রান্না, রান্নাবাটি, খেলা, সংসার / শ্রম, অবসর, মূল্য, বাজার

লিখেছেন মধুশ্রী বসু ।

(রান্না, রান্নাবাটি, খেলা, সংসার)

আর পাঁচটা বাঙালি পরিবারের মতো আমারও রক্তে এবং বেড়ে ওঠাতে আছে সু-রাঁধুনিদের ছায়া। অথচ বাড়ির একমাত্র মেয়ে হওয়ার আহ্লাদী সুবাদে আমার ছিলো কুটোটিও নাড়তে না হওয়ার অধিকার এবং বিলক্ষণ অধিকারবোধও।এই গোলেমালে পড়ে বেশ ডাগর বয়েস অব্দিই কাঁপা-কাঁপা বুকে কালো চা, দরকারের চেয়ে বেশি কিম্বা কম পরিমাণ তেল আর নুন দেওয়া ডিমভাজা, কিম্বা গলা-গলা ম্যাগি ছাড়া আর কিছু বানাতে শিখিনি।যেটুকু যা শিখেছি, সবই পরবর্তীকালে একা থাকতে শুরু করার পর। ফলে আজও আমার অনেক ছোটোছোটো রান্নার কাজ শেখা হয়নি। তার কারণ হয় আমার নিজের সেই বিশেষ খাদ্যটি নিয়ে ততো উৎসাহ ছিলোনা, নয়তো এই যে, নিজের খাওয়ার জন্য কে অতো কষ্ট করে! যেমন আজও আমি ঠিক সাহসের সাথে দুধ দেওয়া চা বানাতে পারি না, যেহেতু নিজে খাই লিকার, বা কোনোদিন যদি দুধ দিয়ে খাইওবা, সেটা টুক করে দোকান থেকে কিনে খাবার সুবিধা বা রেস্ত অনায়াসেই ছিলো চিরটাকাল। এই অপারগতা ভালো নাকি মন্দ, তাই নিয়ে আমার একটা দোটানা থেকে গেছে চিরদিন।

মধ্য/উচ্চ-মধ্যবিত্ত,অধিকাংশ ক্ষেত্রবিশেষেই খোলামেলা উদারপন্থী মাতৃতান্ত্রিক, কিন্তু ওদিকে আবার সামাজিক-রাজনৈতিক দিক থেকে কতকটা কূপমণ্ডূক, প্রতিদিনকার নানান আচার-ব্যবহারে জেনে-না জেনে কার্যত সামন্ততান্ত্রিক পরিবারে বেড়ে ওঠা, নব্বইয়ের দশকে বয়ঃসন্ধিতে পড়া আমার মতো অনেক বাঙালি মেয়েই হয়তো আমার এই দোটানাকে চিনতে পারবে।আমাদের আগের দু-তিন প্রজন্মের ‘শিক্ষিত রুচিশীলা দায়িত্বশীলা বাঙালি ভদ্রমহিলা’দের পোঁ ধরে, আমাদের ভবিষ্যৎ তখন আর একেবারেই সরাসরি রান্না শেখা, ঘরের কাজ করা,সংসার করা ইত্যাকার পারদর্শিতার মাপকাঠি দিয়ে বিচার্য ছিলো না।বরং পড়াশুনো, চাকরি, মূল্যবোধ, রুচিবোধ — এইসবই তখন যেন প্রধান, অন্তত উপর-উপর।অথচ আবার মেয়েদের রান্না বা অন্যান্য সাংসারিক কাজ শেখার ঔচিত্যবোধের ধারণাটিও হারিয়ে যায়নি।পরিবারের মানুষ সরাসরি যদি এটা নিয়ে খুব গা নাও করতেন, বৃহত্তর পরিবারে বা সমাজের আর পাঁচটা জায়গায়, এমনকি বই-সিনেমা-থিয়েটারেও তখনও এই ছবি উঠে আসছে।নায়িকা চরিত্ররা আমার ঠাকুমা-দিদিমা-মা-মাসি-পিসিদের মতোই একপক্ষে বহির্মুখী আধুনিকা হলেও অপরপক্ষে গৃহমুখীসু-রাঁধুনি,সংসারের ধারক-বাহকও। এদিকে বাড়িতেও আবার আমার ‘রিয়েল লাইফ’ নায়িকারা রান্না করছেন দেখছি, আবার তারই মধ্যে তাঁদের ভিতর অনেকেই চাকরি করছেন পুরোদস্তুর।ফাঁকে ফাঁকে কখনও কেউ ডেকে বলছেন ‘কাল সকাল থেকে নিয়ম করে বাজারটা করে নিয়ে এসো।আহা রোজ না হোক মাঝেমধ্যে রান্নাঘরে ঢুকে হাত পাকাও কারণ এসবতো শেখা দরকার’।আবার কেউ বলছেন ‘সেকি ছি ছি রান্নাঘরের দিকে ঘেঁষো না,মন দিয়ে পড়ো গিয়ে, যাও’! বাড়িতে কাজ করেন যাঁরা — কেউ পাকাপাকি, কেউ দিনে কয়েক ঘণ্টা (তাঁদের কাজেরও একটা বড় অংশ রান্নাকে কেন্দ্র করে ঘোরে) — তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ চুপচাপ মন দিয়ে কাজ করছেন, আবার কখনও হয়তো অবসরকালে আফশোস করছেন, ‘যদি আমাদের বাবা-মা আমাদের আরও একটু পড়াতে পারতো, যদি তাদের সেই টাকা থাকতো, তাহলে কি লোকের বাড়ি কাজ করতে আসি?’ কেউ আবার আসছেন, বাড়িময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, নির্দ্বিধায় কাজে ‘গাফিলতি’ করছেন, আবার কাজ নিয়ে বা মাইনে নিয়ে বা পুজোর শাড়ি-বোনাস নিয়ে — অর্থাৎ শ্রমের মূল্য নিয়ে — মা-ঠাকুমার সাথে তেড়ে ঝগড়া করছেন।

এই মহিলা মহলে আমার জায়গা কোথায়? জন্মসূত্রে মূল্যের কথা নয় এটা, কর্মসূত্রে বা শ্রমসূত্রে আমার মূল্য কি? আমি ‘বাবুর বাড়ির মেয়ে’ এবং আমার বাবা-মা’র আমাকে পড়াবার মতো সংগতি রয়েছে। কিন্তু পরিবারের প্রাত্যহিক কেনা-বেচা-রাঁধা-বাড়া-খাওয়া-ধোয়ার ভিতর মূল্যগত ভাবে আমি কি যোগ করে থাকি? আবার বাড়ির বাইরে পারাখলে এই প্রশ্নটিই তখন আরও ব্যাপক অর্থে ভাবাতে শুরু করে, কারণ তখন শুধু আমার পরিবার ঘিরে থাকা মহিলারা নন, তুল্যমূল্য বিচার তখন এক বৃহত্তর নারী সমাজের সাথে। তাদের মধ্যে অনেকে তখন আমার মতোই বয়েসে ছোটো হলেও লিঙ্গের দিক থেকে, সংস্কৃতির দিক থেকে আমার মতোই ‘নারী’। নারী, যাঁরা কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজের ‘অফিশিয়াল’ রাঁধুনি হিসেবে কাজ করেছেন, ফলে তাদের — আমাদের — পরিচয়বোধ থেকে রান্নার বিষয়টা উড়িয়ে দেওয়া অতো সহজ নয়।তাই চেয়ে হোক, না চেয়ে হোক, নানান তুলনামূলক সামাজিক বিচার ব্যবস্থার এবং আমার স্ব-বিচার পদ্ধতিরও একটি প্রচ্ছন্ন অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আজও দেখছি থেকে গেছে রান্না।

স্কুলে পড়তে, কিম্বা কলেজের গোড়ার দিকে এইসব দোটানার ব্যাপার স্যাপার যখন ঘটছে, সাথে সাথে তখন আমাদের চারপাশের সমাজ-সংস্কৃতি বদলাচ্ছে বেশ দ্রুত।বিশ্বায়ন বা নয়া-উদারনৈতিকতাবাদ তখনও অপেক্ষাকৃত নতুন গল্প—আমরা সবে যার নানামুখ দেখতে শুরু করেছি মাত্র, তাও বিচারবুদ্ধি দিয়ে অর্থনীতি-রাজনীতির দিক থেকে ততো নয়, বরং বেশ একটা সাংস্কৃতিক খেলা হিসেবে। নানান রকমের সামাজিক মূল্যায়ন বদলে যাচ্ছে, যার খানিকটা ভালো লাগছে, খানিকটায় ভয় করছে, খানিকটা নিয়ে মুখ টেপাটেপি করে নিষিদ্ধ হাসাহাসি করছি, কিন্তু সেসব নিঃশব্দে ঢুকে যাচ্ছে আমাদের মননে, তৈরি করছে ‘আমাদের প্রজন্ম’, বিশেষ করে তার মধ্যেকার মধ্য/উচ্চ-মধ্যবিত্ত লিঙ্গায়িত শ্রেণী।আমাদের প্রজন্ম এই দোটানাকে একভাবে ভিতর থেকে দেখেছে— এইসব নতুন মূল্যায়নের হাত ধরে পরিবার-সংসার-বিয়ে-সন্তান বিষয়ক পাশ-ফেলের সাথে সাথে পড়াশুনো-চাকরি-শ্রম-বাজার-পুঁজি-মূল্যায়নের পাশ-ফেল কিভাবে মিশে আছে, তার নানান নতুন ছবি উঠে এসেছে আমাদের কাছে।পরবর্তীকালে একা থাকতে শুরু করে যে ধরণের জীবন যাত্রার ভিতর দিয়ে গেছি, যাচ্ছি, যার ভিতর আবার ‘রান্না’ জড়িয়ে আছে নানান ভাবে, সেটি একটি বিশেষ ব্যক্তিগত যাত্রা নয়, বরং ওই সামাজিক রূপান্তরের, আমাদের প্রজন্মের এই দোটানাকে নিয়ে বাঁচতে শেখার হাজার হাজার গল্পের মধ্যে একটি।

তা’বলে এমন নয় যে এসব চিন্তা আমায় ওই বয়েসে প্রচুর ভাবিয়েছে। আসলে রান্না বলতে একটা বয়েস অব্দি আমি বুঝেছি আমার নিজের খিদে মিটবার অন্তরালে এক রহস্যময় — প্রায় ভীতিপ্রদএক পদ্ধতি (মাছের তেল ছিটলে আমি এখনো পিট্টান দিই, একবার এক বন্ধুর বাড়ি প্রেশার কুকার বার্স্ট করে গোটা রান্নাঘরের দেওয়াল গলাগলা হলুদ ফুটন্ত অর্ধসিদ্ধ মুগের ডালে প্রলেপিত হতে দেখার পর আমি আর কোনোদিন প্রেশার কুকার ব্যবহার করে উঠতে পারিনি), যার বিষয়ে আমি আকাট থাকতেই পছন্দ করেছি।তবে বাড়ির গুরুজনদের আদেশ-উপদেশ যা করতে পারে না, বয়ঃধর্মতা সহজেই করে ফেলে।সেই নিয়মে একটা বয়েসের পর এলো ‘পুরুষের পেটের ভিতর দিয়ে হৃদয়ে পৌঁছনো’র আশায় রান্নাঘরে ঘুরঘুর।যেমনসদ্য প্রেম করতে শুরু করে নিজেকে সেই প্রেমের যোগ্য নারী হিসেবে দেখার আর দেখানোর চেষ্টায় বাড়ি থেকে রান্না করে প্রেমিকের ‘মেস’-এ নিয়ে যাওয়া, তাকে ও তার বন্ধুদের খাওয়াবো বলে। মুখে বলছি বটে নিজে রান্না করে এনেছি। আসলে বাপের পয়সায় কেনা মালপত্র দিয়ে, দিদি-মাসিদের রাঁধা পনীর-চিকেন, যাতে আমি হয়তো হাতটুকু ঠেকিয়েছি ‘ইতি গজ’-র মতো। আরও কয়েক বছর পরে একা হোস্টেলে কড়া রকমের পড়াশুনোর চাপে থাকতে শুরু করে যা হলো তাকে বলে ঠেলার নাম বাবাজি। তখন কালো জিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে বাংলা আলু চচ্চড়ি থেকে শুরু করে আপেল-দুধ-পেঁয়াজ দিয়ে মেক্সিকান চিংড়ি মাছ সবই‘মেডিটেটিভ’, সবই‘অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট’।মোদ্দা কথা এই যে, প্রেম করতে গিয়ে হাতেখড়ি, আর ঠেলায় পড়ে একলা-একলা অনুশীলন, তাই আমার রান্না করা, রান্না শেখা — সমস্তই ভীষণ স্বার্থপরের মতো।তাতে পরকে খাইয়ে সুখ পাওয়ার নারীসুলভ ঔদার্য নেই। ফলে রান্নার সূত্রে পরিবারে বা সমাজে স্ব-মূল্যবিচার বিষয়টি আমার কাছে আজও অস্বচ্ছ। তা স্ব-মূল্যের কথা নাহয় ছেড়ে দিলাম, কিন্তু রান্নার মূল্য ঠিক কি? কি কি রূপেই বা আমরা রান্নাকে দেখতে পারি, যাতে তার মূল্য নির্ধারণের নানা মাত্রাকে পাশাপাশি দেখা যেতে পারে? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর পেলে আমার মূল প্রশ্নেরও কাছাকাছি পৌঁছনো যাবে একসময়।

(শ্রম, অবসর, মূল্য, বাজার)

নিজের সাতকাহন যদি বাদও দিই, তবু সাধারণভাবেই মনে হয় রান্না আজকের উচ্চ/মধ্যবিত্ত সমাজে যতো না কাজ, তার চাইতে বেশি খেলা। রান্নাবাটির মতন খেলা নয়, বরং এক দারুণ অনিবার্য প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাণিজ্যিক খেলা, যা আবার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক উপাদান নিয়ে খেলবার সাথে সাথেআবেগ-অনুভূতি নিয়েও খেলে। এই জটিলতাই ‘ঘরের রান্না’কেঠিক কোন চোখেদেখা যায় তা নিয়ে ধন্দ লাগায়। আর যদি এটাই ঠাহর করে না ওঠা যায় যে রান্না শ্রম নাকি অবসর নাকি খেলা নাকি শিল্প, তাহলে তার মূল্য নির্ধারণ করা আরোই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের কথা বলবো না বলেছিলাম। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গে একটা করুণ ব্যক্তিগত গল্প বলতেই হয়। এই পালাবার-পথ-নেই গোছের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস আমি ব্যক্তিগতভাবে খানিকটা পেয়েছিলাম একবার যখন স্কুলের কয়েকজন বন্ধুর সাথে তাদেরই একজনের ফাঁকা বাড়িতে, কেন যেন সেজেগুজে আড্ডা দিতে গিয়েছিলাম। বেশ একসঙ্গে যাওয়া হলো। কিন্তু সেখানে পৌঁছোতেই কোথা থেকে ছেলেরা হঠাৎ বেশ দল পাকিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করলো আর মেয়েরা শাড়ির আঁচল-টাঁচল কোমরে গুঁজে কি একটা ডিম-আলুর ভুজিয়া বানাতে গেলো। এদিকে আমি তখন না পারি ক্রিকেট খেলতে, না পারি রান্না করতে, অর্থাৎ না মদ্দা না মাদী। তো হকচকিয়ে বাকি মেয়েদের পিছন পিছন গুড়গুড় করে রান্নাঘরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, যেন অপার হয়ে বসে আছি — এইরকম মনে হচ্ছে। আমাদের মধ্যে সবচাইতে গিন্নী যে বান্ধবী ছিলো আমাদের সে আমায় চট করে চারটে আলু ধরিয়ে দিয়ে বললো — ‘কাট’। তা আমি একটা কাজ পেয়ে খুশি হয়ে কাটতে শুরু করেছি কি করিনি, আরেক বান্ধবী হেসেই আকুল, বলে — ‘ও কি হচ্ছে! এক-একটা টুকরো এক-এক সাইজের’! বলেই আমার হাত থেকে বঁটি-টটি কেড়ে নিয়ে খ্যাঁস খ্যাঁস করে সমস্ত আলু চমৎকার সমান সাইজে কেটে ফেললো। কি যে দুঃখ তখন!

মজার ব্যাপার এই যে, আমার মতো অপার লোকের অবস্থা আজও — রান্নাবান্না কতকটাশিখেও — হরেদরে এক। ঠেলায় পড়ে নিজের পেট এবং মন ভরাতে আঁকড়ে-মাকড়ে শেখা রান্নায় ‘লোকের কেমন লাগবে’, অর্থাৎ মূল্যায়ন তথা বাজারের চিন্তার অবকাশ ততো থাকে না। বরং সবটাই যেন নিজের সাথে নিজের কথোপকথন — প্রেমের চেয়েও বেশি ব্যক্তিগত একটা বিষয়। তাকে গুষ্টিগতভাবে অবসর যাপনের আলোচনায় এনে ফেলার ভাষাটাই আমার কাছে অজানা। উনিশ শতক আর বিশ শতকের একটি বড় অংশ জুড়ে, কিম্বা আজও, এখনও রান্নাঘর কেন্দ্রিক যে নারীসমাজ, বা অন্যদিকে দেখলে এখনকার দিনে বহু নিউক্লিয়ার পরিবারে যে দুই পার্টনারে হাত মিলিয়ে রান্নাবান্না, ভাগ করে নেওয়া আলাপ-আলোচনা, তার কোনোটাই আমার মতো একা থাকা, একা রান্না শেখা মেয়েদের কাছে পরিচিত ছবি নয়। বরং ছোটোবেলায় একলা বসে রান্নাবাটি খেলার সাথে আমার এখনকার রান্না করার ধরণের মিল অনেক বেশি। তখন যেমন মুঠো মুঠো বকুল-বাবলা-মাকাল-কাঠবাদাম ফল বা তরকারির খসখসে খোসা নিয়ে পরমানন্দে পাথর দিয়ে থেঁতো করা, বা ভাঙা কাঁচি দিয়ে কাটা, কাটতে কাটতে ক্লান্ত হলে যেমন-তেমন করে শেষ করে দিয়ে হঠাৎ ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে চলে যাওয়া — এখনও তেমনই। তবে বয়েসের সাথে সাথে আমিও সেয়ানা হয়েছি। রন্ধন এবং খাদ্যপিপাসু দঙ্গলে গিয়ে পড়লে আগেভাগে বোতল নিয়ে বসে রাজা-উজির মারতে শুরু করি, যাতে ‘সকলের মাঝে বসে’ আলাদা হওয়ার বিদঘুটে প্যাঁচে পড়তে না হয়। অবশ্য প্যাঁচ কাটানো ছাড়াও এতে হয়তো নিজের আরেক রকমের মস্তানি-মদ্দানি লিঙ্গ-বিপ্রতীপ অবস্থান দেখানো যায়, যা আবার ‘খারাপ করে রান্না করা’র চাইতে মধ্য/উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য — বিশেষ করে নিজের বৌ না হলে।

তবে তখনকার আর এখনকার কথা মিলিয়ে দেখলে বলতেই হয় যে বয়েসের সাথে সাথে, পরিবার থেকে আলাদা থাকতে শুরু করে,স্বাভাবিক নিয়মেই আমাদের সকলের জীবনেই রান্নার ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।এই ভূমিকার পুরোটাই ব্যবহারিক নয়, সামাজিকও। যেমন ছোটোবেলায় রোজকার আলাপ-আলোচনার মধ্যে রান্না-খাওয়ার ততো জায়গা ছিলো না। অথচ বড় হয়ে, এই সেলফি তোলা সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা পাল্লা দিয়ে নিজের ছবি আর নিজের রাঁধা কিম্বা খাওয়া খাবারের ছবি তুলে যাই, আর তাই নিয়ে কথা বলে যাই অনন্তর।বিশেষ করে ‘ভার্চুয়াল মিডিয়ায়’ এই নিয়ে কথোপকথন আমাদের সব চাইতে পছন্দের নয়া-উদারনৈতিক মধ্যবিত্ত ‘খেলা’গুলোর মধ্যে একটা। এর সাথে রান্নাকে বা খাদ্যকে সাজানোর প্রসঙ্গটিও চলে আসে। সৌন্দর্যবোধ — ‘রন্ধনশিল্পে’র যা একটি অন্যতম প্রধান উপাদান।

রান্নাকে সৃজন-শিল্প হিসেবে দেখলে তখন তার সৃষ্টবস্তু কিন্তু শুধু খাদ্য নয় আর।শুধু উদরপূর্তি আর পুষ্টির ব্যাপার হলে রান্নার মূল্য-নির্ধারণ এতো জটিল হতো না। সমস্যা হচ্ছে, শুধু খাদ্যরূপ ব্যবহার আর সৌন্দর্যচর্চা নয়, তার পাশাপাশি রান্না তৈরি করে মানুষের পরিচয়, পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রেণীবিভাগ এবং সে সমস্ত বাবদে নানান ‘স্টিরিওটাইপ’ও, যা তখন আবার আমাদের জীবনে নানান রকমের সীমানা নির্ধারণ করতে থাকে।আসলে রান্না কোন ছার, রান্নাবাটিকেও কিন্তু একদম এক কথায় খেলা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না, তারও রয়েছে নিজস্ব রাজনীতি। যেমন ছোটোবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময় যা আমার কাছে ছিলো একটি অনুকরণমূলক সময় কাটানোর নাটুকে উপায়, তাই আবার আমার অনেক খেলার সাথীর কাছে ছিলো সত্যিকারের কাজ, রোজদিনের জীবন। তাছাড়া ‘রান্নাবাটি মেয়েদের খেলা’, ‘পুরুষ বাচ্চার রান্নাবাটি খেলতে নেই’ — ইত্যাকার প্রসঙ্গ তো হামেহাল উঠে আসে। তবে রান্না নিয়ে এই মূল্যগত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সেই ফেলা জমিতে ঝোপঝাড়ের ভিতর মেঠো রান্নাবাটি হয়তো নিছকই ছেলেমানুষি খেলা-খেলা বিষয়, এবং তার অর্থনৈতিক প্রভাবও সরাসরি ও ব্যাপকভাবে সুদূরপ্রসারী নয়।অন্যদিকে খেলা-খেলা করে সত্যিকারের রান্না করলে বাজারে তার দাম থাকে না।এখানে খেলা-খেলা বলতে বোঝাচ্ছি খেয়ালখুশি মতন করা,চেহারা-টেহারা,দাম-টাম, বিক্রি-টিক্রির পরোয়া না করে (খেলার সাথে ‘খেলা-খেলা’ গুলিয়ে ফেললে চলবে না। আজকাল বেশির ভাগ খেলাই আর খেলা-খেলা করে করার উপায় নেই, বিস্তর টাকাপয়সার ব্যাপার, ছাপোষা ক্যাবলা লোকের নাগালের জিনিসই নয়)।

এই আলোচনায় খেলা আর শিল্প — এই কথাদুটো ঘুরে ফিরে আসছে। আসলে বাণিজ্যিক অর্থে সফল শিল্প আর বাণিজ্যিক অর্থে সফল খেলা (খেলা-খেলা নয়) সমার্থক।তাদের সমস্যা, সার্থকতাগুলোও একই ধরণের।বাণিজ্যিক অর্থে যেকোনো সৃজনশীল কাজেরই তিনটে ভাগ থাকে। গোড়া, মধ্য এবং আগা। গোড়া, অর্থাৎ কেন করবো, কি কি লাগবে করতে, খরচা পাতি কেমন। মধ্য অর্থাৎ কিভাবে করছি। আগা অর্থাৎ, করলাম তো, এবার সেটা নিয়ে হবেটা কি, যা ভেবে করতে গিয়েছিলাম, তার সাথে মিল রইলো কি না, তার চেয়ে ভালো হলো, নাকি মন্দ, এবং এবার এর মূল্য কতো হাঁকা যায় (বা যদি গোড়াতেই মূল্য হাঁকাহাঁকি হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তার সাথে কতোটা সামঞ্জস্য রইলো)—এইসব। এই গোড়ার কেনা দাম এবং আগারবেচাদাম যত বেশি, ততো মধ্যেকার ওই ‘কিভাবে করছি’ — তাই নিয়ে ব্যতিব্যস্ততা।অথচ ওই মধ্যভাগটিতেই ‘খেলা-খেলা’ করার সুযোগ। আর সেই খেলা-খেলা করার ভিতর যে একটামুক্তির স্বাদ — যার চর্চা করতে গেলে বেশ ঝাড়া-হাত-পা হয়ে ‘প্রোডাক্ট’-এর বদলে ‘প্রোসেস’ নিয়ে আপনমনে তাক-ডুমা-ডুম-ডুম করা যায় — তার ভাগটা ওই দাম যতো চড়ে, ততো কমতে থাকে। এমনিতেও তাক-ডুমা-ডুম-ডুম করে অবসর কাটিয়ে গড়পড়তা মানুষের পক্ষে এই কড়া পুঁজিবাদী পৃথিবীতে পেট চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। যদি সে অবসরে যথেষ্ট পরিশ্রম মিশে থাকে (যেমন আমরা রান্নাবাটি খেলতাম মারাত্মক খাটাখাটনি করে, স্কুল থেকে ফিরেই না খেয়ে-দেয়েই ঠা ঠা রোদে ঘেমে-নেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা), তাহলেও কঠিন, এক যদি না কায়দা করে বাজারে তার একটা দাম ঠিক করে ফেলা যায় — যাকে বলে ‘মার্কেটিং’।রান্নাবাটির অবশ্য এক নিজস্ব ‘মার্কেটিং’-এর লিঙ্গায়িত অর্থনীতি-রাজনীতিও রয়েছে — তার উপাদানের বাজারি দরদামে, তার বিজ্ঞাপনে (যেমন ধরা যাক ‘বার্বি’র কিচেন সেটে)। কিন্তু খানিক আগে যা বলছিলাম, আমাদের মেঠো রান্নাবাটি অন্তত অর্থনীতির দিক থেকে খেলা-খেলা বই তেমন কিছু ছিলো না বললেও হয়।

এখন এই প্রসঙ্গ ধরেই আবার ‘সাংসারিক রান্না’ বিষয়ক ধন্দের কারণটায় ফিরে আসা যাক। এ ধরণের রান্নার শ্রমলব্ধ বস্তুটির, অর্থাৎ ঘরের খাবারের বাজারি দাম বলে সরাসরি ঠিক তেমন কিছু নেই, কারণ তার বাজার এই এতোটুকু মাত্র — ঘরের মানুষক’টি, খুব বড় জোর পরিচিত গণ্ডির কয়েকজন (কখনও আবার তাও নয়, খালি নিজের পেটটি মাত্র)।এই বাঁধা ধরা দাম না থাকার ফলেই কি আমাদের রন্ধন পটীয়সী গৃহবধূ/‘গৃহকন্যা’দের মধ্যে এক বড় অংশের আজও এই বদনাম; এই যে, তাঁরা ঘরে বসে কর্মক্ষম পুরুষের (বা পরিবার ভেদে নারীরও) অন্ন ধ্বংস করে থাকেন?অথচ মূল্য বস্তুটিকে খানিকটা ব্যাপক অর্থে ধরলে দেখতে পাচ্ছি, তাঁদের এই শারীরিক-মানসিক শ্রমের মূল্য শুধু বাড়ির খাওয়ার টেবিলে প্রত্যক্ষ উদর পূর্তিটুকুতে মাত্র নয়। তারও চেয়ে বেশি মূল্য একটি বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিয়মানুবর্তী ভূমিকা পালনের ভিতর দিয়ে (যার নানান দিকগুলোতে এই মুহূর্তে যেতে চাইছি না), যার সাথে আবার অর্থনৈতিক মূল্যও জড়িয়ে আছে। সমাজ-সংস্কৃতি বদলে যাওয়ার সাথে সাথে এই পুরো বিষয়টারই পুনর্মূল্যায়ন ঘটতে বাধ্য। যেমন ঘটেছে বিশ্বায়নের সাথে সাথেও। ‘ঘরের রান্না’র সংজ্ঞা, বিবরণ বদলে গেছে, আরও জটিল হয়ে উঠেছে।তার সাথে বদলে গেছে সেই রাঁধুনিদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং তার মূল্য।

(রান্না, রান্নাবাটি, খেলা, সংসার)

রান্না আর রান্নাবাটির কতোখানি এক? কতোখানি আলাদা? আমাদের চেয়ে খানিক বড় দিদিদের যে সময় লোকে দেখতে আসতেন, ছেলের মা-মাসিরা জিজ্ঞেস করতেন—‘বলো তো মা, রান্নায় কি লাগে?’ আমার এক দিদি একবার বুদ্ধি খাটিয়ে বলেছিলো —‘ফোড়ন’। তাতে বয়োজ্যেষ্ঠা মহিলা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলেন—‘হলো না, রান্নায় লাগে মন’।অর্থাৎ কিনা, একেবারেই খেলা-খেলা করে করা চলবে না।

ওদিকে খেলা-খেলা হওয়া সত্বেও রান্নাবাটির আছে এক নিজস্ব মনঃ  সংযোগের,গাম্ভীর্যের গল্প — হ্যাঁ, একরকমের ছেলেমানুষি গাম্ভীর্য, কিন্তু তাই বলে তাকে হেলাফেলা করার কিছু নেই।তার মধ্যে বড়দের গাম্ভীর্যের অনুকরণের একটা চেষ্টা রয়েছে বটে।কিন্তু তারও চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটা কিছু ঘটছে—লাল টকটকে কিম্বা সবুজ কচকচে বকুল ফলের গা, ধুতরো, বাবলা কিম্বা কাঠবাদাম ফলের মোটা শাদা শাঁস থেঁতো হচ্ছে গোল গোল নুড়ি পাথরের ঘায়ে, লাল-হলুদ-কমলা-গোলাপি ল্যানটার্ন ফুল কুচি কুচি করে তার সাথে সত্যিকারের ধনেপাতা-কারিপাতার দুর্দম সবুজ মিশিয়ে,শুকনো কাঠ-কঞ্চি আর খবরের কাগজের আগুনের তা তে ভাঁড় ভর্তি বালি গরম হচ্ছে।তার ভিতর আবার এক-এক দিন সত্যিকারের মশলা বা তরকারির টুকরো-টাকরা ফেলা— কালো জিরে, শাদা জিরে, আলু, বেগুন। সে আলু আবার সত্যি সত্যি খেলার পরে খেয়ে নেওয়া যাবে নুন দিয়ে কিম্বা আলুনিই। তার মতো বিস্ময় আর হয় না! তারপরে কখনও আবার আমার দিদিমা কানা ওঠা মোটকা নীল অ্যালুমিনিয়ামের থালায় করে ফেলে দেওয়া তরকারির খোসা ধরে খেলতে দিতেন। তার কতরকম রঙ, গন্ধ আর স্পর্শ—তাজা থাকলে এক রকম, শুকিয়ে গেলে আরেক রকম! — এ সব দেখতে দেখতে ভিতর থেকে কেমন একটা মুগ্ধতা, একটা মনোযোগ আপনি এসে পড়ে। সেই মুগ্ধতার, মনোযোগের একটা মনোহর গাম্ভীর্য রয়েছে। শিশুদের ভিতর এটা প্রায়ই দেখা যায়। তফাৎ এই যে, এই ‘মন’কে ঠিক বাজারের দাম দিয়ে বিচার করা যায় না। এই মনই এই রান্নাবাটি খেলাকে খেলা-খেলা করে তুলতে পারে।তবে এসব হাওয়ার আনন্দকে পাত্তা না দিয়ে রান্নাবাটির মতো খেলারও সার্থকতার মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারেকার খেলনাবাটি কতো ঝাঁ-চকচকে, কোন বার্বির কিচেন সেটে কটা, কতো কায়দার বাসনপত্র রয়েছে তার উপর। তেমনও হয়।

খেলার কথা উঠেছে যখন, তখন বলতে হয়—আজকাল মেয়েদের খেলাধুলোর দিকে নানান উন্নতি হয়েছে।কথাটা মিথ্যে নয়, অথচ আবার এই কথাটাই হলো গিয়ে অনেক ভুল কথার গোড়া। প্রথমত খেলায় উন্নতি হয়েছে এই উপর-উপর বক্তব্যটার মানে কি? মানে এই নয় যে মেয়েরা হঠাৎ পর্দা সরিয়ে খেলার জগতে পা রাখতে শুরু করেছে, সে মুহূর্তটা আমরা শতখানেক বছর আগে পার হয়ে এসেছি এবং পার হয়ে চলেছি, নতুন কিছু নয়। নতুন হলো,আমরা‘মিডিয়া’য় মেয়েদের খেলার, মেডেল পাওয়ার ছবি দেখতে পাচ্ছি। তার সারার্থ হচ্ছে মেয়েদের খেলার ব্যাপারে লোকের ‘অর্থনৈতিক উৎসাহ’ বাড়ছে, অর্থাৎ কিনা ব্যাবসায়ী মানুষজন পয়সা খরচা করে তাতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। মানে দাঁড়ালো এই যে, মেয়েদের খেলার ভালো কাটতি হচ্ছে বাজারে। সে বাজার কিন্তু শুধু খেলাধুলোর খেলুড়ি, দর্শক, প্রযোজকদের নিয়েই তৈরি না। তার সাথে ক্রিম, জাঙিয়া, জুতো, শরীর খারাপের ন্যাকড়া, মোটরগাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে শুরু করে দেশী-বিদেশী রাজনীতি-অর্থনীতির আরেক রকমের খেলার হাজার একটা চাল — সবই রয়েছে। নারীবাদই হোক আর অন্য যে বাদই হোক, তাকে চট করে বাণিজ্যিক করে ফেলতে আমাদের, মিডিয়ার খুব বেশি সময় লাগে না।‘রান্না’ নামের খেলাটিরও আজকের পৃথিবীতে এইরকমের মিডিয়া-দর বিস্তর।

রান্নার সরাসরি অর্থনৈতিক মূল্য (অতএব বিজ্ঞাপনী মূল্য) এবং ভোগগত মূল্য আছে, রান্নাবাটির তেমন নেই। তাই রান্না শ্রম এবং রান্নাবাটি অবসর। প্রথমটিতে মন দিতে হয় তাকে বাজারের কাছে, মিডিয়ার কাছে প্রকাশিতব্য, বিক্রয়যোগ্য করে তুলতে, পরেরটিতে মন আপনি উড়ে এসে বসে, তারপর সে থেকেও যেতে পারে, আবার উড়েও যেতে পারে। যে রান্নাবাটি খেলছে, সে যদি সেই ঝাঁ-চকচকে ‘কুকিং সেট’-এর বাণিজ্যিক ছকেও ঢোকে, তাহলেও সে বড়জোর ক্রেতা, বিক্রেতা নয় সাধারণত— অবসরের নিয়ম এইরকমই।

অথচ ঘরে বসে করা রান্নাকে আমরা — বিশেষত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অনেকসময় অবসরের শখ হিসেবেও দেখে থাকি। ওদিকে খেয়াল করলে কিন্তু শুধুই অবসরযাপন নয়, রান্নাবাটি খেলার ভিতর দিয়ে মেয়েদের পরবর্তী জীবন বিষয়ে শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে, যাকে বলা যায় অনুশীলন বা ‘ট্রেনিং’।যে শ্রমের জোয়াল সামাজিক বিধি অনুযায়ী কয়েক বছরের মধ্যেই কাঁধে তুলে নিতে হবে, বিশেষ করে বিয়ে হওয়ার পরে, যেখানে মূল্যায়নের একটি ‘স্বাভাবিক’ মাপকাঠিই এই বিশেষ শ্রম এবং তাতে ওজর আপত্তি বিহীন নির্বিঘ্ন পারদর্শিতা, তার সাথে খেলাচ্ছলে আলাপ-পরিচয়। আজকালকার মেয়েদের জীবনে, আমাদের মতো মেয়েদের জীবনে, ছবিটা নিশ্চয়ই অনেক পাল্টে গেছে। কিন্তু তা সত্বেও রান্নাবাটি খেলার মধ্যেকার এই সাংস্কৃতিক অন্তঃসারটুকু রয়ে গেছে — রয়ে গেছে মেয়েদের একটা সাংসারিক অনুশীলনে অভ্যস্ত করে তুলবার সামাজিক প্রয়োজনীয়তা।আমাদের সামাজিক নিয়মবিধিতে এটি এতই গভীর একটি অনুশীলন, যে শুধু ছোটোবেলার খেলার মধ্যে দিয়ে নয়, মেয়েদের বড় হয়ে ওঠার, বিকশিত হওয়ার প্রতিটি ধাপে এর ছবি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মেয়েদের নানান চাকরির ট্রেনিং-এও নানাভাবে রয়েছে এর প্রতিচ্ছবি।ফ্যাক্টরিতে শপফ্লোরের কড়া ছকে বাঁধা, প্রায় মগজহীন, গতানুগতিক গোছাগুছির কাজ থেকে শুরু করে উঁচুতলায় ম্যানেজারির কাজ (যেটাও আসলে গোছাগুছিই) — এসবই ‘মেয়েরা ভালো করতে পারে’ — এইরকমের একটা ধারণা খুবই প্রচলিত। সংসার মেয়েদের এইরকম কাজের জন্য তৈরি করে, আবার এইধরণের কাজগুলিও যেন সন্তর্পণে, চক্রাকারে, মেয়েদের ওই সংসারের জন্যই তৈরি করতে থাকে নিঃশব্দে। আজকের ভারতে শ্রম-বাজারে মেয়েকর্মচারীর চাকরি বলতে এই ধরণের কাজই আগে বোঝায়। কিন্তু সেই প্রত্যক্ষ বাজারে ব্যাপক অসাম্য থাকলেও, অন্তত গোদাভাবে শ্রমের একধরণের একটা সরলীকৃত অর্থমূল্য নির্ধারণ-পদ্ধতি আছে, ঘরের রান্নায় যা নেই।

ঘরের রান্নার অর্থমূল্য ঠিক কিভাবে ধার্য হয়? যতোক্ষণ রান্না ব্যাপারটা একটা আদর্শ সাংসারিক বার্টার সিস্টেমের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকছে, ততক্ষণ আপাতভাবে কোনো সমস্যা নেই। বাড়ির একাংশের মানুষ এক ধরণের কাজ করে খাদ্য সংগ্রহ করে আনছেন, আরেক অংশের মানুষ আরেক ধরণের যোগাড়যন্ত্র করে সেই সমস্ত খাদ্যকে খাবার যোগ্য করে তুলছেন — কেউ কারুর চাইতে ছোটো নন, বাজারের ভূমিকা থাকলেও সরাসরি হস্তক্ষেপ নেই। কিন্তু সেই জাতীয় ‘আদর্শ’ জীবন — যার কথা এঙ্গেলস বলেছেন ‘অরিজিন অফ ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড দা স্টেট’-এ — সে যদি কখনো থেকেও থাকে, আমরা তার থেকে কয়েক হাজার বছর হলো সরে এসেছি। অ্যানজেলা ডেভিস এই অপেক্ষাকৃত লিঙ্গহীন শ্রম-বিভাজনের ছায়া দেখেছিলেন মাসাই উপজাতির মধ্যে, কিন্তু এই একই পৃথিবীতে বসবাস করেও, এইজাতীয় উপজাতিক জীবনযাত্রা থেকেও তো আমরা আসলে ওই কয়েক হাজার বছরেরই দূরত্বে রয়েছি। এই কারণেই রান্না কি ধরণের ‘কাজ’, তাতে শ্রমের ভাগ বেশি, না অবসরের সার বস্তু বেশি — এমন কি শ্রম এবং অবসর-এর এই বিভাজনটাই আমাদের এই ভোগবাদী, পুঁজিবাদী পৃথিবীতে জটিল।

জটিল, কারণ আমরা অবসর ভরিয়ে তুলতে চাই সামগ্রিক বিশ্রাম দিয়ে নয়, বরং ‘সার্থক’ খেলা বা শিল্প দিয়ে, যা আবার সার্থকতার সন্ধানে, অর্থাৎ বাজারি কারণে ক্রমবর্ধমান ভাবে তার খেলা-খেলা ভাবটি হারিয়ে ফেলছে, পুঁজিসন্ধানী হয়ে উঠছে। অর্থাৎ আমরা অবসর ভরে তুলি এক বিকল্প শ্রম দিয়ে, যার মূল্য আমাদের মূল অর্থকরী শ্রমের চাইতে কম বা বেশি দুই-ই হতে পারে। অথচ এই বিকল্প শ্রমকে আমরা খেলা বা শিল্প নামে ডাকি — প্রায় অজুহাতের মতো। স্টক মার্কেটে শেয়ার কেনাবেচাকেও তো লোকে ফাটকা খেলা বলে…

(শ্রম, অবসর, মূল্য, বাজার)

অবসর নিয়ে ‘তখনকার দিনে’ বোধহয় মানুষকে অতো মাথা খাটাতে হতো না।আমাদের বর্তমান চিন্তাধারায় যাকে ‘অবসর’ বা ‘শখ’ বলে দেখা হয়, তার অনেক কিছুই মাত্র এক-দু শতক আগেও ছিলো ‘অবশ্য প্রয়োজনীয় শ্রম’ — বা সোজা বাংলায় বলতে গেলে কাজ, যা সরাসরি রোজকার জীবনধারণের সহায়ক, যা করাটা জীবনের অঙ্গ, যার ভালোমন্দ হয় না, যা করতেই হয়, যা না করলে বেঁচে থাকার কোনো মানে দাঁড়ায় না। ফলে দিনের মধ্যেনিয়মকরে অলস অবসরের দাবি — এই ধারণাটাই তখন খানিক অচেনা ছিলো। এই কথাটিই কাঞ্চা ইলাইয়া ‘হোয়াই আয়াম নট এ হিন্দু’-তে লিখেছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশে উঁচু (ভোগবাদী) ও নীচু (শ্রমবাদী) জাতের মানুষদের ‘শ্রম’-এর ধারণা প্রসঙ্গে। অর্থনীতিবিদ শিরীষা নাইডুর গবেষণাতেওএই একই কথা উঠে আসে, সাথে আরও কিছু প্রশ্ন নিয়ে। ফিল্ডের কাজে মধ্যভারতে গিয়ে সেখানকার এক গ্রামের পুনর্বাসিত মানুষজনকে দেখে এইসব প্রশ্ন আসে ওঁর মনে।এক পশু সংরক্ষণ অরণ্যের কাছে সেই গ্রাম ছিলো, যেখানে ওঁরা চাল ছাওয়া কুঁড়েঘরে থাকতেন। ওঁদের এক প্রতিবেশী গ্রামের বাসিন্দারা তখনও নিজেদের গ্রামেই থাকছিলেন, অর্থাৎ পুনর্বাসিত হননি তখনও, আর সেখানেই শিরীষা প্রথম যান। বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার ওঁদের। গোটা দিনটাই ‘শ্রম’-জাতীয় কাজে ভর্তি। আধুনিক জগতথেকে — বিশেষত ওই অঞ্চলের বড় রাস্তাটা থেকে দূরে বসবাস করার ব্যাপারে ওঁদের বেশ সুখীই মনে হয়। এরপর শিরীষা সেই অন্য প্রতিবেশী গ্রামটির মানুষজনের সাথেও দেখা করেন, যাঁদের কোনো কারণে ওই বড় রাস্তারই একদম কাছে পুনর্বাসিত করা হয়েছিলো। তাঁরা সেখানে পাকা বাড়িতে থাকছিলেন এবং আধুনিক জগতের নানান সুবিধা পাচ্ছিলেন। তবু পুনর্বাসনের নানা সমস্যা ছাড়াও তাঁদের মূল অসুবিধার জায়গাটা ছিলো এই যে, তাঁরা ঘরের চাল ছাইতে পারছিলেন না। এই চাল ছাওয়া একটি শ্রমসাধ্য কাজ। ঠিক ধরণের পাতা খুঁজে বার করতে হয়, প্রতি দুমাসে ওই চাল সারাতেও হয়।শিরীষা লেখেন—

“এটাকে আমি শ্রম বলবো। কিন্তু তাঁরা এই কাজের ভিতরে সুখ দেখতে পান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে খেটেখুটে তাঁরা ওই পাতা খুঁজতে আর চাল ছাইতে চান।

শিল্প আর সৃজনশীলতা কাকে বলে, আর প্রতিদিনের কাজকর্মে তার ভূমিকা কি? পশ্চিম ভারতে মহিলারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাঁদের বাড়ি সাজান। এঁদের অর্থনৈতিক সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এইরকম কিছু কিছু কাজকে ‘শিল্প’ হিসেবে ভারতের উচ্চবিত্ত পরিবারগুলিতে এবং বিদেশেও উঁচু দামে বিক্রি করা হয়। এর দুর্ভাগ্যজনক ফল হয়েছে এই, যে এই কাজটি এখন একটি অর্থকরী কাজমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রতিদিনকার জীবনের একটি অঙ্গ না থেকে।”

আসলে শ্রম, অবসর, শিল্প, খেলা — তাদের কর্তা ও কর্মবিচার — এই সমস্ত কিছুর সীমান্ত রেখাগুলি খুবই হালকা আঁচড়ের মতো — প্রায় বিভ্রম সৃষ্টিকারী এক-একটি ধারণা, যা প্রতি মুহূর্তে ভোগ ও যাপন — এই দুই পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রান্নাও তার চাইতে আলাদা নয়। তার উপর রন্ধন — এই বিশেষ শ্রমটি সরাসরি পুঁজি আরভোগের সাথে যুক্ত। ফলে খাদ্যবস্তুর ‘বস্তুত্ব’ এই বিশেষ শ্রমটিকে একটি যাপন হিসেবে না দেখে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখাতে শুরু করে। গতানুগতিকতা-দোষে জর্জর ‘গৃহকর্ম’ বা ‘গৃহশ্রমে’র ভিতর তাই রান্নাকেই আমরা রাজার আসন দিয়ে দেখি। তা নয়তো টিউকল থেকে কোমরে চোট না লাগিয়ে কতোরকম ভাবে জল ভরা যায়, কিম্বা বাসন মাজার দ্রুততম পাঁচটি পদ্ধতি এই নিয়ে কফি টেবিল বই ছেড়েই দেওয়া যায়, মায় লিটল ম্যাগাজিন মেলায় চটি বইই কি আজ আর কেউ লিখবেন, নাকি কিনবেন?

আজকের পুঁজিবাদী সমাজে পাশ পাওয়ার সুবাদে রান্না একটি পুরোদস্তুর প্রতি্যোগিতামূলক ক্ষেত্র। যদি হোটেল-রেস্টুরেন্টের বড় বড় কথা বাদও দিই, শুধুমাত্র আমাদের গার্হস্থ্য-সার্ক্লেই বীরচন্দ্র রাজা ভানুমতীর হাতের চিতলমাছের মুইঠ্যা খেলেন, নাকি করেণুমতীর হাতের গাছপাঁঠা — সেই ইঁদুরদৌড়, কিম্বা ভাঁড়ারের চাবি নিয়ে শাশুড়ি-বউয়ের ঝগড়া বা চায়ে চিনির পরিমাণ নিয়ে কাজের মাসির সাথে বাড়ির গিন্নীর তর্কাতর্কি থেকে শুরু করে ‘রোজগেরে গিন্নী’তে কার মুখ দেখা যাবে, আর কার যাবে না, সেই অব্দি নানান সূক্ষ্ম-স্থূল কচকচির জায়গা হয়ে উঠেছে রান্না — যা কিনা আবার শ্রম না শিল্প না অবসর নাকি খেলা, তা বুঝে ওঠা আরও জটিল হয়ে উঠছে দিনকে-দিন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ আর পুঁজিবাদী-ভোগবাদীবাজারের চাপিয়ে দেওয়া প্রতিযোগিতা মেয়েদের মনে ওইসব অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি করতে আর তাতে ঘি ঢালতে থাকে। সেই একই মন, ফোড়নের বদলে যা আমার দিদিকে সেই ভদ্রমহিলা রান্নায় নিবেশিত করতে উপদেশ দিয়েছিলেন।

মনের মূল্য কি? মন কখন দেওয়া যায়? পেটে খিদে থাকলে, মাথার উপর চাল না থাকলে, সাধারণভাবে মাথায় যদি সর্বক্ষণ অর্থচিন্তা বা স্বাস্থ্যচিন্তা ঘুরতে থাকে, তাহলে মন দেওয়া যায় না, বা অন্তত যার নেই, তার কাছে মন দাবি করা যায় না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে রান্নায় মন দেওয়ার সুযোগ কাদের থাকে? এবং যখন রান্নায় কথাবলছি — সে যদি শুধুমাত্র বাড়ির রান্নাই হয়, তখনও সেটা কোন ধরণের রান্না? ভাত-ডাল-আলুসিদ্ধ-মাছ, নাকি কোনোক্রমে নাকেমুখে গোঁজা পাউরুটি-ডিম-ম্যাগি-চা, নাকি পালপার্বণের কড়াইশুঁটির শিঙাড়া-মাংসের কচুরি-ভাপা দই-আমের মালপোয়া, নাকি আবার শখের মাথা খাটানো বিয়ার দিয়ে চিকেন কারি কিম্বা চাউমিন ভরা চিনির রস মাখানো অমলেট, নাকি আবার স্বাস্থ্যসচেতন মিলেট, শাকসিদ্ধ, স্যালাড, নাকি পোকা ধরা চাল আর পড়তি বাজারের কচুঘেঁচু কষে ফুটিয়ে পোকা তাড়িয়ে খাওয়া? এই এক-এক ধরণের রান্নার মূল্য কি এক-এক রকম? আবার আমি যদি আমার নিজের জন্য রাঁধি, কিম্বা আমার ছোট পরিবারের জন্য রাঁধি, বা রাঁধি এক বৃহত্তর পরিবারের জন্য, বা কোনো লঙ্গরখানায়, কিম্বা একটা চাকরি হিসেবে রাঁধি ওই একই রান্না কারুর বাড়ি রান্নার মাসি হয়ে বা দাদাঠাকুরের মেসে বা পাঁচতারা হোটেলে — তাহলে তার মূল্য কিভাবে পাল্টে পাল্টে যায়? আবার একজন মানুষ, যার মন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের দিক থেকে, বাজারের দাবি পূরণের জন্য সৃজনের দিক থেকে, অবসরের শখ মেটাবার জন্য খেলার দিক থেকে প্রায় একই সাথে খাটছে, ‘রান্নায় মন লাগে’ — এই কথাটার যার কাছে আর খুব একটা মানে নেই, তার কাছে রান্নার মূল্য এবং সমাজের কাছে তার রান্নার মূল্য — এর ফারাক বিরাট।নিজের, আর কাছ থেকে দেখা কিছু মানুষের ছায়া ধরে কথাটা বলছি বটে, কিন্তু এ তো বিশেষ একজন মানুষের বিষয়ে কথা নয় — এটি এই সময়ের এই সামাজিক শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য — সেই শ্রেণী আবার লিঙ্গায়িত।

যাই হোক, এই আলোচনায় মূল্য কথাটা নানাভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু আপাতত ধরে নেওয়া যাক আমরা বলছি নিছক অর্থকরী শ্রমমূল্যের কথা। অথচ শুনতে নিছক হলেও এই আলোচনায় পৌঁছনো কঠিন, বিশেষত যখন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজিবাদী-পিতৃতান্ত্রিক নীতিগুলো সবসময় চেষ্টা করে চলেছে, যাতে আমাদের ‘মন’ওদিক পানে না যায়! রান্নার ‘মূল্য’ স্থির করা বেশ গোলমেলে ব্যাপার। ধরা যাক একটি পরিবারে সপ্তাহে সাত দিন কি কি রান্না হবে — আমি বাড়ির গিন্নী হিসেবে সেই ভাবনাচিন্তাটা করতে পারি, অথচ হয়তো আমি সত্যি রান্নাটা করলাম না, তার জন্য আমার বাড়িতে রান্নার একজন ‘লোক’ রয়েছেন,যিনি শুধু নির্দেশ পালন করে যাবেন। সেক্ষেত্রে আমি হয়তো তাঁর সম্ভাব্য কর্মক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করছি না।এবার আমি যদি মনে করি, আমার কাজের এতো চাপ যে দৈনিক রান্না বিষয়ক ওই চিন্তা আমার পক্ষে করা সম্ভব নয় এবং আমি তার ভারটা সেই ‘লোকে’র হাতে ছেড়ে দিলাম। তবে কি এবার ‘প্ল্যানিং’-বাবদ আমি তাঁকে আগের চাইতে বেশি মূল্য দিতে শুরু করবো? বাজারে কাজের বিভাজন এবং মূল্যকরণের পদ্ধতি অনুযায়ী তাই করা উচিত। কিন্তু আমরা কি তাই করে থাকি।উপরন্তু আমি হয়তো এই ‘চিন্তা’র দায়িত্ব তাঁর উপর পুরোপুরি ছাড়লাম না, এক-একদিন হঠাৎ আকস্মিকভাবেই (খুব সম্ভবত আমার মেজাজ অনুযায়ী) আমার নিজস্ব (বিপরীত) ধ্যানধারণা-মতো তাঁর চিন্তা পদ্ধতির বিচার শুরু করলাম — এক্ষেত্রে আমি আমাদের সামাজিক অবস্থানের তারতম্য, রান্নার এই কাজটির কোনো বাঁধাধরা ‘কনট্র্যাক্ট’ না থাকা এবং তাঁরও আমার মধ্যেকার যে অর্থনৈতিক অবস্থানের নিম্নমুখী ঢাল, তার সুযোগ নিলাম। অসংগঠিত বা ‘আনঅরগ্যানাইজড’ শ্রমের ক্ষেত্রে এই জাতীয় সমস্যা প্রায়ই উঠে আসে।

ওদিকে আবার এই একই জিনিস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঘটে থাকে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর ভিতরে, যেখানে স্বামী, যিনি কোনো কোনো সময়ে রান্না করতেও সক্ষম (কিন্তু পালপার্বণে ছাড়া করেন না) এবং হয়তো বাজার করতে দক্ষ। তিনি কিম্বা তাঁদের সন্তানরাও এই ধরণের বিচারকের ভূমিকা নিয়ে থাকেন, বিশেষত যদি রাঁধুনির ভূমিকায় থাকা স্ত্রী গৃহবধূ হন। স্বামী-সন্তানরা বিচার করার অধিকার কাঁধে তুলে নেন এই ধারণা থেকে, যে বাড়ি বসে রান্নার কাজ বাইরে বেরিয়ে টাকা রোজগারের চাইতে ‘সহজ’! আসলে এক-আধ দিন শখে রান্না করা একজন মানুষ এ কথা বলতেই পারেন যে রান্নার কাজ সহজ, কিন্তু ওই একই কাজ যখন দিনের পর দিন বা বছরের পর বছর একজন মানুষ করে যান, তাঁর দিনের একটি বড় অংশ যদি যায় ওই বিশেষ কাজের পিছনে বা মূল কাজটির চারদিকে যে আরও অন্তত আরও দশটা বিষয় জড়িয়ে থাকে, তাই নিয়ে ভাবনাচিন্তায়, তখন সেটা পুরোদস্তুর শ্রমের পর্যায়ে গিয়ে পড়ে, এবং তার মূল্য নির্ধারণের প্রয়োজন ওঠে। অথচ এই যে মূল্য — এ বিষয়ে কি আমরা রোজকার জীবনে (যে জীবনে আজকালকার দিনে লিঙ্গবিষয়ক নানা প্রশ্ন উঠে আসে প্রায়ই) আজও যথেষ্ট আলোচনা বা চিন্তাভাবনা করে থাকি? রান্না কিভাবে শুধু লিঙ্গ নয়,এক-একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণীর পরিচয় ও নানান আন্তঃসম্পর্কও সংজ্ঞায়িত করতে পারে, কিভাবে অনেক সময় এই সংজ্ঞায়ন ব্যবহার করা হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক মুনাফার স্বার্থে — উভয় লিঙ্গেই — এ সব নিয়ে প্রায়ই আমাদের চিন্তার জায়গায় একটা খামতি থেকে যায়।

আসলে রান্না জিনিসটা যেমন সরাসরি একটি ভোগ্যবস্তু — ফলে ভোগবাদী রাজনীতি প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই আবার রান্না এবং খাদ্য আমাদের ন্যূনতম জীবনধারণের একটি অঙ্গও তো বটে? এক-একটি জনগোষ্ঠীর (একজন মানুষ/ একটি পরিবার/ বাসস্থান বা কর্মস্থান ভিত্তিক একটিগোষ্ঠী) জন্য রান্না কাউকে না কাউকে করতেই হবে — ঘটনাচক্রে তিনি গৃহবধূ হতে পারেন, বা গৃহকর্তা, অলস চাকুরিজীবী, ব্যস্ত ব্যবসায়ী বা পরমুখাপেক্ষী ‘বেকার’, হোটেলের রাঁধুনি বা ঠিকে রান্নার লোক। রান্না নামক শ্রমটির সঙ্গে আমাদের জীবনধারণের মূল স্রোতের এই অতি নৈকট্য হয়তো আমাদের রান্নার রাজনীতি নিয়ে ভাবতে খানিকটা অনুৎসাহী করে।

অনুৎসাহ কাটিয়ে গৃহবধূর রোজকার রান্নার মূল্যায়ন প্রসঙ্গটিতে ফিরে আসা যাক। ধরে নিলাম আমরা শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদের রান্নার অর্থমূল্য কেমন হতে পারে, তাইই বিবেচনা করছি? আমি যদি গৃহবধূ হই, এবং পারিবারিক রান্নার দায়িত্বে থাকি, তাহলে আমার নিজের শ্রমের আর্থিক মূল্য ধার্য করার সবচাইতে সহজ পদ্ধতি হবে আমার পরিবারের (স্বামী অথবা/এবং কর্মক্ষম পুত্র-কন্যা) কাছে এই মূল্য দাবি করা। তারপরে আসতে পারে সরকারি ‘সহযোগিতা’র প্রশ্ন, যেখানে এই ধরণের কাজ—রোজকার রান্না, বাড়ির অন্যান্য কাজ (হয়তো যৌন সম্পর্ককেও) ইত্যাদিকে একরকমের পুরোপুরি সংগঠিত না হলেও ‘সেমি-অরগ্যানাইজড’ সেক্টর বলে ধরার দাবি উঠতে পারে। অথচ রান্না যেহেতু আমাদের জীবনধারণের এবং পারিবারিক আর সামাজিক সম্পর্ক-নির্মাণের সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে, এই ধরণের মূল্যনির্ধারণ তার মূলে আঘাত করবে। বিশেষত যে দৈনন্দিন পিতৃতান্ত্রিক, ভোগবাদী, বস্তুতান্ত্রিক নিয়মে আমরা খানিকটা স্বভাবত, এবং অনেকটাই সামাজিক অভ্যাসবশত অভ্যস্ত, তাকে গুলিয়ে দেবে। যেমন আমরা সাধারণত পুরুষের আয় এবং সেই আয়কে পরিবারের কাজে লাগানোর নিয়মটিকেই ‘ঠিক’ বলে মনে করি; তেমনই মেয়েদের বাড়ির কাজ — বিশেষত রান্নার উপাদান যোগাড় এবং খাবার তৈরিতে পারদর্শিতাকে ‘প্রয়োজনীয় সদগুণ’ বলে মনে করি। এই বাঁধাধরা ধারণা ওই পারিবারিক চিত্রে একটা স্থিতিশীল মূল্যায়ন প্রথা তৈরি করে, যা বার্টার-জাতীয়, কিন্তু ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যথেচ্ছ অসম হয়ে উঠতে পারে, এবং ওঠে। এই অসম স্থিতিশীলতাকে এইধরণের ভাবনা অনেকটাই নাড়িয়ে দেবে,নানান বিরোধ আর প্রতিকূল মনোভাব ইত্যাদির সৃষ্টি করবে।

সত্যি বলতে ছাড়া-ছাড়া ভাবে হলেও এর কাছাকাছি ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। উদাহরণস্বরূপ কোনো কোনো পরিবারের গৃহবধূর চাকরি করতে চাওয়া, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দাবি করা, পরিবারের বাইরে অর্থকরী না হলেও কাজের বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা অর্থাৎ মানসিক, বৌদ্ধিক স্বাধীনতা দাবি করা ইত্যাদি বিষয়ক চূড়ান্ত অশান্তির কথা মনে করা যেতে পারে। রান্না প্রসঙ্গে এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতার বিষয়টি খুবই অদ্ভুত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেহারা নিতে পারে। যেমন বাড়িতে কি রান্না হবে, তার অধিকার নিয়েও পরিবারের মানুষদের ভিতর কঠোর শ্রেণীবিভাগ ও প্রতিযোগিতা থাকে (কয়েক মাস আগে মুক্তি পাওয়া ‘প্রাক্তন’ সিনেমায় ‘সুখী, বুদ্ধিমতী, শ্বশুরবাড়িকে ট্যাঁকে রাখা’ মালিনী চরিত্রটি যেমন বলে, বিয়ের প্রথম পাঁচ বছর রান্না-বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো শাশুড়িকেই নিতে দেওয়া উচিত)। এর উপর সরাসরি অর্থপ্রসঙ্গ উঠলে কি ধরণের গোলমাল উপস্থিত হবে, সেটা আন্দাজ করা কঠিন নয়।

তার উপরে আমাদের বর্তমান অবস্থানে গতানুগতিক বা শারীরিক শ্রমধর্মী কাজকে কম আর্থ-সামাজিক মূল্যের এবং সৃজনশীল ‘মাথার কাজ’কে বেশি আর্থ-সামাজিক মূল্যের বলে ধরা হয়ে থাকে। এই ধারণাটিকেও এই প্রসঙ্গে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে গতানুগতিকতা কোন কাজে নেই? আবারও নায়ার কথিত চাল ছাইবার গল্পটি মনে আসে। শ্রমকে আবশ্যিক হিসেবে দেখা, তার গতানুগতিকতাকে আনন্দের পরিপন্থী হিসেবে না দেখা — এসবের সাথে আবার সেই শ্রম কার জন্য করা হচ্ছে, কি অবস্থায় এবং আবারও, কি মূল্যে— এই প্রশ্নগুলিও ফের ঘুরে ঘুরে আসে। নৃত্যশিল্পী সুজানা লিঙ্কে শরীরের নড়াচড়া নিয়ে বলেছিলেন, প্রকৃত সৃজনশীল সে-ই, যে প্রতিটি গতানুগতিক নড়াচড়াকে প্রতিবার শরীর দিয়ে করে দেখানোর ভিতরে একটা নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারে এবং সেটা দর্শকের কাছেও প্রতিবার নতুন ভাবে পৌঁছে দিতে পারে। ইলাইয়া বা নায়ার ‘শ্রম’ বলতে এই জাতীয় সৃজনশীল শ্রমের কথা বলেছিলেন বলে মনে হয়, যার ধারণাটি উচ্চ/মধ্যবিত্ত শারীরিক শ্রমবিমুখী সমাজে আমরা হয়তো বুঝে উঠতে পারি না। কিন্তু মনে হয় যে, ওই মাপের সৃজনশীলতার প্রকাশের জন্য ওই বিশেষ শ্রমটিকে যেভাবে আপন করে নেওয়া প্রয়োজন, আমাদের এই সমাজের মানুষের সে ক্ষমতা নেই; যেটুকু বা ছিলো, তা ক্রমহ্রাসমান। যেমন রান্নাবিষয়ক সৃজনশীলতাকে আমরা বাজারমুখী নয়া-উদারনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, দেখনদারিতে বেঁধেছি।

উদাহরণ — আমাদের রোজকার শহুরে সামাজিক জীবনে উচ্চ/মধ্যবিত্ত বাড়িতে রান্না হয়ে উঠছে মহিলাদের (পুরুষদেরও হয়তো, কিন্তু তার গল্প আলাদা) অবসরের একটি শখ — এবং বেশ দামী একটি শখ। ‘রোজগেরে গিন্নী’, ‘রান্নাঘর’-এর মতো টিভি-অনুষ্ঠান বা ‘হ্যাংলা’ পত্রিকার মতো ক্ষেত্রসৌন্দর্যবোধের নামে, ফাটাফাটি সাজগোজ করা, স্বাদেগন্ধে অতুলনীয় ‘মাল্টিকুইজিন’ প্রস্তুতকারিণীকে ঝাঁ-চকচকে পাঁচতারা শেফদের পাশাপাশি একটি চালচিত্রে গাঁথা ছবি করে রাখছে। এই শখ নিয়ে বিজ্ঞাপনী আহ্লাদীপনা এবং তার ভোগবাদী চিত্রায়নের ভিতর ঘরের রান্নার শ্রম-মূল্যায়নের ব্যাপারে কোনো নতুন পথনির্দেশ নেই। রান্নাকে বৃহত্তর বিশ্বায়িত বাজারি মূল্য দেওয়ার দাবি করে বটে এই ক্ষেত্রগুলি। কিন্তুতার রাজনীতি, বা তার ভিতরকার আসল অর্থনীতিও স্বভাবতই সযত্নে লুকোনো। এই ক্ষেত্রগুলিতে রন্ধনকারিণী মহিলার এবং তাঁর রান্নার পারদর্শিতার পিছনে কোনো ইতিহাস বা ভবিষ্যৎ নেই, শ্রেণী নেই, জাত নেই, জাতি নেই। লিঙ্গ আছে, যে ইনি নারী, কিন্তু তার অর্থ হচ্ছে ইনি একজন চিরাচরিত রাঁধুনি, যাঁর ‘স্কিল’ ঝলমলে সাজানো গোছানো উচ্চ/মধ্যবিত্ত রান্নাঘরে হাসি-হাসি মুখে স্বাদু, সুন্দর সব খাদ্য তৈরি করা। সেই রান্নাঘরটির বাইরে ওই ‘গিন্নী’র প্রায় কোনো জীবন নেই, এমনকি ওই রান্নাঘরের বাইরে কোনো পৃথিবীই নেই, যেমন নেই ওইসব স্বাদু, সুন্দর খাদ্যের উপাদানের কোনো মূল্য।এইভাবে হয়তো ওই একটি ‘এপিসোডে’ রান্নার গতানুগতিকতাকে জয় করে নেওয়া গেলো, কিন্তু ওই বুদ্বুদটির বাইরের ছবিটি একচুলও পাল্টালো না।

(রান্না, রান্নাবাটি, খেলা, সংসার)

গতানুগতিকতাকে দূর করা যায়, যখন একটি কাজে নিজের সৃজনশীল বিকাশ হচ্ছে — এইরকম অনুভূতি হয়, কিম্বা যখন সেই কাজ একটি যৌথ কাজ, যৌথ বিকাশের, আন্তঃসম্পর্কগঠনের সিঁড়ির ধাপ হয়ে ওঠে। অথচ সেই বিকাশের উপর যদি চাপিয়ে দেওয়া হয় বাজারি মূল্যায়ন, সেই যৌথতার উপর যদি চাপিয়ে দেওয়া হয় সামাজিক-অর্থনৈতিকনিয়ম আর চাহিদা, তখন অবস্থা জটিল, অসম, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

আগের শতাব্দী পর্যন্তও শহরে উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিতে ব্যাপকভাবে একান্নবর্তী বসবাসের চল ছিলো। সেইসব পরিবারে রান্নার উপর ভর করে মেয়েমহলে একটি পরিষ্কার শ্রেণীবিভাগ ছিল।যেমন সাধারণত বাড়ির সরকার বা কোনো পুরুষ কর্মচারী বাজারের খরচাপাতি বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেবেন। তারপর সবচাইতে প্রভাবশালী পুরুষ বা জ্যেষ্ঠতম পুরুষের স্ত্রী, বা জ্যেষ্ঠতমা স্ত্রীলোক রান্না বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেবেন, তারপর ক্রমশ পদাবনতির (বা কখনও কখনও সমান্তরাল পদবিন্যাসের) সাথে সাথে রান্নার বিশেষ বিশেষ পদ তৈরির ভার, তরকারি কাটার ভার, রান্নাঘর ধোয়ামোছার কাজ এইভাবে বাকি মেয়েদের উপর ন্যাস্ত হবে।এর পরিচয় আগের দুই শতকের নানান লেখাতে পাওয়া যায়।যেমন উনিশ শতকের শেষের দিকের বর্ণনা স্যার আশুতোষ রায়ের বোন প্রসন্নময়ী দেবীর আত্মজীবনীতে —

“…তখন গৃহিণীরা ও বধূগণ দৈনিক গৃহকার্যে ব্যাপৃত থাকিতেন। আমাদের গ্রামে ভাঁড়ার বাহিরে ভাণ্ডারির হাতে গোলায় থাকার নিয়ম। সেই সকালে আসিয়া লোক গণিয়া সকল দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহ করিত। তরকারী, পিসিমা তারা কুটিয়া দিতেন, দাসীগণ রন্ধনশালার কার্য করিত। সেকালে বেতনভোগী পাচক ব্রাহ্মণের হস্তে কর্তারা আহার করিতেন না।যত বড়ই ধনী জমিদারগৃহিণী হউক না কেন, তাঁহাকে স্বামী পুত্র আত্মীয় স্বজনের জন্য দুই বেলা রন্ধন করিতে হইত। বিবাহিতা কন্যাগণ পিত্রালয়ে থাকাকালীন পিতা-পিতামহদিগকে পরিবেশন করিত। তখন কুটুম্ব ছাড়া গৃহই ছিল না। প্রত্যহ দেবসেবা, বারমেসে তেরো পার্বণ, ব্রত, নিয়ম, ব্রাহ্মণভোজন লাগিয়াই থাকিত। ঠাকুর ভোগ বিধবারা রাঁধিতেন”।

এই শ্রেণীবিভাগ বাইরের ‘পুরুষ জগতের’ নিয়মের মতোই মূলত সামন্ততান্ত্রিক এবং ধনতান্ত্রিক ছিলো। ক্ষমতা, অর্থ ও জাত-ভেদের দ্বারা প্রভাবিত। তার উপর ছিলো (আজও অনেক পরিবারেই রয়েছে) নানান সংস্কারমূলক সামাজিক শাসন বিধি, যেমন মাসিক চক্রের সময় রান্নাঘরে ঢোকা যাবে না, কিম্বা আমিষ তরকারির পাত্রে নিরামিষ তরকারি করা যাবে না, তার সাথে এঁটোকাঁটা-ছোঁয়াছুঁয়ির হাজার একটা নিয়ম আর তার নিজস্ব নানা শাস্তিবিধান। কিন্তু এসব সত্বেও একই সাথেছিলো এক যৌথতা — পিতৃতন্ত্র-ধনতন্ত্রকে ফাঁকি দেওয়া এক ‘নারী-ক্ষেত্র’, তার নিজস্ব ‘ইকোসিস্টেম’ — কাজের ফাঁকে ফাঁকে মহিলামহলের একাধিক শ্রেণীর মধ্যেকার অভিস্রাবণ, এবং তার ভিতর দিয়ে কাজের গতানুগতিকতাকে ভুলে থাকা। তার সাথে ছিলো গৃহবধূদের নানান ফেরিওয়ালী, বা ‘কাজের মেয়ে’দের সাথে গল্পকথার ছলে সামাজিকতা — এমনকি সুখদুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়ারও এক বৃহত্তর ক্ষেত্র, যা কখনোই কাউকে সমানাধিকার দিতো না, কিন্তু একধরণের সমান্তরাল সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতো। রান্নাঘরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেমন শ্রম ছিলো, তেমন অবসরও ছিলো, কিন্তু কিছুই প্রায় অধিকার হিসেবে নিয়মে বাঁধা ছিলো না, ফলে তাকে চাইলেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ অস্বীকার করতে পারতো। উল্টোদিকে মেয়েরা নিজেরাও ইচ্ছে ও ক্ষমতামতো এই অলিখিত অধিকারগুলিকে (শ্রমের অধিকার, শ্রমের ‘মূল্য’র অধিকার, অবসরের বা ছুটির অধিকার, অধিকার থাকবার অধিকার…) জারি বা লঙ্ঘন করতেন (বর্তমান যৌথতাবিমুখ উচ্চ/মধ্যবিত্ত সমাজেঅবশ্য এই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে)। তবে এই জাতীয় ‘সিস্টেম’-এর মধ্যে হঠাৎ সরাসরি রান্নার অর্থমূল্যায়ন জারি করলে অবস্থা কি দাঁড়াতো সেটা বলা কঠিন। গৃহবধূ এবং গৃহকর্মিণী যদি কোনো পরিবারে সরাসরি ‘সহকর্মিণী’ হয়ে দাঁড়াতেন, তাহলে তাঁদের ভিতর প্রতিযোগিতা বাড়তো, নাকি মালিক(মাইনেদাতা গৃহকর্তা)-এর বিরুদ্ধে এককাট্টা হবার পথ আবেগহীন এবং সহজতর হতো তা বেশ একটা দেখবার মতো বিষয়!

যেকোনো আর্থ-সামাজিক সিস্টেমে মানুষের সৃজনশীলতা ও শ্রমের মূল্যবিচারের সাথে সাথে পারদর্শিতা বা ‘স্কিল’ প্রসঙ্গটি চলে আসে। আমরা পারদর্শিতার জন্য অর্থ ব্যায় করতে রাজি থাকি, একটি কাজ কতো যন্ত্রণাদায়ক-ভাবে গতানুগতিক, তার জন্য নয়। রন্ধনবিদ্যাকে যে শিল্প বলা হয়, তার পিছনে আসল বক্তব্য আসলে এই যে, এটিকে আমরা একটি ‘গুণ’ হিসেবে দেখি, যাতে পারদর্শিতা লাভ করা যায় এবং কেউ পারদর্শী হলে ভোগবাদী অর্থে সমাজের ধনবান শ্রেণীর নানা লাভ হয় — লাভ শুধু ভালো খাবার খাওয়ায় নয়, একে কেন্দ্র করে বাজার গড়ে তোলায়। রান্নাকেন্দ্রিক পারদর্শিতাগুলি মেয়েদের সাংসারিক গুণবিচারেচিরকালই বড় ভূমিকা পালন করতো। কোনো মহিলার হয়তো অন্য নানা দোষ ছিলো — মুখরা, দেমাকী ইত্যাদি, কিন্তু তিনি যদি রান্নায়পারদর্শী হতেন, তাহলে তাঁর এই সমাজে একটা দাম থাকতো, এবং এই সমাজে তাঁর একটা আত্মীকরণও ঘটতো। অপরদিকে রাঁধতে না পারলে যতই গুণ থাক না কেন, মহিলাদের সাংসারিক দাম ততো নয়। জনপ্রিয় গল্প-উপন্যাসে বা বাংলা সিনেমাতেও (অধিকাংশই পুরুষ লেখক/চলচ্চিত্রকারের পছন্দের স্টিরিওটাইপ) যেমন দেখা যায়, দস্যি/মূর্খ ছোটবৌকে স্নেহময়ী বড় ভাজ রান্না শেখাচ্ছেন বিরূপ স্বামী-ভাশুরকে মুগ্ধ করার জন্য, বা সম্পর্কবিমুখননদ-বৌদি বা শাশুড়ি-বৌ রন্ধনশিক্ষার মধ্যে দিয়ে একধরণের একটা সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। এমনকি দ্রৌপদী — যিনি এমনিতেও রূপে-ব্যক্তিত্বে অনন্যা, তাঁকে তাঁর ‘স্কিল’ প্রমাণ করতে হচ্ছে বনবাসে শ’য়ে-শ’য়ে সাধুসন্ন্যাসীর জন্য রান্না করে। কৃষ্ণ শুধু তাঁকে কাপড় পরিয়ে লজ্জানিবারণ করেননি, ‘সূর্যের থালা’ উপহার দিয়ে হাওয়া থেকে অফুরন্ত স্বাদু খাদ্য ‘নির্মাণের’ ক্ষমতা দিয়েছিলেন — তাঁকে একজন গুণবতী গৃহবধূ করে তুলেছিলেন।

অথচ গতানুগতিক, ক্লান্তিকর শ্রম এই গুণবতী গৃহবধূদেরও অবসরের সাথী হতে পারে না। অন্যদিকে সৃজনশীল পারদর্শিতা শখ হয়েমানুষের অবসরকেভরিয়ে রাখতে পারে। পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষের জীবনেই শ্রম ও সৃষ্টির এই মেলবন্ধন ঘটে না।যদি আগের দুই শতাব্দীর মেয়েদের লেখা আত্মজীবনী বা গল্প-উপন্যাস পড়া যায় — বিশেষত যে সময় মেয়েরা সবে লিখতে শুরু করেছেন — তাহলে অনেক জায়গাতেই দেখা যাবে রান্নাবান্না নিয়ে কথা থাকলেও মেয়েরা সৃজনশীলতা, বা শখ, বা আত্মিক উন্নতির পথ হিসেবে বলতে দেখছেন বই পড়া, লেখা, সেলাই করা, ছবি আঁকা, ধর্মকর্ম করা ইত্যাদিকে। রান্না পরিষ্কারভাবেই তাঁদের শ্রমের জায়গা, তাঁকে তাঁরা অবসরে চান না। এর আরও একটা কারণ হলো, তাঁরা তাঁদের চারপাশে ক্ষমতাবান পুরুষদের ওই কাজগুলিকেই মূল্যবান বলে মনে করতে দেখছেন। এবং প্রচ্ছন্নভাবে হলেও তাঁরা জানেন যে তাঁদের স্ব-মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, ওইসব ক্ষেত্রেও তাঁদের বোধশক্তি, সৃজনশক্তি এবং পারদর্শিতা তৈরি করা প্রয়োজন। আবার বামপন্থী আন্দোলনগুলির ইতিহাসের ভিতর উঠে এসেছে এর সমান্তরাল ছবি, যেখানে আন্দোলন চলাকালীনও মেয়েদের অকথিত দায়িত্ব থেকে যেতো রান্নাবান্না, শিবিরের সাংসারিক দিকগুলি সামলানো, কিম্বা অমুক ফ্যাক্টরির মহিলাদের ইউনিয়নে, আন্দোলনে সামিল হওয়ার ফলে তমুক ফ্যাক্টরিতে কাজ করা তাঁদের স্বামীদের অসন্তোষ, অথচ যদিও সেই স্বামীরাও ওই সংগঠনেরই সদস্য। এইরকম সব বন্দোবস্ত নিয়েই সেই রসিকতা, যে স্বামী বলছেন আমার আর আমার স্ত্রীর মধ্যে সমস্ত ছোটো ছোটো সিদ্ধান্ত ও নেয় — যেমন কি বাজার হবে, কি রান্না হবে আর সব বড় বড় সিদ্ধান্ত আমার, যেমন ইরাকে যুদ্ধ লাগবে কিনা, কিম্বা পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কার হওয়া উচিত ইত্যাদি… এই রসিকতাটিকে দুদিক দিয়ে পড়া যায়। সত্যিই কোনটা ‘বড়’ আর কোনটা ‘ছোটো’ সিদ্ধান্ত তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে যায়।

(শ্রম, অবসর, মূল্য, বাজার)

পুঁজিবাদী-পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিচারে রান্নাকে সাংসারিক বার্টার সিস্টেম বা অবশ্য প্রয়োজনীয় শ্রম বলে দেখা হয় না, যৌথতা নির্মাণের পথ বলেও না, দেখা হয় সাজানো-গোছানো বিক্রয়যোগ্য ছবি হিসেবে।উপরন্তু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিতে আমরা এই বিশেষ শ্রমলব্ধ ফলটিকে (অর্থাৎ রেঁধেবেড়ে দেওয়া খাদ্যকে) ছোটোবেলা থেকেই হয় অর্থপ্রসূত, নয় সামাজিক সম্পর্কপ্রসূত স্বাভাবিক অধিকারবলে ধরে নিতে শিখি। এখনকার সমাজে রোজকার জীবনে ক্রমশ বাড়তে থাকা রেস্টুরেন্ট আর হোম-ডেলিভারি সংস্কৃতি হয়তো এই ভাবনাকে আরোই শক্ত করে তুলছে কারণ সেখানে সমস্ত পদ্ধতিটি আরও বেশি চোখের আড়ালে এবং অসঙ্কোচে বাজারি। এই অসঙ্কোচ বাজারমুখি তাই খাদ্য এবং রন্ধন-উপাদান সরবরাহকারী বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিকে আবার উল্টে খাবারের সাথে যে ঘরোয়াপনার ধারণাটি আমাদের ভিতরে থানা গেড়ে বসে আছে, তার সুযোগ নিতে উৎসাহ দেয়, যার অসংখ্য ছাপ দেখা যায় বিজ্ঞাপনগুলিতে। সব মিলিয়ে এ এক অদ্ভুত গোলচক্কর।

তবে স্বীকার করতেই হবে, এখন বাজারের বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক দিকটিও এতোটাই বিস্তীর্ণ ও জটিল যে এর বিপরীত স্বাদের বহু ছবি উঠে আসছে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে, যেগুলো ক্রমশ সমানভাবে বিক্রয়যোগ্য হয়ে উঠছে। যেমন কঙ্গনা রানাউত অভিনীত একটি ‘গ্রসারি’র হোম-ডেলিভারি ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞাপনটি, যেখানে শহরে মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ে হওয়া, কিন্তু গ্রাম্য উচ্চারণের মেয়ে কঙ্গনা, বেসুরে বেতালে হলেও, বাড়িশুদ্ধু লোককে বসিয়ে রেখে বাইজি-নাচ নাচছেন (‘ব্যস একবার মেরা কহাঁ মান লিziয়ে’) — অর্থাৎ ‘অবসর’-এমন দিতে পারছেন। আর তাঁর যে রান্না সংক্রান্ত বিরক্তিকর কাজ (এক্ষেত্রে মুদির দোকানের জিনিসপত্র বাজার করে ঘরে আনা; বিরক্তিকর যে, সেটা ডেলিভারি-বয় কলিংবেল টিপতে কঙ্গনার অবসর যাপনে বাধা পড়া মুখ বেঁকানো থেকে পরিষ্কার), তার ভার নিয়ে নিচ্ছে ওই বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানিটি। এইধরণের বিজ্ঞাপন নিয়েও হয়তো আবার নানা প্রশ্ন তোলা যায়, এবং এগুলিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে অনেক, কিন্তু নানা অন্যরকমের ভাবনাচিন্তাও উঠে আসছে — এই পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপনের দীর্ঘ জটিল গল্প থাক। কার্যত, ধনকেন্দ্রিক ও ভোগকেন্দ্রিক নিয়মে বাজারের ক্রমশ ঘরে ঢুকে পড়া, অথচ পিতৃতান্ত্রিক নিয়মে ঘরকে (সমাজতান্ত্রিক সুযোগসুবিধা দেওয়ার কথা ছেড়েই দিলাম) ওই বাজারের সুযোগসুবিধাও পেতে না দেওয়া — এই জায়গায় এসে আমরা একরকম ঠেকে আছি। এবং মোটের উপর ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এইরকম যে,সাংসারিক রান্নাকে (যা আমাদের দেশে শুধু নয়, গোটা পৃথিবীতেই আজও মূলত মেয়েরাই করে থাকেন) আর পাঁচটা শ্রমের মতো সহজে শ্রম বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না, আবেগ-অনুভূতি, সামাজিক ঠিক-ভুলের প্রশ্নের পাশাপাশি আবার সৃষ্টির আনন্দ-টানন্দ বিষয়ক নানা প্রশ্ন এসে পড়ে। আবার আর পাঁচটা শিল্পচর্চা বা খেলাধুলোর মতো সৃজনশীলতা হিসেবেও দেখা যায় না, কারণ রোজকার পারিবারিক রান্না আর রান্নার চারপাশে প্রতিদিনকার বাজার করা, মশলা পেষা, তরকারি কাটা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা, বাসন ধোয়া, জিনিসপত্র ফ্রিজে বা মিটসেফে ঢোকানো — এমন হাজার একটা কাজের মধ্যে বা এই সংক্রান্ত হাজার একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া, হিসেবপত্তর রাখার ভিতর সৃষ্টির বা এমনকি ‘খেলা-খেলা’ করার জায়গাও কতোটা তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।

ঠিক শ্রম নয়, ঠিক সৃষ্টি নয়, তাহলে কি রান্না একটি স্বনিযুক্ত ব্যবসা? যেখানে প্রতিটি রাঁধুনি পরিবাররূপ বাজারের হালহকিকত বুঝে নিজের কাজের মূল্য স্থির করেন? এবং ব্যবসার আদত নিয়ম মতোই, এই মূল্যের পুরোটা আর্থিক নয়। নানান খাত রয়েছে। খোলা বাজারে রান্না যে একটি ব্যবসা তাতে সন্দেহ কিছু নেই, কিন্তু গৃহবধূর, বা নিজের জন্য নিজের সাংসারিক রান্নাকেওকিআমরা একটি সফল ব্যবসা হিসেবে তত্ত্বায়িত করতে পারি?

আরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়, যে রান্নাকে আমরা বাজার থেকে একদম টেনে বার করে নিয়ে গিয়ে একটি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দেখতে পারি কিনা। এই মুহূর্তে ভারতের মতো দেশে খাবারের রাজনীতি যখন ভয়াবহ আকার নিয়েছে, তখন এই প্রশ্নের উত্তর স্বভাবতই ইতিবাচক। শুধু বৃহত্তর রাজনীতি নয়, অরন্ধন চিরকালই একদম পারিবারিক পরিধিতে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। ঘরের রান্নার পাশাপাশি রান্নার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্যান্য কাজ, তার অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, আবার সেই কাজগুলির সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষজন — নিজের জীবনের সাথে তাঁদের জীবনকে জড়িয়ে দেখা, সেই দেখাটাকে, আর সেই দেখার পাশাপাশি রান্নাকে তখন একটি যৌথ সৃজন হিসেবে ভাবা — এইভাবে ক্রমশ চিন্তার পরিধি বাড়ালে হয়তো তখন ঘরের রোজকার রান্নাও আর গতানুগতিক অনির্দিষ্ট প্রকৃতির এবং সঙ্কীর্ণ ভোগবাদী অর্থের ‘কাজ’ মাত্র হয়ে থাকে না — আগেও যা একবার বলা হয়েছে। একটু আগ বাড়িয়ে বললে এমনটাও বলা যায়, রান্না হয়তো তখন বরং সত্যিকারের শিল্প হয়ে উঠবে, যা যৌথতামুখী চিন্তার বিকাশ ঘটাবে এবং বাজারের, কিম্বা শুধুই ফল ভোগের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না। এই বিষয়টিকে অন্য পরিসরে আরও বিস্তারিতভাবে দেখা প্রয়োজন।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to রান্না, রান্নাবাটি, খেলা, সংসার / শ্রম, অবসর, মূল্য, বাজার

  1. পিংব্যাকঃ রান্না, রান্নাবাটি, খেলা, সংসার / শ্রম, অবসর, মূল্য, বাজার | parsleys

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s