কুর্দিস্তান – একটি প্রতিবাদী স্পর্ধা

লিখেছেন সন্দীপ মুন্সী ।

“ওরা আমাদের ভয় পায়। কারণ ওরা মনে করে কোনো মেয়ের হাতে ওদের মৃত্যু হলে ওরা দোজ্‌খে পচে মরবে। আর আমরা ঠিক এই কারণেই ওদের ভয় পাই না।”

এই বক্তব্য কোবানি শহরে আইএসাইএস-এর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এক YPJ গেরিলা দলের মহিলা সৈনিকের। এক পশ্চিমি সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে এই কথাগুলোই বলেছেন তিনি। বর্তমানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর ইসলামিক স্টেটের মত বৃহৎ মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে ফ্রন্টলাইন তা আগলাচ্ছেন এই কুর্দি স্বাধীন বাহিনিগুলি SDF-এর অংশ হিসেবে ও একের পর এক শহর তারা কেড়ে নিচ্ছেন আইএসাইএস-এর কাছ থেকে। কুর্দিদের দীর্ঘ কয়েক দশকের স্বাধীনতা স্পৃহা, লড়াইয়ের ঐতিহ্য তাদের এই নতুন লড়াইয়ে যোগাচ্ছে অপরিমেয় জেদ।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্ত্বে তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা যে সংগ্রাম শুরু করে তা পরে জন্ম দিয়েছিল তুর্কি প্রজাতন্ত্রের। সেভ্‌রেসের চুক্তি অগ্রাহ্য করে এই তুর্কি প্রজাতন্ত্র ১৯২৩ খ্রীঃ নতুন চুক্তি সাক্ষর করে – লুসেন-এর চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে তুর্কি সমগ্র আনাতোলিয়া পেনিনসুলার অধিকার পায়। এর মধ্যে একটা বৃহৎ অংশ ছিল কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর বাসভূমি। লুসেন-এর চুক্তিতে কুর্দ-দের দীর্ঘ দিনের স্বাধীনতা অ স্বায়ত্ত্ব শাসনের দাবিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল।

তুর্কি ছাড়াও এই দেশহীন কুর্দরা ছড়িয়ে ছিল ইরাকে, সিরিয়ায় ও ইরানে। ১৯২০-৩০এর দশকে তুর্কিতে নিজেদের স্বায়ত্ত্ব শাসন আর স্বাধীনতার দাবি নিয়ে কুর্দরা সংগ্রাম শুরু করলে তা দমন করা হয় ভয়ানক অত্যাচারের মাধ্যমে। বিপুল সংখ্যক কুর্দ তুর্কি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। কুর্দি ন্যায় ও সামাজিক প্রথা আইনবলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কুর্দ ভাষাকে সীমাবদ্ধ করা হয় ও তুর্কিতে কুর্দ-দের ‘পাহাড়ি তুর্কি’ নাম দিয়ে তাদের গোষ্ঠীগত পরিচয়ও ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। তা সত্ত্বেও কুর্দদের স্বাধীনতা স্পৃহা, তাদের রাষ্ট্রের দাবিকে দমানো যায়নি।

১৯৮০’র দশকের মাঝামাঝি কুর্দি জাতীয়তাবাদের সাথে মেলে সাম্যবাদের ভাবাদর্শ যা পরিণত রূপ পায় ১৯৮৪ খ্রীঃ Kurdistan Workers’ Party গঠনের মাধ্যমে। এই PKKএর মাধ্যমে অবদমিত কুর্দরা তাদের প্রতিবাদকে পূর্ণ রূপ দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল। শুরু হল তাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক দীর্ঘজীবি অধ্যায়। ১৯৭৮ সালে কিশ নামের গ্রামে আব্দুল্লা ওকালানের নেতৃত্বে একদল কুর্দি ছাত্র সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হল। কুর্দি জাতীয়তাবাদ আরো সুদৃঢ় হল তার সাথে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের ভাবধারার সংযুক্তির মাধ্যমে। ওই সময়ে তুর্কিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে PKK তুর্কি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। ১৯৮০ সালে তুর্কিতে ক্যু-কে কেন্দ্র করে প্রশাসন ব্যাপক দমন পীড়ন শুরু করে। PKK-এর সদস্যদের খুন করা হয়, কারাবন্দী করা হয়, অনেকে সিরিয়া ও ইরানে পালিয়ে যায় ও সেই সব অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে দেয় নিজেদের বিপ্লবের কথা। ইরান, সিরিয়ার কুর্দিরাও ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হয় PKKএর আদর্শ সংগ্রামের দ্বারা এবং ১৯৮৪এর মধ্যে PKK পরিণত হয় একটি আধা সামরিক বাহিনীতে। তুর্কি, ইরান, ইরাক, সিরিয়ায় একের পর এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। PKKএর সংগ্রামের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলে তুর্কি দমন পীড়ন। বেড়ে চলে PKKএর শহীদের সংখ্যা। দীর্ঘ দিন ধরে নিপীড়িত কুর্দিদের মন থে দাসত্ব ও ভয়ের ধারণা টেনে বার করে PKK ঢুকিয়ে দেয় স্বাধীনতার স্বপ্ন, ও এই স্বাধীনতার ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয় নারীদের। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক স্বাধীনতা। তারা প্রচার করে যে নারীদের মুক্তি না ঘটলে প্রকৃত স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব নয়। দলে দলে ক্ররদি নারীরা যোগ দেয় PKKএর গেরিলা বাহিনীতে। লড়াই চালাতে থাকে তুর্কির পাহাড়ে পর্বতে তাদের পুরুষ কমরেডদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এই মহিলারা একদিকে যেমন লড়াই করছিলেন তুর্কি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, অন্যদিকে তেমনি তাঁদের লড়তে হচ্ছিল পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও শোষণ্মূলক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। গঠিত হয় Free Women’s Unit বা YJA Star।

কোনো বিদেশী শক্তির সাহায্য ছাড়া, শুধুমাত্র দীর্ঘ কয়েক দশকের স্বাধীনতার স্বপ্নকে সম্বল করে লড়াই চালাতে থাকে PKK। ১৯৯০এর দশকে তাদের সংগ্রাম চরম রূপ ধারণ করে। তুর্কি এবং সিরিয়ার মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটলে PKK সিরিয়ায় তাদের ঘাঁটিগুলো ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ও তীব্রতর সংগ্রাম চালাতে ধুরু করে। বাড়তে থাকে শহীদের সংখ্যা। হাকি কারের, কেমাল পীর, ফেরহাত কুরত্যে, মাহির কায়ান্ সহ আরো অনেকে। তুর্কি সাম্রাজ্যবাদের শত্রু PKK নেতা অকালানকে স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদেরশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। শেষ পর্যন্ত ইসরালেয়ের বিশেষ বাহিনী মোসাদের সহযোগিতায় ওকালান ধরা পরে ১৯৯৯ সালে। প্রথমে বিচারে তাকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। যদিও পরে তুর্কি সাম্রাজ্যবাদীরা এই সিদ্ধান্তের ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা চিন্তা করে ওকালানকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করে।

কুর্দিদের দীর্ঘ দিনের সংগ্রামের ফলে শেষ পর্যন্ত তুর্কি মতবাদের কিছু কিছু কুর্দ বিরোধী আইন শিথীল হতে শুরু করে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ ও ‘পুনঃসংযোগ’-এর নাম দিয়ে। কুর্দি ভাষায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয় এবং সীমাবদ্ধতা সংক্রান্ত আইন বাতিল করা হয়। অন্যদিকে তুর্কি সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী বেশ কিছু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন PKKকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ও সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্নিত করে। ২০০৪এর ২রা এপ্রিল Council of European Union PKK-কে তাদের সন্ত্রাসবাদী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। মার্কিনি ত্রেজারি আমেরিকায় PKK ও তার সহযোগীদের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

PKK ও কুর্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তুর্কি প্রশাসনের এই ভিক্ষার দান নিতে রাজি ছিল না। তারা তাদের নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিল। কুর্দি কবি শেরকো বেকাস লিখলেন,

“আমাদের মধ্যে এখনো বীজ লুকিয়ে আছে

কখনো বাতাস তাকে নিয়ে যায়, কখনো ফেরত নিয়ে আসে

তারা উড়ে যায় তৃষ্ণার্ত পাহাড়ে।

লুকিয়ে থাকে পাথরে পাথরে।

তারপর প্রথম বর্ষা

দ্বিতীয় বর্ষা

তৃতীয় বর্ষা

তারা বেড়ে ওঠে আবার।

আমরা অরণ্য এখন।

আমরা অযুত এখন।”

ইতিমধ্যে হেল্মন্দে নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদের হস্তক্ষেপ জাগিয়ে তুলেছে এক দানবকে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে আবির্ভাব ঘটেছে মৌলবাদী ইসলামিক স্টেটের। ধীরে ধীরে তৈল সম্পদের কালোবাজারির সাহাযে নিজেদের পরিণত করেছে ভয়ঙ্কর শক্তিতে। শুরু করেছে খলিফাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। মার্কিনি মদতপুষ্ট ইরাকি বাহিনী যখন পিছু হঠছে আইএসাইএস-এর আক্রমণের মুখে, ঠিক সেই সময়েই আইএস বিরোধী লড়াইয়ের ফ্রন্টলাইন আগলাতে এগিয়ে আসে কুর্দরা। ২০১৪’র জুলাইতে প্রথম PKK মুখোমুখি হয় Islamic State of Iraq and Levant (ISIL)-এর। আইএস-এর বেষ্টনীর মধ্যে থেকে উদ্ধার করে হাজার হাজার ইয়াজিদিদের। তুর্কি প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে আইএস বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। সিরিয়ার কুর্দি People’s Protection Unit (YPG)এর সাথে জোট বেঁধে এখন আইএস বিরোধী ঘাঁটি আগলাচ্ছে PKKএর গেরিলারা।সংগ্রামে যোগ দিয়েছেন তুর্কির কুর্দি সংগ্রামীরা। সত্যি হচ্ছে বেকাস-এর কবিতার লাইন –

“রাত এগারোটার পর

শুধুমাত্র একটি শব্দ, একটি শব্দই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে শহরে।

প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পর্বতে

আর বিষের দরিয়ার মাঝে বয়ে যাচ্ছে জীবনের একটি মাত্র তরী

শুধু একটাই শব্দ

রাত এগারোটার পর

ঘরের বাদ্যযন্ত্রটিতে বাজছে

রাইফেল ও পেশমারগাদের গান…”

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s