আরেকটি প্রভাতের ইশারায়

লিখেছেন  সৌম্যজিৎ রজক ।

১.

বাংলায় বিজয়া দশমী সেইদিন। হিন্দিতে দশেরা। মৃত্যুদিন রাবণের। মঞ্চ বাঁধা হয়েছিলো লখনৌ-এ। বাচ্চারা মঞ্চস্থ করেছিলো তুলসিদাসী রামায়ন। দর্শকাসনে আরও অনেকের সাথে তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। একটু পরেই রাবণের কুশপুতুলে ছুঁড়ে মারা হবে রকেট। অগ্নিসংযোগ এবং পুড়ে মরবে রাক্ষসরাজ। উল্লাসে ফেটে পড়বে তার শরীরে লুকনো বাজি, ফটকা, আসমুদ্রহিমাচল। এবছর দশেরায় অশুভশক্তির প্রতীক রাবনের কুশপুতুলে আগুন ছুঁড়ে মেরেছেন স্বয়ং প্রাইম মিনিস্টার।  রাবণ বধের প্রাক্কালে লখনৌতে তাঁর ভাষণ, স্বাভাবিক কারণেই, ছিলো স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন যে কড়া নাড়ছে নাগপুরের দরজায়! অতয়েব, ‘জয় শ্রী রাম’! হিন্দুমর্যাদাপুরুষোত্তম রামচন্দ্রের রূপকেই মঞ্চে তখন দণ্ডায়মান আমাদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে’র রাষ্ট্রনায়ক। একে একে হাতে তুলে নিচ্ছেন ধনুক, গদা, সুদর্শন চক্র। চাকতির খেল দেখতে চাইছে ভারতবর্ষ …

 আমাদের এসব দেখতে বেশ মজা লাগে। গা গরম হয়ে যায়। দুই হাতে টিউবওয়েল উপড়ে নেন সানি দেওল। প্রচণ্ড আক্রোশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারেন সব শালা পাকিস্তানিদের। আমরা টানটান হয়ে যাই। চার আঙুলের নখ চেপে বসে তালুতে। মুঠো শক্ত হয়ে আসে। এমনই সময় কানে আমাদের গরম তেল ঢেলে দেয় কেউ, “দুধ মাঙ্গোগে তো ক্ষীর দেঙ্গে/কাশ্মীর মাঙ্গোগে তো…”! কান দিয়ে উত্তাপ পাচার হয় মগজে। শরীরের সবকটা শিরা ফুলে ওঠে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ আমরা ছাপোশা ছাদে গিয়ে টাঙিয়ে দিই জাতীয় পতাকা। আমাদের স্বাধীনতা পতপত করে হেমন্তের হাওয়ায়। উড়তে থাকে প্রিয়তম অশোকচক্র। অশোকচক্রই তো? নাকি সুদর্শন? আগের দৃশ্যেই যা ধারণ করলেন প্রধানমন্ত্রী। আমাদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের প্রতীক আর ‘হিন্দুত্বে’র চিহ্ন… গুলিয়ে যাচ্ছে আমাদের কাছে।

২.

আমরা ছোট থেকে শিখেছি, দেশকে ভালোবাসতে। কেননা সে “সকল দেশের সেরা”। বাকিরা আমাদের চেয়ে ‘কম ভালো’ কিংবা ‘খারাপ’। বাকিরা নিম্নমানের। বাকিদের হারাতে না পারলে আমরা তো জিততে শিখিনি কখনো। শিখিনি নিজের দেশকে ভালোবাসতে। পারিনি বলতে, আমার মা মাধুরি দিক্ষীতের মতো সুন্দরি নয়, তবু সে আমারই মা। আমি তাকে ভালোবাসি। আমার মা যখন আই.সি.সি.ইউ-তে পাঞ্জা লড়ছে মৃত্যুর সাথে, গোড়ালিতে ভর দিয়ে দরজার চৌকো কাঁচটুকু দিয়ে আমি তখন দেখছি মাকে। দেখছি পাশের বেডে ঐ যে ভদ্রমহিলা! মায়ের আরোগ্যের আগে পাশের মহিলার মৃত্যুকামনা করেছি কি কখনো? দেশমাতৃকার বেলায় কেন তবে অন্য দেশকে ঘৃণা করতে হবে আগে? ২০১৬-র ভারতবর্ষে সে প্রশ্ন তুলছি না সচেতনভাবেই। আমরা তো ‘বর্ডার’-‘গদর’ দেখে শিখে গেছি, নিজের দেশকে ভালোবাসার আবশ্যিক প্রাক্‌শর্ত ওটাই। পাকিস্তানিদের ফেলে ক্যলানো অবশ্য কর্তব্য। দুইহাতে উপড়ে ফেলা টিউবওয়েল দিয়ে পিষে মারতে হবে ওদের। আজ ছাদে নিজের দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়েই, তাই, তৃপ্ত হয় না আমার দেশপ্রেম। আমি খুঁজতে বেরোই দুশমনদের। এগলি-অগলি গরু খোঁজা খুঁজেও এক পিস্‌ পাকিস্তানি পাই না যদিও। এখন অতৃপ্ত দেশপ্রেম নিয়ে, আমার ক্ষুধার্থ তাড়না নিয়ে আমি কোথায় যাবো, মিস্টার দেওল? কসাইমহল্লায়? ওখানে মুসলমানেরা থাকে, পাকিস্তানিদের সাথে ধর্মের মিল ওদের। আমরা তো শিখেছি, ধর্মই মানুষের প্রকৃত চামড়া। আসল পরিচয়। অতয়েব ওরাই আমাদের শত্রু। দেশের শুত্রুকে না ক্যলালে আমি দেশকে ভালোবাসবো কীভাবে, মাননীয় আদবানিজি? তাই দুটো ঢিল ছুঁড়ে আসি ওপাড়ার বাবরি মসজিদে! এপাড়ার ক্লাবঘরের সান্ধ্য আড্ডায়, আজ থেকে বরং, প্রবেশ নিষিদ্ধ করি সোহেল-সোয়েবের। প্রতিদিন সকালে নাহয় উঠে পড়ি লোকাল ট্রেনে। আসুন, কামরায় কামরায় ছড়িয়ে দিতে থাকি বিষ। ধর্মের পবিত্র প্যাকেটে। জমে উঠুক আমাদের দেশভক্তি। মা, মাগো ভক্তি দাও মা আরও!

 এত ভক্তি লইয়া তুমি কি করিবে? ভারতমাতার নাম করিতে করিতে ধেয়ে যাবো, সন্তোষিমাতার নাম লইয়া ঝাঁপিয়ে পড়বো। আর যে ঘর থেকে বেরোবে মুসলমানেরা, উস ঘরমে ঘুসকে মারেঙ্গে! যে মুসলমান জন্মায়নি এখনো, তার ঘর – তার মাতৃগর্ভ। তরোয়ালের শীর্ষে গেঁথে আঠা-আঠা-জেলি-জেলি ভ্রূণ টেনে বের করে আনবো প্রচণ্ড সূর্যালোকে। ফিরিয়ে আনবো রামরাজ্য। ম্লেচ্ছহীন এক দেশ। সে বড়ো সুখের সময় ছিলো। সে ছিলো বড়ো আনন্দের সময়। এত সমৃদ্ধি যার কোনও ইয়ত্তা ছিলো না। গোলায় ধান ছিলো, হেঁসেলে দ্রৌপদী। আঁতুড় ঘরে ছিলো প্লাস্টিক সার্জারির ইন্তেজাম। হাতির পেচ্ছাপ আর এটা-ওটা মিশিয়ে উড়ে বেড়াতো ২০০ ফুট বাই ২০০ ফুটের এরোপ্লেন। এই ছিলো হিন্দু সভ্যতা। এটুকু বলেই থেমে গেলে গল্প জমছে না ঠিক। এতক্ষনে প্রমান হয়েছে হিন্দুদের কীর্তি; মুসলমানের অপকীর্তি প্রমান না করতে পারলে ক্লাইম্যাক্স জমবে না। গজনির মামুদ কবে সোমনাথের মন্দির ভেঙেছিলো, বলতে হবে অনর্গল। বলতে হবে, ওরা এসে সব তছনছ করে দিলো। এমনকি আমাদের আদি এয়ারপোর্টগুলোও, যেখানে উঠতো-নামতো পুষ্পক জেট। ঠিক যেভাবে সেমেটিকরাই (ইহুদি) রোম সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ি। আর্য সভ্যতার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ রোম সাম্রাজ্য অধঃপতিত হয়েছিলো ওদের সাথে মেলামেশার জন্যই। ঠিক যেভাবে ইহুদিদের তাড়িয়েছিলেন মহামতি হিটলার, সেভাবেই তাড়াতে হবে মুসলমানদের এই দেশ থেকে। বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলছি না, স্যার। আপনাদের বীর সাভারকারের প্রেসক্রিপশনে একথাই লেখা আছে। লেখা আছে, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করার আগে ঘৃণা ছড়াতে হবে অন্যের বিরুদ্ধে। যেভাবে জার্মানির একদল বিজ্ঞানিকে (পড়ুন একপাল ভেঁড়াকে) জড়ো করে তত্ত্ব নামানো হয়েছিলো বাজারে – আর্যরা এসেছে শিম্পাঞ্জি থেকে আর বাকিরা গরিলার বংশধর। স্বভাবতই আর্যরা প্রাণি হিসেবেই বাকিদের থেকে উন্নতমানের। বীরভোগ্যা বসুন্ধরাকে তারাই, তাই, শাসন করতে পারে। আর্য বিজ্ঞানি আর উন্মাদদের যাবতীয় এক্সপেরিমেন্টে গিনিপিগ হবে বাকিরা। ইহুদি, ক্যাথলিক, স্লাভ প্রমুখ। সেপথেই আলো জ্বেলে এদেশেও জমে উঠবে হলোকাস্ট। সারজিকাল স্ট্রাইক হবে কাশ্মীরে; আর মুসলামের ঘর থেকে আসা ছাত্র নিখোঁজ হয়ে যাবে দিল্লীতে। মুম্বইতে নিষিদ্ধ হবে পাকিস্তানি শিল্পীর সুটিং। ১৪৪ ধারা জারি হবে আমাদের পাড়ায় পাড়ায়। মোহর্‌রমের তাজিয়া-দুর্গা ভাসানে বেড়ে চলবে উত্তেজনার পারদ। হোয়াটসঅ্যাপে ভেসে আসবে ঘৃণা, আসবে ভক্তিও। এতঃপর আমরা মনে রাখবো, হাজার বছর আগের প্লাস্টিক সার্জারি আর এরোপ্লেন। আর ভুলে যাবো, গতকালই বন্ধ হয়ে গেলো হিন্দুস্তান ক্যাবলস, সেইল-এর একটার পর একটা শাখা বিক্কিরি হয়ে গেলো ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’য়। জি-নিউজে দেখবো আমরা, কীভাবে সার্জিকাল স্ট্রাইকের তদারকিতে সারারাত জেগে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। খবর রাখবো না, পাশের মহল্লায় পেটে গমছা বেঁধে ঘুমিয়ে পড়েছে বন্ধ কারখানার শ্রমিক। শিশুটিও শুয়ে আছে পাশে, বধূটিও আছে।  ভুলে যাবো, ৩ লাখ কৃষকের আত্মহত্যা। মুছে ফেলবো, দীর্ঘ-দীর্ঘতর হতে থাকা বেকার তালিকা। মন দিয়ে শুনবো, মনকি বাত!

৩.

“ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে যখন পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।” প্রধানমন্ত্রী বলেছেন লখনৌ-এর মঞ্চ থেকে সেইদিন। প্রশ্ন করতে সাধ জাগে, কী করে চিনবো স্যার সেই মহেন্দ্রক্ষণ? যখন ‘অনিবার্য’ হয়ে ওঠে যুদ্ধ! আপনার পয়লা নম্বর শত্রু কমিউনিস্টরা এককালে একভাবে এই প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো। “যখনই জনতা চায় বস্ত্র ও খাদ্য / সীমান্তে বেজে ওঠে যুদ্ধের বাদ্য”! আজ ফের দামামা শুনতে পাচ্ছি আমরা শর্‌হদে। আপনিও বলছেন, সেই মহেন্দ্রক্ষণটির কথা যখন কিনা যুদ্ধ হয়ে ওঠে ‘পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা’। আর আমরা মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছি, আপনার এই বক্তৃতার আগেরদিনই প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সমীক্ষার রিপোর্ট। গ্লোবাল হাঙ্গার ইন্ডেক্স ২০১৬ জানাচ্ছে, ১১৮টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আমাদের স্থান ৯৭। জানাচ্ছে, দেশের ৪০% পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুই ভুগছে অপুষ্টিতে। যদিও এই দেশের শিশুদের জন্যই চালু আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো দুটো খাদ্য প্রকল্প। আঙ্গনবাড়ি আর মিড ডে মিল। দুক্ষেত্রেই গত দু’বছরে খরচ কমিয়েছে সরকার। মিড ডে মিলে তো শেষ বাজেটেই ব্যয়বরাদ্দ কমেছে ৩২%। ক্ষুধা বাড়ছে ভারতবর্ষের, বাড়ছে অনাহার-অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর হার। বেড়েই চলেছে বেকার সংখ্যা। লকআউট কারখানার গেট। ডিজিটাল ভারতে বেড়ে চলেছে চাল-ডালের বাজার দর। কমছে আয়। মজুরি। সামাজিক সুরক্ষা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সামাজিক সুরক্ষার সবকটি ক্ষেত্র থেকে হাত ঝেড়ে ফেলছে সরকার। পকেটে পুরে নিচ্ছে। পকেট থেকে মুঠো ভর্তি মোহর বের করে তুলে দিচ্ছে কর্পোরেটদের হাতে। আর এ তো স্রেফ আমাদের মহান ভারতবর্ষের কথা নয়! ২০০৯ সালে কাদায় মুখ থুবড়ে পড়া বিশ্ব পুঁজিবাদ ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। মুক্তি চাইছে। চাইছে উড়তে। কিন্তু তার ঠোঁট উঠলেই, কাদায় পড়ে যাচ্ছে লেজ। লেজ তুললেই ঠোঁট আঁটকে যাচ্ছে কাদায়। ১৯৩৯ সালে পুঁজিবাদের মহামন্দা দেখে এই উপমাই দিয়েছিলেন যোশেফ স্তালিন। প্রথমের দিকে সেই ঐতিহাসিক মহামন্দার সাথেই তুলনা করা হচ্ছিলো ২০০৯-এর সংকটকে। কিন্তু ক্রমাগত বোঝা যাচ্ছে, আজকের সংকট হার মানিয়েছে অতীতের তামাম পুঁজিবাদী সংকটকে। পুঁজিবাদের মাথারা মাঝে মাঝেই “সংকট ফুরিয়ে গিয়েছে” বলার চেষ্টা করলেও, চাদরের তলা দিয়ে বেরিয়ে পড়ছে পা। মাথা, মুখ ঢেকে রাখা যাচ্ছে না আর। চাপের মুখে, অন্য কেউ নয়, ‘ইন্টারন্যাশনাল মনিটারিং ফাণ্ডে’র মতো সংস্থাও স্বীকার করে নিতে বাধ্য হচ্ছে সত্যতা। ২০১৫ সালে আই.এম.এফ-এর প্রতিবেদন (‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক আউটলুক’) জানাচ্ছে, “…আরও বেশি ঝুঁকির দিকেই পরিস্থিতিকে সূচীত করছে। …২০১৫ সালের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক বৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।… ২০১৫ সালে সামগ্রিকভাবে ৩.১% বৃদ্ধিকেই লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধার্য করা হয় যা ২০১৪ সালের তুলনায় ঈষৎ কম…। ২০১৪ সালের গোটা বছর জুড়েই আন্তর্জাতিক শিল্পোৎপাদন দুর্বল হয়েছে। …২০১৫ সালের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণও হ্রাস পায়। …২০০৮-২০১৪ এই সময়পর্বে উৎপাদন বৃদ্ধি উভয়ই অনেক হ্রাস পায়। …উৎপাদন বৃদ্ধির নিম্নহারের অর্থ দাঁড়ায় বেকারত্ব এখনও অনেক বেশি।” ভারতের দিকেই তাকিয়ে দেখি! দেশের ৮টি শ্রমনিবিড় শিল্পক্ষেত্রে (যেখানে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন) গত ১৫ বছর ধরে ক্রমাগত কর্মসংস্থান কমেছে। এই ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম কর্মসংস্থান হয়েছে ২০১৫ সালেই। প্রতিবছর ভারতে শ্রমের বাজারে ভিড় করে ১.৩ কোটি কর্মপ্রার্থী। বেকার। আর প্রতি বছর গড়ে কাজ পাচ্ছে ১.৩ লক্ষ। যারা কাজ পাচ্ছে, তারাও স্থায়ী ধরণের কাজ পাচ্ছেন না। দেশের ৯৩% শ্রমিক-কর্মচারীই ঠিকাভিত্তিতে কাজ করছেন। কন্ট্রাক্টচুয়াল। জীবন-জীবীকার নেই কোনো নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা। নেই কাজের সময় বা কাজের জায়গার কোনো স্থায়ীত্ব। ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, লাট খেতে হচ্ছে কাটা ঘুড়ির মতো। বাড়ছে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হুহু করে। সারা দুনিয়াজুড়েই কাজের খোঁজে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে কর্মপ্রার্থীদের। বিশ্বে বাড়তে থাকা উদ্বাস্তুদের ঢল কার্যত শ্রমের বিশ্বায়নকেই তরান্বিত করছে। আর বিপরীতক্রমে বিভিন্ন দেশের বেকারের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া যাচ্ছে উদ্বাস্তুবিদ্বেষ। ওরা অন্য দেশ থেকে এসে আমাদের কাজের বাজার দখল করে নিচ্ছে! তাই তাড়িয়ে দিতে হবে ওদের! এই গণ-মানসিকতা যত চাড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে, লাভ হচ্ছে ততই। দু’মুখে। এভাবে চোখ ঘুরিয়ে দিতে পারলে, একদিকে, নিজের দুর্দশার আসল কারণ খুঁজতে ভুলে যাচ্ছে মানুষ। আরেকদিকে তীব্র অভিবাসনবিরোধীতাকে রাজনীতির কেন্দ্রে এনে দেশে দেশে শক্তি বাড়াতে পারছে উগ্র-দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলো। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রপতির কথাই বা শুধু বলি কেন? উগ্র-দক্ষিণপন্থী বা ফ্যাসিস্টধর্মী দলগুলোর প্রতিনিধিরাই ২০১৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ১/৪ ভাগ দখল করেছে। হাঙ্গেরিতে কট্টর-দক্ষিণপন্থী (অভিবাসী-বিরোধী)’রা সরকার চালাচ্ছে। নেদারল্যাণ্ডে একইধরণের শক্তি ‘ফ্রিডম পার্টি’র গণভিত্তি বাড়ছে ক্রমাগত। ফ্রান্সে আগামী বছর এপ্রিল-মে মাসে নির্বাচন। তার আগে ‘মোদি-ঝড়ে’র মতোই প্রায় ঝড় তোলা হচ্ছে সেখানে ‘ন্যাশনাল পার্টি’র অনুকূলে। শক্তি বাড়ছে গ্রীসে ‘গোল্ডেন ডন’, জার্মানিতে ‘অল্টার্নেটিভ ফর ডয়েশ্ল্যান্ড’-এর মতো দলের। বিশ্বজুড়ে উগ্র-দক্ষিণপন্থার এই ব্যাপক শক্তিসমাবেশে আমাদের দেশ সামিল হবে না শ্রীমান মোদির নেতৃত্ত্বে, তাই কি হয়? কাদায় পড়া বিশ্ব পুঁজিবাদ তার শরীরের সামনের দিকটা টেনে তুলতে চাইছে। মানুষের ওপর লুন্ঠন বাড়িয়ে, কর্পোরেটদের হাতে সমস্ত সম্পদ তুলে দিয়ে মুক্তি পেতে চাইছে সংকট থেকে। সহজাত প্রতিবর্তক্রিয়ায় আয় কমছে সাধারণ মানুষের, বাড়ছে দুর্দশা। চাহিদা কমে যাচ্ছে বাজারে। কমে যাচ্ছে তার উৎপাদন। শরীরের পেছন দিকটা লেপ্টে যাচ্ছে কাদায়। চাহিদা বাড়াতে গেলেই, লেজ কাদা থেকে তুলতে গেলেই, মুখ থুবড়ে পড়বে সে। এই অনিবার্য উভয়সংকট থেকে বেরোনোর পথ কী? উৎপাদন বাড়াতে হবে এমন পন্যের যার চাহিদা আছে। চাহিদা কীসের আছে? কীসের চাহিদা চাইলেই তৈরি করা যায় সহজে? ‘অস্ত্র’ ছোট্ট শব্দ। ‘যুদ্ধ, যুদ্ধ’ রব তুলতে পারলেই সৃষ্টি করা যায় তার চাহিদা। ব্যাপক চাহিদা। ’৩৯-এর মহামন্দার প্রেক্ষিতে বাঁধিয়ে ফেলা গিয়েছিলো বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু, হায় হাসি, হায় দেবদারু! ইতিমধ্যে, পুঁজিবাদ ভেঙে ফেলেছে তার যত জাতির সীমানা। ‘ফিনান্স পুঁজি’র সামনে জুড়ে বসেছে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি। লগ্নী পুঁজি এক দেশের শেয়ার বাজার বন্ধের আগে চলে যায় অন্য দেশে। দালাল স্ট্রিট থেকে ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত রচিত হয়েছে তার কায়ব্যূহ। তাহলে উপায়? সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ না হোক, আঞ্চলিক যুদ্ধ বাঁধানোর আয়োজন করো! ভারত-পাকিস্তান যেমন! কল্পিত নয়; পরিকল্পিত এই যুদ্ধ-যুদ্ধ আবহাওয়া। ঘটা করে সীমান্তে বেজে উঠছে যুদ্ধের বাদ্য! উপরন্তু, এই যুদ্ধবাজ দুনিয়ায় কে কত বড়ো মস্তান তার ওপরে নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কার কত বাজারদর! আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যাণ্ডের সাথে উত্তর চীন সাগরে কলার তুলে ঘুরে বেড়াবে ভারতীয় নৌবাহিনী… এও কি বড়ো কম খোয়াব? তদুপরি দেশে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়াতে পাকবিরোধী যুদ্ধ-যুদ্ধ প্রস্তুতি জরুরি। এর জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক স্তরে শক্তিশালী সমর্থন। সব কিছু আজ তাই মার্কিন-করকমলেসু। ভারতবর্ষকে তার এতদিনকার অবস্থানের বিপ্রতীপে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপারে ভারত আগাগোড়াই প্যালেস্টাইনের মুক্তিযুদ্ধের সাথী। শুধু সংহতি নয়, যৎসামান্য খড়কুটো নিয়ে তার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে সে। আজ ইজরায়েলি আগ্রাসনের দিকে ঝুঁকে পড়া ভারতীয় বিদেশনীতির একদিকে অবশ্যই আছে ‘হিন্দুত্বে’র রাজনৈতিক মতাদর্শ; আরেকদিকে অনিবার্যভাবেই রয়েছে মার্কিন-সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ভারত সরকারের অমোঘ টান। এই চৌম্বকিয় শক্তিতেই সই হয়ে গেলো লজিস্টিক চুক্তি। ভারতবর্ষের তিন বাহিনির যেকোনো ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে গেলো আমেরিকান সেনাবাহিনি। এরপরও কি আমরা বুঝতে পারছি না, কেন এত যুদ্ধের শোরগোল জানলা দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের ঘরে ঘরে? শরীরে, মজ্জায়! চ্যানেলে চ্যানেলে নিপুন দক্ষতায় বাজানো হচ্ছে যুদ্ধের প্রিলিউড। খবর কাগজগুলো আমাদের বাড়িতে এসে পৌঁছোচ্ছে, যেন যুদ্ধের চরম ঘোষণাপত্র।

৪.

যুদ্ধ ছড়ানোর কাজে, যুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠনই শুধু না – জনতাকে উন্মত্ত করে তুলতে মূলধারার সংবাদমাধ্যম চিরকালই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসে। একুশ শতকীয় ভারতীয় মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যে সেই ঐতিহ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী, সে কথা আর আলাদা করে নাই বা বললাম! মড়ার ওপর খাড়ার ঘা এখন, বাজারে এসেছে হোয়াটস্‌অ্যাপ, ইউটিউব, ট্যুইটার, ফেসবুক প্রমুখ প্রমুখ। যুদ্ধোন্মাদনা ছড়াতে যে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে ‘রাতদিন-সাতদিনে’র নিউজ-চ্যানেলগুলোকে। আমরা বলছি, শতাব্দী প্রাচীন এক গল্প। স্পেন ঢলে পড়ছে পশ্চিমে, তার শক্তি কমতে কমতে মিলিয়ে যাচ্ছে সেসময়। আর শক্তি বাড়ছে দুনিয়ার উঠতি মাস্তান আমেরিকার। নিভু-নিভু স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদ আর জ্বলতে শুরু করা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের মধ্যে টক্কর দিচ্ছে। কিউবা, ফিলিপাইনস, পুয়ের্তোরিকো… কেকের টুকরোগুলো নিজের প্লেটে তুলে নেওয়ার জন্য মাত্র সাড়ে তিনমাস চলেছিলো স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ। স্পেন তার উপনিবেশগুলো (কিউবা, ফিলিপাইনস, পুয়ের্তোরিকো)’র ওপর ব্যাপক জুলুম চালাচ্ছে। ‘আমেরিকার পবিত্র কর্তব্য’ সেখানকার মানুষকে ‘রক্ষা’ করা… এভাবেই যাস্টিফাই করতে হবে যুদ্ধকে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে। আমেরিকার সাধারণ লোকেদের বোঝাতে হবে, কেন আমেরিকার ‘যুদ্ধ করা উচিৎ’, কেনই বা এই যুদ্ধে ‘ঝাঁপিয়ে পড়া উচিৎ সাধারণ আমেরিকানদের’!  ১৮৯৯ সাল; স্বভাবতই ‘মিডিয়া’ বলতে এত এত মাধ্যম ছিলো না শাসকের হাতে। ছিলো না আজকের মতো জটিল এবং বহুস্তরীয় নেটওয়র্ক। তখন ছিলো পাতি খবর কাগজ। পাঠকসংখ্যা ব্যাপক, কেননা দাম মাত্র ‘ওয়ান পেনি’। অতএব সংবাদপত্রগুলির কাঁধেই ন্যস্ত হলো দায়িত্ব। নিউইয়র্কের  ‘আনন্দবাজার’ তখন দুটো কাগজ। ‘নিউ ইয়র্ক জার্নাল’ আর ‘নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’। দুজন বাঘা বাঘা সাংবাদিক-সম্পাদক দুটো সংবাদপত্রের মাথায়। প্রথমটায় পুলিৎজার, অন্যটায় হার্স্ট। হার্স্ট তো ‘দ্য ইয়েলো কিড’ কার্টুন ছেপেই বাজার কাত করে ফেলেছেন। পুলিৎজারও কঠিন প্রতিযোগী। একজন দু’ আউন্স যুদ্ধোন্মাদনা ছড়াতে পারলে, দ্বিতীয়জনকে চার আউন্স বেশি মাদক সাপ্লাই করতেই হবে। জমে উঠলো প্রতিযোগিতা। কে কত সুচারুভাবে চারিয়ে দিতে পারে যুদ্ধের নেশা! মিথ্যে, মিথ্যে, ঢপ আর গাঁজাখুরি কে কত লেপে দিতে পারে কাগজের প্রতিটি কলামে। হেরে যেতে রাজি নয় কেউই। হার্স্ট তাই একদিন যুদ্ধের নিউজ কভার করতে যাওয়া তার বীর চিত্রসাংবাদিকদের পাঠালেন বিশেষ বার্তা। হলুদ রঙের এক টেলিগ্রাম… “ইউ ফার্নিশ দ্য পিকচর, আই উইল ফার্নিশ দ্য ওয়ার”! সংবাদ নির্মিত হতে থাকলো চড়া হলুদ রঙের। হ্যালোজেনের আলোর মতো হলুদ, যার সামনে ধাঁধিয়ে যায় চোখ। স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ পৃথিবীকে দিয়ে গেলো নতুন শব্দ, নতুন ধারণা… ‘হলুদ সাংবাদিকতা’! যুদ্ধ আর সাংবাদিকতার মাঝে একটি পাতলা হল্‌দে আস্তরণ ছাড়া আর কিচ্ছুটি রইলো না।

আজ সংবাদমাধ্যম, শাসকের হাতে থাকা ‘মূলধারা’র সংবাদমাধ্যম অনেক বেশি হৃষ্টপুষ্ট সেদিনের থেকে। ফুলেফেঁপে উঠেছে সে, জাল ও মেদ বাড়িয়ে দৈর্ঘে ও প্রস্তে বেড়েছে তার বিস্তার। লগ্নীপুঁজির লালা আঠা আঠা, নয়াউদার সংবাদমাধ্যম হলুদ ওই পাতলা পর্দাকেও লোপাট করেছে অবলীলায়। ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ আজ তার অভিধানে বাতিলযোগ্য। ঠাণ্ডা যুদ্ধও ফুরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে, ইতিহাসে মিলিয়ে গেছে সোভিয়েত রাশিয়া। আর কেন রাখঢাক-গুড়গুড়, বাপু? কমলালেবুর মতো পৃথিবীটা আজ চ্যাপ্টা; একমেরু। সকলই হাতের মুঠোয় এখন। পুঁজি আর পুঁজির মালিকের আর কাকে ভয়? এইবারে যত অপরাধ, সব বুক ফুলিয়ে করার মৌকা এসেছে! এইবার খুল্লামখুল্লা পেয়ার করেঙ্গে হাম দোনো। সংবাদে যে মিথ্যে মেশাই আমরা, তার রঙ হলুদ হতে যাবে কেন? এসো ডিয়ার, আজ বুক ঠুকে বলি, হ্যাঁ আমরা খবর ‘বানাই’। মিথ্যে মেশাই না , ‘সত্য’ নির্মান করি আমরা। আমরা যা ছাপি, তাই ‘সত্য’। বাধ্যতামূলকভাবেই। পৃথিবীর মানুষেরা তাতেই সহমত পোষণ করবে। করতে বাধ্য। আমাদের হাউসে আমরা মেনুফ্যাকচার করি কনসেন্ট। আর এতে কোনও গোপনীয়তা নেই , আমাদের সমস্ত অপরাধ খোলামেলা। স্বচ্ছ। অকৃত্রিম। প্রকৃতির মতো। ‘হলুদ’ নয়, নিওলিবারেল আমাদের প্রিয়তম শব্দ ‘সবুজ সাংবাদিকতা’।

৫.

‘সবুজ’ শুনলেই কেন আজও সব তালগোল পাকিয়ে যায়। শীতলপুরের ছোট টিলাটার ওপর থেকে দেখা দিগন্তবিস্তারী মাঠ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আর সূর্যাস্তের সময় নেমে আসি টিলা থেকে, পিসতুতো ভাইয়ের হাত ধরে। ছোট পিসির বাড়ি যাওয়ার আগেই শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছ। হয়তো স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধের সমবয়সী, হয়তো আরও বৃদ্ধ। বটতলে হ্যারিকেন জ্বলে। গাঁয়ের বাচ্চাদের মহাভারতের গল্প শোনায় এক বুড়ো। সেও কত প্রাচীন, বাজি ধরে বলতে পারি, কেউই জানে না সঠিক। আমরাও জুটে যাই আসরে। রাত বাড়ে, একে একে মরে যায় ঘটোৎকচ, অভিমন্যু, কর্ণ। বিষাদে ভারি হয়ে আসে বৃদ্ধ বৃক্ষ। যুদ্ধ চলতেই থাকে। হাতের মুঠো পাকানোই থাকে গ্রামীন শিশুদের। মল্লযুদ্ধে ভীম যখন ক্লান্ত; তবু দুর্যোধনের ঊরুর দিকে কয়েক পলক তাকায়, শিরা ফুলে ওঠে। দুলে ওঠে শতবছরের ডাল-পালা। আমি শুনি, শুনে যাই। মন্ত্রমুগ্ধ। মহাভারত শেষ হওয়ার আগেই গ্রামের মায়েরা এসে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় শিশুদের। দেখি, ছোট পিসিমনিও দ্রুতপায়ে ধেয়ে আসছে। আমাদেরও উঠে যেতে হয়। পরদিন সকালে শহরে ফিরে এসেছি। তারও কত পরে কলকাতায়। এখনো ‘সবুজ’ শুনলে বৃদ্ধের মুখে শোনা মহাভারতের কথা মনে পড়ে। শুধু মনে পড়ে না, যুদ্ধ কখন থেমেছিলো! বিজয়ী পাণ্ডব কবে যজ্ঞ করেছিলো অশ্বমেধের! পৃথিবীর যত রথী, মহারথী নিজের রাজ্যে পথ ছেড়ে দিয়েছিলো ঘোড়ার! পেছনে মহাবীর অর্জুন! ছোট্ট এক নিষাদ রাজ্যে, অখ্যাত রাজা প্রবলপরাক্রমী অশ্বমেধ রুখে দাঁড়িয়েছিলো! মনে পড়ে না, তার কথা বলেছিলো কিনা বৃদ্ধ! পেছনে মহাবীর অর্জুন! সামান্য, অতি সামান্য শক্তি – তবু, রুখে দাঁড়িয়েছিলো জোয়ান নিষাদ। হিরন্যধনুর নাতি, একলব্যের ছেলে। তার ধক, হিম্মতের কথা আমাদের মহাভারতে বলেনি বুড়ো বটগাছ। না বলাটাই প্রথা। আমাদের নিউজ চ্যানেলগুলিও তো উরি দেখায়, উনা দেখায় না। সার্জিকাল স্ট্রাইকের রাতে প্রধানমন্ত্রীর না-ঘুমিয়ে ঘরময় পায়চারির ছবি দেখি আমরা ঘরে বসে। রাধিকা ভেমুলার হাতে উত্তোলিত হয় প্রিয় স্বাধীনতার পতাকা, সে ছবি দেখায় না কেউ।

 দেশ তো ঘর। ঘরের সদর দরজায় টানটান উত্তেজনা। পড়োশির সাথে যুদ্ধ লাগবো-লাগবো করছে। সে খবরে ছয়লাপ হলো ঘর। এদিকে ঘরের ভেতরে যে বেঁধেছে তুমুল লড়াই, সে খবর দেখাবে না ব্রেকিং নিউজে? “রাখো তোমাদের গোলাঙুল, আমাদের জমি ফেরত দাও” বলে দেশের একদল ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধে ক’দিন আগেই। উনায়। ‘দলিত অস্মিতা যাত্রা’ দলিতদের ওপর সামাজিক অত্যাচারের বিরোধিতা করার সাথে প্রচণ্ড দাবি তুললো জমির অধিকারের। সামাজিক-অর্থনৈতিক দাবি উচ্চারিত হলো একযোগে। নীল রঙে মিশে গেলো লাল। গর্জন শোনা গেলো ঘরের ভেতর থেকে। তারও কয়েকদিন আগে ১৮ কোটি শ্রমজীবি একসাথে স্তব্ধ করে দিলো দেশ। মাত্র একদিনের জন্য। ঘুম ছুটে গেলো তাতেই ভারতের শিল্পপতিদের যৌথ সংগঠন ‘অ্যাসোচেম’-এর। শ্রমিকদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য হলো সরকার। ইষৎ মাথা নামাতেও বাধ্য হলো কয়েকটি দাবিতে। সুপ্রিম কোর্ট স্বীকৃতি দিলো, সম কাজে সম মজুরির দাবিকে। সরকারকে দিয়ে কোর্টের রায়কে বাস্তবায়িত করানোর লড়াই এবার। একটা ছোট যুদ্ধ শেষে আরও বড়ো যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাচ্ছে এভাবেই। শুধু দলিত আর শ্রমিকরাই নয়, ছাত্ররাও একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করছে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে থমকে যাচ্ছে অশ্বমেধ। পেছনে অর্জুন? রাজনাথ সিং? নরেন মোদি-সুষমা স্বরাজ? শক্তি কম হতে পারে, ধক আর হিম্মত কারও কাছে বন্ধক দেয়নি এদেশের গণআন্দোলন। অশ্বমেধের পথ রুখে দাঁড়াচ্ছে তেভাগা-তেলেঙ্গানার দেশের কৃষক সমাজ। আমূল ভূমি সংস্কার, সিলিং বহির্ভূত ও পতিত জমি ভূমিহীন চাষির হাতে দেওয়ার দাবিতে দেশের চার প্রান্ত থেকে শুরু হচ্ছে ‘কিষান সংঘর্ষ জাঠা’। তামিলনাড়, পশ্চিমবঙ্গ, জম্মু আর কন্যাকুমারী থেকে কৃষকেরা ঢেউ আছড়ে দেবেন রাজধানীতে। কাছেই পার্লামেন্ট। ভেতরে হয়তো আলোচনা চলছে সীমান্তে যুদ্ধের খুঁটিনাটি নিয়ে। ঘরের ভেতরে যে যুদ্ধ লেগেছে তুমুল, সে কথা ওদের মনে করিয়ে দিতে হবে।

৬.

ঘরের ভেতর যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ভারতবর্ষে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া সে যুদ্ধের বার্তা সযত্নে চেপে যাবে, ঘুরিয়ে দেবে চোখ সদর দরজার দিকে, এ তো জানা কথাই। কিন্তু কী করবো আমরা? দেখুন, আমি সরাসরি নিজের কথা বলছি। আপনার কথা বলছি, প্রিয় পাঠক। আমাদের কথা বলছি। কী করবো আমরা? সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে নেমে আসবো বারবার টিলা থেকে? সূর্যোদয়ের আগে গ্রামের লোকেদের ডেকে নিয়ে আসবো না এইখানে, টিলার মাথায়? এই নিকষ মধ্যরাত্রে হতাশার দিনলিপি ফেলে, অন্যের দিকে তোলা সমস্ত তর্জনী তালুতে ফিরিয়ে এনে, সমস্ত নেতিবাচকতার আস্তরণ ভেদ করে… আসুন, যৎসামান্য ইতিবাচক সম্ভাবনার কথাটুকুই অন্তত লিখে রাখি আমরা! দু’হাত ছুঁড়ে সেসব ছড়িয়ে দিই, আসুন,একসাথে। তবেই না ‘কোরাস’ আমাদের!

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s