মিলেনিয়াল কথা: আলো Chrome-এ আসিতেছে

লিখেছেন সর্বজয়া ভট্টাচার্য। 

নয়ের দশকের শেষের দিকে মুক্তি পেল করণ জোহরের প্রথম ছবি – কুছ কুছ হোতা হ্যায়। গল্প অতি পুরনো – এক পুরুষ, দুই নারীকে নিয়ে এক ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনি।  খেয়াল করুন, এই তিন চরিত্রের পাশাপাশি এদের বাবা মা ভাই বোন, পিসি, ঠাকুমা, দাদু – এদের মুখও মনে পড়ে যাবে ছবিটার কথা ভাবলে। শুধু মনে পড়ে যাবে তা নয়, আরেকটু তলিয়ে দেখুন, এমনকি সম্ভব হলে ছবিটাও দেখুন আরেকবার – এই প্রত্যেকটা চরিত্রের একটা স্বতন্ত্র জায়গা আছে ছবির প্লটে। এদের ছাড়া ছবি তৈরি হবে না।

কথা হচ্ছে এক বিশেষ ধরণের হিন্দি ছবি নিয়েই। বাংলায় একে বলে ‘ফ্যামিলি ফিল্ম’। শব্দবন্ধটি কিঞ্চিত গোলমেলে। ‘ফ্যামিলি ফিল্ম’ মানেটা ঠিক কী? পরিবারকে নিয়ে দেখা যায় যে ছবি? নাকি পরিবার যেই ছবির কেন্দ্রে সেরকম ছবি? আমাদের দেশে সম্ভবত এই দুই অর্থেই ব্যবহার করা হয় আধা বাক্যটি। পরিবারকে নিয়ে দেখা যাবে এমন ছবি মানে যে ছবিতে যৌনতা নেই (বা আছে, কিন্তু তা প্রকট নয়; যে ছবিতে প্রকট যৌনতা আছে তাকে বাংলায় বলে ‘অ্যাডাল্ট ফিল্ম’), খুব বেশি মারামারি নেই (থাকলে হত ‘অ্যাক্‌শন ফিল্ম’), হাসি-ঠাট্টা আছে তবে সেটাই মুখ্য নয়, আর হাসির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলা প্রবাদ বাক্যকে সত্য প্রমাণ করে আছে যথেষ্ট পরিমাণে চোখের জল। তা ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ হল সেই ধরণের ছবি। যুগ যুগ ধরে হিন্দি ছবি এই ফ্যামিলি ফিল্ম বানিয়ে এসেছে। তাহলে কী এমন হল এই নয়ের দশকে যে করণ জোহরের এই ছবির নাম দিয়ে শুরু করতে হচ্ছে আমাদের লেখা?

ছবির নাম অনুসরণ করেই বলা যায়, হচ্ছিল কিছু একটা। অথবা বলা ভালো, হচ্ছিল তার আগে থেকেই, নয়ের দশকে তার গতি বাড়ল। গতি। বোধহয় এই সময় থেকেই এই শব্দটা দিয়ে মাপা শুরু হয়ে গেল জীবনযাত্রা। জীবনের গতি বেড়ে যাওয়াতে আমরা শিখলাম, আমাদের সময় খুব কম। অতএব, যাহা চাই তাহা এক্ষুণি চাই। আমাদের রান্নাঘরে তাই ঢুকে পড়ল ‘ইন্সট্যান্ট ফুড’, আঞ্চলিক কোনো ভাষায় যার কোনো প্রতিশব্দ নেই। কিন্তু নামে যতই বিদেশি গন্ধ থাকুক না কেন, ভেতরের জিনিস কিন্তু এক্কেবারে দিশি – রাজমা, ডাল, মুরগি, দোসা, ইডলি, পনির – কী নেই! বললাম বটে রান্নাঘরে, কিন্তু আসলে পরিবর্তন ঘটছিল আরো গভীরে কোথাও। পরিবর্তন ঘটছিল আমাদের ভাষায়, আমাদের দৈনন্দিন অভিধানে, অভ্যাসে, বেঁচে থাকায়। ইন্সট্যান্ট ফুড, ইন্সট্যান্ট কফি, ফাস্ট ফুড, ফাস্ট লেন – গতিময়তাই জীবন। খিস্তির মধ্যে ক্রমশ ঢুকে পড়ল ‘শিট’, ‘ক্র্যাপ’, বা ‘ফাক্‌’। রাস্তাঘাটে হোঁচট খেলে আমরা বলতে শিখলাম ‘আউচ্‌’। হাসির কথা শুনে lol, চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলে OMG, বিরক্ত না হতে চাইলে DND – এরকমই আরো অনেক ধ্বনিতে অভ্যস্ত হতে শুরু করল আমাদের জিভ আর কান আর হ্যাঁ, আমাদের চোখও। এরা আসলে শব্দও নয়। কখনো দুটো, কখনো চারটে বা তারও বেশি শব্দের আদ্যাক্ষর পাশাপাশি বসিয়ে তৈরি করা অ্যাক্রনিম। গতির স্তাবক আমরা, সম্পূর্ণ বাক্য বলারও সময় নেই। না, এরকম ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে এসবের ফলে বাংলা মুছে গেল আমাদের জীবন থেকে। মুছল তো না, বরং তারও কিছু পরিবর্তন ঘটল, কাল এবং ভাষার নিয়মেই। যেমন এই সময় নাগাদ, ‘ভালো’ বোঝাতে ব্যবহার শুরু হল ‘ব্যাপক’ এবং ‘দুরন্ত’ – এই দু’টি শব্দ। এখানেও একটা গতির অনুষঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে।

এই জায়গায় এসে দুটো প্রশ্ন করা যেতে পারে। এক, যে সমস্ত ইংরেজি স্ল্যাং-জাতীয় শব্দ আমাদের মুখের ভাষায়, আর কিছু ক্ষেত্রে লেখার ভাষাতেও জায়গা করে নিল, তারা এল কোত্থেকে? কোন ফাস্ট লেন বেয়ে? আর দুই, কারা ব্যবহার করল এই শব্দদের?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর শুরু করা যায় ইতিহাস দিয়ে – ভাষা কী ভাবে জন্মালো, বড় হল, আলাদা হল, এক ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার কী সম্পর্ক ইত্যাদি। সেখান থেকে পৌঁছে যাওয়া যাবে বাংলা ভাষার উদ্ভব, বিকাশ ও বিবর্তনের কাহিনিতে। টেনে আনা যাবে নানা উদাহরণ; দেখানো যাবে আমরা দৈনিক কতগুলো আরবি, ফার্সি, ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি, নিজেদেরই অজান্তে। সেই পথে কিছু দূর হাঁটলে দেখা যাবে ভাষার বিকাশ ও বিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ইতিহাস। এ খুব সহজ সরল একটা কথা। জানা কথা, ইংরেজরা খাতায় কলমে দুশো বছর ভারতের ওপর, আর তাছাড়া বাকি দুনিয়াটার ওপরও ছড়ি না ঘোরালে আমাদের ভাষার মধ্যে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ এভাবে ঘটত না। মানে এই যে এত সহজেই বলছি চেয়ার, টেবিল, ব্যাট, বল, ব্যাগ , মনেই হচ্ছে না বাংলা শব্দ বলছি না – এটা হত না। সেই যে শিব্রামের গল্পে এক সংস্কৃতের পন্ডিতের (সংস্কৃতই তো? নাকি বাংলা? হাতের কাছে বইটা নেই বলে মেলানো যাচ্ছে না) কথা ছিল না? তিনি ভাষার ব্যাপারে খুবই, যাকে বলে, প্যুরিটান। তো, তিনি ছাত্রদের বলেছেন, একদম শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হবে। সেইদিন বা তার পরের দিন, পন্ডিত মশাই বাসে করে ফিরছেন, সেই একই বাসে তাঁর এক ছাত্রও রয়েছে। হঠাৎ সেই ছাত্রটির চোখে পড়ল, এক পকেটমার নিপুণ অভ্যাসে পন্ডিত মশাইয়ের ব্যাগ চুরি করছে। ছাত্রের অবস্থা সঙ্গীন, সে জানান দিতে চায়, কিন্তু পন্ডিত মশাই বলেছেন শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হবে, কিন্তু ব্যাগ কে সাধু ভাষায় কী বলে তার জানা নেই! তাই শেষমেশ সে চেঁচিয়ে ওঠে, “পন্ডিত মশাই, ব্যাগ গ্রহণ কল্ল।” এদিকে পন্ডিত মশাই ভাবছেন, ছেলেটি তাঁকে কাল ব্যগ্র হতে বলছে কেন! মাঝখান থেকে চোর তো ব্যাগ নিয়ে ভাগলবা! বা, তারাপদ রায়ের সেই গল্পটাও মনে পড়ে যেতে পারে। লেখক বাংলাদেশ গেছেন। রিক্সায় চেপে বলেছেন সচিবালয় যাবেন। বাংলায় বলতে পেরে বেশ খানিকটা গর্বও হয়েছে লেখকের। এদিকে রিক্সাচালক বুঝতেই পারছেন না তাঁকে কোথায় যেতে হবে। লেখক তখন বুদ্ধি করে বললেন ‘সেক্রেটারিয়েট’। আর রিক্সাচালক চটে গিয়ে বললেন, “প্রথমেই বাংলায় বললেই হত!” আমাদের বোধ করি কিছু শেখার আছে শিব্রামের এই স্কুলছাত্র আর ঢাকার এই রিক্সাচালকের উপাখ্যান থেকে।

এক নম্বর প্রশ্ন থেকে আমরা কিছুটা সরে এসেছি। ফেরত যাওয়া যাক। কথা হচ্ছিল মানুষ তথা ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার বিবর্তনের আন্তঃসম্পর্ক জাতীয় খটমট শুনতে একটা সরল বিষয় নিয়ে। আরেকটা গল্পের আশ্রয় নেওয়া যাক। রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ নাটকের শেষ অংশে রাজা সভা ডেকেছেন, সবাই উপস্থিত। রাজা শুনলেন, একটা পাখি ডাকছে। জিজ্ঞেস করলেন, “ওটা কী পাখি?” কোনো এক সভাসদ উত্তর দিল, “ঘুঘু”। নামটা পছন্দ হল না রাজার। বললেন, “তাসের দেশের ভাষায় ওর এক নতুন নাম দাও। বলো, বিন্তি।” রবীন্দ্রনাথেরই আরেকটি লেখায় বিন্তির উল্লেখ আছে, তবে পাখির প্রসঙ্গে নয়। ‘নষ্টনীড়’ গল্পে চারু আর মন্দা তাস খেলছে – সত্যজিতের সিনেমায় খেলা হচ্ছিল রঙ মিলন্তি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লেখায় খেলার নাম ছিল ‘বিন্তি’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ জানাচ্ছে, “তাস খেলায় তাসের সাত হইতে টেক্কা পর্যন্ত্য পর পর তিন খান তাস (সাত, আট, নয়, দশ) হইলে বিন্তি হয়। বিন্তি হইলে প্রতিপক্ষকে সাধারণ খেলায় দুই কুড়ি সাত ফোঁটা অপেক্ষা কুড়ি ফোঁটা বেশী, বা তিন কুড়ি সাত ফোঁটা দেখাইতে হয়।” রাজশেখর বসু ‘চলন্তিকা’-তে বিন্তি সম্পর্কে  লিখছেন, “গ্রাবু খেলায় তিন তাসের অনুক্রমিক ফোটক।” মনে পড়ে যেতে পারে, রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশ নাটকেই রুইতন এসে হরতনীকে বলছে, “তোমার যে ডাক পড়েছে রাজসভার গরাবু মন্ডলে।” গরাবু শব্দটি যে গ্রাবু’র অপভ্রংশ এই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। রাজশেখর ও হরিচরণ দু’জনেই জানাচ্ছেন যে, বিন্তি শব্দটি এসেছে পর্তুগিজ ‘ভিন্তে’ শব্দটি থেকে, যার অর্থ ‘কুড়ি’। কোথায় যেন পড়েছিলাম, রুইতন, হরতন, ইস্কাবন শব্দ এবং তাসগুলি আমরা পর্তুগিজদের থেকেই পেয়েছি। কবে পর্তুগিজরা বাংলার বন্দর থেকে নোঙ্গর তুলে চলে গেছে, কিন্তু ভাষা থেকে গেছে এখনো।

কিন্তু এই যে প্রচলিত শব্দের স্ল্যাং অর্থে ব্যবহার, এ শেখাতে তো কোনো সাহেব জাহাজ ভাসায়নি মহাসাগরে। তাহলে? তাহলে কী করে জানলাম আমরা কোনো কাজ পন্ড হয়ে গেলে, বা খারাপ কিছু ঘটলে, বা কোনো কিছুকে খারাপ বলতে গেলে বলতে হয় ‘শিট!’ অথবা ‘ক্র্যাপ!’? কোনো জাহাজ নয়, এই সব শব্দ অদৃশ্য তার বেয়ে নেমে এলো আমাদের টেলিভিশন সেটে। নয়ের দশকের মাঝামাঝি নতুন পে কমিশনের দৌলতে বাঙালি মধ্যবিত্তের ঘরে টিভি ততদিনে আর বিরল বস্তু নয়। তারা এল। আমরা দেখলাম। তারা আমাদের জয় করল। আমরা পুরনো শব্দের নতুন ব্যবহার শিখলাম। শিখলাম পেপসি-কোকাকোলা, ডায়ানার নীল জামা, ডুবন্ত জাহাজে জ্যাক আর রোজের প্রেম। সেই ঘুরে ফিরে জাহাজ চলে এলো।

ঘড়ি বললে যে ছবিটা আমার আপনার চোখে ভেসে ওঠে, সেই ঘড়ি প্রথম ভারতবর্ষে এসেছিল ইংরেজদের জাহাজে করে। ইংরেজ বণিকরা ঘড়ির দোকান খুলেছিল ধর্মতলার আশে পাশে। ভীমনাগের মিষ্টির দোকানে গেলে দেখবেন, একটা আশ্চর্য ঘড়ি টাঙ্গানো আছে। ভূ-ভারতে এমন ঘড়ি আর একটাও আছে কিনা সন্দেহ। ব্যাপারটা আর কিছুই না, ঘড়িতে সংখ্যাগুলো সব বাংলায় লেখা। ঘড়ির ইতিহাসটা বেশ মজার। কলকাতা শহরে এখন যে রাস্তাটার নাম হেমন্ত বসু সরণি, এক কালে তার নাম ছিল ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রীট। ‘কলিকাতা স্ট্রীট ডাইরেক্টরী সূত্রে জানা যাচ্ছে, “লালদিঘির উত্তর-পূর্ব কোণে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ গির্জার স্থানে কলকাতার প্রথম দেওয়ানি আদালত স্থাপিত হয়েছিল; তখন গৃহটির নাম ছিল ‘ওল্ড কোর্ট হাউস’।” সেই কোর্ট হাউসের নামেই রাস্তার নাম। এই রাস্তা ধরে এগোলে ছিল একের পর এক সাহেবের দোকান; সেইখানে, ২০ নং বাড়ি ছিল কুক অ্যান্ড কেল্‌ভির দোকান। ১৮৫৮ সালে তৈরি এই কোম্পানি নানারকম জিনিসের মধ্যে ঘড়িও বানাত। শোনা যায়, এই কোম্পানির বড় সাহেব গেছিলেন ভীম নাগের দোকানে মিষ্টি খেতে। মিষ্টি খেয়ে খুশি হয়ে সাহেব ভীম নাগকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত বড় দোকানে কোনো ঘড়ি নেই কেন। উনিই একটা ঘড়ির ব্যবস্থা করে দেবেন। সাহেবের কথা শুনে ভীম নাগ বলেছিলেন যে ঘড়ি নিতে ওনার আপত্তি নেই, কিন্তু মুশকিল একটা জায়গাতেই। দোকানের কর্মচারীরা কেউ ইংরেজি জানে না, তাই ঘড়ি দেখে তারা কিছু বুঝতে পারবে না। সাহেব কি বাংলা ঘড়ি বানিয়ে দিতে পারবেন? বড় সাহেব রাজি। তখন ইংলান্ডে পাঠানো হল বাংলায় লেখা নমুনা। সেই দেখে কোনো এক ইংরেজ শ্রমিক ঘড়ির ভেতর আঁকলেন বাংলা সংখ্যা। সেই ঘড়ি কলকাতায় ফিরে ভীম নাগের দোকানের দেওয়ালে জায়গা পেল।

আমাদের এখন ঘড়ি কেনা বেশির ভাগ সময় দোকানে গিয়েই হয় না। বাড়ি বসে অর্ডার করে ফেলা যায় কুক অ্যান্ড কেলভির ঘড়ি, যদিও কলকাতা থেকে সেই দোকান উঠে গেছে অনেক দিন হল। তাতে কী ক্ষতি হয় খুব? হয় না। ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলা জীবনের নিয়মে কোনোই ক্ষতি হয় না এতে। শুধু সেই ঝড়ের গতিতে কখনো কখনো গাছ ভেঙে পড়ে, শিকড়সুদ্ধ উপড়ে গিয়ে। আমরা নতুন নতুন শব্দ শিখে ফেলি যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে, ঘড়ি-জামা-জুতো-বাসন-তরকারি-খাবার স-অ-ব কিনে ফেলি যন্ত্রের সাহায্যে। আমাদের পাড়ার মুদির দোকান ঝড়ে ভেঙে যায়, মুদির দোকান লাগোয়া আড্ডা ভেঙে যায়। হাইরাইজ ওঠে। শহর ঢেকে দেয় কফি শপ।

কলকাতার বাঙালির এক বিশেষ অংশের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটি বিখ্যাত তার নাম হল ইন্ডিয়ান কফি হাউজ। কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজটি সর্বাধিক জনপ্রিয়। ভারতবর্ষে প্রথম ইন্ডিয়ান কফি হাউজ খুলেছিল ১৯৩৬ সালে, বম্বে শহরে। তখন এর নাম ছিল ইন্ডিয়া কফি হাউজ। স্বাধীনতার পরে মূলত এ কে গোপালনের উৎসাহে কর্মচারীরা একটি আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের ফলে পরিচালনার ক্ষমতা চলে আসে কর্মচারীদের হাতে। এই সময়ে নাম পাল্টে হয় ইন্ডিয়ান কফি হাউজ। স্বাধীনতার পর ইন্ডিয়ার পাশে ইংরেজি ‘এন’ হরফটা জুড়ে দেওয়ার কোনো কারণ নিশ্চয়ই ছিল। নিশ্চয়ই দরকার ছিল ইংরেজ অধিকৃত ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখানোর। একটি অক্ষরের মধ্যে দিয়ে একটা জাতির পরিচয় প্রকাশ পেল। ‘ইন্ডিয়ান’। কলকাতায় প্রথম কবে বারিস্তা খুলল এখন ঠিক মনে নেই। তার কিছু পরেই ক্যাফে কফি ডে। সেই যে একটা সমীক্ষা হয়েছিল, কোকাকোলা আর পেপ্‌সি নিয়ে – একটার বোতলে অন্য পানীয় রেখে ক্রেতাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কোনটা বেশি ভালো বা এরকমই কিছু একটা। সেরকম একটা নিরীক্ষা এই বারিস্তা আর ক্যাফে কফি ডে নিয়েও করা যেত। দোকানের নামের নিয়ন সাইনবোর্ড খুলে ফেললে বোঝবার উপায় থাকত না, কোনটা কার দোকান। খেয়াল করা যেতে পারে, কফি হাউজ-এর ভারতীয়ত্ব ছাড়াও আরো একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। ‘হাউজ’। বাড়ি। বারিস্তা বা ক্যাফে কফি ডে কে আপনি দোকান ছাড়া কিছু ভাবেননি কখনো।

আমরা এবার এগোতে পারি দ্বিতীয় প্রশ্নের দিকে। এই যে এতক্ষণ ধরে লেখা হচ্ছে ‘আমরা’, এই সমষ্টি কাদের নিয়ে তৈরি? যাদের নিয়ে তৈরি তাদের বলা হয় ‘মিলেনিয়াল’। ২০১৭ সালে এদের বয়স ১৩ থেকে ৩৩-এর মধ্যে। অর্থাৎ এদের মধ্যে যাদের বয়স সব থেকে বেশি তাদের জন্ম ১৯৮৪ সালে, আর যাদের সব থেকে কম তাদের জন্ম ২০০৪ সালে। মিলেনিয়াল শব্দটির সঙ্গে নতুন শতাব্দীর যে ধ্বন্যাত্মক যোগাযোগ এতক্ষণ পাওয়া যাচ্ছিল, বাস্তবে তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ মিলেনিয়ালদের বেশির ভাগেরই জন্ম মিলেনিয়াম-এর আগে। এর থেকে এটাই আরো স্পষ্ট হয় যে নতুন শতাব্দীর সূচনা, অন্তত ২০০০ সালে ছিল কিছু সংখ্যার পরিবর্তন মাত্র। আসল পরিবর্তন শুরু হয়েছিল তার কিছু আগে থেকেই, একেক দেশে যদিও সূচনার কাল পৃথক।

ধরে নেওয়া যেতে পারে ভারতবর্ষে এই মিলেনিয়ালদের আগমন ১৯৯২-এর পর থেকে। বা, বলা যেতে পারে, ১৯৯১-১৯৯২ সালের বাজেট যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটালো, সেই পরিবর্তন যাদের বড় হয়ে ওঠার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলল, ভারতবর্ষে তারাই মিলেনিয়াল। কিন্তু এই সময়ে যাদের জন্ম আর বেড়ে ওঠা, তারা সবাই কী মিলেনিয়াল? না যে, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, মিলেনিয়াল বলতেই আমরা বুঝব শহর, খুব বেশি হলে আধা-শহর।  আর অবশ্যই বুঝব সমাজের এক বিশেষ শ্রেণিকে।

১৯৯৮ সালে যখন কুছ কুছ হোতা হ্যায় মুক্তি পেল, মিলেনিয়ালরা তখনো মঞ্চে আসেনি। মঞ্চে আসেনি ঠিকই, কিন্তু তার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে আছে। করণ জোহরের এই ছবি, আমরা প্রথমেই বলেছি, আসলে খুবই পুরনো। কিন্তু নতুন নিশ্চয়ই কিছু ছিল এর ভিতরে। ছিল। শাহরুখ খান, কাজল, আর রানি মুখার্জি’র পোশাক। তাদের ভাষা। এতে নতুনত্ব ছিল। নতুন বলে কিছুটা আড়ষ্টতাও ছিল সম্ভবত। অনভ্যাসের ফোঁটা, কপালে তো চড়চড় করবেই।  কাঁহাতক আর অদ্ভুত অ্যাক্সেন্টে রামের ভজন গাওয়া যায়? বাস্কেটবল খেলা, উল্টো করে টুপি পরা, ‘ওয়েস্টর্ন’ পোশাক পরিহিতা নায়িকা যুগল – এসব একটু সাজানো লাগে। ছবিকে তাই ফিরে যেতেই হয় সাবেকিয়ানায়। তার ভারতীয়ত্বের ধারণার মধ্যে আদপে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার কোনো উদ্দেশ্য নেই। (কার আছে কে জানে?)  আছে শুধু পুরনো, জং ধরে যাওয়া মূল্যবোধকে আবার চাপিয়ে দেওয়া। তার সঙ্গে আছে ধর্মের ভয়ানক মিশেল। আছে পিতৃতন্ত্রের স্তব। তাই মিলেনিয়ালরা যখন এসে বলল এসব কিচ্ছু চাই না, মূল্যবোধ চাই না, পরিচিতি চাই না, কাঠামো চাই না, তখন মনে হল, বাঃ! বেশ তো বলেছে। এই তবে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত মুক্তির বাণী। দেখুন রণবীর কপুরকে। কী স্মার্ট! ও মা! শিমলায় শুটিং করেছে বুঝি? আমি তো ভাবলাম সুইৎজারল্যান্ড! ভাবব কেন? কেন শিমলাকে দেখে চিনতে পারব না শিমলা বলেই? একটু দূর থেকে দেখুন, শাহরুখ খান আর রণবীর কপুরের মধ্যে ফারাক একটাই – আমাদের অভ্যেস। আর একটা ফারাক আছে। শাহরুখ আমাদের কোনো স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায়নি। রণবীররা দেখিয়েছে। দেখিয়েছে শৃঙ্খলা ছাড়া আর হারাবার কিছুই নেই আমাদের। অতীত আমাদের বেঁধে রাখতে পারে না। ভবিষ্যৎ আমাদের দড়ি পরাতে পারে না। আমাদের শুধু বর্তমান আছে, তাই, জিও বেফিকরে! জিও মানে বেঁচে থাকা না রিলায়েন্সের সিম, কে জানে!

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s