পৃথিবী এবং পরিবেশ নিয়ে কিছু অসংলগ্ন বিলাপ

লিখেছেন  প্রিয়ক মিত্র ।

“মানুষ যে মাটিকে কাঁদাল

  লুট করে মাটির জীবন

  সে মাটি শুভেচ্ছা পাঠাল

  ঘাসের সবুজে প্রাণপণ”

                  -কবীর সুমন

টি এস এলিয়ট এপ্রিলকে বলেছিলেন ক্রুয়েলেস্ট মান্থ,আর নাসার সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাস হল ‘হটেস্ট মান্থ এভার’, অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত উষ্ণতম মাস।

এরকম একটি ঘটনায় চমকে গেছেন তাবৎ বিজ্ঞানী কুল। জার্মান আবহাওয়াবিদ স্টেফান রাহমস্টর্ফ বলেছেন এই মুহূর্তে আমরা সকলেই রয়েছি ‘ক্লাইমেট এমারজেন্সি’-র মধ্যে।

গার্ডিয়ান পত্রিকার যে প্রবন্ধ থেকে এই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সেই প্রবন্ধেই বলা হচ্ছে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড মাত্রা ছাড়া হয়ে পড়ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উন্মুক্ত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড। তা ক্রমাগত পৃথিবীর বায়োস্ফিয়ারে মিশে যাচ্ছে এবং সমুদ্র ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গলে যাচ্ছে আর্কটিকের বরফ। দুই দশকের বেশি সময় যাবৎ জাতিপুঞ্জ আবহাওয়ার এমন ভয়ঙ্কর পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্কতা দিয়ে আসছে।

পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি, শুধুই শুকনো তথ্য এবং পরিসংখ্যান দেওয়া নয়, কিছু ভাবনাকেও উসকে দিতে চেয়েই লিখতে বসা। যে তথ্যগুলো জানালাম সেটা মূলত পরিস্থিতির তীব্রতা বোঝানোর জন্য। এই ভয় ধরিয়ে দেওয়া অবস্থা তৈরি হল কী ভাবে? আসলে এই ‘ধ্বংসের দায়ভাগে’ আমরা সকলেই ‘সমান অংশীদার’। এটুকু অন্তত স্বীকার করে নিয়ে এগোনো উচিত। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘অ্যানথ্রোপসিন’, অর্থাৎ এই সময় দাঁড়িয়ে মানুষই আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যা কাঙ্খিত নয়। আজ পৃথিবী জুড়ে সবুজ ধ্বংস হচ্ছে নির্বিচারে। যেমন ধরা যাক আমাজনের সতেরো শতাংশ অরণ্য অঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেছে বিগত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে। গোটা বিশ্ব জুড়ে প্রতি বছর ৫০০০০ হেক্টরের বেশি জঙ্গল ধ্বংস হয়। লোকালয় এবং জঙ্গলের সহবাস বিশ্বের বহু জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু যে সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে তা হল এই সহাবস্থানে প্রকৃতি এবং বসতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারছে না। বহু ক্ষেত্রেই চাষ আবাদ অথবা পশু চারণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বনাঞ্চল এবং তার ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ছে সেই সব বনাঞ্চল সাফ করারও। এ প্রসঙ্গে মনে করা যায় গ্যারেট হার্ডিনের একটি তত্ত্ব, ট্র্যাজেডি অফ কমনস।  যেখানে হার্ডিন বলছেন সাধারণের জন্য উন্মুক্ত যে সব সম্পদ, যার মধ্যে প্রকৃতিও অন্তর্ভুক্ত, সেই সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহারের তাগিদ জন্মায় মানুষের মধ্যে।আর তার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ। কিন্তু এই ট্র্যাজেডি অফ কমনস কি বিশ্বায়ন পরবর্তী দুনিয়াতেও প্রযোজ্য? যেখানে জঙ্গল কেটে চাষ-জমি তৈরি হচ্ছে বা গৃহপালিত পশুদের চরানো হচ্ছে সে সব জায়গার কথা বাদ দিচ্ছি। কিন্তু যে সব জায়গায় শিল্পায়নের জন্য নির্বিচারে বনজ সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে? ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় তেল-কল তৈরির উদ্দেশ্যে বিস্তীর্ণ জঙ্গলে অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে। ব্রাজিল,কঙ্গোবেসিন,ইন্দোনেসিয়া,পূর্ব রাশিয়ার জঙ্গল জুড়ে চলছে কাঠের চোরা চালান। ভারতবর্ষে উত্তরাখন্ডের জঙ্গলে আগুণ লাগার পেছনেও কাঠ চোরা চালানকারীদের হাত ছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল। অথচ এই সমস্ত কিছুর ফলে প্রবল ভাবে বিপন্ন হচ্ছে জীব বৈচিত্র্য। ভারতবর্ষে একটি ডায়মন্ড মাইনিং প্রকল্পের জন্য মধ্য প্রদেশের প্রায় ৪৯০০০ হেক্টর জঙ্গল ধ্বংস করার ধুয়ো ওঠায় সিঁদুরে মেঘ দেখছিলেন পরিবেশ দরদীরা। ভাগ্যক্রমে সরকার এই প্রকল্পে সিলমোহর দেয় নি। এই বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি বাঘেদের নিশ্চিন্ত নিরাপদ চারণভূমি। এমনিতেই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের তালিকাভুক্ত হয়ে থাকা রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রজাতিটি আরও বিপন্ন হয়ে পড়ত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে। তবে এখনও বাংলাদেশ এবং ভারতের ব্যাপক এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ম্যানগ্রোভ অরণ্য, ভয়ঙ্কর সুন্দর সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দু-দেশেই চলছে প্রতিরোধ। বাংলাদেশে ছ-হাজার এবং ভারতে চার হাজার চারশো, সব মিলিয়ে দশ হাজার চারশো বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃতির এই অরণ্য ধ্বংস হয়ে গেলে বাঘ সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণ তো ধ্বংস হবেই, পরিবেশের ভারসাম্যও ব্যহত হবে। যদিও সম্প্রতি ইউনেস্কো এই প্রকল্পকে পরিবেশ বিরোধী বলে ঘোষণা করেছে, কিন্তু তাতে শাসকের মন টলে কি না তা লক্ষণীয়। পৃথিবী জুড়েই অরণ্য অঞ্চলগুলি যত বিনষ্ট হচ্ছে তত বিপদ সীমা অতিক্রম করছে পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতা। এই পৃথিবীব্যাপী গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর রক্ত চক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে এ এক প্রকার আত্মহনন ব্যাতীত অন্য কী?

হার্ডিনের তত্ত্বকে কারা সমর্থন করবেন বা করবেন না তা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়, এই তত্ত্বের মধ্যে যে আর্থসামাজিক প্রেক্ষিত রয়েছে তা এড়িয়ে গিয়ে আমরা একটি সার বস্তু বেছে নিতে পারি। তা হল মানুষ এবং প্রকৃতির সহাবস্থান কী ভাবে ঘটবে? কৃষি এবং শিল্প দুইয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও আমরা কি পরিবেশকে আগলে রাখার চেষ্টা করতে পারি না? সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট, অর্থাৎ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের তত্ত্ব সম্পর্কে অনেকেই অবিদিত। কিন্তু সে তত্ত্ব নেহাতই আটকে থাকছে অ্যাকাডেমিক চর্চার ঘেরাটোপে। ‘ইন্ডিয়া : ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেশন’ বইতে জঁ দ্রিজ এবং অমর্ত্য সেন প্রকৃতি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানব জীবনের ওপর সর্বগ্রাসী উন্নয়নের প্রভাব কী হতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার কোনো চেষ্টা কোথাও দেখা যায় না। একই সঙ্গে ভাবা উচিত যেখানে অরণ্য এবং মানুষ পাশাপাশি রয়েছে সেখানে কী হতে পারে তাদের ভেতরকার সম্পর্ক? সম্প্রতি কাজিরাঙ্গায় জঙ্গল সংলগ্ন কিছু বসতি উচ্ছেদ করতে গিয়ে দুজন মানুষের প্রাণ নিয়েছে শাসক, এ ঘটনা ভয়ঙ্কর নিন্দনীয়, কিন্তু এ-ও তো ঘটনা যে অরণ্য সংরক্ষণের স্বার্থেও বসতির উচ্ছেদ প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে কী পদ্ধতি অবলম্বন করলে মানুষ এবং পশুর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা যায় তা নিয়ে ভাবনা চিন্তার আশু প্রয়োজন আছে।  আদিম যুগ থেকেই প্রকৃতি এবং মানুষের সংঘাত চলছেই। কীভাবে বিশ্বায়িত বিশ্বের থেকে কোটি যোজন দূরে মানুষ প্রকৃতিকে যুঝে তার সঙ্গেই বেঁচে থেকেছে তার নজির মেলে আফ্রিকার লোককথা বা আমাদের রায়মঙ্গল জাতীয় মঙ্গলকাব্যে। তাহলে এই সমস্যাকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়? এখনও বহু জায়গায় হিংস্র বন্য প্রাণের সঙ্গে যুঝতে হয় মানুষকে। ভারতবর্ষে ডুয়ার্স বনাঞ্চলে হাতির হানায় বহু শস্যক্ষেত্র নষ্ট হয়, সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বা মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হওয়ার ঘটনাও নেহাত কম নয়। কিন্তু এ সব অঞ্চলের স্থানীয় মানুষরা কিন্তু পরম মমতার চোখে দেখেন বন্য প্রাণীদের। তাও চোরা শিকার রোধ করা যায় না। এই শিকার কারা করেন? ব্যাধ বা নিষাদরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন শিকার করে, আর রাজারাজড়াদের কাছে মৃগয়া ছিল শখ আহ্লাদ। এ থেকেই বোঝা যায় তথাকথিত সভ্য সমাজের এ বিষয়ে কী ভূমিকা। প্রযুক্তি এবং পুঁজিতে প্রথম বিশ্বকে টক্কর দেওয়া রাষ্ট্র চীনে বাঘেদের জন্য রয়েছে কসাইখানা। থাইল্যান্ডের ‘টাইগার টেম্পল’-এ ফ্রিজের মধ্যে ব্যাঘ্র শাবকদের রেখে দেওয়ার ঘটনা হয়তো অনেকেরই স্মৃতিতে টাটকা। লাওসের সরকার তাদের টাইগার ফার্মগুলিকে বন্ধ করার রাস্তায় এগিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাঘেদের কেন্দ্র করে এই বেআইনি বাণিজ্যের বাজার তাহলে কিছুটা থমকাবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, মানুষ-প্রকৃতি-বন্যপ্রাণীদের সম্পর্ক তাহলে প্রকৃতপক্ষে কোথায় দাঁড়িয়ে? এর উত্তর খুঁজবেন পরিবেশবিদরা, কিন্তু প্রশ্নগুলো অন্তত তুলে রাখা যাক, তৈরি করে রাখা যাক চর্চার পরিসর।

যুদ্ধের দামামা বাজছে ভারত-পাকিস্তান জুড়ে, এইমুহূর্তে। জল-জমি-জঙ্গল পরিবেশ সংক্রান্ত দাবিগুলো ঢাকা পড়ে যাবে উগ্র জাতীয়তাবাদের হুঙ্কারের তলায়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন যুদ্ধে পরিবেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এসেছে সময় বিশেষে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ নামক একটি হার্বিসাইড ব্যবহারে পরিবেশ যেভাবে বিষাক্ত হয়েছিল তা ইতিহাস জানা ব্যক্তিদের স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না। গালফ্ওয়ার বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও প্রভূত রাসায়নিক অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। আর এইভাবে পরিবেশের ক্ষতিসাধন হলে মানুষ তার আঁচ এড়িয়ে বাঁচতে পারে না। হিরোশিমা-নাগাসাকি সাধারণ জ্ঞানের বিষয় হয়ে উঠেছে এখন, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে জাদুগোড়ায় কীভাবে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হচ্ছে শিশুরা।

ডিপ ইকোলজির তত্ত্বের আমদানি করেছিলেন আর্নে নায়েস, ১৯৭৩ সালে। অনেকেই একে মানুষ বিরোধী বলে ভেবে নিয়েছেন, কিন্তু আদতে এই তত্ত্ব এইটুকুই বলতে চেয়েছিল, “পৃথিবীটা পাখি-গাছ-মানুষ সবার”। মজার বিষয় টেকনোলজির অগ্রগতি থেমে নেই, এবং একই সঙ্গে বেড়ে চলেছে মানুষের মনোজগতের সমস্যা। মৌলবাদ, উগ্রপন্থা, গণহত্যা, অনাহার দুর্ভিক্ষের মতন বৃহৎ সামাজিক সমস্যার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে মানসিক রোগ। প্যানঅপটিকনের ছোট ছোট খুপরিতে বন্দী থেকে মানুষ ক্রমশ বিচ্ছিন্নতার পাঠ নিচ্ছে। এ হেন পরিস্থিতিতে পরিবেশই একমাত্র মুক্তির আয়ূধ হয়ে উঠতে পারে, আমরা এই অদ্ভুত আঁধারে দাঁড়িয়ে একবার যদি ভেবে দেখি এইভাবে, তাহলে খুব ক্ষতি হবে?

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s