স্মার্ট শহরের ইতিকথা

লিখেছেন মৈত্রেয়ী সেনগুপ্ত। 

জহরলাল নেহরুর বিখ্যাত উক্তি “dams are the temples of modern India” হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা আছে। ১৯৫৫ সালে অন্ধ্রের নাগার্জুনসাগর ড্যাম উদ্বোধন করার সময় তার এই উক্তি প্রকৃতির দমনকে সমর্থন করে এক আশ্চর্য পবিত্রতার দোহাই দিয়ে। কয়েক বছর পর, ১৯৫৮-র নভেম্বর মাসে (কিছুটা ভুল স্বীকার করে নিয়ে কিনা কে জানে), Central Board of Irrigation and Power-এর মিটিঙে নেহরু বলেন যে ভারতবর্ষে এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তার ভাষায় এটাকে বলা যেতে পারে ‘disease of giganticism’। তিনি চাইছিলেন জাতীয় সমৃদ্ধির পথে বিকল্প হোক ছোট কারখানা, সেচ প্রকল্প, বৈদ্যুতিক কেন্দ্র। নেহরু বলেন, “big projects were unable to assume national prosperity leading to national upsets, upsets of the people moving out and their retaliation and many other things.” তবে নেহরুর এই মত-বদল দেশের হাজার হাজার বিতাড়িত মানুষের মতই হারিয়ে যাবে। আধুনিক ভারতবর্ষ গঠনের চাকা ততদিনে ঘুরে গেছে।

Absolute Power বা সার্বিক ক্ষমতার ব্যবহার সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসকদল যেভাবে করেছিল, শুধু তার মুখোশটা পাল্টে নানা উপায়ে ভারতবর্ষের জমি অধিগ্রহণ করলেন নেহরু। ইংরেজ পরিকল্পিত জমি অধিগ্রহণ আইনের (১৮৯৪) কৌশলে eminent domain-এর doctrine ধার্য করলেন।  ১৬২৫ খৃষ্টাব্দে হিউগো গ্রোটিউস De jure belli ac pracis ( যুদ্ধ ও শান্তির আইন প্রসঙ্গে) গ্রন্থে লেখেন,

“The property of the subject is under the eminent domain of the state  or he who acts for it may use or even alienate and destroy such property, not only in cases of extreme necessity, but for ends of public utility, to which ends, those who formed civil society must be supposed to have intended that private ends should give way. But it is to be added that when this is done the state is bound to make good the loss of those who lose their property.”

অর্থাৎ, সহজ ভাবে বলতে গেলে,  জনগণের উন্নতির স্বার্থে স্বল্প ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে যেকোনো ব্যক্তির জমি অধিগ্রহণ করা রাষ্ট্রের অধিকার।

নেহরুর আধুনিক ভারতে নানা রকম ভাবে এই doctrine ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রথমে, পাঁচের দশকের প্রথমার্ধে, জমিদারদের থেকে জমি ফিরিয়ে নেওয়া হয়। দেশের মানুষের কাছে রাষ্ট্রের সুর তখন নরম। রাষ্ট্র বলল, সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে যারা এতদিন মানুষের জমি লুট করেছে তাদের থেকে জমি কেড়ে নেওয়া হোক। ১৯৫০-এ নতুন আইন তৈরি হল – Zamindari Abolition Act। সেখান থেকে, তর্কে-বিতর্কে, সম্পত্তির ধারণা নতুন এক আইনি রূপ নিতে শুরু করল। সেই একই doctrine ব্যবহার করে বিশাল কল-কারখানা, জল-বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠলো, হাজার হাজার মানুষের জল-জঙ্গল-জমি কেড়ে নিয়ে, তাদের ঘরছাড়া করে।

সাতের দশক থেকে বিভিন্ন আন্দোলনের ফলে উঠে এল কিছু প্রশ্ন। এই বিশাল প্রকল্পগুলো কাদের সুবিধে করে দেবে? সকলে কী সমান সুবিধে পাবে? রাষ্ট্র উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেবে কীভাবে? তারা যেখানে নতুন বসতি গড়বে, সেখানকার মানুষ কী তাদের গ্রহণ করবে? যে ক্ষতিপূরণের আশা তাদের দেখানো হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণের গণনা কি নির্ভুল? এবং সবথেকে জরুরি প্রশ্ন, ‘জনস্বার্থ’-এর অর্থ কী? জনস্বার্থে জনগণের স্বার্থ আসলে কতটা জড়িয়ে আছে?

ঊষা রামানাথান বলেন,

“The morality of the law which effects displacement is posited on the ‘larger public good’. It is couched in the language of ‘public purpose’. It reasons that the state will have to act to protect, and advance, generally, the interests of the people. There is an impracticability about detailing every circumstance which may need state action under these laws; the field is then left deliberately open, with the power essentially resting with state to determine what constitutes ‘public purpose’.”

রাষ্ট্র যখন জনকল্যাণের ধারণা নির্ধারণ করার চেষ্টা করে, তখন বুঝতে হবে, সেই ধারণা যেই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয় তা হল মানুষের সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করার ধারণা। একের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয় আরেকজনকে। সরল ভাবে বলতে গেলে, প্রথম অর্থে, রাষ্ট্র জমিদারি ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কৌশলে গঠন করল তার eminent domain। দ্বিতীয় অর্থে, সেই রাষ্ট্রই তার সার্বিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছে দেশবাসীর জল-জঙ্গল-জমি কেড়ে নিতে, তাদের সম্মতি ছাড়াই। তারা যখন লড়াই করে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছে তাদের চাষের জমি, তাদের ঘরবাড়ি, তখন রাষ্ট্র তাদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দিয়েছে – অর্থাৎ তারা জনকল্যাণ-স্বার্থ বিরোধী। তৃতীয় অর্থে,  রাষ্ট্র দুই দশকের নয়াউদারনীতির নীরব দর্শক মাত্র। নিজের পরাজয় স্বীকার করেই নয়াউদারনীতির প্রতি রাষ্ট্রের বিপুল আনুগত্য। মুক্ত চুক্তির যুগে সে নিজেই এখন চুক্তিবদ্ধ। আর দেশবাসীর সর্বস্ব লুটে নিয়ে সে বিক্রি করে দিচ্ছে গ্লোবাল ক্যাপিটালের কাছে।

গান্ধী তাঁর ‘জাতির জনক’-এর তক্‌মা সার্থক করে ১৯৪৫ সালে নেহরুকে একটি চিঠিতে তাঁর ‘আধুনিক গ্রাম’-এর ধারণার কথা লেখেন,

“While I admire modern science, I find that it is the old looked at in the true light of modern science which should be re-clothed and refashioned aright. You must not imagine that I am envisaging our village life as it is today. After all, every man lives in the world of his dreams. My ideal village will contain intelligent human beings. They will not live in dirt and darkness as animals. Men and women will be free to hold their own against anyone in the world. There will be neither plague, nor cholera, nor small pox, no one will be idle, no one will wallow in luxury…it is still possible to envisage railways, post and telegraph offices, etc. For me it is material to obtain the material article and the rest will fit into the picture afterwards.”

অর্থাৎ, গান্ধীর দৃষ্টিতে যেমন শহরের মূলেই ছিল আমাদের সভ্যতার বিকৃতি, নেহরুর আধুনিক ভারতের স্বপ্ন ছিল খানিকটা অন্যরকম।

“The fundamental problem of India is not Delhi or Calcutta or Bombay but the villages of India…We want to urbanise the village, not take away the people from the villages.”

আধুনিক ভারতের স্বপ্ন তাহলে দু’রকম। গান্ধী বললেন দেশ আধুনিক হতে গেলে, প্রয়োজন বিজ্ঞান – গ্রামবাসীদের আলোকপ্রাপ্তি ঘটবে এভাবেই। নেহরুর চিন্তা অন্যরকম। তাঁর ইতিহাসের রেখাগত চেতনায় শহর অতিক্রম করে গ্রামকে। গ্রামের আধুনিক উত্তরাধিকারী শহর। সেই শহর অতি স্পষ্ট ভাবে ‘ভারতীয়’। সেই আধুনিকীকরণ এক ‘ভারতীয়’ প্রক্রিয়া।

কয়েক বছরের মাথায় প্রতাপ সিং কাইরন নেহরুকে জানালেন যে পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর এখন পাকিস্তানের অংশ। নেহরু তাঁর সিভিল সার্ভেন্ট ভার্মা এবং থাপরকে ডেকে বললেন, নতুন এক শহর প্রয়োজন। তাঁরা চিঠি পাঠালেন লে কর্বাসিয়ারকে। তিনি শীঘ্রই রাজি হলেন চন্ডীগড় তৈরি করতে।

নতুন শহর চন্ডীগড় তৈরির সময়ে নেহরু মনে রেখেছিলেন কোম্পানি শহরগুলির ইতিহাস। মনে রেখেছিলেন,  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীকালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে গঠন করেছিল একের পর এক শহর – কলকাতা, মাদ্রাজ, বম্বে। শহরগুলির মাঝখানে এক অন্য শহর, সাদা শহর – বিরাট অট্টালিকা, কোম্পানি অফিসারদের থাকার ব্যবস্থা, বন-জঙ্গল সাফ করে খোলা সবুজ শহুরে ময়দান, কালো চামড়ার মানুষদের জন্য নিষিদ্ধ রাস্তা। শহরের ভেতরেই একাধিক শহর। অফিসারদের জন্য তৈরি হল সীমানা ঘেরা এক ঝকঝকে শহর, তার চারপাশে তাদের অনুগামী জমিদার শ্রেণির শহুরে আবাসন, এবং সব শেষে ‘নেটিভ’দের কালো শহর, তাদের অক্লেশ পরিশ্রমে বাঁধা ঘর, তাদের বাজার, কোলাহল। নেহরু মনে রেখেছিলেন এই অসম শহর, মনে রেখেছিলেন universal access-এর ভুঁয়ো স্বপ্ন। মনে রেখেছিলেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায় যাকে বলেছেন বৃটিশ শাসকদলের ‘rule by colonial difference’। তাই নেহরু যখন কর্বাসিয়ারের সঙ্গে বসে নতুন শহর চন্ডীগড়ের সত্তা নির্ধারণ করলেন, তখন তিনি জানতেন যে আধুনিক ভারতের শহর আখেরে হওয়া উচিত সবার।

তারপর শুরু হল নতুন শহরের কাজ। প্রকান্ড আকার ধারণ করল চন্ডীগড়ের বিধান সভা, সচিবালয়, হাই কোর্ট এবং আধুনিক ভারতের স্বপ্নের ওপেন হ্যান্ড মনুমেন্ট। এই মনুমেন্ট সর্বসাধারণের। এখানে নাগরিকরা একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে, তর্ক করতে পারে। তর্কের বিষয়? সে নানারকম – দেশের কথা, দশের কথা, দেশ কোন পথে এগোবে তার কথা, নতুন দেশের নতুন নাগরিকরা কেমন করে গড়ে তুলবে শক্ত, বলিষ্ঠ ‘গণতন্ত্র’, ইত্যাদি।

যেই উদারতায় তৈরি হল চন্ডীগড়, তার সমস্যা বাড়ল বৈ কমল না। দেশভাগের যন্ত্রনা, স্মৃতি-বিস্মৃতিকে বিলীন করে যে শহর, তার বদলে আজ সেখানেই বসেছে আর্ম্‌ড পেট্রল। চন্ডীগড়ের ওপেন হ্যান্ড মনুমেন্টে খোলা মনে তর্ক, মুক্তচিন্তার অবকাশ রাষ্ট্র নিঃশেষ করেছে। সেই অবকাশ আদৌ কোনোদিন ছিল কিনা তা অন্য প্রশ্ন। এখানে মূল কথাটা এইটা নয় যে ওপেন হ্যান্ড মনুমেন্ট পরিণত হয়েছে একটি বুর্জোয়া পাবলিক স্পেসে। কলকাতার ময়দান চত্ত্বর যেভাবে বন্দুকধারী গার্ড দ্বারা সংরক্ষিত, তেমনই চন্ডীগড়ের মনুমেন্টে সকলের প্রবেশের অধিকার আজ আর নেই। আসল ব্যাপারটা হল, কীভাবে চন্ডীগড়ে নেহরু আধুনিক ভারতের স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন।

নেহরু ঘোষণা করেছিলেন:

“Let this be a new town, symbolical of the freedom of India.”

পঞ্চাশ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হল সেই স্বপ্নের শহরের জন্য।

স্মার্ট সিটি প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালে। বিজেপি’র ম্যানিফেস্টোতে মোদি বললেন,

“There will be high growth urban centres where our cities would no longer remain a reflection of poverty and bottlenecks – rather, they should become symbols of efficiency, speed and scale, and this would happen through a 100 new cities enabled with the latest technology and infrastructure that would be built for them.”

বছর ঘুরতেই, স্মার্ট সিটি গাইডলাইন দ্বারা নতুন শতাব্দীর দেশে, নতুন শতাব্দীর শহরের ছবি ভেসে উঠল আমাদের চোখের সামনে।

আমেরিকার এক গ্লোবাল কন্সালটেন্সি ফার্ম, ফ্রস্ট্‌ অ্যান্ড সালিভান বলল যে আনুমানিক ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে স্মার্ট সিটির বাজার দর হয়ে দাঁড়াবে ১.৫৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্মার্ট সিটিকে তারা সাত ভাগে ভাগ করল – “smart governance and education, smart security, smart energy, smart infrastructure, smart mobility, smart healthcare, smart building”। অর্থাৎ বিশ্বের সকল স্মার্ট সিটিতে থাকা-খাওয়া, যানবাহন, বিদ্যুৎ প্রকল্প, লেখাপড়া, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা, এমনকি শহরের বাসিন্দারাও হয়ে উঠবে ‘স্মার্ট’।

স্মার্ট সিটির পরিকল্পনায় রয়েছে  eminent domainএর doctrine দ্বারা ব্যবহৃত ঔপনিবেশিক সার্বিক (absolute) ক্ষমতার আগ্রাসন; রয়েছে কোম্পানি শহরের নিষিদ্ধ সাদা শহর, দেওয়াল, বন্দুকধারী গার্ড। নিষিদ্ধ সাদা শহর এখন স্মার্ট সিটি নিজেই। এই সীমাবদ্ধ শহরের মধ্যিখানে তার সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট। তার চারপাশে গড়ে উঠল উঁচু কাঁচের তৈরি ইমারত। নয়াউদারনীতির দালালরা, সিমেন্স, আই বি এম-এর মত কর্পোরেট মাফিয়ারা ছড়িয়ে দিতে শুরু করল ভুঁয়ো স্বপ্ন। ব্যবহার করল মিডিয়া। যেমন দেখেছি আমরা রাজারহাটের ক্ষেত্রে। টাউনশিপ গড়ার উদ্দেশ্যে এই নয়াউদারনীতির ধারক-বাহকরা বলল যে ওখানকার বস্তিগুলির বাসিন্দা এবং ছোট ক্ষেতের অধিবাসীদের ওপর নিম্নশ্রেণি, নিম্নমধ্যবিত্ত ( low income group/middle income group) মানুষদের জন্য তৈরি হবে নতুন রাজারহাট, কলকাতার নতুন স্যাটেলাইট টাউন। কেমন এই পরিকল্পনা?

ওখানকার কারখানা, উঁচু বিল্ডিং – যা তৈরি হবে, সেখানেই ওদের চাকরি, বাসস্থান, ইত্যাদির সুযোগ থাকবে – এমন কথাই দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন খবরের কাগজ ও অন্যান্য মিডিয়ায় ঝকঝকে ছবি ভেসে উঠেছিল আমাদের চোখের সামনে। কিন্তু হল কী? সাদা শহর, বড় বড় হাঁ-করা মেশিন, কলকাতা শহর-কেন্দ্রের বিধ্বংসী বিস্তার, বস্তি উচ্ছেদ, ক্ষেতের জমি দখল সহযোগে তৈরি হল নতুন রাজারহাট। প্রথম পরিকল্পিত স্মার্ট সিটির নমুনা মাত্র। যেখানে ইংরেজি বলতে পারে না বলে , ‘স্মার্ট’ নয় বলে, ছাঁটাই হতে শুরু করল একের পর এক নিম্নশ্রেণির মানুষেরা। স্বপ্নের চাকা থমকে গেল। আসলে বুর্জোয়াদের ব্যবসা বাণিজ্যের মুনাফার কেন্দ্র হয়ে উঠল এই রাজারহাট। কর্পোরেট গ্রামের মানুষকে স্বপ্ন দেখায় মিডিয়া মারফত। ভুঁয়ো প্রতিশ্রুতি দেয়। তারপর তার সর্বস্ব লুট করে – কখনো প্রতারিত করে, কখনো গায়ের জোরে জমি দখল করে। প্রান্তিক মানুষগুলোকে আরো প্রান্তে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার নামই হল ‘মডার্ণ ডেভেলপমেন্ট’।

গাই দ্যে বর্দ তাঁর Society of the Spectacle-এ লিখেছেন যে,

“The spectacle is not a collection of images, but a social relation among people, mediated by images.”

ছবি মারফত ভুঁয়ো স্বপ্ন বেচে, upward mobility-র আশা দেখিয়ে নয়াউদারনীতি তৈরি করবে ভারতবর্ষের ‘স্মার্ট সিটি’।

একশোটার বেশি স্মার্ট সিটির পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন মোদি। ‘ডেভেলপমেন্ট’-এর কাজ চলছে জোর কদমে –  কংগ্রেসি ইউ পি এ এক-এর  SEZ পরিকল্পনা অনুসরণ করে আরো ক্রুর পদ্ধতিতে নতুন ভারতের নতুন সরকারের পরিকল্পিত নতুন মিলেনিয়ার নতুন আধুনিক ভারতের স্বপ্ন।বুর্জোয়া কর্পোরেটরা খোলা বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে একাই, বিজেপি তাদের আরো সুবিধে করে দেবে, মোটা টাকার বিনিময়ে বেচে দেবে দেশ। আর অন্যদিকে জিগির তুলবে মেকি জাতীয়তাবাদের। সম্প্রতি আমরা দেখেছি, আই বি এম তাদের সমীক্ষায় জানিয়েছে যে ২০৫০-এর মধ্যে গ্রামের ৭০% মানুষ স্মার্ট সিটিতে মাইগ্রেট করবে। আর তাই একশোটার বেশি স্মার্ট সিটি তৈরির ঘোষণা। বিজেপি সরকারও ফ্রস্ট্‌ অ্যান্ড সালিভানের মত তাদের স্বপ্নের শহরকে ভেঙে ফেলল ছ’টি টুকরোয় –  “smart governance, smart mobility, smart people, smart economy, smart environment, and smart living.”

খুব স্মার্টলি আমরা সবাই ‘স্মার্ট’ হয়ে উঠব। স্মার্ট অর্থে চতুর। চাতুরি দিয়ে তাদের বাণিজ্য বিস্তৃত হবে বহু গুণ। এই কেনাবেচায় নিজেদেরকেও পণ্যায়িত করে আমরা পরিণত হব তাদের ভৃত্যে। আমাদের বসতে বললে বসব। চাবুকের ডগায় আমাদের অক্লেশ শ্রম। শ্রমের কোনো মূল্য থাকবে না, শ্রমিকদের থাকবে না কোনো subjectivity। একদিন পরিশ্রান্ত আমরা স্মার্ট সিটির সুসংরক্ষিত দেওয়ালের দরজায় মুখ থুবড়ে পড়ব। হারিয়ে যাব। কিন্তু কীসের ভিত্তিতে হল এই সমীক্ষা? তাদের গূঢ় অভিসন্ধির কথা কী আমরা একবারও ভেবে দেখব না?

স্মার্ট সিটি গাইডলাইনে যে শাসনকার্যের নমুনা আছে তা Company Act ২০১৩ দ্বারা নির্মিত একটি বেসরকারি সংস্থার। এই সংস্থার নাম Special Purpose Vehicle। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতা নয়, তার থাকবে বিপুল পরিমাণে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং পৌরশাসন। রাজারহাটের HIDCO-র চেয়ারম্যান সঞ্জয় মিত্রের মত আরো লোক জড় হবে নতুন শহর তৈরি করতে। তারা বুজে দেবে খাল-বিল, সাফ করে ফেলবে ফলের বাগান, সিমেণ্ট ফেলবে উর্বর চাষের জমিতে। কর্পোরেট বিনিয়োগকারী এবং স্মার্ট সিটি গাইডলাইন মিলিত ভাবে এমন সুযোগ করে দেবে যার মাধ্যমে মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিগুলি কিনে নিতে পারবে Special Purpose Vehicle-এর অর্ধেক বা অর্ধেকেরও বেশি শেয়ার।

তারা মোটা টাকা নিয়ে এসেছে। সহজেই পকেটস্থ করবে মুনাফা। নানান চমক দেখিয়ে আমাদের মুগ্ধ করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্মার্ট সিটি তৈরি হবে অসংখ্য। আর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ব আমরা। বড় বড় ফ্লাইওভার যোগ করে দেবে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত নিমেষের মধ্যে। কেবল শ্রেণি বৈষম্য বেড়ে চলবে আরো। মানুষে মানুষে বিয়োগ ঘটিয়ে, চাষী-শ্রমিকদেরই সর্বস্ব লুট করে গড়ে উঠবে দানবী স্কাইস্ক্রেপার।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s