ব্যাঙ্কসির ছবি: প্রেম ও দ্রোহের নয়া মানবিক ভাষ্য

লিখেছেন সায়ন্তন সেন। 

(এক)

ক্ষোভের কিছু নেই কেননা বিশ্বায়নোত্তর কালে রিফিউজি সবাই, এক অর্থে। কেননা গুহাচিত্রের দিন অপহৃত আমাদের। এমনকি  স্বাধীনতাও– যা আমরা হারিয়েছি সেইদিন থেকেই। রিফিউজি পল গগ্যাও, কেননা তাহিতি দ্বীপের কুটিরে নিজস্ব আলতামিরায় যখন আগুনের বর্ণমালায় তিনি লিখে রাখছিলেন ইতিহাসের অন্তিম স্বাক্ষর– অবিচ্যুয়ারি লেখার জন্য ছিল না কোনো স্তাবক। আর কতটা অসহায় ভাবে বোধহীন এই সময়, শুকনো পাতায় আগুন জ্বেলে নির্বাণের পথে হেঁটে গেলে একজন পল গগ্যা, সেই অভিশপ্ত ছাই ঘেঁটে নিতে শিখি না আমরা।

কাট টু দু’হাজার ষোল।

মহানগরের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল থেকে ছেনি-হাতুড়ির আঘাতে জর্জরিত হতে হতে লোপাট হয়ে গেল এক-একটা গ্রাফিতি, আর অবশিষ্ট রাজপথে পানের পিক্ উদ্রেককারী একজন বুদ্ধিজীবি পেচ্ছাপ করতেও এলেন না। সেদিন চিৎকার করেছিল ছাত্ররা, বাজারের ইনসেনটিভচুম্বিত ছবি-ক্রিটিকদের প্যান্টের চেন খোলা হাটে নামিয়ে দেওয়ার মতো হিংস্র এই নন্দনতত্ত্ব– ‘নাশকতার নন্দনতত্ত্ব’-এর স্বপক্ষে। গ্রাফিতির পক্ষে। যে কবিতা দেওয়ালে লেখা হবে, তাকে বুক দিয়ে আগলানোর দায় অতএব নিতে হবে আমাদেরই। যতদিন অন্তত দেওয়াল আছে, কবিতা আছে, আর ব্যাঙ্কসি আছেন। রিফিউজি আমরা, তবু ব্যাঙ্কসির ডানাওলা প্রেত কখনো না কখনো উড়ে আসে প্রেসিডেন্সির ছাদে, আর প্যান অপটিকানের অন্ধকার কুঠুরিতে তৈরি হয় বিদ্রোহের ছক।

পাঠক, ব্যাঙ্কসির গ্রাফিতির ভুবনে আপনাকে একটি বিব্রত স্বাগত। আমি নাচার, গ্রাফিতির নন্দনতত্ত্ব বা রাজনীতি নিয়ে কথা বলবো বটে, তবে মূলত এই লেখায় ব্যাঙ্কসির চিত্রভাবনার মৌলিকতাগুলোই খুঁজতে চাইবো। তার আগে, এই ডিসক্লেইমার থাক– মৌলিকতা মানে এখানে ওরিজিনালিটি নয়। কোনো সৃজনই ওরিজিনাল নয়, হতে পারে না। বরং, ব্যাঙ্কসির দেওয়াললিখন (আই রিপিট, ‘দেওয়াললিখন’, কোনো কলাকৈবল্যবাদী ধক্ থাকলে এসে কেটে দিয়ে যান) এই অর্থে বিশিষ্ট যে, তা প্রাকৃতজনের আটপৌরে যাপনের সাথে মিশে থাকে– নান্দনিকতার শর্তকে ক্ষুণ্ন না করেই। দেওয়ালের ব্যাকরণকে মেনেই ব্যাঙ্কসি তৈরি করেন এক-একটি মেদুর ক্যানভাস। বিপন্নতা– যা ব্যক্তিগত হয়েও এই পুঁজিপ্রলোভনবাদী সভ্যতায় ভীষণ ভাবেই সার্বজনীন– তার স্পর্ধিত ধারাভাষ্য ব্যাঙ্কসির ছবি। এবং, গ্রাফিতি যদি একটি পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট হয়, যা পরিকল্পিত ভাবেই পথচলতি মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য আয়নার সামনে দাঁড় করাবে, পরখ করবে তার না-মানুষ মুখ আর ছুঁড়ে দেবে টকটকে আক্রোশ, তার অন্যতম সফল কারিগর ব্যাঙ্কসি। কিন্তু ‘কেবল’ সেটুকুই নন।

অতএব, তাঁর গ্রাফিতির মৌলিকতাকে কোথায় কোথায় খুঁজবো আমরা– এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে শবব্যবচ্ছেদ।

তার আগে কিছুটা প্রাক্-কথন প্রয়োজন। প্রয়োজন, কারণ, গ্রাফিতির সাধারণ লক্ষণগুলি থেকে ব্যাঙ্কসি ঠিক কোথায় আলাদা, আমরা খুঁজতে চাইবো। এবং মনে রাখবো, এই পৃথকত্ব কেবল এস্থেটিক্সের বিচারে নয়, কোন বিশেষ ফিলোসফিক্যাল অবস্থানে ব্যাঙ্কসি, তাঁর গ্রাফিতি সিচ্যুয়েট (তর্জমা হলো না) করতে চাইছেন– তাও ভেবে দেখতে হবে।

(দুই)

গ্রাফিতি– যা বাধ্যত ক্যানভাস হিসাবে ব্যবহার করে একটি দেওয়াল বা সরকারী সাইনবোর্ড বা হোর্ডিং, এমনকি যানবাহনও– শিল্প নাকি শিল্প নয়, তা নিয়ে বহু তর্ক ইতোপূর্বে হয়ে গেছে। অনেকেই এর মধ্যে প্রতিবাদী চরিত্র ইত্যাদি খুঁজে পেয়েছেন এবং সামগ্রিক ভাবে একটা সান্ত্বনা পুরস্কারও দিতে সম্মত হয়েছেন। অর্থাত্ কিনা, “আহা, এস্থেটিক্সের বিচারে হলোই বা কিছু খাটো, তবু সমাজের গায়ে টক-টক গন্ধটা কেমন চমৎকার ধরেছে!”– এরকম একটা ফালতু কথা বলা চলছে। এমত তাত্ত্বিকদের জন্য গোড়াতেই একটি সপাট ও দাম্ভিক ঘোষণা থাক– তাজমহলের গোপন ললিত-দেওয়ালে যখন স্বাক্ষর রেখে যান শ্রমিকেরা, রাজানুগ্রহে আঙুল কাটা পড়ার আগেই, যা আবিষ্কৃত হতে পারে বহু শতক পার করে এসে, তখন ভয় হয়, এই বিদ্রোহকে আর কেবল ‘লোকশিক্ষে’-র পরিসরে বেঁধে রাখা যাবে না। এই বিদ্রোহের জাত আলাদা। ‘কাঙাল মালসাট’-এ নবারুণ ভট্টাচার্য ফ্যাতারুদের সৌজন্যে কতকটা অ্যানার্কিক ধাঁচে শুরু করেছিলেন যে চাপা বিদ্রোহ, যেখানে কবি পুরন্দর বলে “প্রাসাদ গাত্রে মুতিয়া ভাঙিব আইন”, তা কেবল জনসচেতনতার পবিত্র ও ছাপোষা  কর্তব্যপালনেই থেমে থাকে না। তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার মুখে একটি উদযাপিত (হ্যাঁ, ‘উদযাপিত’) প্রস্রাব। প্রস্রাব– যা নোঙরা, ঘিনঘিনে, বর্বর। পল গগ্যাকে তাঁর বন্ধু একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাঁর ছবির বর্বরতা নিয়ে। উত্তরে জানিয়েছিলেন গগ্যা, “তোমাদের সভ্যতা আসলে একটা অসুখ, আর আমার ছবির বর্বরতা তার মোক্ষম ওষুধ”। এটা সেই ওষুধ যা শুশ্রূষার বদলি হিসাবে কখনো বিজ্ঞাপিত সমাজ, সভ্যতার দিকে ছুঁড়ে দেয় তপ্ত লাভা ও অ্যাসিড, আবার অন্য-কখনো, আপোসকামী ‘self’-এর দিকেই তা নিক্ষেপ করে। এই বিদ্রোহের চরিত্র-বিশ্লেষণে বিনয় ঘোষের প্রসঙ্গ উথ্থাপিত হতে পারে,– “যন্ত্রবিজ্ঞানের চূড়ান্ত উন্নতির যুগে সমগ্র মানবসমাজ নিশ্চিহ্ন করতে পারে এরকম নিউক্লিয়ার মারণাস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নির্যাতিত মানুষ নিরস্ত্র অবস্থায় গেরিলা বাহিনী গঠন করে যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করে… বহুকালের নির্যাতন পীড়ন শোষণ ও বৈপ্লবিক শঠতার বিরুদ্ধে এ হলো সমগ্র মানবসত্তার বিদ্রোহ। এ হলো instinctual revolt”।

আসলে গ্রাফিতি যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাও একরকম instinctual revolt। ধরা যাক, গিজার বিখ্যাত পিরামিডের ভেতরের দেওয়ালে পাওয়া গেছে  অসংখ্য শ্রমিকের নাম, আবার প্রাচীন রোমের ধ্বংসস্তূপে নামহীন যোদ্ধারা খোদাই করে গেছে তাদের কথা। এ সবই গ্রাফিতি, যেখানে আদৌ শিল্পসৃষ্টির কোনো বাসনাই ছিল না। ছিল কিছু বিক্ষিপ্ত আঁচড় যা আসলে কেবল  পাথরের গায়ে নয়, প্রথাগত ইতিহাসের গায়ে খোদাই করা এক-একটি নির্মম পরিহাস। আবার উনিশশো আটষট্টিতে প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে বিতর্কিত আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়াজুড়ে– প্রশ্ন আছে তার পদ্ধতি নিয়ে, থাকবেও– তবু প্রশ্নাতীত, দেওয়ালে দেওয়ালে কোলাজ পদ্ধতিতে তা তৈরি করে যায় অন্তর্ঘাতের নীল নকশা। সেই সময়ের কয়েকটি গ্রাফিতি থেকে এখানে স্লোগান তুলে দেওয়া হলো:

(ক)  In the decor of the spectacle,
the eye meets only things and
their prices

(খ)  The liberation of humanity is
all or nothing

(গ)  The revolution is incredible
because it’s really happening

(ঘ)  No replastering, the structure
is rotten

মনে হয় না, এই বিদ্রোহ আসলে খুব অর্গানাইজড্ নয়, বরং অতিনিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রায়িত পুঁজিনির্ভর সভ্যতায় একটা কেওস তৈরির চেষ্টা এবং সেই কেওসকেই উদযাপন করা? উল্লেখ থাক, গ্রাফিতির এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আরেকটা বৈশিষ্ট্য, গ্রাফিতি কালোত্তীর্ণ কিছু বলতে চায় না কখনোই, তা দাবি করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, কতকটা স্থূল ভাবে হলেও ‘এখনত্ব’ আরোপ করে বক্তব্যে, যা তন্বিষ্ঠ মনোযোগে দায়বদ্ধ করতে পারে মানুষকে। তলস্তয় যেমন বলেছিলেন তাঁর ‘তিনটি প্রশ্ন’ গল্পে– “Remember then: there is only one time that is important– now! it is the most important time because it is the only time when we have any power”।

এত কথা বলবার কারণ, ব্যাঙ্কসি কোথায় এবং কীভাবে আলাদা তা বুঝতে গেলে আমাদের মনে রাখতে হবে গ্রাফিতির রাজনীতি ও রণকৌশল সংক্রান্ত এই পূর্বশর্তগুলি।

(তিন)

“The greatest crimes in the world are not committed by people breaking the rules but by people following the rules. It’s people who follow orders that drop bombs and massacre villages.”

— Banksy

সার্কাজমের বহুল-ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানকে আঁশটে রকমের হ্যাটা করে চলেছেন তিনি। এই দ্রোহ তাঁর, যেন ভাঙনের রুদ্ধশ্বাস গতিতে টুকরো করে দেবেন, যা কিছু প্রতিষ্ঠিত। শাশ্বতর স্পর্ধাকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করতে করতে তিনি তৈরি করছেন মানবিক দর্শনের নয়া ভাষ্য। পরপর উদাহরণ তুলে আনা যেতে পারে। ব্যাঙ্কসির খুব জনপ্রিয় তিনটি গ্রাফিতির কথা ধরা যাক।

ধরা যাক, মোনালিজার কাঁধে মিসাইল।

ধরা যাক, আইনস্টাইনের ছবির পাশে এই দগদগে সংলাপ– “জাস্ট গুগল্ ইট”।

ধরা যাক, অলিম্পিকের পাঁচটি বৃত্তের থেকে একটি ছিঁড়ে নিয়ে পালাচ্ছে দুর্বিনীত বালক।

einstein

এভাবেই আমাদের মগজে সেঁধিয়ে থাকা ভরসার, স্বস্তির, আস্থার, সৌন্দর্যের যাবতীয় পূর্বস্বীকৃতিকে বিধ্বস্ত করতে থাকেন তিনি। প্রশ্নাতীত যে ঈশ্বর, তিনি মৃত। নতুন ঈশ্বর দীর্ঘজীবি হোন। ব্যাঙ্কসি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখান, একটি আঙুল তুলতে শেখান– কখনো তর্জনী-কখনো মধ্যমা, যা নির্দিষ্ট ভাবে তাক্ করা থাকে অধিকাংশ সময় নিজের দিকেই। একটি ইন্ট্রোস্পেকশনের খতিয়ান তৈরি হয় এইভাবে, যা হাতুড়ির মতো ঘা দিতে থাকে মাথায়। এই কাজটি ব্যাঙ্কসি ছাড়া এত নিখুঁত ভাবে করে উঠতে পারেননি আর কেউ। এমনকি স্টেনসিলিং পদ্ধতিকে যখন ব্যবহার করছেন তিনি, তখন তা হয়ে উঠছে একটি পোলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট। কেন বলছি এই কথা? স্টেনসিলিং-এর সুবিধা এই, একটি নির্দিষ্ট ছাঁচকে ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ে তৈরি করে ফেলা যায় হবহু একই ছবি, অসংখ্য। প্রতিবাদের কোনো কপিরাইট নেই। অর্থাত্, যে প্যামফ্লেটটি তিনি তৈরি করে যাবেন, ইতিহাসসিদ্ধ ভাবেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারবে হাতে-হাতে, অজস্র হাতে– ঠিক এইখানে এসে স্টেনসিলিং কেবল ‘টেকনিক্’ হয়ে থাকে না। হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক উচ্চারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ কলকাতার এঁদো গলি পর্যন্ত যে উচ্চারণ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এটা কেবল কেওস আর ডিসঅর্ডারের সেলিব্রেশন হতে পারে না। এ বিদ্রোহের নিশ্চয়ই কোনো সচেতন ও পরিকল্পিত অভিমুখ আছে, যা কেবল ভাঙনেই শেষ হবে না। বাড়িয়ে বলছি মনে হচ্ছে? আরেকটু দেখা যাক।

(চার)

“Art should comfort the disturbed and disturb the comfortable”

— Banksy

ব্যাঙ্কসি ‘পপ’-এর sign-গুলি প্রভূত ব্যবহার করেছেন তাঁর গ্রাফিতিতে। স্পাইডারম্যান বা মিকিমাউসের মুড়ি -মুড়কিসুলভ ব্যবহার লক্ষ্য করা যাবে। এরকম একটি– স্পাইডারম্যান খুলে ফেলছে তার মুখোশ, আর মুখোশ শুধু নয়, চামড়ার তল থেকে উঠে আসছে বৃদ্ধের বলিরেখাঙ্কিত ক্লিষ্ট মুখ, হেমন্তের অবিন্যস্ত বিষাদময়তা যেন। একজন গ্রাফিতি-শিল্পী, ‘angst’ যার ছবির ডমিন্যান্ট থিম হওয়ার কথা ছিল, তিনি এইভাবে কাতরতা, আর্তি ফুটিয়ে তুলবেন কেন? তোলা স্বাভাবিক? তোলা উচিত?

আমাদের অনুসন্ধান কার্যত শুরু হয় এইখান থেকে, কারণ এই ছবিটি ব্যতিক্রম নয়। দেখুন, একটি বাচ্চা মেয়ে হাত বাড়িয়ে আছে একটা লাল বেলুনের দিকে, বেলুনটা উড়ে যাচ্ছে দূরে, মেয়েটির হাতের সীমানা ছাড়িয়ে।

belun away.jpg

এই গ্রাফিতির সিক্যুয়েল হিসেবে আমরা পড়তে পারি আরেকটা গ্রাফিতিকে। তুলনায় বড়ো, একটি মেয়ে একগুচ্ছ গ্যাসবেলুন ধরে উড়াল দিচ্ছে আকাশে।

belun float.jpg

দ্বিতীয়টিকে প্রথমটির সিক্যুয়েল হিসেবে যে পড়তে চাইছি– সে কেবল আমার ব্যক্তিগত নিরাময় বাসনা নয়। একটু মন দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে প্রথম ছবিতেই, প্রত্যয়ী হয়ে, শিল্পী ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আরেকটু, আরেকটু হাত বাড়ালেই মুঠোয় চলে আসবে সুতো। মেয়েটির দেহভঙ্গি লক্ষ্য করুন। ও কিছুতেই হারতে পারে না। সভ্যতার এই ক্লসট্রোফোবিক ল্যাবেরিন্থে ইকাইরাসদের জন্য ব্যাঙ্কসি তৈরি রাখেন ডানা, হোক না মোমের, যায় আসে না কিছু। আর এখানে এসে গ্রাফিতির সাধারণ লক্ষণ থেকে ব্যাঙ্কসি বিচ্যুত হন অনেকখানি। বিচ্যুত হন, কেননা, ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়’, বিচ্যুত হন, কেননা, যে হাতে সূর্যের রেখা আছে, সেই হাত ছেড়ে পালানো যায় না। রাইফেল-গ্রেনেডে ঠাসাঠাসি পৃথিবীর উপর তিনি আঁকেন প্রেমিক-প্রেমিকার ছবি, যাদের বয়স বারো কি তেরো। চমৎকার কেবল এটুকুই না, পরস্পরকে তারা ধরে আছে এমন দেহভঙ্গিতে, যেন আশ্বস্ত করছে একে-অপরকে।

lovers.jpg

আশ্বস্ত হই আমরাও। মনে করি, যেন ওদের আড়াল থেকেই আমাদের ভরসা দিতে থাকেন শিল্পী স্বয়ং। এত ক্লেদের মধ্যেও ব্যাঙ্কসি ভুলে যান না আমাদের পরিচিত কুশল বিনিময়, প্রেম ও খুনসুটি। পার্কিং জোনে ‘ing’-টুকু মুছে ফেলে অনায়াসে তিনি আঁকতে পারেন দোলনা, যাতে দোল খায় আমাদের অকপট বালকবয়স। আমি বলছি না মহত্ শিল্পকে হতেই হবে উত্তরণমুখী, কিন্তু উত্তরণ সত্য, বলছি জোর দিয়ে। বহুলচর্বিত ফুল ছুঁড়ে ফেলা রাগী মানুষটার পাশাপাশি উড়তে থাকা মেয়েটিকেও না দেখলে, আমাদের ব্যাঙ্কসি-পাঠ হয়ে পড়ে একদেশদর্শী। ‘লজ্জা-ঘৃণা-রাগের পরে এটাও বুঝি থাকে’, ‘এটা’ সেই কার্নিভালেস্ক এলিমেন্ট যা আবিলতার মধ্যেও মুখ থেকে সবটুকু হাসি মুছে নেয় না।

bomb.jpg

(পাঁচ)

গ্রাফিতির প্রতিস্পর্ধা, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, ঘৃণা, স্যাটায়ার, সামগ্রিক ভাবে উত্তরাধুনিক ভাবান্দোলনের প্রভাব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, হবেও। এই লেখায় ব্যাঙ্কসির একটা বিশেষ প্রবণতা নিয়ে, যা তাকে বিশিষ্ট করে তোলে, আলোচনা করা হলো। এর বাইরেও অসংখ্য গ্রাফিতি তিনি এঁকেছেন এবং আঁকবেন।

ব্যাঙ্কসি কি প্রেমিক? ব্যাঙ্কসি কি কবি? এও এক প্রতিবাদ। নয়? প্রিয় কবির কোনো গদ্যে পড়েছিলাম নাকি নিজের চোখেই দেখা, রাতের সব তারা যখন জ্বলে ওঠে দাউদাউ করে, ঘুমন্ত নদীর উপর দিয়ে উড়ে যান এক প্রকান্ড ডানামানব, ডানায় সেলাই করা থাকে মিসাইল আর যতবার রক্ত পড়ে ফুলের জন্ম হয় পৃথিবীতে। যদি জেগে থাকাটাও একটা ধর্ম হয়, ভালোবাসা প্রতিবাদ হবে না কেন?

আলবাত হবে, ততদিন, যতদিন দেওয়াল আছে, কবিতা আছে, আর ব্যাঙ্কসি আছেন।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s