জীবন মানে: “ধারাবাহিক” উৎসব আর বিনোদন

লিখেছেন  বীথিকা সাহানা।

সিরিয়াল বা ধারাবাহিক আপনি কেন দেখেন? প্রথম উত্তর, কেন দেখব না! সেখানে যা যা দেখানো হয় সবই তো জীবনের সত্য; আমাদের জীবনে যা যা ঘটে তাই তো দেখায় সেখানে। দ্বিতীয় উত্তর, না জানি সব ঠিক নয়, কিছু কিছু ঠিক মানে বেশিরভাগটাই ঠিক। তৃতীয় উত্তর, জানি মিথ্যে কিন্তু বেশ সময় কেটে যায়। একঘেয়ে জীবনে সিরিয়ালের নিত্য-নতুন টুইস্ট বেশ আনন্দ দেয়।

একই রকম দেখতে চরিত্রের অদল-বদল, মৃত চরিত্রের বেঁচে ওঠা, হঠাৎ স্মৃতিভ্রম বা হঠাৎ স্মৃতি ফিরে পাওয়া এগুলি বিশ্বাসযোগ্য?রোজ ঘটে আপনাদের সাথে? না। এগুলি কেউই সত্যি বলে মানতে রাজি হয়নি। কিন্তু প্রতি গল্পের প্লট সাজানো হয় শুধু এগুলি দিয়েই। এগুলিই নিত্য-নতুন টুইস্ট এর জোগান দেয়।

আচ্ছা, আগে কী করতেন? মানে সিরিয়াল দেখার আগে? এই সময়টায়? উত্তর নানা ধরণের- বই পড়তাম, সেলাই করতাম, পেপার পড়ার সময় হত না সারাদিন সেটা পড়তাম, আমি তো চিরকালই সিরিয়াল দেখি, অন্য কী করতাম ভেবে দেখিনি; তবে আমাদের মা কাকীমারা দেখতাম একে অপরের চুল বাঁধতে বাঁধতে গল্প করত, কেউ উল বুনত, কেউ সুপুরি কাটত, নানারকম কাজ করত।

আপনি ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’ দেখেছেন? না কোন চ্যানেলে হয়? নাম শুনে তো সাংসারিক সিরিয়াল মনে হচ্ছেনা! … যাক্‌গে, ধরুন, আপনি দেখছেন ‘কিঁউ কী শাস ভী কভি বহু থী'(ওটা আর এখন হয়না!), আচ্ছা ‘বধূবরণ’ দেখছেন, আর বাইরে গুলিগোলা, বোমা পড়ছে…

জীবন মানে Zzzz…বাংলা।

কিন্তু অনেকেই বলেন, আগের থেকে সিরিয়ালের গল্প, কাহিনি বলার ধরণ অনেক বদলে গেছে। চ্যানেলগুলিও তাই দাবি করে।   স্টার জলসা: চলো পাল্টাই; স্টার প্লাস: রিস্তা ওয়াহি সোচ নয়ি; বা Viacom18(Owner: National Amusements Reliance Industries) এর কালার্স: জাসবাত কে রাঙ্গ; এইরকম ভাবে তাদের tagline গুলি দিয়ে চ্যানেলগুলি তা বিজ্ঞাপিতও করেছে। আর এই ‘মা জেঠিমা’(নারী-পুরুষ, প্রচুর কম বয়সী ছেলে মেয়েরাও নিয়মিত দেখে) দের পাশাপাশি ঘোষিত ‘youth channel’ও আছে,M TV- Stay Raw; Channel V- Bloody Cool।

আমরা কথা বলব মূলত বাংলা ধারাবাহিক গুলি নিয়েই। তার আগে সাম্প্রতিক কয়েকটি সিরিয়ালের  নাম ও তাদের tagline গুলি একটু মনে করে নিই। ১। ‘দীপ জ্বেলে যাই’: ঘরে জিতব। বাইরেও; অর্থাৎ আধুনিকা, working women দের আগে ঘর তারপর বাইরে, আগে ঘর-সংসার সামলে তারপর বাইরে যেতে হবে, উল্টোদিকে পুরুষদের শুধু বাইরে সামলালেই হবে, হেঁশেল মাড়ানো স্ত্রৈণতা, বা অপৌরষেয় কাজ। ২। ‘লক্ষ্মীমন্ত। বুদ্ধিমন্ত। গোয়েন্দাগিন্নী’, গিন্নীর আগে লক্ষ্মীমন্ত হওয়া প্রয়োজন তারপরে বুদ্ধীমন্ত। গোয়েন্দা গিন্নী পরমা মিত্র (ফেলু বা প্রদোষ মিত্রকে মনে পড়বে শুধু নামসূত্রেই) কে প্রায় প্রত্যেক কেস হ্যান্ডেল করার আগেই শাশুড়ির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। ধারাবাহিকের গল্পের বেশ খানিকটা জুড়েই থাকে শাশুড়ির রাগ ভাঙানোর বা অনুমতি নেওয়ার প্রসঙ্গ; শাশুড়ি অনুমতি দেন এই শর্তে যে, পরিবার ও ঘরের কাজে যেন অবহেলা না হয়। তারপর অবশ্যম্ভাবী ভাবেই কেসের সমাধান এবং তার সঙ্গে পারফেক্ট ঘর সামলানো, শাশুড়ির ও একান্নবর্তী পরিবারের প্রশংসা,প্রতিটি কেস সমাধানের পরের চেনা ছক। আবার পরবর্তী কেস, শাশুড়ির রাগ… ৩। “রাধাঃ রূপে তোমায় ভোলাবো না”, সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র রাধা। প্লট মোটামুটি এরকম, রাধার বিয়ে হয়না কারণ সে মোটা, তারপর ‘রূপে গুণে ধনে পরিপূর্ণ সমৃদ্ধ’ এক নায়কের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। রাধা তাদের বাড়ির আদর্শ বউ হয়ে উঠবে। রাধার উল্টোদিকে আছে স্লিম ‘সুন্দরি’ খলনায়িকা। আমাদের মনে হতে পারে, এই তো নতুন concept। Body shaming এর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া গল্প। সত্যিই তো ‘চলো পাল্টাই’ (স্টার জলসার বিজ্ঞাপন)। আজ্ঞে না, একটু ভেবে দেখুন বাধ সাধছে এর tagline। নায়ক ও নায়কের পরিবারের মন জয় করতে চায় রাধা; কিন্তু তার রূপ নেই অতএব গুণ দিয়েই তা জয় করতে হবে। অর্থাৎ মোটা, কালো মেয়েরা তো কুৎসিতই, ‘আগে রূপবিচারি পরে গুণ’! রূপ নেই তাই গুণ দিয়েই সংসারের আদর্শ বউ হতে হবে। প্রচলিত ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে একটিও কথা বলা হলনা। বরং তাকেই নতুন মোড়কে আমাদের মাথায় চিরস্থায়ী করে গেঁথে দেওয়া হল। ৪। আরেকটি, “কোজাগরিঃ আদরে বাঁদর মেয়েকে মানুষ করবে কে?”(এই সিরিয়ালের TRP সবচেয়ে বেশি ছিল) কোজাগরি, বিয়ে করতে চায়না, কিন্তু মেয়েদের বিয়ে তো করতেই হবে নইলেই সে অরক্ষণীয়া (হ্যাঁ, ২০১৬ সালেও এই ধারণার প্রচার)! বিয়ের পর অবধারিতভাবে তার ‘আদর্শ বউ’ হয়ে ওঠার গল্পই এখানে বলা হয়েছে। এই তালিকায় আছে ‘খোকাবাবু’ও। ৬। আমাদের কাছে রাজনীতির সঙ্গে  প্রত্যক্ষ্যভাবে যুক্ত মেয়েদের সংখ্যা নেহাত কম নেই। কিন্তু যেন নতুন ঘটনা, সেইভাবে পরিবেশিত একটি সিরিয়াল, “আমার দুর্গাঃ ঘরের মেয়ের রাজনীতিতে পা”। ‘ঘরের মেয়ে হয়ে থাকাটা আগে জরুরি বাইরে যতই ডানা মেল’- একেবারে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চলতি typical বুলি। বিশ্বাস করুন সত্যিই এখানেও নতুন কিচ্ছু নেই। ঠিক একইরকম চর্বিতচর্বণ প্রত্যেকটি সিরিয়াল।

আরেক ধরণের সিরিয়াল আছে। প্রান্তিক, মফস্বলের আদিবাসী বা পারিবারিক সহকর্মী মেয়েরা কেন্দ্রীয় চরিত্র। এরা প্রায় সকলেই অল্পশিক্ষিত, ঘরের কাজে পারদর্শী বা কোথাও উজ্জ্বল ছাত্রী, স্বামীর বা স্বামীর পরিবারের দয়ায় হঠাৎ ‘উপযুক্ত শিক্ষিত’ হয়। এবং কলকাতার সম্পন্ন বাড়ির ‘আদর্শ বউ’ হয়ে ওঠে, সেই সঙ্গে চলতি অর্থে সুন্দরি হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রায় প্রত্যেক সিরিয়ালেই তাদের বিপরীতে থাকে শহুরে, শিক্ষিত, ‘জটিল-কুটিল’ মেয়েরা , কখনও স্বামীর আরেক স্ত্রী (বাস্তবে যা আইনের বিরুদ্ধে) বা প্রেমিকা হিসেবে। এই তালিকায় আছে অগুন্তি সব সিরিয়াল, ভাষা(ভাষা), ইষ্টি-কুটুম(বাহা), বধূবরণ(কনক), কুসুমদোলা(ইমন), এই ছেলেটা ভেলভেলেটা (ইয়ে, মানে ‘নামকরণের সার্থকতা না খোঁজাই ভালো’)-র শালুক, কে আপন কে পর(জবা), পূণ্যি পুকুর(কঙ্কাবতী)…। এই সিরিয়ালগুলি যে  ‘গৃহস্থ বাড়িতে’ চলে সেখানে বেশির ভাগ সময় যখন সিরিয়াল চলে, তখন বাড়ির বউরা বসে খাটে বা উঁচুতে অথচ কাজের মেয়ে বসে নীচে, মেঝেয়; অদ্ভুত paradox। বাস্তবে তাদের প্রতি মনোভাব বা আচরণ এতটুকুও বদলায় না কারণ সিরিয়ালে দেখানো চরিত্র গুলির সঙ্গে বাস্তবে এই শ্রেণির কোনো মিল নেই। এর উল্টোদিকে আছে এক (অভিনব!) সিরিয়াল, ‘মিলনতিথিঃ শত্রুর নাম প্রিয় বন্ধু। তাতে প্লট খানিকটা এরকম- সম্ভ্রান্ত পরিবারের নায়িকা(অহনা), সে তার বাড়ির সাহায্যকারীর মেয়েকে(বহ্নি) প্রিয় বন্ধু ভাবে, কিন্তু বহ্নি ভীষণ ঈর্ষাকাতর,অহনার সব (না, সিরিয়াল গুলির ‘আদর্শ বউ’ দের সম্পত্তি বলতে পত্নীত্ব, মাতৃত্ব, সতীত্ব র বানিয়ে তোলা concept) কেড়ে নিতে চায়। আর যখনই ধরা পড়ে তখন অহনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয় পরিবারের উচ্চশিক্ষা, সম্ভ্রান্ত অবস্থার জোরে আর উল্টোদিকে থাকে বহ্নির ‘কাজের মেয়ে’, ‘অশিক্ষিত’ পরিচয়। মানে, তার সঙ্গে থাকে চলতি justification; ‘এই মেয়েরা’ তো ‘এরকম’ হবেই!

গৃহবধূর মা, এটা সিরিয়ালের অন্যতম জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আদর্শ মায়েরা মেয়ের সংসারে/বাড়িতে আসেনা, এমনকি এই চরিত্র গুলি হঠাৎ উবেও যায়, মানে প্লটে তাদের আর ফিরিয়ে আনা হয়না; অনাথ হলে আরও সুবিধে(কনক, ইমন, জবা)। আর যে মায়েরা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে তারা অনিবার্যভাবে ‘কুশিক্ষা’ দেয়, অশান্তি বাধায়। উদাহরণ? পটলকুমার গানওয়ালা(অদিতির মা), বধূবরণ(ঝিলমিলের মা), গোয়েন্দা গিন্নী(নন্দার মা), দীপ জ্বেলে যাই(তৃণার মা, রাগিণী)… মেয়ের বাড়িতে অন্ন, জল স্পর্শ করতে নেই, পুরনো নিয়ম; তার মানে যদি কেউ আসেও, মেয়েকে দেখে না খেয়ে, না থেকে ফিরে যাওয়াই ‘নিয়ম’। এই সিরিয়াল গুলি সেই কুসংস্কারকেই সযত্নে মেনে ও মানিয়ে চলেছে আমাদের। ও হ্যাঁ, এই মায়েরা সহকারি চরিত্রের মা; ‘আদর্শ বউ’ এর মায়েরা তো এরকম হয়-ই না! আমরাও এই ভাবেই বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে চলেছি! ছি!

এবং এই সিরিয়ালগুলির ‘আদর্শ বৌ’-দের সাত চড়ে রা কাড়ে না, ভালো-মন্দ সব মানিয়ে চলে, স্বামীর অত্যাচার সয়েও লক্ষ্মীর মত পদসেবা করে। তাই এই সিরিয়ালগুলি দেখে সেই বাস্তবে ‘আদর্শ’ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে প্রতিবার আরও নতুন উদ্যমে, সহ্যশক্তি বাড়িয়ে, উৎসাহিত হয়ে নিজেকে ভুলে সকলের সেবায় মন দেয়। এটাই পিতৃতন্ত্রের লাভ। আর তাই কখনও পুরুষেরা বা কখনও নানা গুরুজনেরা এই ‘অবসরের সময়’ তাদের বিরক্ত করে না। পিতৃতন্ত্র যেভাবে ঘরের ভেতর, পুঁজিবাদ সেভাবে  ঘরের বাইরে তৈরি করে রেখেছে এই অবসরের পরিসর – শপিং মলে, মাল্টিপ্লেক্সে। এই প্রসঙ্গে, আমাদের মনে পড়বে পরশুরামের ‘গুরুবিদায়’ গল্পটির একটি অংশ।বংশলোচন, নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ত্রীর ধর্মগুরুর শখ মেটান। কারণ তার মনে হয়েছে, তার স্ত্রী অত্যন্ত একগুঁয়ে। ‘যদি দেশের বর্তমান হুজুগের বশে তাঁহার পিকেটিং করিবার বা প্রভাতফেরি গাহিবার ঝোঁক হইত তবে বংশলোচনের মান-ইজ্জিত অনারারি হাকিমি কোথায় থাকিত? তাঁহার হাকিমি কোথায় থাকিত? তাঁহার মুরুব্বি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবই বা কি বলিতেন মোটের উপর দেশভক্তির চেয়ে গুরুভক্তিতে ঝঞ্ঝাট কম”। সত্যিই তো সিরিয়াল দেখলে বাইরের কাজে, নিজের বঞ্চিত অবস্থার প্রতি তারা মন দেবে কম। প্রতিবাদ করবে কম। প্রশ্ন করবে কম। আর খুব পরিকল্পিত ভাবে খুব সন্তর্পণে সিরিয়ালগুলি এই পুরুষতান্ত্রিক উদ্দেশ্যই সাধন করে।

এই সিরিয়ালগুলি সবই চলে বিজ্ঞাপনের পয়সায়। তারাই এদের স্পনসর। বিভিন্ন সিরিয়ালের মাঝে গল্প থামিয়ে তাদের বিজ্ঞাপন করতেও দেখা যায়। কিন্তু গোটা সিরিয়ালটাই বিজ্ঞাপন এরকমটাও দেখা যাচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক বাংলা সিরিয়াল শুরু হয়েছে, ‘জড়োয়ার ঝুমকো’। সেনকো গোল্ডই তার প্রধান স্পনসর। সেখনকার প্রতিটি চরিত্র অবিশ্বাস্য রকম সোনার ভারি গয়না পরে অভিনয় করে। সোনার দোকানের মালিক ও তার কারিগরদের লড়াই তার প্রতিবেশ। না খেটে খাওয়া, শ্রমিক, কর্মীদের লড়াই-এর গল্প তাতে এক ফোঁটাও নেই। যদিও মোড়কটা তেমনই। আসল লক্ষ্য ‘পুষ্পপাতা নেকলেস’ হাসিল করা! কারিগরের মেয়ে মালিকের বাড়ির পুত্রবধু। কিন্তু তার গল্পও আর পাঁচটা সাংসারিক ঝামেলা-ঝাটি, আদর্শ পুত্রবধূ হওয়া। ‘গয়না যার পরিচয়’ এই tagline ধারাবাহিক ও তার স্পনসর দুক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

মূলত বেসরকারি কোম্পানী গুলির বিজ্ঞাপন ও তাদের স্বার্থই এই টি.ভি.চ্যানেলগুলি পূরণ করে, তাদের বাজার তৈরিতে সাহায্য করে। আবার দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পুলিশদের বিনোদনের অনুষ্ঠান ‘জয় হে’ তে টলিউড কে “my cultural family” বলে সম্বোধন করছেন। বিভিন্ন জায়গায় নানান সময়ে তিনি জনগণকে উৎসব করতে ও সিরিয়াল দেখতেও উৎসাহিত করেছেন একথা আমরা সকলেই জানি। সরকারের ‘সাংস্কৃতিক দলের’ কাজই হল রাষ্ট্রীয় চাহিদাগুলিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাহিদা হিসেবে illusion তৈরি করা এবং হেজিমনিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। Quora নামক একটি জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়। তাতে জনৈক  ব্যক্তির প্রশ্ন ছিল, সিরিয়ালগুলিতে মুসলমান পরিবার বা চরিত্রদের নিয়ে প্লট তৈরির হার ভারতবর্ষে এত কম কেন? দুটি জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘কুবুল হ্যায়’ এবং ‘বে-ইন্তেহা’ (মুসলমান পরিবারের গল্প)। একটি ২০১৫, অন্যটি ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে বলেন জিন্দেগি নামে একটি চ্যানেলে শুধু মুসলিম দের নিয়েই সিরিয়াল হয়(পাকিস্তানি ও টার্কিস); কেউ দেখতে চাইলে সেটা দেখতে পারেন। অর্থাৎ একই চ্যানেলে দুই ধর্মের সিরিয়ালে প্রচার বন্ধ হওয়ার পথে। কেউ যদি কিছুদিন বাদে বলে যারা হিন্দু হয়েও ওই চ্যানেল দেখে তাদের পাকিস্তানে যাওয়া উচিত, অবাক হবেন না। অবশ্য আমরা কিছুতেই যেন আর অবাক হই না, মেনে নিই, মানিয়ে নিতে বলি।চ্যানেল ভাগ হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে!

 তার উত্তরে সেখানে বলা হয়েছে, হিন্দুদের উৎসব বেশি, এবং সবগুলিই আনন্দ-উৎসব, সিরিয়ালে সকলেই আনন্দ বিনোদন চায় তাই হিন্দুদের নিয়েই গল্প তৈরি হওয়াই বাঞ্ছনীয়! আমরা হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে দেখা যাক উৎসব ও তার বাজার কীভাবে তৈরি হয়? হিন্দি বাংলা দুই সিরিয়ালেই ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত উৎসব অনুষ্ঠান ছাড়া বাকি সব উৎসবকেই এক ‘বিরাট হিন্দুধর্মের’ আওতায় আনা হয়েছে। দুর্গাপুজো, দিওয়ালি, সর্বপ্রধান। মাঝে মাঝে কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলির বাড়িতে আস্ত মন্দিরের পাশাপাশি personal God-ও থাকে; যেমন রাধার গনেশ দাদা, পাখির তারা মা, ভুতু আর পটলের গোপাল ঠাকুর, কনকের রাধা-মাধব ইত্যাদি, তারা এদের প্রত্যেক twist-এ অনিবার্যভাবে positive সাহায্য করে (মৃতের বেঁচে ওঠা, ম্যাজিক করা, telepathy ঘটানো, নানাবিধ)।

এর সঙ্গেই থাকে পৌরাণিক ও ইতিহাসের কাহিনি নিয়ে তৈরি ফ্যান্টাসি সংরূপের সিরিয়ালগুলি।আলিফ-ল্যায়লা ছাড়া আর কোনো সিরিয়াল হিন্দী বা বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রতিবেশে তৈরি হয়নি বললেই চলে। কিন্তু রামায়ণ ও মহাভারতের বহু version লাগাতার telecast হয়ে চলেছে। রামানন্দ সাগর(১৯৮৭-৮৮), জয় হনুমান (সঞ্জয় খান, ১৯৯৭-২০০০) আনন্দ সাগর(২০০৮-২০০৯), সিয়া কে রাম(২০১৫-১৬)-এর কথা বলা যায়। মহাভারত ও কৃষ্ণকে নিয়ে বি.আর.চোপড়ার মহাভারত(১৯৮৮-১৯৯০), একতা কাপুরের ‘কা’হানি হামারে মহাভারত কি(২০০৮; K-সিরিয়াল, অতয়েব মহাভারত-ও ‘ক’ দিয়ে শুরু হতে হবে), সিদ্ধার্থ কুমার তিওয়ারির মহাভারত(২০১৩-১৪); রামানন্দ সাগরের শ্রীকৃষ্ণ(১৯৯৩-৯৬), জয় শ্রী কৃষ্ণ(২০০৮-২০১০), বাল কৃষ্ণ(২০১৬-), ভক্তের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ(২০১৬-) ইত্যাদি। এছাড়াও আছে লক্ষ্মী, দুর্গা, শিব, পতঞ্জলি নিবেদিত সন্তোষী, এমনকি শনি কে নিয়ে সিরিয়াল।

আর ইতিহাসের, রোমান্সের গল্প নিয়ে, পৃথ্বীরাজ-সংযুক্তা, চন্দ্র-নন্দিনী(চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য), যোধা-আকবর(ধর্মের দিক দিয়ে দেখলে গোটা প্লটে যোধার হিন্দুত্ব ও আকবরে হিন্দুত্ব প্রীতিকেই usp করা হয়েছে), আছে অশোক, ঝান্সী কি রাণী, চাণক্য, মাহারাণা প্রতাপ, শোভা সোমনাথ কি(নায়িকা শোভা সোমনাথ মন্দিরের ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই করে মুসলমান গজনীর বিরুদ্ধে)।  ইদানীং নানা কারণেই এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। স্পনসররা উৎসাহিত করছেন এই ধরণের ভাবনাগুলিকে। তার কারণ- ১। হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ তৈরি করা যায়(সেই উনিশ শতক থেক চলে আসা ঐতিহাসিক উপন্যাসের পরিচিত ছক। হিন্দু নায়ক মহান, বাকি ধর্মের মানুষেরা মন্দ, বহিরাগত, বিদেশি)। ২। ‘যথার্থ ভারতবর্ষের’ ‘হিন্দু রামরাজ্যের’ এক অলীক স্বর্গ নির্মাণ করা। ৩। স্বল্পবাস নারী পুরুষ দেখিয়ে, আদর্শ শরীরের মাপকাঠি তৈরি করা(সঙ্গে green tea, oats, kellogs ইত্যাদির বিজ্ঞাপণ) ও যৌন আবেদনকে usp করে তোলা, এই পরিসর ‘সামাজিক’ সিরিয়ালে কম কারণ স্বল্পবসনা মানেই সেখানে ‘vamp character’। ৩। ‘আদর্শ চরিত্র’র ভাবনাকে প্রমাণের চেষ্টা বা আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া। মানে বাকি সিরিয়ালে যে সংস্কার, আদর্শ, ঐতিহ্য, রুচির দোহাই দেওয়া হচ্ছে মানুষের মনে, তার ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা; যেন তার শেকড়ে পৌঁছোতে চাইছে। ধরুন, ১০ টা ‘আদর্শ বৌমা’ তৈরির সিরিয়াল তার সঙ্গে  দুটো লক্ষ্মী বা সীতা নির্ভর সিরিয়াল। অর্থাৎ ফেসবুকের ‘be like Bill’ এর মতো ‘be like Sita or Lokkhi’ আর কী! নইলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা মুশকিল। ৪। ‘যথার্থ ভারতবর্ষের’ ‘হিন্দু’ রাজার একটি concept তৈরি করা। যেমন রামের রামরাজ্য, কৃষ্ণের সাহায্যে  ধর্মরাজ্য, বা, যখন চাণক্য চন্দ্রগুপ্তকে তার গ্রীক পত্নী হেলেনা নয়, অন্য হিন্দু পত্নীর সঙ্গে হিন্দু উত্তরাধিকারি(পুত্র) উৎপন্ন করার পরামর্শ দেয় কারণ ‘ভারতবর্ষের রাজা যবনপুত্র হতে পারেনা’! আর রাজা, একনায়কের ধারণা জনতা ভালো ‘খাচ্ছে’; কারণ বাস্তবের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল গুলি ‘একটি বিশেষ’ মুখ নির্ভর। এই মুখ গুলিই রাজা, দেব বা দেবীর সমতুল্য, তারা জনতার সব ইচ্ছেপূরণ ঘটানোর ক্ষমতা রাখেন(মনে পড়বে অনিল কাপুরের নায়ক সিনেমা আর কেজরিওয়াল কে এক করে দেখার ভোটের আগের প্রচারের কথাও)। ৫। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অবিশ্বাস্যরকম সত্যি  বৈশিষ্ট্য হল- সমস্ত ইতিহাস ও পুরাণ নির্ভর প্লট DISTORTED। মানে কৃষ্ণ আর রাধার প্রথম দেখা রূপকথার গল্পের মত রাক্ষসকে মেরে রাধাকে উদ্ধার করে হয়নি। বা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আর নন্দের মেয়ে নন্দিনীর প্রেমের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

একেবারেই ফ্যান্টাসি নির্ভর ‘মৌলিক’ গল্প চন্দ্রকান্তা, কিরণমালা, মহাকুম্ভ, নাগিন, ব্রহ্মরাক্ষস ইত্যাদি। এই গল্পগুলির বৈশিষ্ট্যগুলিও এক। তার সঙ্গে আছে কুসংস্কার, জাদু-টোনা, black magic-এর আমদানি। ইদানীং, তথাকথিত সামিজিক সিরিয়ালেও আলটপকা এসে পড়ে ভূত, অলৌকিক ক্ষমতাশালি মন্দ চরিত্রও।  এগুলিও স্বাভাবিক বিশ্বাসে গৃহীত হয়, কারণ ১। বেশিরভাগ মানুষ এগুলি সত্যি বলে মানে। ২। আমার পছন্দের নায়ক, নায়িকা মন্দ শাশুড়ি, মন্দ সতীন, মন্দ পারিবারিক শত্রু, মন্দ রাজনৈতিক নেতার সাথে লড়ে শুধু তাই নয় এমনকি শত্রু যত ক্ষমতাশালিই হোক, অলৌকিক, রাক্ষস, ভূত, নাগিন, জীন যাই হোক না কেন সবকিছুকেই পরাজিত করার ক্ষমতা রাখে(আমার রাম দশ মাথাওয়ালা রাবণ বধ করে)।এই রূপকথার ইচ্ছাপূরণের ধারণাই ব্যাবহৃত হয়ে চলেছে। Hindu/Hindi hegemony সগৌরবে চলিতেছে। যতবার আপনি হিন্দুত্বের আস্ফালন করেন , কানফাটানো উৎসব উদ্‌যাপন করেন ততবার আপনার পাশের অন্যধর্মের মানুষটি ভয়ে মুষড়ে পড়ে বা আক্রোশে লড়বে বলে রাগ জমিয়ে জমিয়ে তৈরি হতে থাকে। ধর্মের ভিন্নতা, কালো টাকা আছে কী নেই, কতটা দেশভক্তি এসব নিক্তিতে আমরা মাপতে মাপতে নিজেরা মারামারি করব! নাকি এতে লাভবান কারা হচ্ছে সেই প্রক্রিয়াটিকে বুঝে নিতে চাইব?

Capitalist Society সবসময়ই একটি ‘Authentic Culture’ এর Utopian Image তৈরি করে। যার উদ্দেশ্য distraction from your present miserable situation। আসুন, দেখুন, আমরা যে শুধু গ্রামের বোকা, হাবা, অশিক্ষিত, নাগরিক, জটিল, ত্যাঁদড় মেয়েদেরই ‘আদর্শ বউ বানাই’(হীরক রাজের যন্ত্রের মত), তা-ই নয়; বিদেশী মেম কেও ‘সংস্কার বাড়ির’ ঘোমটা দেওয়া আদর্শ বৌমা বানাই গোছের প্রকল্প! সিরিয়ালে আপনার কথা বলা হয় না। বরং বলা হয় নির্দিষ্ট কিছু মাপকাঠি, বাঁধাধরা ছক, রক্ষণশীলতা, নারীর নারীত্ব, পুরুষের পৌরুষত্ব; মিথ্যা জগতের কথা। আর এই  বানিয়ে তোলা জগত বাস্তবে তৈরি করে দেয় বানিয়ে তোলা ভোক্তা ও বানিয়ে তোলা চাহিদা অনুযায়ি দ্রব্যের বাজার। তাতে পণ্যের চাহিদা ও বিক্রী পরস্পর সম্পৃক্ত থেকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যবসায়ীদের মুনাফাকে বাড়িয়ে তোলে। একটু খুঁজে দেখতে পারেন এই চ্যানেল গুলির মালিক কারা…

তার আগে বুঝে নিই চাহিদার প্রকৃতি ঠিক কেমন? “Desire is never fulfilled or fully satisfied, it is endlessly reproduced in our fantasies. ‘Anxiety is brought on by disappearance of desire.’ In other words, anxiety is the result of getting too close to what we desire,thus threatening to eliminate ‘lack’ itself and end desire. This is further complicated by the retroactive nature of desire. As Zizek observes, ‘The paradox of desire is that it posits retroactively its own cause, i.e. the object a [object small other] is an object that can be perceived only by a gaze “distorted” by desire, an object that does not exist for an “objective” gaze.In other words, what I desire is organized by processes of fantasy which fix on an object and generate a desire which appears to have drawn me to the object but which in fact did not exist until I first fixed upon the object: what appears to be a forward movement is always retroactive.(Cultural Theory and Popular Culture:An Introduction, John Storey Page No.108-09).

আপনি চাওয়ার আগেই কাম্য বস্তু আপনার কাছে হাজির হয়ে যায়। আর শুধু তাই নয়, আপনার চাহিদাগুলিও বাজার তৈরি করে। False status, false সংখ্যাগরিষ্ঠ identity-র homogeneity তৈরি করে। Odonil-এর বিজ্ঞাপনে আত্মীয়ের সমস্ত মানবিক ব্যবহারকে উপেক্ষা করে বাথরুমে Odonil নেই বলে কোনো class(status) নেই বলে দাগিয়ে দিই। আদর্শ স্ত্রী, মা, ভাই, নাগরিক-গ্রাম্য, সুন্দরি-কুৎসিত, ভালো-খারাপ কোনগুলিকে ‘ঠিক’ বলব ঠিক করে দেওয়া হয়। আমরা বাস্তবে ‘ঠিক তার মতো’ খুঁজতে থাকি। সাংসারিক, পারিবারিক চাহিদা গুলি তৈরি হয় সেই নিয়মেই। বাড়ির বউ বাইরে অন্য কাজ করে এটা বিশ্বায়নের অর্থনীতির যুগে প্রচলিত ঘটনা। কিন্তু সিরিয়ালের সমস্ত বৌমা ঘর সামলে তবে বাইরে যায়। বাইরে যেতে হলে মেয়েদের একাকেই ঘর সামলে তবে বাইরে যেতে হবে- এটা চাপিয়ে দেওয়া ধারণা। এতটাই যে এটাকে আর অস্বাভাবিক বলে মনেই হয়না, আর তাতে পুরুষদের দায়িত্ব ভাগ করার কথা একবারও বলা হয়না।

মিত্রোঁ… মিথ্যা ইতিহাস(ইতিহাসের ছাত্র পরীক্ষার খাতার যোধা-আকবরের গল্প লেখে ইতিহাস হিসেব), মিথ্যা পুরাণ, মিথ্যা আদর্শ, মিথ্যা মোহ আর মিথ্যা চাহিদার গোলোক ধাঁধায় আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখার মিথ্যা বাজারি জাল বিস্তৃত।

এই গোটা প্রক্রিয়ায় সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলি একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে। এতটাই ওতপ্রোতভাবে তারা জড়িয়ে গেছে যে তাদেরকে আলাদা করে বোঝার জো অব্দি নেই।

কিন্তু এই আঁতাত জনগনের স্বার্থের জন্য কখনই কাম্য নয়। ভারতবর্ষে যখন প্রথম টেলিভিশন আসে, তাতে সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। মাঝে মাঝেই তাই বেতারে পণ্যের বিজ্ঞাপণ, হিন্দি ছবির গান বন্ধ করে দেওয়া হয়; যদিও তা সফল হয়নি। সরকারি খরচে মনোহর শ্যাম জোশীকে মেক্সিকো পাঠানো হয় এই টেলিভিশন এর কার্যকলাপ বোঝার জন্য। ফিরে এসে তিনি লেখেন- ‘হামলোগ’(১৯৮৪-৮৫)। প্রথম সিরিয়াল, মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনি। সরকারি ‘হম দো হামারে দো’ প্রকল্পের কথা মাথায় রেখে(এখন বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন একান্নবর্তী পরিবার দেখানো হয়, চরিত্র বাড়লে গল্পের মায়াজাল নতুন নতুন পথে বিকশিত হতে থাকে বলে)। নতুন ধরণের অর্থনৈতিক  পরিবেশে তৈরি হওয়া ছোটো পরিবারের চাই চটজলদি খাবার, তাই Maggie – two minute noodle এর প্রযোজক। আরেকটি সিরিয়াল হত ‘নুক্কড়’(১৯৮৬-৮৭) যার চরিত্ররা কেউ ভিখারি, ছোটো মিস্ত্রী,পানওয়ালা, ঘরের কাজের সহকর্মী ইত্যাদি নিম্ন আর্থিক বর্গের মানুষেরা। এই সিরিয়ালটি অসম্ভব সাফল্য পায়; খোপড়ি, ঘনসু ভিখারি, কেদার ভাই, চরিত্রগুলি মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। ১৯৭৮ এ television-এ Autonomy স্বীকৃত হয়। ‘নুক্কড়’-এর উল্টোদিকে আছে বর্তমানের সিরিয়ালগুলি, এর একটিও এই আর্থিক বর্গকে নিয়ে বা তাদের জন্য নির্মিত নয়। সিরিয়াল শুরুই হয় বিশালাকার, বিলাসবহুল বাড়ির একটা Pan view দেখিয়ে। চরিত্রগুলি দামি, অতিরিক্ত পোশাক আর অলঙ্কারে ঢাকা, যাদের সঙ্গে সত্যি সত্যি ভেবে দেখলে কারোরই একাত্ম হওয়া সম্ভব নয়। দর্শক কীভাবে এর দিকে আকর্ষিত হতে থাকল তা আরও আকর্ষনীয় ঘটনা। সিরিয়ালের প্লট এপিসোডিক, তাছাড়াও ছোটো ছোটো কয়েকদিনের সমস্যা টানাপোড়েন বানিয়ে তোলা হয়, তারপর দর্শকের anxiety, আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে নানান মোড় ও তারপর নায়ক-নায়িকার জয় হয়। ফলে যে কোনো নতুন দর্শক যে কোনো মুহূর্তে আকর্ষিত হয় ও গল্পের সঙ্গে সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। এখন নতুন একটি ধরণ এসেছে। ধরা-ছোঁয়ার বাইরের নায়ক বা নায়িকার(এটাই বেশি) সঙ্গে কোনো এক ‘lucky দর্শকের’ দেখা করা, পার্টি করা, কফি বা খাবার খাওয়ার সু্যোগ দেওয়া হয়। আর এই সুযোগ সবসময়ই কোন পণ্যের বিজ্ঞাপণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বাস্তবে তারা কেমন এরকম একটি পাপারাৎজি ঝোঁককে উৎসাহিত করা হয়।

মোটামুটি আটের দশক থেকেই চিঠি লিখে দর্শক দের participation কে আহ্বান ও উৎসাহিত করা হয়। সঙ্গে চালু হয় পুরস্কারের লোভ। আস্তে আস্তে তা বাড়তে থাকে, সশরীরে উপস্থিত থেকে, ফোন করে(বিগ বস), এখন নানান সোসাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মাধ্যমে তা আরোও সহজ। ‘হামলোগ’ সিরিয়াল-এ অশোক কুমার চরিত্র গুলি নিয়ে ক্যামেরায় চোখ রেখে সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে আলোচনা করলেন প্রথম। দর্শককে নিজের সঙ্গে মিলেয়ে সম্বোধন করলেন ‘হামলোগ’(ক্যায়া হোতা হ্যায় আগলে হাফতে ফির দেখেঙ্গে ‘হামলোগ’)।এর বেশ কিছুদিন পর একতা কাপুরের ভীষণ জনপ্রিয় ‘কিঁউ কি শাস ভি কভি বহু থী’(২০০০-২০০৮) তে আদর্শ তুলসী বহু, সেই যে আদরে সোজন্যে ভরিয়ে আমাদের তার পরিবারের অন্দরমহলে হাতছানি দিয়ে নিয়ে গেল এখনো আমাদের সেই ক্ষুধিত পাষাণের ভ্রমপুরী থেকে বাইরে আসা হল না; ক্রমাগত অলিতে গলিতে মেতেই চলেছি। যতই ‘পাগলেরা’ তফাত যাও বলে চেঁচিয়ে মরুক।

যত সরকারি প্রভাব কমেছে ততই দৃঢ় হয়েছে মিডিয়ার ঈশ্বরত্ব। এতটাই যে মিডিয়া ট্রায়ালে রাতারাতি ফাঁসি অব্দি। জনগণকে কে বেশি represent করছে তাই নিয়ে রেষারেষি। গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি ঠিক করছে মিডিয়া। ‘দেশপ্রেম’ কাকে বলে, কে বেশি ‘দেশপ্রেমিক’, কে পাকিস্তান যাবে, কালো টাকা ২০১৬ সালে কোন কোন বেকুব লোক মাটির নীচে রেখে  নিস্তার পায়নি! প্রধানমন্ত্রী কোন সিম কিনতে বলছেন, কোন অনলাইন ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে বলছেন ইত্যাদি স-অ-অ-অ-ব। মানে রাষ্ট্র আর বাজার একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। আর যখনই এরকমটা ঘটে তখন সব কিছুই পণ্য হয়ে যায়। এমনকি মানুষও, তার আবেগও। সব কিছুর-ই দরদাম চলতে থাকে। তখনই গরিব আরও গরিব হয়, ধনী আরও ধনী।

একটু একটু adjust করতে করতে আর কিছুই পাই না। নিজেদের exploited আর  oppressed দশাটাকেই চিনতে পারছি না। আর পাচ্ছিনা যে সেই বঞ্চনার বোধটাও আর কাজ করছে না। যেমন ধরুন, যে ‘সৎ’ তার কোনো কিছুতেই অসুবিধে হয় না, দুষ্টের দমনে সে অংশগ্রহণ করে! যেমন- যতই অসুবিধে হোক কাজ ছেড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অল্প টাকায় কষ্টে সংসার চালাচ্ছে কেউ, কারণ সে জানে অদূরেই সেই ‘কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছ নির্মল ভবিষ্যৎ’; এই সময়টা একটু মানিয়ে নিতে হয়। তাহলে প্রতিবাদ করছে কেন কিছু পাগল? নিশ্চয় কালো টাকায় টান পড়েছে। প্রতি মুহূর্তে আমার পাশের লোকের প্রতি সন্দেহ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। সকলেই সকলকে আড়চোখে দেখছি। এবার সুদিন নিশ্চিত!  আমরা কোরাসে গাইছি আমাদের ‘প্রিয় গান’- ‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও। আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি। যেটা ছিলো না ছিলো না সেটা না পাওয়াই থাক’। সব পেলে নাকি নষ্ট জীবন!!! এই নিজেদের মধ্যেই ধর্ম, কালো টাকা-সাদা টাকায় আমরা ভাগ  আরও ভাগ হয়ে হয়ে যাচ্ছি, ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন আর আত্মকেন্দ্রিক।

সিরিয়ালে অবসর যাপনের মধ্যে আছে একধরণের পলায়নপরতা। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সাংসারিক জগতের বাস্তবিক সমস্যা থেকে দর্শক পালিয়ে থাকে, তা নয়। এই ‘escapism’ মানুষকে বৃহত্তর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং ধনতান্ত্রিক সমাজ তাকে যেভাবে হাতের পুতুল করে ব্যবহার করে বা বঞ্চিত করে , সেই জানা-বোঝার অনুভব থেকেও তাকে আড়াল করে রাখে। এর সঙ্গেই আছে false identification। আমি বাস্তবে যে সমস্যাগুলির কাছে হেরে গেছি বা পালিয়ে বাঁচছি, আমার পছন্দের scripted চরিত্রটি সেই সব জায়গায় জেতে। ঘরেও, বাইরেও। আর এভাবে আমার একরকমের ইচ্ছেপূরণ ঘটছে কাল্পনিক জগতে। যেটা স্বপ্নের কাজ খানিকটা; বাস্তবে অসম্ভব অবদমিত ইচ্ছার পূর্তি ঘটানো। মানে ধরুন, আপনি সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর আবার দীর্ঘক্ষণ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছেন আর প্রায় তিন ঘন্টা পর যেই আপনার সুযোগ এল অমনি টাকা শেষ atm-এ… আপনি ক্লান্ত, রিক্ত হাতে,বিরক্তি, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি এলেন। এসেই দেখলেন আপনার প্রিয় কাল্পনিক চরিত্রটি তার কাল্পনিক লড়াইয়ে জিতে গেল। আপনার ক্ষোভ, ক্লান্তির release ঘটবে। আর তখনি, যারা একই সমস্যায় ভুক্তভোগী তারা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে একা হয়ে গেল। এইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সব সম্ভাবনাও মিলিয়ে গেল। কাল্পনিক জগতের false identification বাস্তবের একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমস্যা আর তার সমাধানে থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিল। যা-ই ব্যক্তিগত, তা-ই রাজনৈতিক।

যে যত বেশি শোষিত তার জন্য এই ফাঁদগুলি তত দৃঢ়। যেমন- নিম্ন আর্থিক বর্গের মানুষ, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং সর্বোপরি মেয়েরা। কোনো নতুন ভাবনা, চিন্তা, যুগোপযোগী গল্প এসব সিরিয়ালে কিচ্ছু নেই। কারণ জনতা গিলতে চায় নতুন মোড়োকে, নতুন ভাবে বলা সেই বস্তাপচা, যুক্তিহীন, প্রাচীন ভাবনা-চিন্তাই, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো how it is represented। যুক্তিগ্রাহ্য concept বা quality নয়। representation, যা বাজার বা বিজ্ঞাপণের মূল কথা।

এবার কিছু দায় আমাদেরও নিতে হবে। যুক্তির ঘরে তালা দিয়ে বসলে হবে না। একটু ব্রেখটিয় বিচ্ছিন্নতাও জরুরি। আমাদের বাড়ির একটি ছেলে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল, একদিন হঠাৎ সে গুম হয়ে গেল। সবাই চুপচাপ। Gen Y এর ‘youth’-রাও ‘Bloody cool’? একটু স্বপ্নপুরী থেকে জেগে উঠে দেখুন ক্রমশ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে আমাদের। সব কিছুর সঙ্গে আর adjust করবেন না। মন ভালো, মন খারাপ, বিনোদন, একাকীত্বের সমস্যা বা একান্নবর্তী পরিবারের সমস্যা, বাস্তব সমস্যা থেকে পালানোর জন্য বা ‘নিষ্কর্মা অবসর’ যাপনের জন্য সিরিয়াল একমাত্র option নয়।  একটি সাহারা গ্রুপের চ্যানেল,সাহারা ওয়ান-এর tagline – মোহ লে আপকা মন। সব চ্যানেলরই গোপন উদ্দেশ্যটিও তাই। দয়া করে মোহগ্রস্ত হবেন না।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s