একটি বাজেট: সংশ্লিষ্ট কবিতাগুচ্ছ

লিখেছেন সায়ন্তন সেন।
শুরুর আগে
প্রাক্-কথন  ১
——————–
“… I rise to present the budget for 1991-92. As I rise, I am overpowered by a strange feeling of loneliness. I miss a handsome, smiling, listening intently to the budget speech. Shri Rajiv Gandhi is no more. But his dream lives on, his dream of ushering India into the twenty-first century; his dream of a strong, united, technologically sophisticated but humane India. I dedicate this budget to his inspiring memory …”
প্রাক্-কথন  ২
———————
“যে রাতে মোর দুয়ারগুলি উদার ক’রে খুলে দিলেম
ভারতবর্ষ প্রবেশ করল ভীতুর মতো সঙ্গোপনে
তোমার সঙ্গে কাদের সখ্য জ’মে উঠল অন্ধকারে
দীপ নিভিলে এমন খ্যাপা অন্ধকারে কাদের সখ্য!
এখন তুমি কেমন করে বড়ো হচ্ছ উদোম উদোম
নিরুৎসাহে শ্রমবিমুখ ব’সে থাকার অর্থ কী হয়?
কুটিরশিল্প অ্যাবোর্ট করে তাহার মাকু”*
‘প্রাক্-কথন  ১’ এবং ‘প্রাক্-কথন  ২’ গোড়াতেই রাখা হলো এটা দেখানোর জন্য যে, একটা প্রাবন্ধিক উদ্দেশ্য এ লেখার নিশ্চয়ই আছে। ‘প্রাবন্ধিক উদ্দেশ্য’ –  অর্থাৎ – কিছু দৃষ্টান্ত, কিছু অনুমান, কিছু যৌক্তিক পারম্পর্য, আর শেষমেষ একটা হাইপোথিসিস– এই ধাঁচায় লেখাটাকে আগাগোড়া বেঁধে ফেলা সম্ভব। কিন্তু একটু অন্যভাবে শুরু করা যাক। একটু ব্যক্তিগত কথা দিয়ে। সবটা কাজে লাগবে তা নয়, স-ব-টা, কবে, কার, কোন কাজেই বা লেগেছে?
‘এখন তুমি কেমন করে বড়ো হচ্ছ’
আমার বেড়ে ওঠা, আঠেরো বছর বয়স পর্যন্ত, মফস্বলে। আমি সেই বিরল পরিবারগুলির একটির প্রতিনিধি– একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসেও যারা একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিল যৌথতা টিকিয়ে রাখার– এবং পেরেওছিল কিছুদূর। তারপর টুকরো হয়ে গিয়েছিল বাধ্যত, উপায় ছিল না আর, তাই। ২০০৮-এ আমাদের হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেল, আর ২০১১-তে, বাড়ি তিনভাগে ভাগ হলো। সেই সময়ে, বা কিছু আগে-পরে, যৌথপরিবারগুলির ভাঙনের ইতিহাস আমার জানা। সেই ভাঙন, যতখানি ছিল অনিবার্যতা, ততখানি আহ্লাদের ছিল না মোটেই। সে কথা থাক। একটা রুদ্ধশ্বাস ভাঙন চলছিলই– একটানা– নয়ের দশকের গোড়া থেকে। সুতরাং, আমি একইসাথে দেখলাম চাতালে আসন-পেড়ে সকলের একসাথে খাওয়ার হৈচৈ, এবং দেখলাম ব্যক্তিগত ডাইনিং-টেবিলের একাকীত্ব। দেখলাম লোডশেডিং-এর রাতে মোমবাতির আলোয় হরিণ তৈরির কারখানা, দেখলাম পাশাপাশি, ইনভার্টার এবং যতেক মোমবাতি-লণ্ঠনের মেদুর হারিয়ে যাওয়া। বাড়ির পাশেই গঙ্গা, খাগড়াঘাট শ্মশানে আমরা ভিড় করতাম মরা-পেটানো দেখতে। সেই বীভৎসতাও বিদেয় হলো, এলো ইলেক্ট্রিক চুল্লি।
আচ্ছা, চুল্লি কি পোড়াতে পারে অতিরিক্ত কিছু? বা পোড়ায় কিছু কম? না তো! কেবল, দহন-প্রক্রিয়াটি ঘটে যায় লোকচক্ষুর অগোচরে, গোপনে, নিভৃতে, একা-একা। এ দহন দেখা যায় না, শরীর ভিতরে যায়, নাভিকুণ্ড ফিরে আসে– মাঝে একটা শূন্য গহ্বর থাকে কেবল।
জানানো থাক, এই প্যারাগ্রাফের শুরু থেকেই ‘ভাঙন’, ‘শূন্যতা’, ‘একাকীত্ব’– সমূহ শব্দাবলি– এবং শব্দের আড়ালে যে তর্জনী, চোরা ইশারা– তাকে একটা ‘মেটাফর’ হিসেবে আমরা পড়তে পারি। না-ও পারি। ১৯৯১-এর ২৪ জুলাই, বাজেট ঘোষণার ভূমিকায় মনমোহন সিং বলছেন, ‘a strange feeling of loneliness’– এই বাক্যবন্ধ। কিছুক্ষণের জন্য কনটেক্সট্ ভুলে কেবল বাক্যটির দিকে, তার সিনট্যাক্সের দিকে আমরা মন দিই। তারপর দুটো বাক্য স্কিপ করে আসি, ” … technologically sophisticated but humane India … “-তে।
এই বাজেট, ১৯৯১-৯২ বর্ষের, বাজারের মুখ থেকে লাগাম খুলে নেয়। খোলা-বাজারের  অশ্বমেধের ঘোড়া লাগামহীন ছুটতে থাকে ভারতবর্ষের মাটিতে। আমরা অবশ্য, শুরু করবো দুটি অন্যতর প্রশ্ন থেকে।
প্রশ্ন এক, এই ‘technological sophistication’-এর সাথে ‘humane India’-র কি বিরোধ আছে কোনো? ‘But’ শব্দটির তাত্পর্য কী?
প্রশ্ন দুই, নয়াউদারনীতি-প্রসূত  ‘technological sophistication’-এর দেহে কি প্রবিষ্ট থাকে অনিবার্য ‘loneliness’-এর বীজ? এই একাকীত্বের রকম কেমন? এর নির্মাণ কি রাজনৈতিক?
এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়ে, তবেই, নয়ের দশক ও পরবর্তী সময়ে কবিতার প্রস্থচ্ছেদ সম্ভব। তার আগে, আরেকটু শিবের গীত গেয়ে নেওয়া যাক।
‘খ্যাপা অন্ধকারে কাদের সখ্য!’
মুক্ত-বাজারের পাশাপাশি, একদিকে–
(ক) সমাজতন্ত্রের পতন, (খ) পণ্যের অবাধ গোলকায়ন (‘বিশ্বায়ন’ সচেতন ভাবেই লেখা হলো না), (গ) ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রভাব, (ঘ) তথ্যপ্রযুক্তির বিষ্ফোরণ
IMG-20170227-WA0001
আরেক দিকে–
(ঙ) বাবরি মসজিদ ধ্বংস, (চ) ইরাক যুদ্ধ, (ছ) গুজরাট দাঙ্গা, (ঝ) পশ্চিমবঙ্গে কৃষিজমি আন্দোলন ও  বাম-সরকারের পতন, (ঞ) বাংলাদেশে শাহবাগ আন্দোলনের রাজনৈতিক-সামাজিক অভিঘাতকে উপেক্ষা না-করেই প্রস্তুত হচ্ছিল বাংলা কবিতার ক্ষেত্র।
IMG-20170227-WA0002
খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে কি, যদি বলি, নয়ের দশকের গোড়াতেই– ‘বলশয় ব্যালে’র শিল্পীরা তখন ক্ষুধায় অবসন্ন, ছিন্নমূল– পশ্চিম ইওরোপের হোটেলের নাচঘর থেকে– গ্লোবালাইজেশনের উচ্ছিষ্ট খেয়ে লাস্যের নয়া শরীরি বিভঙ্গ শিখতে বাধ্য হচ্ছেন? মার্কিন বোম্বেটেদের দাপটে, তখন বিশ্বময় সবার ভাষা, সবার পোশাক, সবার চুলের ধরণ, এক করে দেওয়ার প্রোপাগান্ডা সাফল্যের পথে। আর টেলিভিশনের পর্দায় একটু ‘হটকে’ বাঁচার হাতছানি– বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায়– ঢেকে দিচ্ছে সেই ক্ষতচিহ্ন, ক্লেদ। শেখাচ্ছে শর্টকাটে ফুত্তি করার নয়া-মানবিক-ভাষ্য।
১) “Open a Coke, open happiness”
     — Coca-cola
২) “Happiness is a choice”
     — Pepsi
৩) “More fun with every bite”
      — BISK FARM
IMG-20170227-WA0003
প্রবণতাটা একটু মন দিয়ে পড়তে চাইলে বোঝা যাবে, বোতলের ছিপির নীচে, কুকিজের প্যাকেটে কীভাবে চালান করে দেওয়া হচ্ছিল– একটা প্রজন্মের শিরা-উপশিরায়– ‘illusory happiness’। কেননা, ভুলিয়ে দিতে হবে অতীত, কেননা ‘ডরকে আগে জিত্ হ্যায়’, তাই ভয়-সংশয়-পিছুটান থাকা চলবে না। মনে রাখতে হবে, কাছাকাছি সময়ে, কমপ্ল্যানের বিজ্ঞাপনে সরাসরি কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়েকে গিনিপিগ করে গবেষণার প্রচার চলছে, যে গবেষণায় লব্ধ ফল নাকি বলে দিচ্ছে ‘কমপ্ল্যান-খাওয়া-বাচ্চা’ আর ‘কমপ্ল্যান-না-খাওয়া-বাচ্চা’-দের কী কী পার্থক্য! কারা বেশি ‘টল’, ‘থিন’, ‘ব্রাইট্’, নাকি ‘টলার-স্ট্রঙ্গার-শার্পার’ (হরলিক্স)? সুতরাং– সমকাল এই প্রশ্নকে এড়িয়ে থাকতে পারছে না আর– কমপ্ল্যান বা হরলিক্স কারা অ্যাফোর্ড করতে পারে, আর কারা পারে না।
IMG-20170227-WA0004
একদিকে সিটবেল্ট বেঁধে ভারতবর্ষ দ্রুত এগোচ্ছিল টেকনোলজিক্যাল সফিস্টিকেশনের দিকে। উল্লেখ্য যে, গ্রামের শহরে উঠে আসা শুরু হয়েছিল আগেই, এখন শুরু হলো গ্রাম> আধাশহর> শহরে রূপান্তরণ। মফস্বল কলকাতামুখী হতে চাইলো বহিরঙ্গের সাজে। এই দশকে প্রাইভেট স্কুলের বাড়ন্ত ফলন, ট্যাঁশ-ফিরিঙ্গি মধ্যবিত্তের পুনরাগমন নির্দেশ  দিচ্ছিল– কোকাকোলা-পেপসি’র সাইনবোর্ডের নীচে আত্মহত্যা করা ছাড়া জীবন অর্থহীন।
স্বাভাবিক ভাবে, আমাদের বাংলায়, নয়া-উদারনীতির নিয়মকানুন মেনেই, বাজারের অনুশাসনে অভ্যস্ত হচ্ছিল একটা গোটা প্রজন্ম, সেই প্রজন্ম, যে তার শৈশবে কাটিয়েছে যৌথ পরিবারে, কৈশোরে মোড়ায় বসে কাঁসার গেলাসে জল খেয়েছে, রেডিও-তে পুরাতনী গান শুনেছে, লাইব্রেরিতে উইয়ে-কাটা বই খুঁজেছে, আর যৌবনে, বা প্রৌঢ়ত্বে ল্যাপটপে মহালয়া বাজিয়েছে, উইকিপিডিয়ায় বিশ্বদর্শন করেছে, কোবো বা কিন্ডল্-এ মিলান কুন্দেরাও পড়েছে। আগেই, বিজ্ঞাপন আর টেলিভিশনকে আত্মস্থ করেছে আটপৌরে যাপনে ও ভাষায়। স্বভাবত, এই সময়ের কবিতাকে একদিক থেকে প্রবল ভাবে নাড়া দিয়েছে কবির শিকড়চেতনা, অন্যদিকে সে অনুভব করেছে অপ্রত্যাশিতের হাতছানি। আর কখনো – এ দুই-এর মধ্যবর্তী শূন্যতা (নাকি ‘কনফিউশন’) গ্রাস করছে কবিতা-কে। বিশ্বময় লেফ্ট ইউটোপিয়ার দেওয়ালে নির্মম ফাটল ধরেছে ইতিমধ্যে – থিতু হতে পারার মতো নিশ্চিত কোনো আশ্রয় নেই – নেই কোনো ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’, নেই ‘মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’, বিশ্বময় সন্ত্রাস, জাতিবদ্বেষ ক্রমবর্ধমান, তখন, শহরে সদ্য গড়ে ওঠা বৈদ্যুতিক চুল্লির দিকে তাকিয়ে কবি কী করবেন? শোকযাপন নাকি উদযাপন?
‘কী তার পোড়াতে আজও কষ্ট হয়?’
” … সম্প্রতি শহরে একটা বৈদ্যুতিক চুল্লি বসেছে। দেখে
আসি কী তার কার্যকারিতা। কী সে পোড়াতে পারে?
কী তার পোড়াতে আজও কষ্ট হয়? ঋণ করে আনা এই বিশ্বব্যাঙ্কের বিকালে
কী তার দহনের বিবেচ্য বিষয়? … “
কবিতার নাম: ‘বৈদ্যুতিক চুল্লি বিষয়ক একটি কবিতা’।
কবি: শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়।
কাব্যগ্রন্থ: ‘হলুদ দাগের বাইরে পথচারী’।
প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০১১।
অনুসিদ্ধান্তের সাথে একটু মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। “কী সে পোড়াতে পারে?” আর “কী তার পোড়াতে আজও কষ্ট হয়?”– এই দুইটি প্রশ্নচিহ্নের অন্তর্বর্তী যে শূন্যতা ও হাহাকার, তার আবহ-ই কি তৈরি করেনি “ঋণ করে আনা …বিশ্বব্যাঙ্কের বিকাল”? মনে হয়, এই অস্থিরচিত্ততা– প্রয়োজনে চুল্লির ভিতর ঢুকে তার ‘দহনের বিবেচ্য বিষয়’-কে বুঝে নিতে চাওয়ার মরিয়া চেষ্টা, আর কত অরব দহন, সম্পর্কের, প্রেমের, বন্ধুত্বের, সহ্য করতে হবে– এই সংশয় আর ক্ষোভ নিয়েই কবিতা লিখতে বসেছিলেন তখন, শ্যামসুন্দরের মতো অনেকে। এই মরিয়া চেষ্টাই করেছিল– হাঁড়ি আলাদা না-হতে দেওয়ার– মফস্বলের অনেক যৌথপরিবার তখন। কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশীর সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে, যেখানে আমরা ছোটরা ছিলাম অনধিকারী, লুকিয়ে দেখেছি না-পারার দহনের স্বাক্ষ্যই বহন করেছে এক-দু ফোঁটা চোখের জল। আবার ব্যক্তিগত কথা বলে ফেললাম।
ঐ কবিতারই পরের অংশ–
” …  আজও
মানুষ তাই গাছে গাছে লেখে প্রিয় নাম, ক্ষমা চায়;
কিন্তু কার কাছে? সেও বুঝি গাছের মতন এক দীর্ঘ ঈশ্বর!
শুয়ে আছে বয়ঃভারে কোটি কোটি বছরের জীবাশ্মের ভিতর? … “
ব্যাখ্যা নিষ্প্রোয়জন। টেকনোলজিক্যাল সফিস্টিকেশন আমাদের একাকী শোকযাপনের জন্য আগুন দিয়েছিল।
‘হিউমেন ইন্ডিয়া’, তার পাকামি দিয়ে, স্মার্টামি দিয়ে যা ঢেকে রাখতে চাইছিল– তার দিকে শ্যামসুন্দরদের কবিতা নির্ভীক ভাবেই তাকিয়েছে। বিজ্ঞাপনের ফ্লেক্সে থাকা রমণীর লাস্যকে টপকে, ছন্দের ভিতর থেকে অন্ধকার তুলে এনেছে কবিতা–
“গ্লোসাইনে জ্বলন্ত মেয়ে, তুমি কি আমাকে আর পাঁচজনের চেয়ে
অন্য চোখে দেখো? যদি দেখো
তবে কেন সিগারেট মুখে নিয়ে আমাকে উড়ে যেতে দেখে
কোনওদিনও নিষেধ করোনি, নাকি মুখ খুললেই
তুমি বলে ফেলতে এ মাসেও তোমার কোনো ছুটি নেই,
বলে ফেলতে রাত্রি হলে বস্ তোমাকে
ডেকে পাঠাবেন, হয়তো বলতে আলোর মোড়কে
বসে থাকা এক অন্ধকার বেড়ালের কথা …”
(কবিতা:   গ্লোসাইনের মেয়েটিকে
 কবি:        ঐ
 কাব্যগ্রন্থ: ঐ)
আমরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ভুলে যাইনি যে, আমরা কথা শুরু করেছিলাম এই ‘আলোর মোড়ক’ (‘technologically sophisticated’) আর তার ভিতরের ‘এক অন্ধকার বেড়াল’ (‘a strange feeling of loneliness’) নিয়ে। মনমোহনের বাজেট– কবিতার বিপ্রতীপে– শুরু হয়েছিল অন্ধকার বেড়ালের কথা বলে, তারপরে ছিল আলোর কথা। অসহ্য সেই আলোর ঝলকানি। কবিতা, প্রতিস্পর্ধী হয়ে, বিপরীতগামী হয়ে, আলোর শরীর চিরে তুলে এনেছে অন্ধকার– এই আমাদের স্বস্তির কথা।
‘রাখালের অপেক্ষায় …’
আমাদের আলোচ্য শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের কবিতা, যদিও ব্যক্তি শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায় না– আমরা চিহ্নিত করতে চাইছি একটা প্রবণতাকে। উল্লেখ্য, আগেই, জানুয়ারি ২০০৮-এ প্রকাশ পেয়েছে জিশান রায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নগর পথিক’। খুব প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত দেখা যাক, ১৪ পাতায় ‘বাঁশি’ কবিতার শেষটুকু–
” … নিয়মের বাইরে যারা বেরোতে চেয়েছিল
                                             কপালে কাটা দাগ
পালিয়ে যেতে গিয়ে ট্রেনের কামরায় দেখেছিলাম দূরে
মোবাইল টাওয়ারের পাশে একটা তালগাছ
                                    রাখালের অপেক্ষায় …”
বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কীভাবে, কতটা সচেতন ভাবে ‘মোবাইল টাওয়ার’ আর ‘তালগাছ’– দুইটি অস্তিত্বকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই ‘পাশাপাশি’, আসলে মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো।
অথবা সুজিত দাশের ‘ধরো দু’জনেই সম্মত’ (প্রকাশকাল: ২০১০) কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘মোদের গরব’ কবিতাটি দেখা যাক–
“বাংলার একটাই নদী হুগলিনদী
বাংলার একটাই শহর কোলকাতা
বাংলার একটাই এলুম খেলুম করলুম গেলুম
বাংলার একজন কবি রবীন্দ্রনাথ …
… বাঙালির দুটো গন্তব্য বেঙ্গালুরু ও বইমেলা
বাঙালির দুটো দক্ষতা শঠতা ও শর্টকাট
বাঙালির দুটো ভবিষ্যত্ ছিন্নমূল ছড়িয়ে যাওয়া আর
গোড়ালিডোবা কালো ধুলোর নান্দনিকে
নিজেরা নিজেদের … “
এই কবিতায় বিদ্রুপ অনেক উচ্চকিত, ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। কেবল আলাদা করে, ‘শর্টকাট’ আর ‘ছিন্নমূল’ শব্দদুটি– আগেই উল্লিখিত বিজ্ঞাপনগুলির বয়ান মনে রেখে– পড়বার অনুরোধ জানাই।
এমন দৃষ্টান্ত মিলবে সে সময় প্রকাশিত অনেক কবির কবিতায়, তবু আলাদা করে উল্লেখ করা দরকার অয়ন গোস্বামী-র ‘কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস ও অন্যান্য’ (প্রকাশকাল: ৯ মে, ২০১৫, বইটি সম্পূর্ণ আলাদা আলোচনার পরিসর দাবি করে, এত সপাট রাজনৈতিক উচ্চারণ সমকালে তেমন আর চোখে পড়ে না) এবং কৃষ্ণ মন্ডলের ‘কথার সন্তান’।
আমারা প্রসঙ্গে ফিরে আসি। শ্যামসুন্দরের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটি– ‘রঞ্জন ক্লিনিকে সন্ধ্যা’– হাতে পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও তিন বছর। আর প্রথম কবিতায়, আমরা খুঁজে পাবো, এই তিন বছরে তিনবার আমাদের এই নীল গ্রহের সূর্য-প্রদক্ষিন-বৃত্তান্ত–
“পৃথিবী যে কত সবুজ, গোরু তা জানে।
অবশ্য পৃথিবী যে গোলাকার তা তার জানবার কথা নয়।
তবে প্রান্তরের মর্মমূলে গেঁথে থাকা একটি কাঠের খুঁটিকে কেন্দ্র করে
ঘুরতে ঘুরতে সে, নিজের অজান্তেই, প্রায় নিখুঁত একটি বৃত্ত রচনা করে।
কিন্তু বারবার ঘোরার ফলে খুঁটিতে বাঁধা দড়ির সঙ্গে সঙ্গে বৃত্তটিও
ক্রমশ ছোট হয়ে আসে।
এক সময় ফুরিয়ে আসে ঘাস। পড়ে আসে বেলা।
এখন সে ক্লান্তভাবে তাকায়। এখন সে কিছু শোনার চেষ্টা করে।
যে মালিক তাকে টাঙা দিয়ে গেছে, দিগন্তে তার ছায়া দেখা যায় কি?
কোনো ক্ষীণ পায়ের শব্দ কি ভেসে আসে?”
এই কবিতার বিশ্লেষণ হয়তো আমার পক্ষে – যাকে বলে ইম্পার্সোনাল থেকে – করা সম্ভব না। নিজের রক্তের আবার বিশ্লেষণ কী?!
কারা তখন বলেছিল, “করলো দুনিয়া মুঠঠি মেঁ”! হাতের চেটোর বাইরে থাকা ক্রমপ্রসারমান অতিবিশ্বের অস্তিত্ব যাঁরা অস্বীকার করছিলেন, শ্যামসুন্দর তাঁদের এই ‘inversion of logic’-এর মুখোমুখি দাঁড় করালেন। যে-অদৃশ্য কাঠের খুঁটিকে কেন্দ্র করে ঘুরতে-ঘুরতে তৈরি হওয়া বৃত্তকে সমগ্র পৃথিবী বলে আমরা মনে করতে শিখছিলাম– সেই খুঁটির নিয়মেই আমাদের নিজস্ব পৃথিবীর পরিধি আরও ছোট হচ্ছিল দিন-কে-দিন। তারপর ছোট হতে হতে, আরও ছোট হতে হতে ঘিরে ফেলছিল আমাদের। টুঁটি চিপে ধরছিল। হাড়মাস কালো করে– বেচারা আমরা– তখন প্রাণপনে খুঁজছিলাম মালিকের পদধ্বনি।  আমরা ভাবছিলাম– মালিক, এই খোলাহাটের মালিক কখন তাঁর মুঠো খুলবেন, দয়া করে। কেননা আমাদের নিয়তি ততদিনে বাজারের মুঠোয়, ততদিনে আমাদের কনভিন্স করা হয়ে গেছে– পিঠের নীচে কোনো তৃণবর্ণ দেশ শুয়ে নেই, দেশ হাতের মুঠোয়, কিন্তু আমার না, বাজারের।
আরেকটি কবিতা, ‘অ্যালার্ম ঘড়ি, মশুর ডাল ও ভারতবর্ষ’ থেকে কিছুটা–
” … আমি একজন ব্যক্তির কথা জানি যিনি মশুর ডালের মধ্যে এঁকেছিলেন ভারতের মানচিত্র।
কিন্তু মানচিত্রের মধ্যে ডাল নেই, রুটি নেই, শুধু হল্লা বাজছিল গভীর রাত্রিতে।
সন্দেহবশত আমি আঠা লাগানো দাঁড়িপাল্লা পাঠিয়ে দেখেছি তার তলায়
আটকে আছে মোহরের মতো ঝকঝকে খিদে। … “
খিদের কবিতা নিশ্চয়ই বাংলা ভাষায় কম লেখা হয়নি। কিন্তু আমি নজর টানছি ‘মশুর ডাল’ আর ‘মোহরের মতো ঝকঝকে’– এই দুটি সাজেশনের দিকে। নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংকটকে সরাসরি ইঙ্গিত করা হলো। পৃথিবী এক আশ্চর্য জাদুকর। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত একটি গল্পের বই থেকে গল্প বেছে ইরানের একজন পরিচালক ছবি বানালেন এগারো মিনিটের– ঠিক এক বছর আগে– ২০১৩ সালে। শ্যামসুন্দরের কবিতাটি আমরা হাতে পেলাম ২০১৪ সালে। আর ২০১৫ সালে কেওয়ান করিমির জন্য বরাদ্দ হলো ২২৩ টি চাবুকের ক্ষত। ঘটনাচক্রে, ২০১৩-তে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিটির নাম ছিল, “Adventure of a Married Couple”– যা ক্ষুব্ধ এবং ক্ষমাহীন দৃষ্টিতে তুলে আনতে পেরেছিল নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন-সংকট। আর যে-কাজটির জন্য, কারিমি’র কারাবাস ও চাবুকের ফরমান জারি হয়, সেটি, করিমির কথায়, ” … has graffiti and wall painting that date back to 100 years ago in Tehran. It is story of a wall and how it reflects what happened in society … “।
কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে যাঁরা এই শেষ অংশটুকু বাহুল্য বা অপ্রয়োজনীয় মনে করবেন – তাঁদের জানিয়ে রাখা ভালো – আমার উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে, বাংলা থেকে ইরান, স্পর্ধার কোনো মানচিত্র নেই। দ্বিতীয়ত, কবিতা হোক বা সিনেমা সমসময়কে এড়িয়ে থাকতে পারে না। এবং অবশ্যই তৃতীয়ত, বড়ো পর্দায়, আদিত্য বিক্রম যে ইমেজ তৈরি করবেন আরও কিছুদিন পরে – শ্যামসুন্দরের একাধিক কবিতা, অধিকাংশই, তার জমি প্রস্তুত করে রেখেছিল।
আমরা অন্তত কৃতজ্ঞ থাকতে পারি – এইটুকু মনে রেখে যে – ‘হলুদ দাগের বাইরে পথচারী’ বা ‘রঞ্জন ক্লিনিকে সন্ধ্যা’-র অনেক কবিতাই একটি বেহায়া বাজেটের দিকে, তিনটি ভেঙে পড়া গম্বুজের দিকে, ‘আই জি আই’ বা ‘রোডরেস’-এর দিকে, কোকাকোলার বিজ্ঞাপনের দিকে লালচোখ নিয়ে তাকিয়েছিল। সেই রাগের গভীরে দরদ ছিল। শিকড়ের টান ছিল। একগুচ্ছ উদাহরণ টেনে আমার বক্তব্যকে জোরালো করবার, এবং লেখার আয়তন বাড়াবার প্রয়োজন নেই। শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের একটি কবিতা দিয়ে লেখা শেষ করি–
একটি রূপকথার এপিটাফ
————————————–
“রোয়াকে রাজপুত্ররা স্থির, সেই দৃশ্য এখনও ভুলিনি
সান্ধ্য কলেজের মাঠে স্মৃতি গোধূলির ঘোর, কিছু চাপা
হাসি-বিনিময় —
সারাটা আকাশ জুড়ে কে যেন নিকিয়ে নিচ্ছে
অন্ধ গোময়…
দিঘি তোলপাড় করে উঠেছিল আশ্চর্য সর্পিণী
এ প্রান্তর ভালোবেসে হৃদি থেকে খুলেছিল মণি
শহর টালমাটাল করে চলে গেল স্মৃতি দিদিমণি”
পুনশ্চ:
চলে তো যেতেই হতো। ঐ বাজেটের-ই শেষে, সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন মনমোহন, ভিক্টর হুগোকে কোট করে, “No power on earth can stop an idea whose time has come”। অন্তত, ‘স্মৃতি-দিদিমণি’-দের জন্য অবিচ্যুয়ারি লিখতে বাংলা কবিতা ভোলেনি। ‘ভোলেনি’ ভাবতে ভালো লাগে। ভাঙা লণ্ঠনের পাশে রাত জাগতে জাগতে, সে আমার ‘ব্যক্তিগত’ নিরাময়-বাসনা।
* কবি: অয়ন গোস্বামী, কবিতা: ‘কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস-৩’, কাব্যগ্রন্থ: কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস ও অন্যান্য।
Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s