‘ঠিক’ শাস্তি বলে মনে হয় না। এই ‘ঠিক শাস্তি বলে মনে না হওয়া’-র পেছনে এক ধরণের সামঞ্জস্য বিধানের মানসিকতা কাজ করে। অপরাধ আর শাস্তির সামঞ্জস্য। কেমন? না, আহত বা নিহত বা নির্যাতিত মানুষটি ঠিক যতখানি কষ্ট পেয়েছেন, মেপে মেপে ততখানি কষ্ট অপরাধীরও পাওয়া চাই। এই সুসমঞ্জস ব্যবস্থার মধ্যেই কেবল ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে – এই ধারণা আমাদের মগজে সেঁদিয়ে থাকে। এই ধারণা থেকেই আসে ভিক্টিমের হাতে ছেড়ে দেওয়ার, তার আত্মজনেদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার, অথবা আরও বড়ো করে ভাবলে পাবলিকের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শগুলো। আমাদের বিনম্র নিবেদন এই,
 
(এক) এই সামঞ্জস্য-বিধানের চেষ্টা অবান্তর এবং আক্রান্তের জন্য অপমানজনক।
 
বরং, (দুই) যে যন্ত্রণা সে পেয়েছে, আর কোনো পরিস্থিতিতে আর কোনো যন্ত্রণাই দাঁড়িপাল্লার হিসেবে তার সমতুল নয়, এই আমাদের বিশ্বাস।
 
এবং বিশ্বাস এও যে, (তিন) তার প্রতিশোধস্পৃহার মধ্যে – যদি সেই স্পৃহা খুব স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাভাবিকও হয় – এই যন্ত্রণার উপশম নেই। থাকতে পারে না।
 
এবং বিশ্বাস, (চার) এই উপশমই আমাদের একমাত্র কাম্য। যদি তাই হয়, তাহলে এমন যেকোনো আবেগকে আমাদের ভিতর থেকেই প্রতিহত করতে হবে, যা সেই স্থায়ী উপশমের পরিপন্থী। মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধতা কেবল এ কারণে নয় যে তাতে অপরাধ কমবে না, এ কারণেও যে তাতে অপরাধীর শরীরে প্রবিষ্ট হয়েও অপরাধের মূল বিন্দুতে পৌঁছনো যাবে না।
 
 
একটি জনপ্রিয় শাস্তি ও রাষ্ট্রের জেলুসিল
 
ঝুলিয়ে দিলেই যে ল্যাটা চুকে যাবে না, এটা বোঝার সময় এসেছে। ভয়াবহ কোনো জঙ্গিহানা অথবা গণহত্যা বা ধর্ষণে যুক্ত থাকা অনেকানেক মানুষ এই সমাজেই তৈরি, এই সমাজের জলহাওয়ায় পুষ্ট, তাঁরা ‘জন্তু’ নন, ‘পিশাচ’ নন, মনুষ্যেতর কোনো ভিনগ্রহী জীব নন, একেবারে হুবহু আমাদেরই মতো রক্তমাংসের মানুষ। এবং আমরাও তাদের মতো মানুষ। আমরা যারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী নই, এবং আমরা যারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী – আমরা দুজনেই – আমরা সকলেই মানুষের মতো নিঃস্ব আর মানুষের মতো ক্রুদ্ধ, মানুষের মতো লোভী আর মানুষের মতো অসহায়, মানুষের মতো হিংসক আর মানুষের মতো প্রেমিক। জনৈক বন্ধু বলেছিলেন ঠাট্টা করে, বিপদে পড়লে কিছুক্ষণ মাথা চুলকান এবং তারপর সেই বিপন্নতার জন্য দ্বিতীয় একজনকে দায়ী করে নিশ্চিন্ত হোন – এ ছাড়া বিপদহরণের, শঙ্কামোচনের আর কোনো পন্থা আমরা শিখে উঠলাম না।
 
আলোচনার ক্ষেত্রকে আবার একটু সংকীর্ণ করা যাক। ধরা যাক, ধর্ষণের পর খুনের মতো একটি ঘটনা, নির্ভয়ানাম্নী তরুণীর সাথে যা ঘটে গেছে, ভারতীয় উপমহাদেশে – ধরা যাক, সেই ‘রেয়ারেস্ট অব রেয়ার’ (যদি মেনেও নিই) কেসে অপরাধীদের ফাঁসির সাজা দেওয়া হলো। কে দেবে শাস্তি? রাষ্ট্র। এই শাস্তির সমর্থনে থাকা অসংখ্য মানুষ, এই আমরা, কী তীব্র অপরাধবোধে পীড়িত! কে শাস্তি দিচ্ছে, শাস্তি দেওয়ার অধিকার কার, কারা এই শাস্তিকে সমর্থন করছে, কারা দূর থেকে শাস্তিটিকে দেখছে – এই সব প্রশ্ন এড়িয়ে যাঁরা চান এখনই মেরে ফেলা হোক ঐ নির্দিষ্ট চারজনকে, তাঁরা অনেকেই আসলে চান নিজেদেরই অজান্তে নিজেদের কাঁধ থেকে দায় সরিয়ে দিতে। তাঁরা জানেন, এই ধর্ষণ, বা আরও অসংখ্য ধর্ষণ, প্রতিদিন – তাঁরাও করছেন। জানেন, যখন বলা হয়, “মেয়েদের মুখে আবার বড়ো বড়ো কথা কী”, যখন বলা হয়, “মেয়ে হয়ে রান্না জানে না”, যখন বলা হয় “রুমালের সাইজের পোশাক”, যখন বলা হয়, “চরিত্রই নেই যার তার আবার ধর্ষণ কীসের”, যখন আড় চোখে চেখে নেওয়া হয় অটো বা বাসের সহযাত্রীটিকে, যখন নিশ্চিন্তে কনুই চালিয়ে দেওয়া হয় আলতো – তখন, জানেন তাঁরা, আসলে তাঁরা সকলে অপরাধী। তাঁরা জানেন, এই অপরাধের ভার তাঁদের বইতে হবে কেননা তাঁদের ফাঁসি দেওয়া তো দূরের কথা, ন্যূনতম শাস্তি দেওয়া হবে না। তাঁরা জানেন, প্রতিদিনের শেষে তাঁদের একবারও দাঁড়াতে হবে না কয়েদি পোশাক পরে। একটা ঝুলন্ত দড়ির সামনে। তাঁরা মানে কোনো তৃতীয় পক্ষ না। আমিও আছি এই ‘তাঁরা’-র মধ্যে। এই আমরা, আমরা সবাই জানি, যেদিন উত্পাদন যন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হলো পুরুষের মালিকানা, সেইদিন থেকে – সেই লাঙল আবিষ্কারের সময় থেকেই আমরা সক্কলে মিলে এই প্রতিটা ধর্ষণকে প্রতিদিন ঘটিয়ে তুলেছি। ঘটতে দিয়েছি। ঐ চারটি ছেলের মুখ – যাদের জন্য আমি অবিচ্যুয়ারি লিখছি না, আই রিপিট, যাদের জন্য আমি অবিচ্যুয়ারি লিখছি না, যারা ভয়ঙ্কর অপরাধী, যে অপরাধের সাথে আর কোনো কিছুর তুলনা হয় না, তেমন ভয়াবহ, ভয়ঙ্কর, হিংস্র অপরাধের অপরাধী যারা – তাদের মুখ আমরা আয়নায় দেখিনি কখনো? যুক্তি এটা নয় যে উপমহাদেশে অসংখ্য ভিক্টিম বিচার পান না। যুক্তি হলো, আমরা চারটে মুখ পেয়ে গেছি, যারা আমাদের বাঁচিয়ে দেবে। যারা মরে গেলে, যখন মরে যাবে তারা, যখন ফাঁসের দড়িটা একটু-একটু করে এঁটে বসবে গলায়, যখন আস্তে আস্তে দম বন্ধ হয়ে আসবে, চোখটা অল্প লাল হবে আর বেরিয়ে আসতে থাকবে ঠিকরে, সেই মুহূর্তগুলোতে আমরা একটু একটু করে হাত ধুয়ে ফেলবো। পরম আহ্লাদে। “কে করেছিল?”– কেউ জানতে চাইলেই নিখুঁত আঙুল তুলবো – “ঐ তো, ঐ চারজন”।  তাতে বেশ ঝেড়ে ফেলা যাবে সব। ঝটপট। আমরা ফাঁসির বিরুদ্ধে কেননা আমরা দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছি না। আমরা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কারণ কেবল ধর্ষণ না, জঙ্গিহানা বা সন্ত্রাসবাদে আমাদের সচেতন বা অচেতন অংশগ্রহণের গ্লানি থেকে আমরা এত সহজে মুক্তি চাই না। আমরা মনে করি, আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে, যেহেতু এবং কেবল যেহেতু, আমরা মনে করি উত্তরণ সম্ভব। আমাদের উত্তরণ সম্ভব। উত্তরণে বিশ্বাস ছাড়া এই বেঁচে থাকা, এই লড়াই, এই বিসংবাদের সবটুকুই অপচয়, আমরা মানি। আমরা মনে করি না মানুষের পেটের ভিতর অপরাধের ইতরবিশেষ তৈরি হয়, তাই ‘সংশোধন সম্ভব না’ – এই প্রফেটিক মন্তব্য আমাদের অবৈজ্ঞানিক আর অন্তঃসারহীন মনে হয়। শাস্তিও তো সংশোধনের জন্যেই! কর্মফলে আমাদের বিশ্বাস নেই। আমাদের বিশ্বাস শাশ্বত মুক্তির খোঁজে অবিরাম লড়াই-এ।
 
প্রশ্ন অবশ্য আরও জটিল। কেবল শাস্তি দেওয়া দরকার কিনা, তা নিয়ে ভাবলে অনেকগুলো সমস্যা থেকে যায়। কে শাস্তি দিচ্ছে সেটাও তো একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমি শাস্তির সাথে সহমত পোষন করি তবুও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, শাস্তিদাতা নিজেই যদি অপরাধী হয়, তাহলে অপরাধের মূলবিন্দুতে পৌঁছনোর পথে তৈরি করে দেওয়া যায় আশ্চর্য আলেয়া। আর তাতে অপরাধ বাড়তে থাকে। শাস্তিও বাড়তে থাকে। কেবল আবছা হতে থাকে অপরাধীর মুখ, তাই না? ভেবে দেখুন, একজন লোক দশজন লোকের হাতে একটা রাইফেল তুলে দিয়ে বললো, ‘যাও ঐ লোকটাকে খুন করে এসো।’ যারা রাইফেল চালিয়ে খুন করলো তারা ভয়ানক অপরাধী। আপনি তাদের দেখতে পেলেন। বললেন, তাদের ফাঁসি চান। রাগে। ক্ষোভে। যন্ত্রণায়। কিন্তু যদি সেই লোকটি ফাঁসি দেওয়ার একমাত্র অধিকারী হয়, যে তাদের হাতে রাইফেল তুলে দিয়েছিল? তাহলে? আপনি শাস্তির সমর্থক কিনা সেটাই কেবল কথা না, আপনি রাষ্ট্রের শাস্তি দেওয়ার অধিকারের সমর্থক কিনা – কথা সেটাও। রাষ্ট্রের জন্মের সাথেই যেখানে জড়িয়ে আছে এই অপরাধপ্রবণতার প্রশ্নগুলো। খুব সহজ করে, “the only way to contain (it would be naive to say ‘end’) terrorism is to look at the monster in the mirror”– অরুন্ধতী রায়ের এই চমকপ্রদ মন্তব্য কি সব অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক নয়?
 
আমরা যুক্তি শৃঙ্খলের শেষের দিকে এসে পৌঁছেছি। বেশ, রাষ্ট্রই তাহলে দানব। তাহলে রাষ্ট্র অন্য কোনো শাস্তিই বা দেয় কোন অধিকারে? না, অধিকারে না। অপরাধবোধে। গ্লানিতে। প্রায়শ্চিত্তে। শাস্তি দেওয়া তো রাষ্ট্রের অধিকারমাত্র নয়, শাস্তি দেওয়া আমার দাবিও বটে। প্রয়োজনে যাবজ্জীবন। যেমন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই আমরা রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাই – তেমন দাবি। দাবি যে জেল হয়ে উঠুক সংশোধনাগার। দাবি যে কয়েদির শ্রমের ফসল ভাগ হয়ে যাক দেশের কল্যাণে। দাবি যে, আধুনিক মনোবিজ্ঞানের প্রথাপদ্ধতি মেনে চলুক সংশোধনের যতেক প্রয়াস, চলুক চিকিত্সা। যতদিন তা না হচ্ছে, তার জন্য চলুক লড়াই, সেই লড়াইকে স্তিমিত করার কোনো চক্রান্তই আমরা মানবো না, এ কথা সোচ্চারে বলবার দায় আমরা নেবো কিনা – এই প্রশ্নই সমকাল আমাদের সামনে রাখছে। যতদিন অপরাধ আছে, ততদিন অপরাধীকে জিন্দা রেখে রাষ্ট্র দায় নিক। আমরা দায় স্বীকার করি। মৃত্যুই তো সেই অমোঘ, যার পর আর নেই! এই ‘নেই’-এর কনোটেশন হতে পারে ভয়ঙ্কর। কালও যারা ছিল, আজ যারা নেই, তারা কি সত্যিই নেই? আজমল কাসভ নেই? নিশ্চিত? মুকেশ সিংহ নেই? আমরা নেই? ধনঞ্জয় নেই? দিব্যি আছে। বহাল তবিয়তে আছে। সেই থাকার মাঝে, রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত চক্রান্ত এই, আমাদের ক্রান্তিকারী সরবতা সেফটি ভালভের মধ্যে দিয়ে প্রশমিত হয়ে আসে প্রতিটা ফাঁসির পর। আমরা একদিন অন্তত আহ্লাদে বলতে পারি, ‘যাক্, বাঁচা গেল’! বাঁচা তবু গেল কি?
 
 
একটা গল্প 
 
এক দেশে এক স্বৈরশাসক ছিলেন। পান থেকে চুন খসলেই তিনি মৃত্যুদণ্ড দিতেন। বিজ্ঞানী ঠিক মতো গবেষণা করছে না, মৃত্যুদণ্ড। শিক্ষক ঠিক মতো ক্লাস নিচ্ছে না, মৃত্যুদণ্ড। ডাক্তার ঠিক মতো চিকিত্সা করছে না, মৃত্যুদণ্ড। কেউ চুরি করেছে, মৃত্যুদণ্ড। তার চেয়ে গুরুতর কোনো অপরাধ হলে তো কথাই নেই! সেই শাসক একদিন ঘুরতে গেলেন অন্য এক দেশে, ছদ্মবেশে ঘুরতে ঘুরতে তিনি হঠাত্ই ঢুকে পড়লেন একটি প্রায়ান্ধকার পানশালায়। আর দেখলেন সেখানে অজস্র মুখ, দেখলেন, মুখগুলো তাঁর চেনা। যাদের তিনি এতদিন মৃত্যুদণ্ড দিয়ে এসেছেন – চোরা কোন্ ফিকিরে তারা এসে দল পাকিয়েছে ভিন্ দেশের এই পানশালায়। একজনও মরেনি। বেঁচে আছে সকলে। বেঁচে আছে এক চুরি থেকে আরেক চুরিতে, এক খুন থেকে আরেক খুনে, এক ধর্ষণ থেকে আরেক ধর্ষণে, এক গণহত্যা থেকে অপর গণহত্যায়, এক হিংসা থেকে নতুন হিংসা, ঘৃণা থেকে আধুনিকতর ঘৃণায় বেঁচে আছে সহস্র মানুষ। বেঁচে আছে মৃত্যুর পরেও। শাসক এখন কী করবেন !
 
সেইসব মুখের ভিড়ে কোনো মুখ কি আমাদেরও নেই?
Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to একটি জনপ্রিয় শাস্তি ও রাষ্ট্রের জেলুসিল

  1. Shyamal Chatterji বলেছেন:

    শাস্তি বা দণ্ডদানের উদ্ভবের ইতিহাস দেখলেই মৃত্যুদণ্ড কখনই সমর্থনযোগ্য নয়, রাষ্ট্র নিজের গাফিলতি ঢাকতে এই দণ্ডকে পপুলার করে। এমনভাবে হাজির করে যাতে জনগন মেনে নেয়।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s