ফিরে দেখা কুনান পোশপোরা

লিখেছেন দ্যুতি সাহা ।

মধ্যরাতে উর্দিধারী পুরুষদের বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেখে উফাক্‌ বুঝেছিল, পালাতে হবে। একতলার বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে গিয়েও তা পারেনি সে। আটকে দিয়েছিল তারই ন’মাসের গর্ভবতী মেয়ে তমন্নার আর্তনাদ। “এদের হাতে আমায় একা ফেলে রেখে যেও না!”

ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকে পরে সৈন্যদল। উফাক্‌ খেয়াল করেছিল, ঘরে ঢোকার আগেই তাদের প্যান্টের চেন খোলা ছিল।

সংজ্ঞা অনুযায়ী গ্রাম ঘিরে বাড়ি বাড়ি ঢুকে অস্ত্র এবং জঙ্গিদের খোঁজ চালানোর নাম ‘কর্ডন অ্যান্ড সার্চ’। উফাক্‌-এর বর্ণনায় তার অন্য এক ছবি ফুটে ওঠে। প্যান্টের চেন খোলা সৈন্যের ছবি। এই বাস্তব কাশ্মীরের। মণিপুরের।

১৯৯০ সালে ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’তে একটি সাক্ষাৎকারে কাশ্মীর পুলিশের তৎকালীন ডিরেক্টার জেনারাল বলেছিলেন, “কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলায় ধর্ষণের ঘটনা সর্বাধিক কারণ সেখানেই জঙ্গিদের মূল আস্তানা। পা ফেললেই মেলে অস্ত্র।” অতএব রিপ্রাইসাল রেপ। অর্থাৎ, প্রত্যাঘাতে ধর্ষণই অস্ত্র।

কাশ্মীর। বরফ পাহাড়। ছবির মত সুন্দর ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে দিয়ে যেন সবুজ কার্পেট। তারই মধ্যে ফুটে থাকে রংবেরঙের সুগন্ধি ফুল। কান পাতলে শোনা যায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা নদীর সুর। সত্যি যদি পৃথিবীতে কোথাও স্বর্গ বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহেই এইখানে। কিন্তু,

“সেই হিম গহ্বর থেকে

অতীতের সংবাদ ভেসে আসে

দু’রকম আওয়াজে দিন মুখর হয়ে ওঠে –

হিংস্র আর্তনাদ আর অবস হাহাকার।”

বাস্তবে, কাশ্মীরের উপত্যকায় যত দূর চোখ যায়, দেখা যায় সেনাবাহিনী। দেখা যায় সবুজ কার্পেটে লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ফুলের সুবাস ছাপিয়ে বাতাসে ভেসে আসে বারুদের গন্ধ; কান পাতলেই শোনা যায় প্রিয়জন হারানোর বুক চেরা হাহাকার।

এ কেমন স্বর্গ? এখানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কার্ফিউ। বাচ্চারা এখানে এক টানা অনেক দিন স্কুলে যেতে পারে না। বিকেলে রাস্তায় হল্লা করে না। মায়েদের রাতে ঘুম আসে না এখানে। বাবারা কাজে বেরোলে ফিরে আসে না। ছেলে-মেয়েরা জেহাদ ঘোষণা করতে চায়। হাতে পাথর তুলে নেয়। মুক্তি চায়। কাশ্মীরের সুগন্ধী উপত্যকায় বিষ মিশে আছে। ভূস্বর্গ নয়, কাশ্মীর আসলে এক জ্বলন্ত রণক্ষেত্র।

ভারতবর্ষের থেকে আজাদি ছিনিয়ে নেওয়ার যুদ্ধে রত কাশ্মীর। বর্তমানে, কাশ্মীর হল পৃথিবীর সেই জায়গা যেখানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সবথেকে বেশি। সর্বাধিক মিলিটারি মোতায়েন করা হয়েছে এখানে।

একটা অন্য কথা মনে পড়ে গেল। সেদিন টিভি-তে একটি রিয়ালিটি শো-তে এক বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা হল সে বড় হয়ে কী হতে চায়। উত্তরে সে বলল, সে ভারতের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চায়। পাশ থেকে তার মা বলেছিলেন, “আমি ওকে বলি যে তুই বিয়ে করবি না, কিন্তু তুই যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কাশ্মীর চলে যাবি, তখন আমাদের কে দেখবে?” বিয়ের বাধ্যতা সংক্রান্ত পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব বাদ দিয়ে শুধু এটুকুই বলতে চাই, ভারতের মানুষের কাছে এই হল কাশ্মীর। ভূস্বর্গ নয়। মিলিটারি।

ভারতের ফৌজ হুমকি দিয়ে, কখনো শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তুলে নিয়ে গিয়ে, গ্রেপ্তার করে বা খুন করে তার দমন চালায় কাশ্মীরে, কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। তারপরে আছে পেলেট বর্ষণ, কাঁদানে গ্যাস, রাতারাতি একজন মানুষকে গায়েব করে দেওয়া। আর আছে যৌন নিগ্রহ। শাস্তিমূলক ধর্ষণ। Reprisal rape।

কুনান ও পোশপোরা। কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলায় পাশাপাশি দুটো গ্রাম।

২০১২ সাল। দিল্লিতে একটি মেয়ের গণধর্ষণের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল গোটা দেশ। তখন, সুদূর কাশ্মীরের বরফ ঢাকা পাহাড় থেকেও এক তরুণীর বার্তা, পাশে থাকার বার্তা। সেই সঙ্গে একটা সহজ প্রশ্ন, “মনে আছে, কুনান পোশপোরা?”

১৯৯১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি মাঝরাতে ভারত সেনার চতুর্থ রাজপুতানা রাইফেল্‌সের সৈন্যরা এই দুটি গ্রামে চালিয়েছিল ‘কর্ডন অ্যান্ড সার্চ’। চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল গ্রাম। হানা দিয়েছিল প্রতিটা বাড়িতে অস্ত্র আর জঙ্গির খোঁজে। সেই খোঁজের অজুহাতে বাড়ির পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গ্রামের কাছে, টর্চার সেন্টারে। সেখানে চলেছিল অমানবিক অত্যাচার, যৌন নিগ্রহ। আর মহিলাদের ধর্ষণ। একবার নয়। বহুবার। একাধিক পুরুষের হাতে। অপরাধ একটাই – কাশ্মিরী আইডেন্টিটি।

সেই রাতে প্রায় পঞ্চাশ জন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কুনান পোশপোরায়। তমন্না তাদেরই একজন।

“ধর্ষিতা মা কুঁকড়ে ওঠে ব্যথায়

পেটের ভিতর বাচ্চা যেই না পাশ ফেরে –

ফিরানের নিচে কাংরি যেভাবে শরীর গরম করে

ফুল যেভাবে ফুটবে বলে বসন্তের দিকে চায়।”

সেই রাতের ঘটনার তিন দিন পর তমন্না জন্ম দেয় তার প্রথম সন্তানের। জন্মের সময় দেখা গেছিল, সেই বাচ্চাটির একটি হাত ভাঙা। তমন্নার সন্তানের মেডিকো-লিগ্যাল সার্টিফিকেটে লেখা ছিল হাত ভেঙে যাওয়ার কারণ – “সৈন্যদের অত্যাচারের ফল।”

এভাবেই বোধহয় কাশ্মীরের শিশুদের জন্ম থেকেই, বা জন্মের আগে থেকেই যুদ্ধের শরিক হতে হয়। না হয়ে উপায় থাকে না।

এসার, ইফ্‌রা, সামরিনা, মুনাজা, নাতাশা। এই পাঁচ কাশ্মীরি তরুণীর উদ্যোগে ফের শুরু হয় ‘আন্‌ট্রেস্‌ড’ বলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কুনান পোশপোরার গণধর্ষনের মামলা। ১৯৯১ সালের সেই রাতের পর গ্রামবাসীরা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানায় এবং মামলা করার কথা বলে। যৎসামান্য তদন্ত চালিয়ে পুলিশ মামলা বন্ধ করার প্রস্তাব দেয়। গ্রামবাসীরা তাতে রাজি হয় না। পুলিশ তখন লিখিত রিপোর্ট জমা দিয়ে বলে এটা ‘জঙ্গিদের চাপে পড়ে সাজানো ঘটনা।’ কেস বন্ধ করে দেয় জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ।

প্রায় তেইশ বছর পর, ২০১৩ সালে, এই পাঁচ মেয়ে নিজেদের উদ্যোগে একদল মহিলার স্বাক্ষর জোগাড় করে একটি পি-আই-এল ফাইল করে। কুনান পোশপোরা’র মামলা ফের শুরু হয়। এখান থেকেই এই পাঁচ জনের একসাথে পথ চলা শুরু। কুনান পোশপোরার মহিলাদের মনে বিচারের আশা ওরাই জুগিয়েছে। উফাক্‌, তমন্নার মত আরো অনেক মহিলার মনে লড়াই করার সাহস জাগিয়েছে ওরা। জাগিয়েছে হার না মানার জেদ।

ওদের অক্লান্ত পরিশ্রম আমাদের কুনান-পোশপোরার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এবার, ভুলে না যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের।

১৯৯১-তে এসার আর তার সাথীরা ছিল নিতান্তই শিশু। কারুর বয়স তিন, কারুর দুই। ইফ্‌রার জন্ম ১৯৯১ সালে। কুনান পোশপোরার কাহিনি এরা শুনেছে, বুঝেছে, বড় হয়ে। এই পাঁচ মেয়ে আলাদা আলাদা পরিবারে বড় হয়েছে, তারা একে অন্যের মত নয়। কিন্তু তাদের বড় হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকাংশে এক রকম। এদের প্রত্যেকের স্মৃতির মধ্যে গেঁথে আছে রাস্তায় রাস্তায় রক্তপাত, গেঁথে আছে পাড়ার কারুর হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া। এরা প্রত্যেকেই লিখেছে, ছোটবেলায় ভারতীয় সেনারা এদের কাছে ছিল আপনজনের মত। যেন মামা কিংবা কাকা। এরা মনে করত, বাড়ির বড়দের উচিৎ সেনাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার। কিন্তু বড় হতে হতে, নিজেদের মত করে বেঁচে থাকতে থাকতে, এদের প্রত্যেকের ছোটবেলার ধারণা ভেঙে গেছে।

Do You Remember Kunan Poshpora?  বইটি’র মধ্যে দিয়ে এই পাঁচ মেয়ে তুলে ধরেছে দুটি গ্রামের লড়াইয়ের ছবি। সেই রাতে ধর্ষিতা মহিলাদের জবানবন্দী ধরা আছে এই বইয়ের পাতায়। মেয়েদের নিজেদের বয়ানে নিজেদের কাহিনির এ এক গুরুত্বপূর্ণ ডক্যুমেন্টেশন। বইটিতে আছে কুনান ও পোশপোরার ছবি, হাতে আঁকা মানচিত্র, চিঠির প্রিন্ট, আইনি দলিলের প্রমাণ। সাতটি ভাগে ভাগ করা বইটি সাবলীল ভাবে বলে চলে সেই রাত এবং তার পরবর্তী রাতগুলোর গল্প। অত্যাচারের কথা, লড়াইয়ের কথা, লড়াই করতে গিয়ে ভেঙে পড়ার কথা, হতাশার কথা, আবার উঠে দাঁড়ানোর কথা।

বই নয়, যেন স্বপ্ন। মানুষের একসাথে হাতে হাত মিলিয়ে হাঁটার স্বপ্ন এই বই। কাশ্মীর, কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ, আফ্‌স্পা – এই সমস্ত বিষয় নিয়ে আরো অনেক বই রয়েছে। এই বইটির বিশেষত্ব হল তার কথক, এবং তাদের বয়ান।

নয়ের দশক থেকে এই ২০১৬ পর্যন্ত কাশ্মীরের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আজাদির লড়াই কখনো আরো শক্তিশালী হয়েছে। কখনো বেড়ে গেছে রক্তপাত। আর এই সময়ের মধ্যে, সব থেকে বেশি বিবর্তন ঘটেছে কাশ্মীরের মেয়েদের। তাদের জীবন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে তাদের জীবন উপস্থাপনা করার চোখও।

বহু বছর ধরে কুনান ও পোশপোরার ধর্ষিতা মহিলাদের দেখা হয়েছিল ‘ভিক্টিম’ হিসেবে, যেমনটা সাধারণত হয়ে থাকে। কিন্তু এই বইয়ের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে তাঁদের আরেকটি ছবি। তাঁরা সার্ভাইভার। কুনান ও পোশপোরা এদের মধ্যে দিয়ে বেঁচে আছে। বেঁচে থাকবে।

কাশ্মীরের মেয়েদের এই বিবর্তনের কথা বহু লেখক-শিল্পীর কাজে ধরা পড়েছে। সঞ্জয় কাক ‘দ্য লাস্ট অপশান: এ স্টোন ইন হার হ্যান্ড’-এ লিখেছেন, “কিছুদিন আগে পর্যন্ত কাশ্মীরের মহিলারা ছিলেন রাস্তার প্রতিবাদের নীরব দর্শক। তাঁরা দেখতেন জানলার ওপার থেকে। কখনো সেই সুরক্ষিত স্থান থেকে বেরিয়ে এলে তাঁরা হয়ে যেতেন ‘ভিক্টিম’ অথবা অন্তহীন শোকযাত্রায় হাহাকার করা নারী। কিন্তু এখন কাশ্মীরি মহিলাদের একটি নতুন ছবি দেখা যাচ্ছে, আর এই ছবি ক্রমশ দখল করছে সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা। এই নতুন কাশ্মিরী মহিলার পরণে সাধারণ সালওয়ার-কামিজ। তার রঙ হাল্কা গোলাপি, নীল, বেগুনি, কিংবা হলুদ। খানিকটা গা-ছাড়া ভাবেই ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকা। যেন কেউ দেখতে পেলেও, কেউ চিনতে পারলেও কিছু যায় আসে না। কোনো ভয় নেই। এই মহিলারা অনেকেই মধ্য বয়স্ক। অনেকে মধ্যবিত্ত। এবং, তার হাতে পাথর।”

do-you-remember-kunan-poshpora

Batool, Essar, Ifrah Butt et al. Do You Remember Kunan Poshpora? : The Story of a Mass Rape. New Delhi: Zubaan Books, 2016. Price: Rs.395/-

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to ফিরে দেখা কুনান পোশপোরা

  1. Arijit বলেছেন:

    Very nicely written review

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s