নয়াউদারবাদ, স্বাধীনতা, ও গণতন্ত্র

লিখেছেন অরিত্র বসু। 

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: অর্থনীতির বেশ কিছু কথা বলা হবে এখানে। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে নিন।

শুরুতেই, ভীষণ ছোট্ট করে,নয়াউদারবাদ কি, তা নিয়ে কথা বলে রাখা যাক।এই গল্পটি আরম্ভ করা প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। সেই সময়, সারা বিশ্বের পুঁজিবাদীরা তাদের শাসন ব্যাবস্থা টিকিয়ে রাখতে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন কেইন্সিয় অর্থনীতির। সময়টা ১৯৫০-১৯৬০ সাল। বাজার পরিচালনার কাজে, রাষ্ট্র বিভিন্ন ভাবে তার ক্ষমতার প্রয়োগ করতো। Fiscal Policy, Monetary Policy, এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিত রাষ্ট্র। ১৯৬০-এর শেষ দিকে, দেখতে পাওয়া যায় যে কেইন্সিয় পদ্ধতি, আগের মত আর কার্যকরী হচ্ছে না। একদিকে বেড়ে চলেছে বেকারত্ব, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মূল্যবৃদ্ধি। পুঁজিবাদীদের প্রয়োজন ছিল এক নতুন অক্সিজেন সিলিন্ডারের।

নয়াউদারবাদ ছিল সেই রক্ষাকবচ। ১৯৪৭ সালে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীরা মিলে বানিয়েছিলেন মন্টপেলেরিন সোসাইটি। এই সোসাইটিই নয়াউদারবাদের আঁতুড়ঘর। Neoliberalism-এর “neo” টা আসছে কারণ নিওক্লাসিকাল অর্থনীতির প্রতি এদের ঝোঁক ছিল প্রবল, যে অর্থনৈতিক দর্শনের মূল বক্তব্য এই, যে বাজার ব্যাবস্থার নিজের মত চলতে পারাকে নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের কাজ, এবং বাজার কে বাজারের মত চলতে দিলে, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মত সমস্যাগুলি, আপনে আপ ঠিক হয়ে যাবে। এই নিওক্লাসিকাল অর্থনীতির সাথে, “ব্যক্তি স্বাধীনতা”র আদর্শ যুক্ত করে, তৈরি হয়েছিল নয়াউদারবাদ। এই মতবাদ অনুযায়ী, “ব্যক্তি স্বাধীনতা”র সাথে বাজারের স্বাধীনতা ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। এবং বাজারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে, বাজারের থেকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রন তুলে নেওয়া উচিত। ফ্রি মার্কেটে রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ আসলে বাজারের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ, যা সাধারন ক্রেতা বিক্রেতার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা – ব্যক্তি স্বাধীনতাকে খর্ব করে।

বিশ্বের পুঁজিবাদী শ্রেণি, জণ্টি রোডসের মতো ডাইভ মারে নয়াউদারবাদের দিকে। নয়াউদারবাদের প্রথম পরীক্ষাগার হিসাবে ব্যাবহার করা হয় চিলি কে। তারপর, একে একে মার্গারেট থ্যাচারের ব্রিটেন, রেগানের আমেরিকা, শিয়াওপিং এর চায়না, এবং ১৯৯১ সালের নরসিমহা রাও, মনমোহন সিং এর ভারত।

বাজারকে, বাণিজ্যকে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনের থেকে মুক্ত করার এই নয়াউদারবাদী অঙ্গিকারের তাৎপর্য কী? এই প্রক্রিয়া, সমস্ত ক্ষেত্রে, যে যে পরিসেবা রাষ্ট্রের দেওয়ার কথা, সেই সমস্ত জনকল্যানমূলক পরিসেবাকে (যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য) বাজারের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক তার সাথে, দেশের অর্থনীতিকে যুক্ত করে বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ার সাথে। বিশ্বায়নের ফলে, বিভিন্ন দ্রব্য, পরিসেবা এবং লগ্নীপুঁজি অত্যন্ত সহজে এক দেশ থেকে উড়ে যেতে পারে অন্য দেশে। পুঁজির আন্তর্জাতিক চরিত্রের সুবাদে, সরকারের কোন পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে আঘাত হানলে, বিনিয়োগকারীরা সেই দেশের বদলে অন্য কোন দেশে বিনিয়োগ করাকে বেশি সুবিধাজনক মনে করলেই, সেই দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যেতে আরম্ভ করে (flight of capital), যা সেই দেশকে সাংঘাতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। তাহলে, বিনিয়োগকারীদের “confidence” বাড়ানোর উপায় কি? উপায় হল, ট্রেড ইউনিয়ন তুলে দেওয়া। উপায় হলো, শ্রমআইন শিথিল করা। উপায় হলো, সমস্ত বিরোধীর আওয়াজ থামানোর কাজে যা প্রয়োজন তাই করা। উপায় হলো, পুলিশ, আইন এবং পার্লামেন্টকে, বিনিয়োগকারী এবং একমাত্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষার কাজে ব্যবহার করা।

আমাদের দেশের রাজনীতির দিকেই তাকানো যাক একবার। যে দেশে আগের নির্বাচনের মূল লড়াই ছিল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে, না, ভুল বললাম, লড়াই ছিল, রাহুল গান্ধী আর নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে। তার কারণ এই, যে এই দুই মুখের লড়াই যেন ভুলিয়ে দেয়, যে আসলে নীতির লড়াই প্রয়োজনীয়, এবং এই দুই প্রধান দলের, অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে কোনো তফাত নেই।

রাষ্ট্রের নীতি, ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীদের, ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের সাথে, বৃহৎ-পুঁজির অসম লড়াইয়ের সুযোগ দেয়, যার ফলাফল ভারত বনাম আফগানিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের ফলাফলের মত হয়। ক্ষুদ্র ক্রেতার অবস্থা একই রকম সঙ্গিন। কোয়েস্ট মলে, পকেটে অল্প টাকা নিয়ে ঢুকেছেন কোনোদিন? আপনার প্রচুর কিছু কেনার ইচ্ছে থাকলেও, আপনি পারবেন না, কারণ আপনার ক্রয় ক্ষমতা নেই। এবং, আপনার ক্রয় ক্ষমতা না থাকার অন্যতম মূল কারণ সম্ভবত এই, যে, আপনি যে চাকরিটা করেন, সেখানে আপনার বেতন বাড়ানোর দাবিটুকু করার কোন সুযোগ নেই।

নয়াউদারবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল Jobless Growth। ভারতবর্ষে ২০০৪-০৫ ও ২০০৯-১০এর মধ্যে, চাকরীর সুযোগ বৃদ্ধির হার ছিল ০.৮ %। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারছিল ১.৫ %। চাকরীর সুযোগের বৃদ্ধি যেহেতু কম, বেকারত্ত্ব বেড়েছে। আপনি ট্রেডইউনিয়ন করলে, আপনি বেতন বাড়াতে বললে, আপনার পিঙ্ক স্লিপ পাওয়ার সম্ভবনা বেড়েছে পাল্লা দিয়ে, কারণ আপনার চাকরি আপনার থেকে কম বেতন পেয়ে করার সুযোগ পাওয়ার জন্য অনেকে অপেক্ষারত।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যে স্বাধীনতার উপর বারবার আঘাত হানছে নয়াউদারবাদ। প্রধানমন্ত্রী হয় রাহুল হবেন, নয় মোদী, অপশন এই বাইনারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখছে আইএমএফ, করে রাখছেন আদানিরা। ওদের হাতে প্রচারমাধ্যম, ওদের হাতে জনমত তৈরির ক্ষমতা, আসলে জনমত তৈরি করার সুযোগ করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক লগ্নী-পুঁজিকে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা তো আক্রান্ত হচ্ছেই, সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করলেই,  দেশদ্রোহী বা অন্য কোন তকমা বসছে, যে তকমার সাহায্যে অত্যন্ত সহজে কণ্ঠরোধ করা যায়। আম আদমির কথা বলার স্বাধীনতা নেই। ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা নেই।এমন কিচ্ছু করার স্বাধীনতা নেই, যা আন্তর্জাতিক লগ্নী-পুঁজিকে চটায়।

নয়াউদারনীতি যখনই থাবা বসায়, রাষ্ট্র কার্যত পরিণত হয় বাজারের ওয়াচডগে। না। আবার ভুল বলা হয়ে গেল।এই ওয়াচডগ ভূমিকা থেকে, ঠিক সেই সময়ই সে বেরোয়, যখন আন্তর্জাতিক ফাটকা পুঁজিদাবী জানায় যে রাষ্ট্র তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিক। কর্পোরেটদের ট্যাক্স ছাড় হোক, বা “fiscal responsibility” (সরকারি ব্যয়বরাদ্দ কমানো), রাষ্ট্র যা যা পদক্ষেপ নেয়, বা যখন চুপটি করে ঠুঁটো জগন্নাথ সেজে বসে থাকে, যা হয়, পুরোটাই কর্পোরেট-ফিন্যান্সিয়াল অলিগার্কির আদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে। বাজারই একমাত্র কথা বলবে এই ব্যবস্থায়।

বাজারই একমাত্র কথা বলবে, এটা এক্সটেন্ড করলে দাঁড়ায়, যে আর কেউ কথা বলবে না। তখনই আসে শ্রম আইন। তখনই আসে ট্রেড ইউনিওন বন্ধ করার আদেশ। ছোট বেলায় ক্লাসের মাস্টার যেমন, এক ক্লাস ঘর থেকে অন্য ক্লাসঘরে যাওয়ার সময়, ঠোঁটে আঙুল রেখে হাঁটতে বলতেন, এই ব্যবস্থা সব্বার ঠোঁটে আঙুল রাখার ব্যবস্থা করে নতুন নতুন আইন তৈরি করে আর সেই আইন প্রয়োগ করে। আসে নতুন অর্ডিন্যান্স। আসে টিয়ার গ্যাস, পেলেট গান, আর রাইফেল হাতে পুলিশ। নয়াউদারবাদ আঘাত করে গণতন্ত্রের উপর।

শ্রমআইনে নানান পরিবর্তন, শ্রমিকদের “বারগেইনিং পাওয়ার” এর উপর আঘাত, বিভিন্ন ভাবে ট্রেডইউনিয়ন বন্ধ করার চেষ্টার মাধ্যমে, শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ের ওপর, শ্রেণি সংগ্রামের উপর বারংবার আঘাত হানে নয়াউদারবাদী রাষ্ট্র। বিভিন্ন আইন তৈরি হয়, যা শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। বেকারত্বের বৃদ্ধির সাথেই উনিয়নের “বারগেইনিং পাওয়ার” ক্রমশ কমতে থাকে, সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না থাকলে, বিচ্ছিন্নতা বোধ বাড়তে থাকে, যা ক্রমশ একজন শ্রমিককে ঠেলে দেয় লুম্পেনাইসেশনের দিকে।

এই ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর উপর থেকে আমআদমির ভরসা উঠিয়ে দিতে চায়। তার কারণ এই, যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে বিভিন্নভাবে শ্রেণি সংগ্রামে ব্যবহার করা সম্ভব।এবং এই ভরসায় আঘাত হানার কাজে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে, রাষ্ট্রকে, ব্যবহার করা হয়। আম আদমি দেখেন, যে তাঁর কাছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সুযোগ খুব সীমিত, কারণ তিনি যে দক্ষিনপন্থী দলকেই রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে নিযুক্ত করবেন, সে প্রায় একই অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করবে। যেহেতু এই দক্ষিনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির নীতি প্রায় একই, নির্বাচনে জিততে তাদের প্রচারের পিছনে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করতে হয়। ফলে, দক্ষিনপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক দুর্নীতি। যে কর্পোরেট মিডিয়াকে ব্যবহার করে এই রাজনৈতিক দল গুলির প্রচার হয়, দেখা যাবে সেই কর্পোরেট মিডিয়াই বারবার এই অর্থনৈতিক দুর্নীতির প্রসঙ্গকে তুলে ধরছে।সমস্ত রাজনৈতিক দলকে একটি সুতোয়, “এরা সব্বাই করাপ্ট” প্রমান করার চেষ্টা, গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর উপর ভরসাকে আঘাত করার জন্য। মনে রাখা দরকার, যে এই পার্লামেন্টের প্রতি অবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই আবির্ভাব হয় ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি সমৃদ্ধ “হিরো”দের, যে কারণে আম আদমির ভরসা তৈরি হয় ফ্যাসি-প্রবণ “সুপারম্যান” এর উপর, যা নয়াউদারবাদী আগ্রাসনকেই জায়গা করে দেয়।

এই বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা আছে তো বটেই, ঠিক তার সাথে এও মনে রাখা প্রয়োজনীয় যে শ্রেণিসংগ্রামে এই পরিকাঠামোকে ব্যবহার না করতে পারলে,  পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়বো আমরা।

এই ব্যবস্থাকে তো সত্যিই transitional দাবী আদায় করার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা যায়।রাস্তার লড়াইয়ের আওয়াজ পৌঁছনো যায় পার্লামেন্টে। বিনামূল্যে উচ্চমানের শিক্ষা-পরিসেবার অধিকারের দাবী, সরকারি খরচে স্বাস্থ্য পরিসেবার সুযোগ দেওয়ার দাবী, সবার জন্য কাজের দাবী, সবার পেটে ভাতের দাবী আসলে শ্রেণীসংগ্রামকেই শক্তিশালী করার উপায়।ভারতের মত দেশে, জিডিপির ১০%  খরচ করলেই এই দাবীগুলোর অনেকগুলিকেই মেটানো যায়।এই দাবী আদায়ের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হল নয়াউদারবাদ। তাই, এই দাবী আদায়ের লড়াই শুধু দাবী আদায়ের লড়াই নয়, এই লড়াই আসলে নয়াউদারবাদের বিরুদ্ধে।

গণতন্ত্রকে বিচ্ছিন্ন ভাবে না দেখে, অন্যান্য জিনিসের সাথে একসাথে দেখলে, দেখা যাবে, যে গণতন্ত্র যেমন অর্থনৈতিক জীবনের উপর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করে, ঠিক তেমনই অর্থনৈতিক বিকাশও গণতন্ত্রের উপর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, ফলে, বুর্জোয়া গণতন্ত্র শ্রেণি শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়।তাই, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যে থেকে যে লড়াই সংগঠিত হচ্ছে, তা আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাধারণ চরিত্রকে আঘাত দেওয়ার প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য এই বর্তমান ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া। রাষ্ট্রের ক্রম-বিলোপ ঘটবে যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, সেই ব্যবস্থাতেই তো প্রকৃত গণতন্ত্র থাকা সম্ভব।

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যে এই লড়াইয়ে বামপন্থীরা যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিত হচ্ছেন, তারা জনপরিসেবামূলক প্রকল্পে সরকারী নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সাথে, নয়াউদারবাদী বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন। এই কাজে বামপন্থীদের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। যে লাতিন আমেরিকা নয়াউদারবাদের প্রথম পরীক্ষাগার ছিল, সেই লাতিন আমেরিকাই বাকি পৃথিবীকে আজ দেখাচ্ছে যে নয়াউদারবাদের বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

নয়াউদারবাদের রক্ষাকবচের সংখ্যা নেহাত কম নয়। নয়াউদারবাদী হেজিমনিতে, যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তা রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে, যখন বিভিন্ন গোষ্ঠী শুধুমাত্র সেই গোষ্ঠীর দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সামগ্রিক লড়াইকে ছোট্ট ছোট্ট টুকরোতে ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়, যাতে “দলিত রাজনীতি” শুধুমাত্র দলিতের কথাই বলে, ছাত্রআন্দোলন যেন সীমিত থাকে শুধুমাত্র ছাত্রদের দাবিদাওয়া নিয়েই। জিগনেশ মেওয়ানি যখন জমি আন্দোলনের কথা বলেন, যখন তিনি জাতির সাথে পুঁজিকে যুক্ত করেন, ওরা ভয় পায়। উমর খালিদের সেমিনারে কথা বলা আটকাতে গুন্ডা পাঠায় ওরা। নাজিব আহমেদের মাকে মারতে পুলিশ পাঠায়।নাজিব,কানহাইয়া, দাভোলকর,জিগনেশ, ফিদেলের ঐক্যবদ্ধ মিছিলই তো নয়াউদারবাদকে চ্যালেঞ্জ করছে আজ।

মাথার উপর মাইক বাজছে। আপনি শুনতে পাচ্ছেন থ্যাচারের গলা। “There is no alternative.”। ঠিক আপনার বাঁ পাশে হেলমেট পরে, হাতে ফিদেলের থেকে উপহার পাওয়া কালশ্নিকভ রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন স্যালভাদর আলেন্দে;  রাইফেলের উপর খোদাই করা “To my comrade in arms. Fidel”। আলেন্দে, রেডিওয়ে একটু আগেই তার শেষ বক্তব্য রেখেছেন। দিনটা ১১ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩।

“My friends,

Surely this will be the last opportunity for me to address you. The Air Force has bombed the towers of Radio Portales and Radio Corporación.

My words do not have bitterness but disappointment. May they be a moral punishment for those who have betrayed their oath: soldiers of Chile, titular commanders in chief, Admiral Merino, who has designated himself Commander of the Navy, and Mr. Mendoza, the despicable general who only yesterday pledged his fidelity and loyalty to the Government, and who also has appointed himself Chief of the Carabineros [national police].

Given these facts, the only thing left for me is to say to workers: I am not going to resign!

Placed in a historic transition, I will pay for loyalty to the people with my life. And I say to them that I am certain that the seed which we have planted in the good conscience of thousands and thousands of Chileans will not be shriveled forever.

They have strength and will be able to dominate us, but social processes can be arrested neither by crime nor force. History is ours, and people make history.

Workers of my country: I want to thank you for the loyalty that you always had, the confidence that you deposited in a man who was only an interpreter of great yearnings for justice, who gave his word that he would respect the Constitution and the law and did just that. At this definitive moment, the last moment when I can address you, I wish you to take advantage of the lesson: foreign capital, imperialism, together with the reaction, created the climate in which the Armed Forces broke their tradition, the tradition taught by General Schneider and reaffirmed by Commander Araya, victims of the same social sector which will today be in their homes hoping, with foreign assistance, to retake power to continue defending their profits and their privileges.

I address, above all, the modest woman of our land, the campesina who believed in us, the worker who labored more, the mother who knew our concern for children. I address professionals of Chile, patriotic professionals, those who days ago continued working against the sedition sponsored by professional associations, class-based associations that also defended the advantages which a capitalist society grants to a few.

I address the youth, those who sang and gave us their joy and their spirit of struggle. I address the man of Chile, the worker, the farmer, the intellectual, those who will be persecuted, because in our country fascism has been already present for many hours — in terrorist attacks, blowing up the bridges, cutting the railroad tracks, destroying the oil and gas pipelines, in the face of the silence of those who had the obligation to protect them.  They were committed. History will judge them.

Surely Radio Magallanes will be silenced, and the calm metal instrument of my voice will no longer reach you. It does not matter. You will continue hearing it. I will always be next to you. At least my memory will be that of a man of dignity who was loyal to [inaudible] the workers.

The people must defend themselves, but they must not sacrifice themselves. The people must not let themselves be destroyed or riddled with bullets, but they cannot be humiliated either.

Workers of my country, I have faith in Chile and its destiny. Other men will overcome this dark and bitter moment when treason seeks to prevail. Go forward knowing that, sooner rather than later, the great avenues will open again where free men will walk to build a better society.

Long live Chile! Long live the people! Long live the workers!

These are my last words, and I am certain that my sacrifice will not be in vain, I am certain that, at the very least, it will be a moral lesson that will punish felony, cowardice, and treason.”

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to নয়াউদারবাদ, স্বাধীনতা, ও গণতন্ত্র

  1. sarbajit sen বলেছেন:

    A much needed writing. Solidarity!

    Liked by 1 person

  2. Samik Saha বলেছেন:

    আপনাদের বক্তব্যের অভিমুখ এবং উদ্দেশ্যতে আমি সহমত। আপনাদের বলার ভঙ্গীতে তীব্র বিরোধীতা। যে ভাষায় আপনারা লিখছেন, যে ভঙ্গীতে আপানারা যুক্তিক্রমে আপনাদের বক্তব্য তৈরি করছেন, ঠিক এই ভঙ্গীতেই ১৯২৫ থেকে ভারতে কমিউনিজমের চর্চা চলছে এবং ক্রমাগত আরো বেশি ব্যর্থতার নজির তৈরি করছে। ভারতীয় সমাজে সন্তোষী মা, বাবা লোকনাথ, সাইবাবার যা প্রভাব কমিউনজমের প্রভাব তার কোটি ভাগের এক ভাগ। এই দুর্দশার সবচেয়ে বড় কারণ ভারতবাসীর কাছে আপনারা ইন্ডিয়ার ভাষায় কথা বলছেন। যে কোন লোকাল ট্রেনের ভেন্ডার কামরায় টানা ৫ দিন ১ ঘণ্টা কাটান বুঝতে পারবেন আমার বক্তব্যের সারবত্তা।

    Like

    • Aritra Basu বলেছেন:

      যেখানে যে ভাষা adopt করা প্রয়োজনীয়, সেখানে সেভাবে কথা বলা উচিত বামপন্থীদের, এ বিষয় আমি সহমত।

      তবে, বামপন্থীরা ঐতিহাসিক ভাবে এই কাজে ব্যর্থ, এই বক্তব্যের সাথে একেবারেই সহমত নই। তা যদি সত্যি হতো, তাহলে আমরা কখনোই কোনো বৃহৎ গণআন্দোলনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারতাম না। তা আমরা অনেকাংশেই পেরেছি। তার মানে, আমাদের কোনো ত্রুটি হয়নি, বিচ্যুতি হয়নি কথা বলার ক্ষেত্রে বা কাজের ক্ষেত্রে, এরম দাবি আমি করছি না। কিন্তু, আমরা জনবিচ্ছিন্ন নই। জনবিচ্ছিন্ন নই বলেই, ট্রেনের ভেন্ডর কামরায় আপনি উঠলে দেখবেন, যে সেখানে ভেন্ডরদের মধ্যে আপনি বামপন্থীদের খুঁজে পাবেন। চাষের ক্ষেতে কৃষকসভার কমরেডকে দেখবেন আপনি। এই যে আমরা’র কথা এতক্ষন বলছি, সেই আমরার মধ্যে তো মূলত তারাই আছেন। এই আমরা আমাদের মতাদর্শকে সবার কাছে নিয়ে যেতে পারিনি। সেই চেষ্টা আমরা করছি। পেশায় ভেন্ডর, রেল কামরায় বসে থাকা আমার কমরেড ও সেই চেষ্টাই করছেন।

      Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s