উদ্বাস্তু সব (অথবা শব)

লিখেছেন শাওন চক্রবর্তী। 

India hosts 199,937 refugees and 5,074 asylum seekers*

(*As on December, 2014)

Refugees to India: A Closure to Home শীর্ষক ডক্যুমেন্টারি শুরুই হচ্ছে উপরের এই কথাগুলোর মধ্য দিয়ে। ভারতে এখনো অনবরত বেড়ে চলেছে বাইরে থেকে আসা উদ্বাস্তু জনসংখ্যা। এঁরা কেউ আসছেন মায়ানমার থেকে, কেউ বাংলাদেশ থেকে, কেউ টিবেট থেকে। একে ধরা যাক কেস নং-১ হিসেবে। এঁরা রাষ্ট্র তাঁদের শোষণ করবে জেনেও নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থাভূক্ত করতে চান আপাত নিরাপত্তার আশায়। এঁদের কারও দায়িত্বই রাষ্ট্র নিতে চায় না। রাষ্ট্রের দিক থেকে একটা খুব সুপরিকল্পিত যুক্তি রয়েছে তার পেছনে। দেশের জনসংখ্যা বিপুল, তাদের ব্যবস্থা করারই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই, তার উপর এই অতিরিক্ত চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। এই যুক্তি শোনার পর দেশের মানুষেরও একটা বিকর্ষণ তৈরি হবে উদ্বাস্তুদের প্রতি। অথচ বেআইনিভাবে কিন্তু উদ্বাস্তুরা রুটি-রুজির সংস্থান ক’রে নিতে পারছেন অনেক ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ রাষ্ট্রেরও সুযোগ ছিল দায়িত্ব নেওয়ার। প্রচলিত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা আসলে মুনাফাকেন্দ্রিক, এই ব্যবস্থায় মানুষের বিষয়ীসত্তা বা Subjectivity’র কোনো গুরুত্ব নেই, সে একটা object মাত্র, একটা পণ্য।

উদ্বাস্তু। Refugee. ভারতীয় উপমহাদেশে যাকে অস্বীকার করা অকল্পনীয়। দেশভাগ, দাঙ্গা, মন্বন্তরের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে যে সমাজ, তার কাছে উদ্বাস্তু শব্দটা কেবলমাত্র একটা সামাজিক অবস্থান নয়, তার থেকে অনেক বেশি আবেগ-সম্পর্কিত একটা অবস্থান। বলা বাহুল্য, সে আবেগ সুখজাত নয়। দেশভাগের সময় থেকে ভারতের ইতিহাস ও আঞ্চলিক সাহিত্যকে ডমিনেট ক’রে চলেছে উদ্বাস্তুর ইতিহাস। তা নিয়ে আমার আলাদা ক’রে কিছু বলার নেই। কিন্তু পরিচিত, গৃহীত এই উদ্বাস্তু সত্তার বাইরেও এই সমাজব্যবস্থায় অনবরত তৈরি হয়ে চলেছে উদ্বাস্তুর নতুন নতুন সংজ্ঞা।

যে মানুষটা বড় হচ্ছে এই সত্যটা জেনেই যে শিক্ষা কেবলমাত্র একটা বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার, স্বাস্থ্য একটা বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার, চিকিৎসা, বিনোদন, সামাজিক স্বীকৃতি সব…সবকিছুই সেই একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার, সেই লোকটা কী করবে? যুদ্ধে নামবে? না। সে তার অল্প শিক্ষা নিয়েই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কোনো সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেবে, দেখবে কিভাবে সূক্ষ্ণ থেকে সূক্ষ্ণতর বিচারে সেখানে বেছে নেওয়া হচ্ছে ক্রিম সেক্‌শনকে, দেখবে তাকে কিভাবে ন্যাংটো ক’রে দেখা হচ্ছে কোনো দু’নম্বরি পদ্ধতিতে সে সেই ক্রিম সেক্‌শনে চ’লে যেতে চাইছে কি না! স্কুল, কলেজ, কারখানা, শপিং মল—সব কিছুর প্রবেশদ্বারে রাষ্ট্র প্রতি মুহুর্তে তাকে সন্দেহ করছে, সন্দেহ করছে তার দায়বদ্ধতাকে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে। তার রুচি, তার খাদ্যাভ্যাস, তার বক্তব্য মায় তার তাবৎ অস্তিত্বকেই সেন্সর ক’রে দেওয়া হবে! এই রাষ্ট্রকে তবে কেন সে বিশ্বাস করবে? কিভাবে নিজেকে প্লেস করবে এই ব্যবস্থাতে? পারবে না। কাজেই সেও আসলে রিফিউজি। যতটুকু অবিশ্বাস তৈরি হ’লে আর রিভোল্ট করার কথা ভাবা যায় না, সেই অবিশ্বাস নিয়েই সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা ক’রে যাবে এই ব্যবস্থাটার সাথে। একে ধরা যাক, কেস নং- ২ হিসেবে।

মফস্বল শহরগুলো অনবরত কলকাতা হয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু তারপরও দুইয়ের মধ্যবর্তী ফাঁক অনেকটা। আজ থেকে বছর সাতেক আগেও পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মফস্বল শপিং মল দেখেনি, ফ্ল্যাটবাড়ি-কমপ্লেক্সের এত বাড়বাড়ন্ত দেখেনি। এখন এ’সবই মফস্বলের পরিচিত চিত্র। অথচ তারপরও কলকাতা কিংবা যে কোনো বড় নগরীতে প্রতিদিন মফস্বল আর গ্রাম থেকে মানুষ উঠে আসছে, চিরকালের ভাবনা নিয়ে নয়। তবে সমকালের? এর উত্তর তাদের জানা নেই। কেন মানুষ চ’লে আসে একটা বড় নগরীতে? সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, বড় শহরে শিক্ষাব্যবস্থা, সুযোগ ও পরিসর অনেক বেশি, কাজের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফলত আধুনিকতার দাবি নিয়ে জন্মানো মানুষের আর কিই বা করার থাকতে পারে! বড় শহরে চ’লে এসে সে আবার বেড়ে উঠতে থাকে নতুনভাবে, তার মূল্যবোধ পালটে যেতে থাকে, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে তার নিজস্ব যাবতীয় ধারণাও পালটে যেতে থাকে। কিছু বছর পর সে যখন ঘুরে দেখে নিজের গ্রামীণ কিংবা মফস্বলীয় অস্তিত্বটাকে, কার্যত সে তখন নতুন মানুষ। ‘নতুন’ , এক্কেবারে ঝা চকচকে! কিন্তু এই নতুন মানুষটা তাহ’লে নিজের ইতিহাস হিসেবে কিসের সাথে সংলগ্ন হবে? তার এই নতুন অস্তিত্বটার ইতিহাস সে কোথায় খুঁজে পাবে? মজার ব্যপার হ’ল, একটা নির্দিষ্ট সময়কালে দাঁড়িয়ে তার ইতিহাস নির্মাণ করা যায় না, বড় জোর যা আছে, তার সন্ধানের চেষ্টাটুকু চালানো যেতে পারে। বড় শহরে তার কোনো stake নেই। সেখানে তার হয়তো বস্তুগত ownership তৈরি হ’তেই পারে; কিন্তু বড় শহরের ইতিহাসকে সে তার শৈশব থেকেই দেখতে শিখেছে দূরবর্তী অবস্থানে থাকা একটা বিষয় হিসেবে, ঠিক পার্থেননকে যেমন গোটা শহর থেকেই দেখা যেত, কিন্তু দূর থেকে – অনেকটা তেমনি! ক্রমশ শহুরে হয়ে উঠতে থাকা সেই মানুষটা তাই বড় শহরের ইতিহাসের কোনো অংশে কখনো নিজের অবস্থান নির্ধারণ ক’রে উঠতে পারে না। যে গ্রাম বা মফস্বল ছেড়ে সে এসেছিল, সেটাও পালটে গেছে, পালটে গেছে দেখাটা এবং দেখতে চাওয়াটাও। ক্রমশ ‘নাগরিক’ হয়ে উঠতে থাকা মানুষটা এখন তার বর্তমান অস্তিত্বের তাড়নায় গ্রাম বা মফস্বলকেও দেখতে চায়  বড় শহরের মিনিয়েচার হিসেবে; চেহারায় নয় – সংস্কৃতিগতভাবে, মানুষের যৌথ যাপনের দিক থেকে, এবং অনিবার্যভাবে হতাশ হয়! এ’ভাবেই জন্ম নিতে থাকে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-র অনেকগুলো প্রথম জীবনের শশী, যে কলকাতাকে খোঁজে গাওদিয়ার মধ্যে, কোথাও নিজেকে প্লেস করতে পারে না, বুঝে উঠতে পারে না তার আসলে ঠিক কোথায় থাকার কথা ছিল!

‘উদ্বাস্তু’ শব্দটি চিহ্নিত করছে সেই সব মানুষকে, যাদের বাধ্যত ছেড়ে আসতে হয়েছে নিজেদের ভিটেকে। সেই যুক্তিক্রমে তবে তো এই মানুষগুলোও উদ্বাস্তুই। মানসিক স্তরে কোনো কিছুর উপর কোনো ownership –ই তার নেই। কোথাও সংলগ্ন হ’তে না পারা, কোথাও শেকড় ছড়াতে না পারা—এটাই তো উদ্বাস্তুর প্রধান সংকট, যা শুধুমাত্র বস্তুগত প্রক্রিয়ায় নির্ণীত হয় না, মানসিক প্রক্রিয়াও যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। উদ্বাস্তু কলোনির সাধারণ সংকটের সাথে এর কোনো ভেদ নেই। একে ধরা যাক, কেস নং-৩ হিসেবে।

দাঙ্গার কারণে যারা ভিটে হারিয়েছে, দেশভাগে যারা ভিটে হারিয়েছে, তারা ‘উদ্বাস্তু’ পরিভাষার ধারণায় গৃহীত। তাদের নিজস্ব মঞ্চ আছে, আছে অধিকার আদায়ের মুভমেন্টে অংশগ্রহণ। কিন্তু এই আধুনিক পুঁজিবাদী, নয়া উদারবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় দাঁড়িয়ে ক্রমশ শেকড় হারাতে থাকা এই নতুন উদ্বাস্তুরা? তাদের কোনো যৌথ মঞ্চ নেই, তারা নিজেদের উদ্বাস্তু হিসেবে এখনো শনাক্ত ক’রে উঠতে পারেনি। ক্রমশ যে উদ্বাস্তুরা একটু একটু ক’রে কিংবা অনেক অনেক ক’রে জড়ো হচ্ছে বড় বড় শহরগুলোতে, যাদের চাপে একদিন ফেটে পড়তে পারে বড় শহরগুলো, তারা তাই প্রতিক্রিয়াও জানায় না। আপাত বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্য একদিকে, অন্যদিকে চেতনায় থাকা ডিস্‌প্লেসমেন্ট কার্যত তাকে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেয় না, তার সামনে মূর্ত কোনোকিছুকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে দেয় না। সময়ের ফ্রেমটাকে বড় করলেই আমরা দেখতে পাব, এই উদ্বাস্তুরা কত ভয়ানকভাবে পরিস্থিতির শিকার!

কেস নং ২ এবং ৩-এ দেখা যাচ্ছে, সংকটটা মূলত ভাবগত এবং কেস নং ১-এর সংকট সরাসরিভাবে বস্তুগত। এই আপাত বৈসাদৃশ্যের কারণেই এই ডিস্‌প্লেস্‌ড্‌ মানুষগুলো কখনো জোটবদ্ধ হ’তে পারে না। প্রতিরোধ, প্রতিস্পর্ধা – এই শব্দগুলোকে ক্রমাগত সস্তা ক’রে দিতে থাকে মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাটা। কার্ল মার্ক্স ‘A Contribution to the Critique of Political Economy’-তে বলেছিলেন,

It is not the consciousness of men that determines their existence, but their social existence that determines their consciousness.

এই ১,২ এবং ৩ নং কেসও আসলে একটাই কেস। উদ্বাস্তু সমস্যাটা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। সমস্যা আদতে একটাই। পুঁজিবাদ।

একটা সময়, যে নিজের গর্ভে ধারণ ক’রে আছে অজস্র বিন্যাসে থাকা অসমতা, এতটাই সুকৌশলী সেই বিন্যাস যে তাকেই ভুল হয় সমতা ব’লে। মানুষ ভুল করে। ভুলই করে। কিছু বলে না। অভ্যেসের ঘষা লেগে অসমান তলও একেবারে তেল চকচকে মসৃণ হয়ে যায়। তাতেই পিছলে পড়ে আইলান কুর্দি। স’রে যায়। খবর মুনাফা। অসহ্য মুনাফা কেবল একমাত্র সত্য হয়ে থেকে যায় সেই মসৃণ তলে।

আস্তে আস্তে কিংবা খুব দ্রুত আমরা এ’ভাবে বোবা হয়ে যেতে থাকি পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতায়। কোনো একটা গোটা বক্তব্য কোনো শিল্প মাধ্যমেই আর সৎ উপায়ে তৈরি হয় না। ‘গোটা’—এই আইডিয়াটাই তো লুপ্তপ্রায়। আসলে মানুষ জানেই না এই মুহুর্তে ঠিক কী তার বলা উচিৎ, ঠিক কী তার করা উচিৎ! অভ্যেস মারফত অর্জিত কিছু শর্তকে মানুষ পালন ক’রে চলে আর মাঝেমধ্যে পাশ ফিরে তাকেই ঔচিত্য ভেবে নিয়ে হাসে। একাই! প্রত্যেকে। বড় শহরের মেদ বাড়তে থাকে প্রতি মুহুর্তে, গ্রাম- মফস্বল উজাড় ক’রে দিয়ে সেখানে ভিড় করতে থাকে ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন উদ্বাস্তুরা। তবে বড় বড় শহরগুলো ফেটে গেলে নিশচয়ই একদিন…

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s