সত্তা, পরিচয় – নিজের সাথে কথোপকথন

লিখেছেন  সৌম্যজিৎ রজক।

আমাকে আমার মত থাকতে দাও। ঘাঁটাতে এসো না। আমি জানি, তোমরা এসব ফাঁদ পেতেছো আমায় জ্ঞান দেবে বলে। আর ফাঁদের নাম দিয়েছ ‘কোরাস’। গোড়াতেই গলদ তোমাদের। আমার এই ডিজে ফিউশন, হানি সিং-এর জমানায় ‘কোরাস-টোরাস’ চলে না। তাও যখন পাবলিক বোকার মতন ফ্যাসিবিরোধী গল্প-টল্প খেত, তখন খানিক চলত। এই বছর ষাটেকে দুনিয়াটা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। কমলালেবুর মতন নয়, এটা এখন চ্যাপ্টা। ইউনিপোলার। ষাট বছর কি কম সময় নাকি? এখন ষাট সেকেন্ডে ফেসবুকের ইনবক্সে পাল্টে পাল্টে যায় আমার গার্লফ্রেন্ড। পার্টনার অনুযায়ী পাল্টে যায় হেয়ার স্টাইল, চুলের ক্রিম, ডিওড্রেন্টের গন্ধ, জামাকাপড়, কলার টিউন। কন্‌সিউমার হিসেবে বাড়তে থাকে আমার ডাইমেন্‌শন। এমনকি, পাল্টে পাল্টে যায় মুখের ভাষাও। তুমি মেলাতে পারছ না তো? তাল সামলাতে পারছ না আমার সাথে! আমার ভাষাও বোঝো না! বেফালতু জ্ঞান দিতে এসো না তাই!

এই ক্রমাগত পাল্টে ফেলাটাই আমার অভ্যেস। আমার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল্লাগে না। একঘেয়ে লাগে। সত্যি বলতে, একা লাগে। বড্ড একা। ভয় করত আগে খুব, এই ডার্কনেস, এই নিঃসঙ্গতা। খালি মনে হত, শূন্যতা গ্রাস করছে আমায়। মৃত্যুর মত শীতল সেই শূন্যতা। বাঁচার জন্য আমি এই নিঃসঙ্গতা, এই অন্ধকার শূন্যস্থানকে ‘এনজয়’ করতে শিখে নিয়েছি। এটা এক ধরণের আপোষ। কাউকে বলে ফেল না যেন! আসলে বেঁচে থাকার জন্য আমায় একটা স্টেটাস মেইনটেইন করতেই হয়। একটা বেপরোয়া, রেবেল-রেবেল হাবভাব। আলবেয়ার কাম্যু তাঁর ‘রেবেল’ নামক দীর্ঘ প্রবন্ধের প্রথম বাক্যে লিখেছিলেন, “What is a rebel? A man who says ‘No’…”! আমি না বলা অভ্যেস করেছি। সবকিছুকে ‘না’ বলা। নিঃসঙ্গতাকে ‘না’ বললেই যৌথতাকে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে – এই যুক্তিকেও ‘না’ বলেছি। ‘না’ আর ‘হ্যাঁ’-এর অবিরাম দ্বন্দ্বে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে গিয়ে নিঃসঙ্গতা আর যৌথতা দুটোকেই পাশ কাটিয়ে আমি বাবার প্রেস্‌ক্রিপ্‌শন চুরি করে ঘুমের ওষুধ কিনে এনেছি কখনো-সখনো। আমার শুধু ‘না’ আছে। হ্যাঁ নেই। ‘না’-হ্যাঁ’-এর দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্বের দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো অবস্থানও তাই নেই আমার। এই মুহূর্তে নিজের প্রেমে মগ্ন নার্সিসিস্ট আমি। পরমুহূর্তেই হতাশায় একমুঠো ঘুমের পিল আর জলের গ্লাস হাতে নিজেকে হত্যা করতে উদ্যত।

মোদ্দা কথাটা হল, আমি কোথাও দাঁড়াই না। ফেসবুকের টাইমলাইন জুড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দৌড়তে থাকি আমি। ক্রমাগত স্ক্রোল করতে করতে আমি সরে সরে যেতে থাকি একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্পে। অনুষ্কা শর্মার প্রেমজীবন থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা থেকে পাড়ার কেচ্ছা থেকে ইউরোপীয় ফুটবল থেকে পার্বতী বাউলের গান থেকে ডায়ানার হানিমুন থেকে ফিরে লেখা চিঠি থেকে প্রেমিকার কুকুরের জন্মদিন থেকে…এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্টে। এক ইস্যু থেকে অন্য ইস্যুতে। ইস্যুই ব্রহ্ম। আদি-অন্ত। তার গভীরে হাতড়ে-পাতড়ে দেখা নেই। কৌতুহল নেই। দুর্নীতিটা অবশ্যই আমার কাছে একটা ইস্যু কিন্তু তার পেছনে কর্পোরেট-আমলা-রাজনীতিবিদ্‌দের বিরাট আঁতাতের দিকে আঙুল তোলা নেই। “Shut Down JNU” আমার কাছে ইস্যুমাত্র।  কিন্তু আমি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নির্দেশ মতো মোদি সরকারের বানানো ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’ নিয়ে ভাবি না। শিক্ষা ও শ্রেণি সম্পর্ক নিয়ে তো মাথা ঘামানোর প্রশ্নই নেই। দলিত প্রশ্ন নিয়েও দু’একটা পোস্টার থাকতে পারে আমার ওয়ালে। ভারতবর্ষের জাতিবিভাজনের ইতিহাস-টিতিহাস নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। ফেসবুক অবকাশ অফার করে না কাউকে। কেবল ছুটিয়ে মারে। একটা থেকে আরেকটায়। একটা সুর থেকে আমি ছুটে যাই আরেকটা সুরে। একটা গান থেকে আরেকটা গানে। পপ্‌ থেকে রক্‌ থেকে বাউল থেকে লাতিন ফোক্‌ থেকে ধ্রুপদী থেকে পাঞ্জাবি ভাংড়ায়। আমার এই ফিউশন বিশ্বে এমনকি noiseও স্থান করে নিচ্ছে সঙ্গীতের মধ্যে। আর ছুটিয়ে মারছে আমায়। এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে। আমার কেবল অবস্থান্তর আছে। ডিস্‌প্লেস্‌মেন্ট আছে। অপেক্ষা করতে আমি শিখিনি কখনো।

ইস্কুলের পুলকার থেকে স্টক এক্সচেঞ্জের ওঠা-নামা — অপেক্ষা করার ফুরসত পাইনি আমি কখনো। এই বাজারে অপেক্ষা করলে শেষ হয়ে যাবে অফার। অপেক্ষা যারা করে তারা নেহাতই বোকা। বোকা বলেই ওরা বিশ্বাস করে, ‘ইতিহাস’ নামক বিন্দু থেকে ‘বর্তমান’ নামক বিন্দু পর্যন্ত একটি কাল্পনিক দাগ টানলে যে রেখাটি পাওয়া যায়, সেটিই এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। সাবেক সমাজতন্ত্রের ধ্বংস্তুপে দাঁড়িয়ে আমি মুছে ফেলেছি আমাদের ইতিহাস। কাল্পনিক রেখাটির উৎসবিন্দু। যেহেতু রেখাটিই আর নেই, স্বভাবতই ভবিষ্যতের দিকে তার এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নও নেই। সোভিয়েতের পতন এবং নয়াউদারনীতির অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন – এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা ঘোষণা করলেন “ইতিহাসের অবসান”। মার্গারেট থ্যাচার জানালেন, “পুঁজিবাদের বিকল্প নেই”। সেইদিন থেকে আমার পেছনে নেই কোনো ইতিহাস। ইতিহাস নেই, তাই ইতিহাসের পরিবর্তনের গল্প আমার কাছে ইউটোপিয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর “ইতিহাস পরিবর্তনে মানুষের সচেতন সংগ্রাম”এর গল্প নেহাতই বক্‌ওয়াস। গাঁজাখুরি।

নির্দিষ্ট ভাবে ফয়েরবাখ আর সাধারণ ভাবে নিজের পূর্ববর্তী জার্মান বস্তবাদীদের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন, “The materialist doctrine that men are products of their circumstances and upbringing, and therefore, changed men are products of other circumstances and changed upbringing, forgets that it is men that change circumstances…”। ফয়েরবাখ সংক্রান্ত থিসিসে মার্ক্স বলতে চান, ঐতিহাসিক বাস্তবতাই মানুষকে (মানুষের চেতনাকে) নির্মাণ করে। মানুষ ইতিহাসের object (বিষয়)। আবার মানুষই সচেতন ভাবে ইতিহাসকে পাল্টে নতুন ইতিহাস বানায়। এটা ইতিহাসে মানুষের subjective (বিষয়ীগত) ভূমিকা। প্রসঙ্গত, এখানে ‘সচেতন ভাবে’ কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তো মৃতদেহও স্রোতের অনুকূলে ভেসে যায়। একমাত্র সচেতন মানুষই স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে পারে। এখনো পর্যন্ত ইতিহাস যাদের অনুকূলে বইছে, তারা তাই মানুষের এই সচেতন বিষয়ীগত ভূমিকাটাকে লোপাট করতে চায়। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা প্রথমেই উৎপাদনে শ্রমিকের বিষয়ীগত ভূমিকাকে কেড়ে নেয়। উৎপাদন প্রক্রিয়াটি শ্রমিকের ইচ্ছানিরপেক্ষ। শ্রমিকের কাছে বিরক্তিকর একটা বোঝা মাত্র। স্বভাবতই এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক sensous subject থেকে physical subjectএ পরিণত হয়।

আমি কিন্তু প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছি এবার। এসব বস্তাপচা মুখস্থ করা তত্ত্বকথার কোনো জায়গা নেই আমার জীবনে, ইতিমধ্যে খুলে গেছে কপাট। আমাদের খোলা বাজারে টাকায় টাকা বাড়ে। শেয়ার বাজারই নিয়ন্ত্রণ করে পুরো সিস্টেমটাকে। এখন মুনাফার জন্য আর কিছু উৎপাদন করতে হয় না। টাকা দিয়েই কিনে ফেলা যায় আরো বেশি টাকা। যেহেতু উৎপাদন-বিমুখ এই ব্যবস্থা, ফলে এখানে শ্রম কিংবা শ্রমিকের বিষয়ীগত ভূমিকার আর কোনো প্রশ্নই থাকে না। বিশ্বায়িত ফিনান্সপুঁজি শাসিত এই জমানা খুন করেছে মানুষের subjective positionকে। Post-industrial এই যুগের দর্শন postmodernism। এইখানে আধুনিকতা বাতিল। যুক্তিবাদ বাতিল। আলোকপ্রাপ্তি বাতিল। আর বুর্জোয়া আধুনিকতা বুর্জোয়াদেরই কবর খুঁড়েছিল যে মার্ক্সবাদের জন্ম দিয়ে, স্বভাবতই সেই মার্ক্সবাদ বাতিল।

এখন থেকে সবকিছু খন্ডিত। টুকরো। ছেঁড়া-ছেঁড়া। আমার স্মৃতি। অনেকানেক স্মৃতি। কিন্তু এই স্মৃতিগুলোকে জুড়ে জুড়ে ‘ইতিহাস’ নামক কোনো আখ্যান বানানো যাবে না। কারণ এরকম কোনো মহা আখ্যান (meta narrative) মানেই সেটা বানানো। কে বানালো? মানুষ সম্মিলিত ভাবে। সবাই মিলে বানানো জিনিস আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে কেন? আমি অস্বীকার করব সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের সম্মিলিত স্মৃতির নাম জ্ঞান। আর সেই জ্ঞানের বিজ্ঞানই হল ইতিহাস। আমি ইতিহাসের কোনো মডেলকেই মানবো না। এটা একটা দারুণ কথা। দেখলে কেমন এই এক কথায় সাম্রাজ্যবাদ আর সমাজতন্ত্র দুটকেই বাতিল করে দেওয়া গেল! সমাজতন্ত্র বাতিল মানে সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সম্ভাবনাও বাতিল। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের সাপও মরল, পুঁজিবাদের লাঠিও ভাঙল না।

এই ব্যবস্থাই ভালো। যেখানে সব কিছু টুকরো-টুকরো সেখানেই আমিও টুকরো-টুকরো। আমার পরিচয়, আমার সত্তা খন্ডিত। একটা ঘর – পুরোটাই কাঁচ দিয়ে ঢাকা। যেদিকে তাকাই – শুধু আমি। অসংখ্য আমি। কোনটা আসল আমি বোঝার উপায় নেই। এখানে বিষয়ী খন্ডিত ও বহুমাত্রিক।  এই খন্ডিত সত্তাগুলির মধ্যেকার সম্পর্ক জটিল। একটা আমি ক্ষেতমজুরের সন্তান। একটা আমি মেয়ে। একটা আমি দলিত। একটা আমি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এইচ ডি করছি। এই প্রতিটি সত্তাই আলাদা আলাদা শোষণের শিকার। সামন্তবাদ, পিতৃতন্ত্র, ব্রাহ্মণ্যবাদ, সরকারী শিক্ষানীতি – এই প্রতিটি শক্তির সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে হয় আমাকে; আমার এই প্রতিটা সত্তাকে। কিন্তু সত্তাগুলির সম্পর্ক এতই জটিল যে এই দ্বন্দ্বগুলির মধ্যেকার সম্পর্ক আমার কাছে অদৃশ্য থেকে যায়। একজন ক্ষেতমজুরের সন্তান হিসেবে আমার দ্বন্দ্ব সামন্তবাদের সাথে, যে সামন্তবাদ আমার পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে উৎপাদনের হাতিয়ার (জমি)। একজন নারী হিসেবে আমার দ্বন্দ্ব চলে পিতৃতন্ত্রের সাথে, যে পিতৃতন্ত্র নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল নারীর হাত থেকে উৎপাদনের হাতিয়ার কেড়ে নিয়ে। একজন দলিত হিসেবে সেই ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে আমার দ্বন্দ্ব চলে যা তার কায়েমি স্বার্থে বানিয়ে নিয়েছিল জাতি কাঠামো – প্রায় ১০০০ বছরের বেশি সময় ধরে যে জাতি কাঠামোটি নির্মাণ করা হয়েছে। সেই কাঠামোর ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে এক ধরণের রাষ্ট্র যা থাকবে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের দখলে। আর দুই বর্ণকে নিয়ে গঠিত শাসক শ্রেণির সহায়ক গোষ্ঠী হবে বৈশ্যরা। ছোট ও প্রান্তিক চাষি, জমিহীন কৃষিশ্রমিক, গ্রামীণ শিল্পী ও কারিগর এবং কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত মানুষ (যাদের হাতে উৎপাদনের কোনো হাতিয়ার নেই) – তারাই শুদ্র। ক্রমে দলিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হিসেবে আমার দ্বন্দ্ব চলে নয়াউদারবাদী সরকারের শিক্ষানীতির সঙ্গে। এই শিক্ষানীতি স্কলারশিপ বন্ধ করে, শিক্ষাখাতে ব্যায়বরাদ্দ ছাঁটাই করে, ব্যাপক বেসরকারীকরণ, কেন্দ্রীকরণের হাত ধরে অর্থনৈতিক-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের হাত থেকে কেড়ে নিতে চায় শিক্ষার সুযোগ। যেহেতু আমি মেটান্যারেটিভ বলে খারিজ করেছি মার্ক্সবাদকে, তাই আমি কখনো বুঝতে চাই না যে আমায় যতরকমের দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে হয়, তার সবক’টাই শ্রেণিসংগ্রামের সাথে যুক্ত। বিষয়ীর বহুমাত্রিক অভিঘাত রাজনীতির ক্ষেত্রে শ্রেণিসংগ্রামকেই দুর্বল করে। আমার প্রতিটি খন্ডিত সত্তা পৃথক পৃথকভাবে যদিও বা দলিত আন্দোলন, মহিলা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন কিংবা ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়, তবুও কখনোই শ্রেণি অভিমুখে লড়াইগুলোকে চালিত করে না। টুকরো-টুকরো সত্তাগুলির পৃথক পৃথক পরিচয় নিয়ে টুকরো-টুকরো লড়াই করার অর্থই হল মূল সংগ্রামটাকে অস্বীকার করে যাওয়া।প্রতিটি সত্তার আলাদা রাজনীতিকরণই পরিচিতি সত্তা রাজনীতির (আইডেন্টিটি পলিটিক্স) জন্ম দিয়েছে। এটাই আমার ফ্যাশন্‌।

আমার অসংখ্য ছেঁড়া ছেঁড়া সত্তা বলেই বিশ্বব্যাঙ্কের টাকায় চলা NGOর ব্যানার নিয়ে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মিটিং-এর বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে অসুবিধে হয় না আমার। ঢালাও বেসরকারীকরণের হয়ে চায়ের দোকানে গলা ফাটিয়েও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনশন করতে পারি আমি। আমার কাছে রাজনীতির সামগ্রিকতার কোনো ধারণা নেই। এমনকি আমার নিজের সত্তার সামগ্রিকতারও কোনো ধারণা নেই। আমার বিভিন্ন সত্তার পরিচয় নিয়ন্ত্রিত হয় আমার ধর্ম, জাতি, ভাষা, লিঙ্গের ভিত্তিতে। আর এই পরিচয়গুলিকে সামনে তুলে ধরতে গিয়ে ঢাকা পড়ে যায় আমার শ্রেণিপরিচয়। পরিচিতি সত্তার রাজনীতির মূল কথাটাই হল শ্রেণিপরিচয়কে অস্বীকার করে অন্য অন্য পরিচয়গুলিকে শুধু তুলে ধরা। দলিতের ওপর সামাজিক শোষণের বিরোধিতা তো এই দেশে বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। ‘অন্যতম’। একমাত্র নয়। কেননা দেশে আমূল ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে এই অংশের মানুষের হাতে উৎপাদনের হাতিয়ারের (জমি) মালিকানা না এলে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব। ভারতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আঁতের কথা, স্বভাবতই, আর্থিক-সামাজিক ন্যায় স্থাপনা। বিপরীতক্রমে, দলিত পরিচিতি সত্তার রাজনীতি, যা কিনা সামাজিক ন্যায়ের দাবি করে, আমূল ভূমিসংস্কার নিয়ে নীরব। মহিলাদের পরিচিতি সত্তার রাজনীতি চুপ থাকে শ্রেণিশোষণ অবসানের প্রশ্নে। অথচ, লিঙ্গের প্রশ্নটিকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়ে এগোতে পারে না সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। জাতিসত্তার আন্দোলনকে শ্রেণি আন্দোলন থেকে মাইনাস করে দেয় যে পরিচিতি সত্তার রাজনীতি, স্বভাবতই সে পায় সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি মদত। সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদতেই দুনিয়াজুড়ে বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির। USAএর সযত্ন পরিচর্যা ছাড়া এ পৃথিবীতে ISIS-এর রমরমা সম্ভবই ছিল না।

আমি এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম শুরুতে। তোমাদের পাল্লায় পড়ে আমার এই ব্যক্তিগত ডায়েরি জ্ঞানের ভারে নুয়ে পড়বে। এত জ্ঞান, এত বাতেলা ভাল্লাগে না আমার! বেশি ভার নিতে পারি না ঘাড়ে। মাথায়। আমার ঘাড়, মাথা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে বাজার অর্থনীতির যুগে। অসংখ্য টুকরো টুকরো সত্তা নিয়ে আমি এখন জাগ্‌লিং করছি। একে ওর পেছনে দাঁড় করাচ্ছি, এর সাথে ঝামেলা পাকাচ্ছি ওর। লিঙ্গসাম্যের কথা বলতে বলতে কখন যেন দাঁড়িয়ে পড়ছি সামাজিক ন্যায়ের লড়াইয়ের বিপ্রতীপে। দলিতদের অধিকার নিয়ে লড়তে লড়তে শত্রু হিসেবে নিজের সামনে দাঁড় করাচ্ছি লিঙ্গসাম্যের  জন্য যারা লড়ছে তাদের। এভাবে আমি নিজেই শত্রু সেজে দাঁড়িয়ে পড়ছি নিজের সামনে। মুখ ভ্যাঙাচ্ছি নিজেকেই। কার লাভ হচ্ছে এতে? একটা আমি প্রচন্ড ‘আধুনিকা’। একটা আমি ‘সনাতন হিন্দু স্ত্রী’। একটা আমি ডেনিমের ক্রেতা। একটা আমি সিঁদুরের। বাজার আমার সত্তাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। বহুমাত্রিক সত্তা নিতে আয়নাঘরের দেওয়ালের দিকে তাকাচ্ছি আমি, নিজেকে দেখছি; অনেকানেক নিজেকে। চে গ্যেভারার ছবি দেওয়া টি-শার্ট, “আই অ্যাম আন্না” লেখা গান্ধিটুপি মাথায়, গলায় ঝুলছে যে গিটার তাতে বব মার্লের মুখ, হাতের অ্যান্ড্রয়েডে মোদির বিশেষ অ্যাপ্‌। আর প্রতিটি আমি’র চেতনায়, খন্ডিত চেতনায়, রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা। আমার খন্ডিত সত্তা, সত্তার খন্ডিত পরিচয়, আমার পরিচিতি সত্তার এই রাজনীতি আমাকে দাঁড় করিয়েছে নিজেরই হাজারটা প্রতিবিম্বের সামনে। আমি পাগলের মতো ঘুরছি এই বন্ধ ঘরে। হাজারটা আমি’র দিকে ফ্যাল্‌ফ্যাল্‌ করে তাকাচ্ছি। অসহায়ের মতন।

আর কতদিন এভাবে নিজেরই পিঠে ছুরি মারতে থাকব আমি?

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s