# বিবিধার্থ-সংগ্রহ ২.০

অকটোথপে-পুরাবৃত্তেতিহাস-প্রাণিবিদ্যা-শিল্প-সাহিত্যাদি-দ্যোতক

লিখেছেন দীপ্তনীল রায়। 

!!! বিজ্ঞাপন !!!
পাঠক! বিবিধার্থ-সংগ্রহ ২।০ হাতে পেয়েছেন। পড়বার আগে শুধু একটা কথা ভাবুন। ১৮৫১ সালে এইটে সংগ্রহ করলে আপনার দেড়টি টাকা খরচা হতো, সঙ্গে মুটেভাড়া লাগতো। ২০১৭ সালে, আন্তর্জালস্থিত কোরাস পত্রিকার সূত্রে, এর সাম্প্রতিকতম সংস্করণ আপনি পড়ছেন স-ম্পূ-র্ণ বিনামূল্যে। বারংবার পড়তে পারছেন, দেশান্তরে ভার্নাকুলর-বিষয়ে উৎসাহী বন্ধুকে পাঠাতে পারছেন। আ-বাপ বুক ক্লাব কিংবা জিও-র থেকেও ভালো অফারে পাচ্ছেন, একেবারে লাইফটাইম রিডিং। কাজেই, দেরী না করে, সংগ্রহে রাখুন; সোৎসাহ পাঠ সম্পন্ন করুন। অকটোথপের ব্যবহার-সম্বলিত এই বিবিধার্থ-সংগ্রহ ২।০ প্রচারের কারণ ভার্নাকুলর এডুকেশনের মহৎ উদ্দেশ্য থেকে অভিন্ন। এইখানে “পুরাবৃত্তের আলোচনা, প্রসিদ্ধ মহাত্মাদিগের উপাখ্যান, প্রাচীন তীর্থাদির বৃত্তান্ত, স্বভাবসিদ্ধ রহস্য ব্যাপার, খাদ্যদ্রব্যের প্রয়োজন, বাণিজ্যদ্রব্যের উৎপাদন, নীতি-গর্ভ উপন্যাস, রহস্যব্যঞ্জক আখ্যান, নূতন গ্রন্থের সমালোচন,” ইত্যাদির অতি সহজে হদিশ পাবেন।

# সংগ্রহ

বইটা কিনেই ফেলি, কারণ বইটা আমার সংগ্রহে নেই।
আগের বইটা পোকায় কাটা গেছে। “পৃথিবী এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম।” সংগ্রহে থাকুক।
বইটার ইংরেজি অনুবাদ কোনওদিন প্রকাশিত হবে না জানি। আলো-অন্ধকারে, এপিআইজীবী হিসেবী আঁধারে নির্মোহ চোখ মেলে, বইটা খুঁটিয়ে পড়ার সম্ভাবনাও খুব কম। তবু সংগ্রহে থাকুক।
মরণাভিলাষী নক্ষত্র, মোমের আলো, মৃতপ্রায় নদীতে লঞ্চের ভোঁ শব্দের মতো, সংগ্রহও আশ্চর্য সত্য।

# সময়চিহ্ন

বিকেলের সহজ সূর্যাস্তদৃশ্য উল্টেপাল্টে দেখে অভিভূত হই। অস্বচ্ছ লেন্সে, নোটখাতার কুটনোকোটা অন্দরমহলে, মুহূর্তের বিহ্বলতার সাক্ষ্য পটাপট জমা পড়ে যায় ঘড়ির সময় ভুলে। মনে হয় চিরকালের জন্য সংগ্রহ করে রেখে দিই, প্রকরণজ্ঞান না থাক, ক্ষতি কী? সংগ্রহে থাকুক খরচাপাতির ভাঙাচোরা শহরের অনেক ওপর দিয়ে কিছু বইকুড়ুনে মেঘের যাওয়া-আসা, বিস্তৃত রক্তিম আকাশ, খামখেয়ালে আকাশ দেখার কয়েকটা মুহূর্ত। জানি এই মুহূর্তগুলি ধরা নেই ফিডে-ফিডে পুঞ্জিত ইথারের প্রত্যক্ষজ্ঞানে, তথ্য ও তত্ত্বের প্রতিসরণে, নক্ষত্র চুরি যাওয়ার রাগী বিবরণমালায়। ট্যাড়াবাঁকা ফাইবার অপটিক কেবল্‌ বয়ে আসা জাতীয় সংহতি, এস্টেটাস, বদনবইয়ের বসন্তসন্ধ্যা, রাজধর্মকৌতুকী কিংবা উত্তেজক তর্কমিত্রবাৎসল্য, অগুনতি মানুষের সুখ- দুঃখের রহস্যময় গুঞ্জন কিংবা ট্র্যাফিক সিগন্যালের অনুপুঙ্খ আকাশবৃত্তি, এসবকিছুর সঙ্গে কোনও ধরণের সম্পর্ক ছাড়াই মুহূর্তগুলি বিশেষ মুহূর্তে বর্তমান, পরক্ষণেই অতীত হয়ে গেল, অই যা, চলে গেল চিরতরের জন্য। কোথায় গেল? বিস্মৃতির আড়ালে, নাকি উপলব্ধিরহিত কোনও বিদ্যুৎপ্রবাহে, মাটির সবুজে, অন্য কোনও বইকুড়ুনে মেঘের মুহূর্তে?

তবু জমা থাকে পাখির পালক, বাসের টিকিট, সবুজ প্লাস্টিকের চাকতি, সম্পত্তির মোহ, বিত্তবাসনা, হরেক পণ্যবাসনা, আর কল্পনার অভাবমোচনে সেই এক সূর্যাস্তের স্মৃতি। বন্ধ ঘড়ির কাঁটা জমিয়ে রাখলেই যেন শৈশবের দিন স্থির।
সংগ্রহ কি সেইসব আশ্চর্য ভাঙা ইটের টুকরো, যেখানে খিটকেল একটা শহরের অব্যতিক্রমী আকাশে সূর্য ডুবে যাওয়ার দৃশ্যটা স্থির হয়ে গাঁথা থেকে যাবে চিরতরের জন্য, কিন্তু তুলে দেখার কেউ নেই? ভাবটা যেন ওই বিশেষ সূর্যাস্তের সাক্ষ্য বয়ে বেড়াব সারাজীবন চুপ করে। যদিও জানি সংগ্রহে থাকলেও ওই সূর্যাস্তদৃশ্যের সঙ্গে জীবনে কোনওদিন আর সংযোগ ঘটবে না। মাটির ঢেলার মতো গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে যাব মহাশূণ্যপথে ঘুরতে ঘুরতে, মুহূর্তের স্মৃতিটুকু শুধু জমে থাকবে যন্ত্রে অথবা কাগজে, নিজের অস্তিত্বের ওপর বিশেষ আস্থা নেই বলে। “মন না রঙায়ে কী ভুল করিয়ে কাপড় রঙালো যোগী”— যন্ত্রস্থ দৃশ্য এবং দলিল- কাগজের অক্ষরায়বের বাইরে স্তব্ধতার অবকাশে আরও অনেক সূর্যাস্ত ঘটবে, জীবনের সায়াহ্ণসন্ধ্যায় আরও অনেক মানুষ এবং রক্তাভ স্মৃতির মৃত্যু ঘটবে, কিন্তু ওই দূরত্ব জন্মে ঘুচবে না। এই অপূরক দূরত্ব সম্পর্কে অবগত হয়েও, লেখক-কবিরা কোন সদুদ্দেশ্যে অনলংকৃত অদোষ সূর্যাস্তের কথা লিখে চলেন যুগের পর যুগ? কেন অক্ষর সহজে হয়ে ওঠে পণ্য অথবা প্রত্নসামগ্রী, তবু স্থানকাল-বিশেষে, অনুভূতির অন্য কোনও অপ্রকাশ্য দিবালোকে, সময়চিহ্নের রূপ নেয়? উপভোগকামনায় সংগ্রহ করে রাখা বস্তুসমূহের অক্ষরবাহী নস্টালজিয়ায় সেইসব সময়চিহ্নের হদিশ মেলে না।

# মেলানকলি

মেলানকলি শব্দটার বাংলা করেছিলেন কেউ একজন – বিষাদ, দৌর্মনস্য। এর কোনওটার ব্যবহারেই ওই সূর্যাস্ত কুড়োনো মানসিক অবস্থা ঠিকঠাক বোঝানো যায় না। কোনও এক নির্দিষ্ট কারণ ঘিরে মেলানকলি নানান বৃত্ত রচনা করে। কখনও সে বৃত্ত ব্যূহের আকার নেয়, ভেতরে-ভেতরে অনুভূতি খেলে, বাইরে বোঝার উপায়টি নেই। মেলানকলি এন্ডোজেনাস, অন্তর্জিষ্ণু। স্বাবেশ বিষাদের কারণে মেলানকলি কেন্দ্রীভূত – জীবন চলে যায় পাশ দিয়ে, স্মৃতিগুলো আবছা হয়েও মুছে যায় না; ক্ষত সারে, কিন্তু দাগ থেকে যায়। কিন্তু এই যে ভোঁতা অনুভূতি–এই যে নানান কারণে-অকারণে সৃষ্ট বেবাক চোখে তাকিয়ে থাকার অনুভূতি—এর কী নাম? মানসক্লান্তি চেনা যায়, নির্দিষ্ট করা যায় মেলানকলি অথবা বিষাদঘন মুহূর্ত, কিন্তু এই যে অদ্ভুত ভোঁ-ভোঁ ভাব? হঠাৎ করে সময়ের থমকে যাওয়া এক মুহূর্তের অসীমতায়, ব্যস্ত রাজপথের এক কোণে যেমন থমকে থাকে বিকেলের সূর্য–সন্ধের আগমনের প্রত্যাশী, অথবা কোনওকিছুরই প্রত্যাশী নয় এমন ভুতুড়ে আলোয় অস্পষ্ট হয়ে যায় সবকিছু, গাড়ির আওয়াজ, ব্যস্ত মানুষজন—এই অনুভূতির কী নাম? বৈচিত্র্য, বৈভব, কীর্তি নয়, দারিদ্র্য, অন্নচিন্তা, সামর্থ্য নয়, সচ্ছলতা, আপসহীনতা নয়, কোন সে অদ্ভুত অনুভূতির প্রাবল্য?

# পৃথিবীর প্রথম তামাশা

লেখক বোঝেন, মানুষ একটা অদ্ভুত প্রাণী– ভোগ করতে না পারলেও সংগ্রহ করে রাখতে চায় সবকিছু। ভবিষ্যতে ভোগের আকাঙ্ক্ষায় জমানো যা-কিছু যদি “সঞ্চয়” হয়, “সংগ্রহ” কাকে বলে? হাই-ইল্ডিং-ভ্যারাইটি একফসলী নষ্ট বীজের যুগে, চাষী কি বীজধান সঞ্চয় করে, নাকি প্রতি বছর ফসল সংগ্রহ করে মাঠ থেকে?

কোনও-এক কবি যখন সময়ভেদী মুহূর্তে দাঁড়িয়ে লেখেন–“নির্জন খেতের দিকে চেয়ে দেখি দাঁড়ায়েছে অভিভূত চাষা”–আবহমান কালের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সেই কৃষিজীবী মানুষটা প্রাকৃত অর্থে কী করছেন? “সঞ্চয়” নাকি অন্য কিছু “সংগ্রহ”? আমরা তো জানি কবিতার ওই মুহূর্তে পুরোদমে নিড়ানির কাজ চলছে মাঠে। ওই একটা মুহূর্তে কী এমন ঘটলো, যে কবির মনে হল শক্ত-সমর্থ কৃষকদেহ হলেও দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আসলে পাখির মতো নরম, নশ্বর, অনিত্য; বুঝতে পারছে না যে অঘ্রানের কমলা রঙের রোদ্দুর মাখা সময়ে সে এক ডিনামাইটের স্তূপের ওপর বসে রয়েছে। গুহাচিত্র শিলালিপির যুগ থেকে বহুদূর, অসূর্য অন্ধকারে মহাকাশযানে চেপে তারায় তারায় বসতি গড়ার সেই কল্পিত আক্ষরিক যুগান্তরের বহু আগের সময়ে, মানুষের অনুভূতি সংগ্রহ করে রাখার ইচ্ছে কোন চিত্ত-চমৎকৃতি, মানবপ্রকৃতজাত কোন উন্মাদক তামাশার কথা শুধুমাত্র ঈশারায় ধরায় পড়ে?

# বর্জাইস

সংগ্রহ প্রসঙ্গে জীবননান্দ দাশ লিখে গেছেন জীবনের লিপ্ত অভিধানের কথা, যেখানে “বর্জাইস অক্ষরে লেখা আছে অন্ধকার দলিলের মানে।” অভিধানটা চোখ কুঁচকে পড়তে হবে। বিশেষ্য পদে “বর্জাইস” শব্দের মানে “অতি ক্ষুদ্র ছাপার অক্ষর;” বিশেষণ পদে “বুর্জোয়া।” শব্দটার সঙ্গে অনুভূতি, বিস্ময়বোধের যোগ অতি অল্প।

# অকটোথপ

আজকাল যে-কোনও বিষয়ে কথা বললে অকটোথপ ব্যবহার করাটাই যুগধর্মানুযায়ী সমীচীন, বাংলায় যাকে বলে এপোকাল সেনসিবিলিটির পরিচায়ক। অকটোথপ ব্যবহার না করলে শব্দরা গুরুত্ব হারায়, উচ্চারণ ফ্যাশান পায় না। বিচল হরফের আজব মহিমা আন্তর্জালে বকরার অকটোথপে।

পাঠক জানেন, ১৮৫১ সালের কলকাতায় ‘ভার্নাকুলর এডুকেশন সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়, ওই বছরেই সোসাইটি রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদনায় বিবিধার্থ সংগ্রহ প্রকাশ করে। কাঠখোদাই ব্লক ব্যবহার করে রাজেন্দ্রলাল প্রত্যেক রচনার আদ্যক্ষর বড় আকারে ছেপে কলকাতার ছাপাখানায় অভিনবত্ব এনেছিলেন। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সে সময়ে বেরোতো বটে, কিন্তু সেটার গুরুগম্ভীর ভাষা এবং জটিল তত্ত্বগুলি রিডিং পাবলিকের দুর্বোধ্য মনে হতো। রাজেন্দ্রলাল সহজ ভাষায় নানাবিধ লেখা ছেপে প্রমাণ করলেন, পাবলিক টেস্ট্‌ অনুযায়ী সচিত্র লেখা প্রকাশ করলে এবং জেব্রা ইত্যাদি এক্সোটিক প্রাণীর ছবি ছাপলে, পাঠকের মন ধরে, বিক্রি বাড়ে। অকটোথপের একালের ঐশ্বরিক মহিমার কথা জানলে রাজেন্দ্রলাল নির্ঘাৎ প্রতিটা শব্দের গোড়ায় একটা করে অকটোথপ জুড়তেন।

থপ করে বসে থাকা, আপাত নড়চড়হীন, রহস্যময় সংকেত চিহ্নটার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জেনে নেওয়া যায়। অকটোথপের সঠিক আবির্ভাবের সময়কাল জানা নেই। তবে রবার্ট ব্রিংহার্স্ট নামক এক সাহেব এলিমেন্টস অফ টাইপোগ্রাফিক স্টাইল কেতাবে জানাচ্ছেন এককালে চিহ্নটার সামাজিক ব্যবহার ছিল– প্রাচীন নরস্‌ ভাষায় (থপ) শব্দের অর্থ “গ্রাম”; অকটোথপ ব্যবহার হতো আটদিকে মাঠ ঘেরা একটা গ্রাম বোঝাতে। রোমানরা এক পাউন্ড ওজন বোঝাতে অকটোথপের কাছাকাছি আরেকটা চিহ্নের ব্যবহার করতো– লিবরা পোন্ডো (℔), যা ক্রমে দুটো সমান্তরাল স্ল্যাসের (//) রূপ নেয়। পাউন্ডের ওজন বোঝাতে অকটোথপ চিহ্নের ব্যাপক প্রচলন ঘটে উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে; সংখ্যাসূচক হিসাবে এর ব্যবহার ভারতবর্ষে শুরু হয় ইংরেজদের হাত ধরে—২বি, এইচবি, ৩বি কাঠের পেনসিলের গায়ে লেখার কথা ভাবা যায়।

অকটোথপের আরও দু-তিনটে প্রচলিত সাংকেতিক ব্যবহার আছে। প্রেস-রিলিজের শেষে তিনটে পর-পর অকটোথপ ইঙ্গিত দেয় যে লেখাটা এখানে শেষ হলো (###), শেষের পাতাটা হারায়নি। দাবার নোটেশানে অকটোথপ ব্যবহার হয় কিস্তিমাত বোঝাতে। পাণ্ডুলিপির প্রুফ সংশোধনে অকটোথপ চিহ্নের ব্যবহার বোঝায়, শব্দ অথবা অক্ষরের মধ্যে ফাঁক রাখতে হবে; ডিলিট চিহ্নের সঙ্গে ব্যবহার করলে বোঝায়, ডিলিট হবে কিন্তু উদ্ভূত ফাঁক থাকবে। কম্পিউটারের লেখালেখিতে অকটোথপের বেশি প্রসার। কিন্তু ব্যবহারে একটা গণ্ডগোল নিহিত আছে। কম্পিউটারে কোড লেখার সময়ে কোড-লেখকেরা অকটোথপ ব্যবহার করেন অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য বোঝাতে, যাতে এই মওকায় লেখাটা মূল কোডের অংশ নয় বরং অপ্রয়োজনীয় সেটা বোঝানো যায় (# কোড লেখা শেষ হলো, বাদাম খাই চল)। যারা কারণে-অকারণে অকপটে অকটোথপ ইস্তেমাল করেন বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে (# উপপ্লব), সাংকেতিক ইঙ্গিতের মধ্যে যে বিষয়টা অপ্রয়োজনীয় বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, সেটা খেয়াল করেন না।

অকটোথপের একটা প্রচলিত নাম “হ্যাস”; অনেকেই ভুলক্রমে “হ্যাসট্যাগ” নামে ডেকে ফেলেন। হ্যাসের পরে স্পেস না দিয়ে শব্দ জুড়লে তবেই হ্যাসট্যাগ, নচেৎ চিহ্নটা অকটোথপই থাকে।

অকটোথপের বাংলা করা যায় অক্ষয্যোদক (অক্ষয্য উদক)—ভাষার শ্রাদ্ধে পিণ্ডদানান্তরে দেওয়া মধুতিলমিশ্রিত জল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বুরবক সাহেবরা কেন কাঁচা আমপোড়া শরবতকে “ম্যাংগো ফুল” আর তোপসে মাছকে “ম্যাংগো ফিস” ডাকতেন, কে জানে। তবে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অহেতুক অক্ষয্যোদক ব্যবহার না করাই ভালো।

# লোষ্ট্র

বঙ্কিমের লোকরহস্য পড়লে জানা যায়, বাপ ছেলেকে থিওরি পড়াতে পড়াতে একটা সংস্কৃত শ্লোকের তর্জমা করে শোনাচ্ছে: “পরের সামগ্রীকে লোষ্ট্রের মত দেখ্‌বে।” বিজাতীয় এলিট ভাষায় শব্দশ্লোক ঝাড়ার প্রাচীন অভ্যাসটা বরকরার আছে এখনও— এতে বক্তার বুকুনি ঘটে ডাব পায়, ঘটের কানা থেকে ঝুলে পড়ে নানারকম তাত্ত্বিক ধানদূর্বাঘাস, দৈব অনুশাসনের আশ্বাস যেন। সংস্কৃত এখন আর কল্কে পায় না, এখন শ্লোক ঝাড়ার রেওয়াজ ইংরেজিতে তর্জমা করা ফরাসিতে, তাতে যদি দুএকটা কঠিন গ্রিক-লাতিন শব্দ যদি থাকে, বহুত আচ্ছা। ফাঁকা ঘটের ভিতর ছলকে পড়বে দুফোঁটা ডাবের জল, দিব্য ছলাৎছলাৎ শব্দ হবে। ওই বঙ্কিমী বাপের সংস্কৃত শ্লোকের ঠেকের পাঠশালা থেকেই জানা যায় “লোষ্ট্র” মানে “মাটির ঢেলা।” ছেলে বাপকে জিগায়, “বাবা, তবে ময়রা বেটাকে আর সন্দেশের দাম না দিলেও হয়–মাটির ঢেলার আর দাম কি?” বাপ ছেলেকে উপদেশ দেয়, “পরের সামগ্রী মাটির মত দেখ্‌বে–নিতে যেন ইচ্ছা না হয়।”

ভোগবাসনার থেকে বিনিময়ের উদ্ভব, বিনিময় থেকে অর্থ, ভোগের স্বার্থে নতুন অনর্থে অর্থ থেকে সৃষ্টি ঘটে পুঁজির। ভোগবাসনা থেকে মানুষ পোঁ ধরে পণ্যের ওপর মানবিক কিছু গুণ আরোপ করে, যদিও পণ্য নেহাতই পণ্য, ধর্ম নেই, মোক্ষ নেই, দোষগুণ কিস্যু নেই, অর্থমূল্য নেই।

চতুর্দশ লুইয়ের শৈশবকালের ফরাসি দেশে, জন ল নামক জনৈক স্কটিশ অর্থনীতিবিদ রাষ্ট্রায়ত্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মারফত প্রথম কাগজের টাকার প্রচলন করেছিলেন। আদতে তো মাটির ঢেলা, ফরাসি সমাজ-অর্থনীতির এমন ভরাডুবি হলো যে রেশ থেকে গেল ফরাসী বিপ্লব পর্যন্ত। ইলেক্ট্রনিক টাকার যুগে “লোষ্ট্র” শব্দটা পকেটে ভরে ঘরে ফেরা যাক বাস্তবে, জলের রঙের মতো স্বচ্ছ রোদে। “আমরা যতটা দূর চ’লে যাই – চেয়ে দেখি আরো কিছু আছে তারপরে।”

লোকরহস্য-র বাপ বুঝিয়েছিল মাটির ঢেলা, ছেলে বুঝলো ঢেলায় নিহিত পণ্যগুণ। শব্দটার এই লোকরহস্য উদ্‌ঘাটন করেই কি জীবনানন্দ দাশ “লোষ্ট্রের মতন স্তব্ধ” কথাটা ভেবেছিলেন কোনও বিশেষ মুহূর্তে?

# রীতি

প্রাচীন উপমহাদেশীয় রসশাস্ত্রের এক ধারার বক্তব্য—“রীতিরাত্মা কাব্যস্য”—রীতিই কাব্যের আত্মা। এইটে না থাকলে নাকি কবিতা-নাটক-উপন্যাস ইত্যাদি সাহিত্য হিসাবে মোটে দাঁড়ায় না।

লেখক জানেন, কেবলমাত্র রীতিধর্ম অনুসরণে বৈকারণিক এবং আলঙ্কারিক সিদ্ধতা আছে, প্রাণের আবেগ নেই। রীতির বাধা গঁতে গাড়িভাড়া জুটলে গাড়োয়ানও জুটে যায় কখনও বা, কিন্তু অভ্যস্ত মুহূর্তের বাইরে হঠাৎ করে যে অনিবর্চনীয় মুহূর্তের হদিস, সেই মুহূর্তের অনুভূতি জোটে না। অবন ঠাকুর বলেন, “রীতি” একটা “পুঁথিগত ক্রিয়া পদ্ধতি”: “যারা নিজের পথ নিজে দেখতে পারে না বা চায় না তাদের জন্য।” ইলিয়াস-মতে রীতি তো কেবল “জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল”: “ডাইনে সালাম ফিরাইয়া বামে সালাম ফিরাইতে গর্দান ঘুরাইচি তে দেহি আমার বগলে নমাজ পড়ে বুড়া এক মুসল্লি।”

রসশাস্ত্র, নমাজপাঠ ভুলে মেরে দিলেও এঁটো আধুনিকতার নিয়মরীতির ঠাট-বাট থাকে, যুক্তিধর্ম–লিটেরারি র‍্যাশলনালিটি মেনে রীতিগত লেখা আবেগবর্জিত হতে চায়। রীতিধর্মে জীবনের নিগূঢ়ার্থ সন্ধান নেই, সেখানে অবলম্বন শুধু সাইনবোর্ডের সহজ প্রতীকোপসনা।

রীতি-নির্দেশিত স্ট্রাকচার, সিনক্রনিক ও ডায়াক্রনিক, শোষক ও শোষিতের পলিটিকাল ইকনমি, সাহিত্যগত অথবা আধ্যাত্মিক টোট্যালিটি, আনরাইটিং অথবা অবচেতনাশ্রয়ী আদিখ্যেতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে লেখক লিখে চলেন। রীতি ভাঙ্গেন। রীতি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে তৈরি করেন নতুন ভাষা, নতুন শৈলী, ভাষা ব্যবহারের নতুন প্রকরণ। কিন্তু কোন আবেগে লেখনীতে ভর করে সূর্যাস্তস্মৃতি, ইতিহাসবোধ, কোনও বিশেষ মুহূর্তের সূর্যাস্তদৃশ্যসংগ্রহ? সাহিত্যরচনার বিভিন্ন ইতিহাস-বিনির্দেশিত পলিটিকালি-কারেক্ট রীতির গত এড়িয়ে, অবিরোধদৃষ্টিতে কেন লেখক লিখে চলেন অতীত ঘটনা, দৃশ্য, এবং ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগরহিত সংযোগের কথা? রীতি-পূজারীরা এইসব প্রশ্নে চিরকাল নিরুত্তর, ছায়াপিণ্ডের মতো অজর। প্লাতো তবু কবি-শিল্পীদের দিব্যোন্মাদ ঠাউড়েছিলেন, বিপজ্জনক বলে চির-নির্বাসন দিয়েছিলেন তাঁর স্বকপোলকল্পিত কাল্পনিক গণতন্ত্র থেকে।

# নিরীক্ষা

রীতির পূজারীরা রীতি-ভাঙা লেখকের ওপর প্রায়সই “দুর্বোধ্য” তকমা লাগান। লেখক যখন ভাষা নিয়ে চিন্তা করেন, সক্রিয়ভাবে ভাষাকে আক্রমণ করেন, রীতির পূজারীরা সেই আক্রমণকে মনে করেন “অনাবশ্যক গৌরচন্দ্রিকা, মুদ্রাদোষ, স্বাতন্ত্র্যের একটা বাহ্য ছাপ।” বোঝেন না, আক্রমণের হেতু লেখকের নিজস্ব উত্তরাধিকারের খোঁজ, রূপের সন্ধান, যে রূপ লুকিয়ে আছে ভাষার গভীরে, বণিক বাস্তবতা অস্বীকার করা সমান্তরাল লোকায়তিক স্রোতে, লেখক ও শিল্পীর অজস্র অনস্টালজিক পিছুটানের ইতিহাসে। কমলকুমার মজুমদারকে উদ্ধৃত করে রাঘব বন্দোপাধ্যায় “আক্রমণ” শব্দটার তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের অবগত করেন:

শব্দটা বিশেষরূপে আমরা যতদূর জানি ভাস্কর্যে ব্যবহৃত হয়–যখন ভাস্কর এক চাঁই এর সমক্ষে দণ্ডায়মান হওয়ত চাঁই নিরীক্ষণ করিতে থাকিয়া সহসা আক্রমণ করে।

রাঘবের থেকে আমরা শিখি, ভাস্করের “আক্রমণ”-এর পরিণতি পাথর থেকে ভাস্কর্যের প্রস্ফূট রূপে বটে, কিন্তু ট্রিগার ওয়ার্ডটা হচ্ছে “নিরীক্ষণ”—দৃষ্টির যতনে দেখা, “ওই দেখা শুধু বাইরের নয়, মনের চোখেও।” রীতি পরম্পরা মেনে দেবমূর্তির নিবদ্ধকরণে “নিরীক্ষা” নেই, যেমন নেই সাহিত্যের আয়-ব্যয়, রাজনৈতিক অকাট্যভাব কিংবা সহজবোধ্যতা অডিট করা নিরীক্ষক, নিরপেক্ষ সাহিত্য-সমালোচকের চোখে। তাঁদের সহজবোধ্যের ধারণা ভোগ এবং পণ্যের স্ববিরোধী ছায়াবাস্তবে, বাস্তব এবং সাহিত্যজাত নয়।

# অশ্বিনী তারা

এক সে কবি, বাড়ি শিমুলপুর। জীবনটা কেটে গেছে কলম হাতে, প্রাকৃতিক দৃশ্য আর নরনারীদের মায়াভরা পৃথিবী দেখতে দেখতে। একদিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন, ওখানে বসেই কাঁপা-কাঁপা হাতে লিখে ফেললেন এক গোছা কবিতা। অশ্বিনী তারার হদিশ পাওয়া যায় সেই এক কবিতায়:

ভরণী তারা থেকে পায়ে হেঁটে হেঁটে সিস্টারদের ঘরে এসে ভাবলাম
‘অশ্বিনী তারায় এলে ভালো হতো’। অমনি কানের কাছে আওয়াজ হল ‘আপনি
এখন অশ্বিনী তারায়’। এ কথা বললেন অশ্বিনী তারার লোকেরা। আমি তখন মনে মনে
ভাবলাম ‘হাইয়েস্ট পসিবল ব্রাঞ্চ অব ম্যাথেমাটিকস্‌ আমি বিনয় এখন অশ্বিনী
তারায় বসে আছি’। কানের কাছে জবাব এল ‘আমি হাইয়েস্ট পসিবল ব্রাঞ্চ অব
ম্যথেমাটিকস বলছি ‘বিনয় মজুমদার, তুমি অশ্বিনী তারায়’।

অশ্বিনী মেষ-তারামণ্ডলের এক যুগ্মতারা। রাশিফলবিচারের স্থূল সংকেতে, ভরণী তারার লোকেরা ধর্মপরায়ণ, সংসারী, নিঃস্বার্থ প্রকৃতি মানুষ, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের এক বা একাধিক গুপ্ত প্রেম থাকে। অশ্বিনী তারার লোকেরা অহেতুক বাস্তববাদী, একগুঁয়ে, সবকিছু বুদ্ধি দিয়ে পরখ করতে চায়।

বিনয়ের থেকে জানতে পারি:

অশ্বিনী তারার লোকগুলির মাতৃভাষা বাংলা। পরণে সুন্দর
সুন্দর জামাকাপড়। অশ্বিনী তারার লোকগুলির সঙ্গে কথাবার্তা বলা যায়।

অশ্বিনী, সে তো এক মেয়ের নাম। সে সূর্যের পত্নী, বাপের নাম বিশ্বকর্মা। সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে সে পালায় বাপের বাড়ি ঘুরে উত্তর কুরুবর্ষে, একটা ঘোড়ার রূপ ধরে সে আনন্দে দিন কাটায়। ঘরে রেখে যায় ছায়া নামের এক নারীশরীর, যার সঙ্গে কিছুকাল সূর্য সহবাস করে, সন্তানের জন্ম দেয়। একদিন সূর্য বুঝে ফেলে যে রয়েছে সে সত্তা হলেও ছায়া। সম্ভোগবাসনায় পাগল হয়ে ঘোড়ার শরীর ধরে সূর্য উপস্থিত হয় উত্তর কুরুবর্ষের দিগন্তবিস্তৃত ঘাসের মাঠে, অশ্বিনীর শরীর পুনর্বার অধিকার করে, ভোগ করে। সেই ধর্ষণের পরিনামে অশ্বিনীর গর্ভে যমজ সন্তান আসে। ধর্ষণজাত দুই সন্তান পৌরাণিক ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিদ্যায় সুপণ্ডিত হন, খ্যাতি লাভ করেন অশ্বিনীকুমার নামে, আদতে তারা যদিও সূর্যের সন্তান। অশ্বিনীর দেহশরীর নিস্পন্দভাবে পড়ে থাকে নক্ষত্রজগতের এক কোণে, স্বাধীনতার অপেক্ষায়, অনন্তকাল।

দেহশরীরের হদিশ পেলেও অশ্বিনীর মনের নাগাল পাওয়া যায় না।শিমুলপুরের কবি জানতেন, অশ্বিনীর আরেক নাম সংজ্ঞা।

# শহীদ

দুই বাংলার যত অকাদেমি, আকাডেমি, এবং একাডেমীর আভিধানিকেরা একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ঠিক করলেন “শহীদ” বানান এইবার থেকে “শহিদ” হিসাবে লেখা হবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ, শহীদ মিনার হয়ে গেল “শহিদ মিনার,” ভাষা-শহীদ দিবস হয়ে গেল “ভাষা-শহিদ দিবস।” বাংলা ভাষায় চাপানো সংস্কৃত বানানের অনুশাসনের কারণেই কি শহীদবেদীগুলোর ওপর রোলে-মোমো-ফেংশুইয়ের দোকান গজিয়ে গেল, বর্ণাশ্রমী রেডিওতে একবার অচানক গানও বাজলো না— “ওরা আমার মুখের কথা কাইড়্যা নিতে চায়।” অনুশাসন যাই হোক, পেছনে তো আছে অনৈতিহাসিকতার উদ্ভট উত্তরাধিকার।

অনৈতিহাসিকতার প্রভাবে শহীদদের মূর্তি গড়া হয়, ভুলে যাওয়া হয়। “ওয়ান্স অ্যাজ ট্রাজেডি, টুয়াইস অ্যাজ ফারস্‌” অমোঘ সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিকাগোর হে-মার্কেটের শহীদ, জালালাবাদ পাহাড়ের শহীদ, তেভাগা-তেলেঙ্গানার শহীদ, বসিরহাট, তরাই, বহরমপুর জেলের যত শহীদদের স্মৃতি ক্রমশ ম্লান হয়, দিবস উদ্‌যাপনের ফেরে শহীদ দিবসের আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ, পূণ্য করে গোপাল পাঁঠার ফ্যানক্লাব, একুশে জুলাইয়ের ক্রমবর্দ্ধমান ক্রাউড। শহীদেরা বেঁচে থাকেন সাহিত্যিক বাস্তবতায়, বেদনার নিজস্ব নিয়মে তারা কথা বলেন নিঃসীম সময়ের প্রান্তরে। “তাহারা” নামক এক আখ্যান, আশির দশকের গোড়ার দিকে লেখা, রাঘব বন্দোপাধ্যায়েরকমুনিস ও অন্যান্য সংকলনে খুঁজে পাবেন। তখন বামফ্রন্টের গোড়ার যুগ, রাস্তার নাম-পরিবর্তন আর সাম্রাজ্যবাদী অতীত বিদায়ের নামে সাহেব-মূর্তি অপসারণ ও শহীদ-মূর্তি প্রতিস্থাপনের খেলা চলছে। এই আখ্যানে লেখক আমাদের মনে করান রামকিঙ্কর বেইজ নামক এক শিল্পীর কথা, যিনি সাহেব বলেই মূর্তি সরানো হবে এই গোঁড়ামো মানতে নারাজ:

শিল্পীর ইতিহাস-চেতনা এতদূর মুক্ত যে তা জাতি দাসত্বের বাইরে, ঝুটা দেশপ্রেমের জিগির তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেজন্য তাপস দত্তের গড়া ক্ষুদিরামের মূর্তি (ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ডিফাইং ডেথ) তাঁর সবচেয়ে ভালো লাগলেও বলে ফেলতে পারেন–ক্ষুদিরাম মানে বোমা, উনি গড়লে হাতে শিকল পরানো থাকত না, হাতে বোমা থাকত।

অজস্র খুলির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গান্ধীমূর্তি গড়লেও রামকিঙ্কর ক্ষুদিরামের শহীদমূর্তিটা আর গড়ে যেতে পারেননি। সেই কারণেই হয়তো ফাঁসির মঞ্চে গান গাওয়া ক্ষুদিরামের মূর্তিটাই দুই-তিন দশকের মধ্যে পাবলিকের মনে বেশ ধরেছে—এই সময়ে যেমন বামপন্থী রাজনীতির একমাত্র দ্যোতক “আমরা আক্রান্ত” স্লোগান আওড়ানো, অপরের তুলনায় আমি কতটা বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, শোষিত কিন্তু অকুতোভয়, তারই অনিঃশেষ প্রতিযোগিতা। এসকল প্রতিযোগিতামূলক বিলীয়মানতার থেকে অনেক দূরে চেতনার শহীদদের উপস্থিতি। রাঘবের রক্তজবা রহস্য-এ দেখি ফিরে আসছেন ক্ষুদিরাম, মিলেনিয়াম পার্কে, আলোর বৃত্তে বিষণ্ণ : “তাঁর হাতে আলগাভাবে রয়েছে একটা বোমা, যা তিনি ধরে রাখেননি, যেন হাতের তেলো থেকে ফলের মতো ঝুলছে।”

ক্যানসারের সঙ্গে লড়তে লড়তে, ঘাড় গুঁজে লিখতে লিখতে, অক্ষরসাধক রাঘব কি তাঁর শেষ লেখায় রামকিঙ্করের স্বপ্নে জাগরূক ক্ষুদিরামের সন্ধান করেছেন? মর্মাবধারণ না ঘটুক, মর্মানুধাবনের চেষ্টা করা যেতে পারে। উপন্যাসটা পড়লে জানা যায়, রাঘব মূর্তি গড়েননি, মূর্তির নেপথ্যে মানুষটার ঐতিহ্যের সন্ধান করেছেন। শহীদ ক্ষুদিরামের হাতের বোমা হারবার্টের স্মৃতিজগতের আচমকা বিস্ফোরণের ঘটনায় শেষ হয়ে যায় না। অপেক্ষায় থাকে উপযুক্ত কোনও বিস্ফোরণ-মুহূর্তের প্রতীক্ষায়।

# স্বাধীনতা

রবীন্দ্রনাথের কণিকা-য় স্বাধীনতার একটা বিবরণ পাওয়া যায়:

শর ভাবে, ছুটে চলি, আমি তো স্বাধীন,
ধনুকটা একঠাঁই বদ্ধ চিরদিন।
ধনু হেসে বলে, শর, জান না সে কথা–
আমারি অধীন জেনো তব স্বাধীনতা।

এখানে স্বাধীনতা সবসময়ে অধীনতার পরিপূরক, অধীনতা না থাকলে স্বাধীনতার কোনও মানে নেই। আগ্রহ থাকলে এই বিবরণের সূত্র ধরে হেগেল-বর্ণিত মাস্টার-স্লেভ ডায়ালেটিকের মহিমা বর্ণনে পৌঁছনো যায়। আগ্রহ যদি থাকে।

শামসুর রহমানের “স্বাধীনতা” কবিতায় বিষয়টার চার কিসিমের পরিচিত-অপরিচিত রূপ ধরা পড়ে।
প্রথমটা সমাজ-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকল্পনা-ভিত্তিক – রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান; কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা; শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা; পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।
দ্বিতীয়টা ব্যক্তিগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকল্পনা-ভিত্তিক – পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন; উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন; বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ; খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা।
তৃতীয়টা দূর থেকে দেখা, কিন্তু আরোপনধর্মী স্বাধীনতার কল্পনা, যা ভোক্তার কাছে স্বাধীনতার সংজ্ঞা নাও হতে পারে – রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার; ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
চতুর্থটা মানব অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্করহিতভাবে প্রাকৃতিক, কিন্তু আরোপনধর্মী কল্পনায় মানবিক অনুভূতির অন্তর্গত – কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা; শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক; বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা।

কখনও প্রথম রূপটা দ্বিতীয় রূপটাকে বুঝতে সাহায্য করে – বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার; চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ। কখনও দ্বিতীয় রূপটা চতুর্থ রূপ নির্ভর করে গড়ে ওঠে – বাগানের ঘর, কোকিলের গান; গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল, হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম; খুকীর অমন তুলতুলে গালে রৌদ্রের খেলা; ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা। এই সকল রূপদর্শনকালে শামসুর রহমানের কবিতায় “স্বাধীনতা”র অস্তিত্বজ্ঞাপন উপমায়, অবাধ মেটাফরে; ধনুকের বেঁধে দেওয়া ঐতিহাসিক কক্ষপথে নির্দিষ্ট নিয়তির বাঁধনে নয়। উপমা না বুঝলে, কল্পনা না করলে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসিক্ত না হলে, “ইচ্ছে”ঘটিত স্বাধীনতা বিষয়টা অস্পষ্ট থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

“স্বাধীনতা” বিষয়টাকে নিয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে গভীরভাবে ভেবেছিলেন আরেকজন বাঙালি দার্শনিক, লেখক। এই বিষয়ে কবিতা লেখেননি কোনও, কিংবা এনথ্রোপোসিন নির্জ্ঞান-সম্পর্কিত মতিভ্রমের প্রবন্ধ-রেসিপিমালা। ডায়েরির পাতায় টুকে লিখেছিলেন শুধু, কয়েক হাজার বছর আগে এই উপমহাদেশে রচনা করা, অথর্ব-বেদে সংগ্রহিত, এক অনামা কবির স্লোক:

গিরয়স্তে পর্বতা হিমবন্তোহরণ্যং তে পৃথিবী স্যোনমস্তু
বভ্রুং কৃষ্ণাং বোহিনীং বিম্বরূপাং ধ্রবং ভূমিং পৃথিবীমিন্দ্র গুপ্তাম্‌।
অজীতোহহতোহ ক্ষতোহধ্যাষ্ঠাং পৃথিবীমহম।

হে পৃথিবী, তোমার গিরিসমূহ, তোমার হিমালয় পর্বতশ্রেণী, তোমার অরণ্যসমূহ সমস্তই মঙ্গলময় হোক, এই পৃথিবী, যিনি বভ্রু বা পাংশুবর্ণা, যিনি রক্তবর্ণা, সমস্ত রূপে রূপময় যিনি, এই বিশাল ভূমি যিনি স্থির ও ইন্দ্রের দ্বারা রক্ষিত – আমি সেই পৃথিবীর উপর দাঁড়িয়ে রয়েছি – আমি হত হইনি, আহত হইনি, আমাকে কেউ জয় করেনি।

১৯৮০ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি এইটে লেখার পর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন:

“Freedom has no purpose. And it is not found on this earth. All we can find here is the struggle for freedom. We struggle to obtain the unattainable—that is what separates man from the beasts.”

খেয়াল রাখতে হবে এই সময়ে লেখক খোয়াবনামা রচনায় রত। ডায়েরিটা পড়লে এও জানা যায় একসময়ে তিনি আখ্যানটার নাম রাখবেন ভেবেছিলেন “ভাবের ব্যারাম”।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s