আন্দোলন সমুদ্রতরঙ্গের মতো  : হেইস্‌নাম কানহাইলালের থিয়েটার

লিখেছেন নন্দলাল মজুমদার। 

তফসিল নং ৮  ও ৭১ নং সংশোধনী বিল দ্বারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি। মণিপুরী  ভাষার। ১৯৯২ সাল। তার আগে পর্যন্ত তা অন্তর্ভূক্ত ছিল না। ভারতীয় সংবিধানে।

আমরা যে মহৎ নাট্যপরিচালকের কথা ও তাঁর সৃষ্টির সামান্যটুকু পেশ করতে চলেছি, তিনি ষাটের দশক থেকে সক্রিয় , তাঁর শিল্পকর্মে, যৌবনদিনে। তিনি ভারতীয় থিয়েটারের এক স্তম্ভ, হেইস্‌নাম কানহাইলাল। তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর পরিচালিত নাটকের অভিনয়ে নটবৃন্দ যে বাচিকভাষা ব্যবহার করেছেন বা যে মৌখিক ভাষায় লিখিত হয়েছে নাট্যরূপগুলি তা দিল্লিছাপ নয়, সরি, সাংবিধানিক ভারতীয় জাতীয় কিছু নয়। উপজাতীয়।

 মেইতেই মানুষ ও মেইতেই সংস্কৃতিকে  দীর্ঘকাল  উপেক্ষা ও অবহেলা করা হয়েছে আমাদের দেশে। তাদের রয়েছে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। নৃত্য, গীত, সাহিত্য, ছড়া, কবিতা। ধর্মীয় লোকাচার। স্বতন্ত্র।

হিন্দু রাজা পামহেইবা (১৬৯০-১৭৫১) এবং ভাগ্যচন্দ্র (১৭৬৩-১৭৯৮) অষ্টাদশ শতকে মেইতেই সংস্কৃতি ধ্বংসের অভিযানে নামেন । রাজশক্তিকে ব্যবহার করে জবরদস্তি হিন্দু সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা বাধ্যতামূলক করা হয়। মেইতেইদের বৈষ্ণবীকরণ এই সময় থেকে শুরু হয়। সরোজ নলিনী পারাট   ‘The Religion of Manipur : Beliefs, Rituals and Historical Developments ‘  বইতে লিখছেন – ‘ It involved such measures as the destruction of the traditional lai ( Gods) , the burning of ancient manuscripts, the burning of the Meithei script, and its replacement by Bengali script, the introduction of the Hindu calendar and system of Gotras, enforcement of Hindu Dietary laws, and the sanctification of the first recorded instances in Manipuri history of Sati’।

প্রাক-বৈদিক যুগের মেইতেই দেব-দেবী সানামাহি কিংবা হারাওবার পূজা নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়। মেইতেই ধর্মাচার নিরাকার উপাসনার। পরবর্তী সময়ে  উদ্ভূত হিন্দু ধর্মের সঙ্গে ছিল প্রবল মূলগত বিরোধ। বিভিন্ন সময়ে রাজবলপ্রযুক্ত  সমাজকাঠামোয়  ধর্মের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। যা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ধরা দেয়। হিন্দু-মেইতেই, মুসলিম-মেইতেই এ হেন বিভাজন আদতে মূল মেইতেই জাতিকেই স্মরণ করায়।

কানহাইলালজী এই বিতর্ককে এড়িয়ে যাননি, তিনি হিন্দু – মুসলমান অথবা ভারতীয় পরিচয়ের আগে নিজেকে ‘মেইতেই’ বলতে পছন্দ করতেন। সত্তর দশকের গোড়ায় তাঁর সৃষ্ট নাটক ‘পেবেট’ (PEBET)-কে অ-হিন্দু বা প্রতি-হিন্দু অভারতীয় নাটক হিসাবে ঘোষণা করা হয়। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি বাধা তৈরি করতে এগিয়ে আসে ও মামদোসুলভ আচরণ করতে থাকে । কী এমন ছিল এই নাটকে? যার জন্য এই ভয় পাওয়া? যার জন্য এই উগ্র পদক্ষেপ?

‘পেবেট’ একটি মেইতেই লোককথা। পাখি-মা এবং তার অনেকগুলি পাখি-সন্তান এবং একটি নিষ্ঠুর অত্যাচারী বিড়ালের কাহিনি। বিড়াল বাচ্চাপাখিদের ভয় দেখিয়ে ও অত্যাচার করে তাদেরকে মায়ের বিরূদ্ধে নিয়ে আসে। বিড়াল সংস্কৃতির অন্তর্গত করতে চায়। এই ছিল পরিচালক কানহাইলালের নব্যপাঠ। আবারও একটি সমকালীন ( তৎকালীন ) রাজনৈতিক চেতনার কন্ঠরুদ্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লাগা শুরু হয়। Rustom Bharucha- র বক্তব্যে “ Kanhailal’s cat is early Vaishnavite in his rhetoric and tactics. The most savage irony of his indoctrination occurs when he brainwashes the Pebet children with the famous words from the Sanskrita Sloka ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী’ . Not only was ‘Pebet’ considered ‘anti-Hindu’ … it was also dismissed as ‘anti-Indian”।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

সত্তর দশক। যখন ভারতীয় থিয়েটার অন্বেষণ করছে তার ঐতিহ্য, তার শিকড়কে। পানিক্কর, গিরীশ কারনাড, হাবিব তানভীর, বিজয় তেন্ডুলকর, রতন থিয়াম, ঊষা গাঙ্গুলি, ত্রিপুরারি শর্মা প্রমুখ নাট্যব্যক্তিত্ব এক নতুন দরজার উন্মোচন করছেন ভারতীয় নাটকে, তখন কানহাইলালজীও সর্বতোভাবে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন, তাঁর নাটকেও আমরা ভারতবর্ষকেই আবিষ্কার করছি, আরেকভাবে। প্রসঙ্গত, হেইস্‌নাম কানহাইলালও এই আন্দোলনের শরিক ছিলেন, ছিলেন কর্মী। পরবর্তীকালে যা ‘Root of the Indian Theatre Movement’- এ পর্যবসিত হয়।

ষাটের দশক থেকেই মণিপুর স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি-দাওয়া নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠতে থাকে। আর্থ-সামাজিকভাবে তাদের পিছিয়ে থাকা ও একঘরে হয়ে থাকা দশা বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠতে থাকে সেখানকার জনগণ। ১৮৯১ সালে  ব্রিটিশ সরকার নতুন আইন জারি করে মণিপুরে। কর আদায়ের ক্ষেত্রে। কৃষিজাত দ্রব্যের বদলে কাঁচা টাকা লাগু হয় কর আইনে। রপ্তানি-বানিজ্য বন্ধ করা হয়। শাক-সবজি, ফল থেকে শুরু করে সবই আমদানিভিত্তিক করা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তীতেও মণিপুরে ন্যূনতম একটিও শিল্প বা কৃষিগত পরিকল্পনা গৃহীত হয় না। উপরন্তু  PART- C রাজ্য হিসাবে ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর মণিপুর ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়। তৎকালীন রাজা বোধচন্দ্র সিং সই করেন চুক্তিতে। শুরু হয় ভারতের নব্য-ঔপনিবেশিক শাসন।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে মায়ানমার, চীন ও পুর্ব-পাকিস্তান ( বাংলাদেশ) – এর সীমান্ত মণিপুরী মানচিত্রের গায়ে, ফলে ভরে ভরে সেনা মোতায়েন করা হয় সেখানে। সত্তর অবধি অবস্থা এখানে গিয়ে পৌঁছায় যে, প্রতি দুটি বাড়ির জন্য একজন করে সেনা।

ষাটের দশক থেকে নাওরিয়া ফুলোর মতবাদকে আদর্শ হিসাবে রেখে, স্বতন্ত্র মেইতেই রাজ্যের দাবি উঠতে থাকে। গড়ে ওঠে ‘PANMYL’ ( Pan Manipuri Youth League), যারা  ‘Meithei-Tribal ethnic oneness’এর দাবি তোলে।

মনিপুরী কবি লাইশরাম সমরেন্দ্র লেখেন, ‘ We have no employment. No openings, very limited resources.’ কানহাইলালের বক্তব্যে, ‘আমরা  semi-urban, semi-tribal । আমরা আধুনিক হতে চাই। কিন্তু কেমনভাবে, তা জানা নেই।‘ লাগাতার দশ বছরের আন্দোলনের ফলে ১৯৭২ সালে মণিপুর ভারতের পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসাবে ঘোষিত হয়। কিন্তু মণিপুরী ভাষা ও সংস্কৃতি তখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় না।

ষাটের দশকে কানহাইলালজী জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়ে (N.S.D) পড়ার জন্য গেছিলেন। ১৯৬৩ সাল। এর ঠিক দু বছর আগে ১৯৬১ সালে তিনি বিয়ে করেছেন অভিনেত্রী সাবিত্রী দেবীকে।

ঘর ছেড়ে তিনি দিল্লিতে নিচ্ছেন নাট্যপাঠ । কিন্তু N.S.D কর্তৃপক্ষ তাঁকে বরখাস্ত করল, কয়েকদিনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে, নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধিভঙ্গের অপরাধে। যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে হিন্দি বা ইংরেজি এ দুটোর কোনওটিতেই কাজ চালানোর ক্ষমতাটুকুও ছিল না কানহাইলালের, সেসময়, ফলে সমস্যা বাড়ছিল।তিনি একলা বোধ  করছিলেন, সঙ্গে ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতের আর্যজাতিসত্তার দাবড়ানি। স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, এ খবর বাড়িতে জানাতে পারেননি। প্রায় আরও এক বছর দিল্লিতে রয়ে গেছিলেন স্কুলে পড়ার নাম করে।  হতাশ হয়ে অবশেষে বাড়িতেই ফিরে আসেন। শুরু হয় জীবিকাহীন দিনযাপন ও অস্থায়ী কাজের খোঁজ।

১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলাক্ষেত্র মণিপুর’। এবার এই দলটির নাট্যপ্রযোজনা অরাজনৈতিক হবে, হবে মানবিক আবেদনহীন, এমন মনে করা পাপ।

একের পর এক নাটকে সমৃদ্ধ হতে থাকে কলাক্ষেত্র। ‘পেবেট’, ‘মেমোয়ার্‌স্‌ অফ আফ্রিকা’, ‘ হিউম্যান কেজ’, ‘ডাকঘর’। একের পর এক। শ্বাসরুদ্ধ করা পরিকল্পনা ও মঞ্চন। মনিপুরী লাইশরাম সমরেন্দ্র-এর ‘ মেমোয়ার্‌স্‌ অফ আফ্রিকা’ অবলম্বনে একটি নাটকের খসড়া তৈরি হয়। যেখানে আফ্রিকার কালো মানুষের নিপীড়ণ ও বঞ্চনার গল্প যুক্ত হয় মণিপুরী মানুষের সঙ্গে। এই নাটকের প্রধান চরিত্র ‘মি’। পুরুষ অথবা নারী। দুজন নুপি তাকে শক্তি জোগায়, শুশ্রূষা ও সাহচর্য দেয়। নুপিরা অর্ধেক আত্মা, অর্ধেক মানুষ। মি-এর জন্ম, আত্ম-আবিষ্কার, ভিন্ন ঋতু অতিক্রম করা, শ্রমশিল্পে যোগদান , চাষ করা , চাষের গান গাওয়া সবই দেখানো হয়। আর থাকে তিনজন রাষ্ট্রমুখ । সেনা। তারা মি-কে সর্বদা নজরে রাখে। মি যত পরিণত হয় , দমন তত বাড়তে থাকে। এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় , মি যখন অল্পমাত্র জলের জন্য হাহাকার করে, সেনারা তারই চারপাশে তাকে ঘিরে অট্টহাস্য করে।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই নাটক প্রায় সংলাপহীন। প্রবল শরীরী অভিনয় , মুখনিঃসৃত নানা মাত্রার ধ্বনির ব্যবহার, দলগতভাবে বডি-ইমেজ তৈরি, কোরাসকন্ঠের ব্যবহার আমাদের স্তম্ভিত করে। নাট্যভাষাহীন নাটক আমরা কেন দেখতে যাব? আজ এই প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তোলে। যদি শুধুমাত্র অডিও ডি ভি ডি বা ক্যাসেট শুনে নাটকের পুর গল্পটাই আমরা বুঝে উঠতে পারি, তাহলে দৃশ্যের ভূমিকা আদৌ কী? কেন আমরা কলা-কুশলীদের অভিনয় দেখব স্টেজে।

কানহাইলালজী এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে চেয়েছেন। বারবার। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কলাক্ষেত্র’-এর নাট্যমঞ্চন মারফত।

২০০০ সালে তিনি নির্দেশনা দেন মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্প ‘দ্রৌপদী’র। তার আগে কলকাতার রঙ্গকর্মী থিয়েটার- দলে  ‘ইমা’ নাটকে নির্দেশনার কাজ করতে এসেছিলেন তিনি। রঙ্গকর্মীর পরিচালক ঊষা গাঙ্গুলির মাধ্যমে তিনি আলাপিত হন মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। সেখান থেকেই দ্রৌপদীর মঞ্চায়নভাবনা।

মূল গল্প সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায়। দোপ্‌দী মেঝেন ও তার স্বামী দুলন মাঝিকে খুঁজছে পুলিশ। ঘোষিত হয়েছে ইনাম। এই দম্পতি বিপ্লবী। উগ্র বামপন্থী কার্য-কলাপে যুক্ত। পুলিশি ভাষায় ‘নোটোরিয়াস’। দোপ্‌দী ও দুলন গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী। তাদের কাছে অস্ত্র বলতে হেঁসো, বল্লম, ছুরি, দা, পাথর। তাই দিয়ে তারা সেনাবাহিনীর জিনা হারাম করে রেখেছে।

সেনাবাহিনী রাষ্ট্রশক্তির প্রধান সূচক। কানহাইলালজীর নাটকে প্রতিবারই আমরা দেখছি, সেনাবাহিনীর দাপাদাপি। এর কারণ  দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রতারণা , শাসনের নামে দমন-পীড়ণ , মণিপুরে। দোপ্‌দী মেঝেনকে তিনি মণিপুরী প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত করতে পারেন অনায়াসে। অপারেশন বাকুলি বা অপারেশন ঝাড়খানি ফরেস্ট হয়ে ওঠে অপারেশন মণিপুর।

দুলন মাঝিকে হত্যা করে তার মৃতদেহ জঙ্গলের মাঝে ফেলে রাখা হয়, দোপ্‌দীকে ধরার টোপ হিসেবে। কিন্তু দোপ্‌দীকে পাওয়া যায় না। পরে জোতদার সূর্য সাহুর  ভাই রোতনী সাহুর দৌলতে ধরা পড়ে দোপ্‌দী মেঝেন। নিয়ে আসা হয় আর্মি ক্যাম্পে। সেনানায়ক আদেশ দেন, দোপ্‌দিকে বানিয়ে আনার জন্য।

বানানো পরবর্তী সাহিত্য বর্ণনা এরূপ- ‘ঘোলাটে চাঁদের আলোয় বিবর্ণ চোখ নিচের দিকে নামাতে নিজের স্তন দুটি চোখে পড়ে এবং ও বোঝে হ্যাঁ- ওকে ঠিকমতো বানানো হয়েছে। এবার ওকে সেনানায়কের পছন্দ হবে। স্তনদুটি কামড়ে ক্ষতবিক্ষত, বৃন্ত ছিন্নভিন্ন। কত জন? চার-পাঁচ-ছয়-সাত-তারপর  দ্রৌপদীর হুঁশ ছিল না।‘

তারপর তাকে বড়সাহেবের তাঁবুতে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হয় সেনারা। দ্রৌপদীকে জলের ঘটি এগিয়ে দেওয়া হয়। সে তা প্রত্যাখ্যান করে ও নগ্ন উঠে দাঁড়ায়।

জেলে পাগলাঘন্টি পড়লে যেমন হয়, সেনাদের মধ্যে ছুটোছুটি লেগে যায় এবং সেনানায়ক বিস্মিত হয়ে বেরিয়ে এসে দেখেন , সূর্যের প্রখর আলোয় উলঙ্গ দ্রৌপদী সোজা মাথায় হেঁটে তাঁর দিকে আসছে। সমস্ত সান্ত্রীরা তার কিছু তফাতে। দ্রৌপদী আরও কাছে আসতে থাকে। সেনানায়কের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেনানায়ক ওকে কাপড় পরাতে আদেশ দেন। সৈন্যরা বলে-‘ পরছে না স্যার। ছিঁড়ে ফেলেছে।‘ কাছে এসে দ্রৌপদী আকাশচেরা তীক্ষ্ণ  গলায় বলে ওঠে – ‘কাপড় কী হবে? ল্যাংটা করতে পারিস? কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?’  তারপর রক্তমাখা থুতু ফেলতে সেনানায়কের সাদা বুশ শার্টটি বেছে নেয়। দ্রৌপদী দুই মর্দিত স্তনে সেনানায়ককে ঠেলতে থাকে, এবং এই প্রথম সেনানায়ক নিরস্ত্র টার্গেটের সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, ভীষণ ভয়।

এই গল্পের মঞ্চায়িত রূপটি কথাসাহিত্যের শব্দসজ্জাগুলিকে মঞ্চসৃষ্ট ছবি ও স্পেস-এর মাধ্যমেই ব্যক্ত করতে থাকে। নাটকে তিনজন মিলিটারি  বাস্তবত রাইফেলহীন, অথচ তাদের হাতের মুভমেন্ট ও শরীরী ভাষার দক্ষতা সর্বদা আগ্নেয়াস্ত্রের কথা মনে করাচ্ছিল। দোপ্‌দী মেঝেনের ভূমিকায় ছিলেন সাবিত্রী দেবী, তিনি বর্তমান সময়ের ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। তাঁর চরিত্রাভিনয় দর্শক হিসেবে দেখা সৌভাগ্যের। একজন অল্প-বয়সী মেয়ে জিন্স-টি শার্টের আধুনিক আরবান প্রতিনিধির লুক নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে মঞ্চে আসে,  তার ভূমিকা ঘোষকের। নাটকের চলনে আরও গতির সঞ্চার করে। সে দর্শকের উদ্দেশে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ও ঘটনা পরম্পরার সুতোকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে।

%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%8c%e0%a6%aa%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a7%a7

 এই নাটকের মঞ্চ-উপাদান বলতে মাঝখানের গোল রস্টাম ও পেছনে শুকনো ডালপালা  সমেত একটি গাছের অবয়ব, যা অত্যন্ত প্রতীকী। দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অত্যাচারের নগ্ন উন্মোচন। এই গাছের ডালেই উলটো করে ঝুলিয়ে রাখা হয় দুলন মাঝিকে।

অভিনয়ে দেহ-সঞ্চালন মণিপুরী লোকনৃত্যের ভঙ্গিমায়। ভারমুক্ত পদ-প্রক্ষেপ। পা উঠছে ও নামছে যেন মাধ্যাকর্ষণহীন। অপর পা তখন অতিরিক্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ভূমিগ্রন্থিত হয়ে আছে। মিলিটারিদের ক্ষেত্রে অবশ্য সর্বত্র তা নয়।

এই নাটকে গেরিলা যুদ্ধ প্রণালী, সেনাদের অভিযান, দ্রৌপদীর খোঁজ ও অপারেশন সবিস্তারে দেখানো হয়েছে। অল্প সংলাপে, বেশিরভাগ চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ( অ্যাকশন ) মারফত। ধর্ষণের মঞ্চদৃশ্য এরকম- গোল রস্টামের মাঝখানে দোপ্‌দি মেঝেন, কুঁকড়ে, হাঁটুমুড়ে। তাকে ঘিরে সৈন্যরা। সেনাদের হাতে বাঁশের লাঠি, যা দিয়ে কাঠের রস্টামে আওয়াজ হচ্ছে – ঠক্‌ ঠক্‌ ঠক্‌। ছন্দে ও লয়ে। ধীরে ধীরে এই আওয়াজ অসহ্য হয়ে উঠছে। নিষ্ঠুর ও হিংস্র হয়ে উঠছে। শেষে দু-পায়ের ফাঁকে লাঠি  ঢুকিয়ে  সেনারা লাফাতে লাফাতে প্রস্থান করে। দৃশ্যভঙ্গিমা দর্শকের চোখে কদর্যভাবে ধাক্কা মারে।

আলো ক্ষীণ হয়। একটি লাল কাপড় রাইট স্টেজ থেকে লেফট স্টেজের দিকে চলে যায়, দোপ্‌দীকে ঢেকে। কাপড়টি পেরিয়ে গেলে দেখা যায় নগ্ন দোপ্‌দী মেঝেন। মঞ্চের মধ্যিখানে।

%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%8c%e0%a6%aa%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a7%a8

এই নগ্নদৃশ্যের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছিল একসময়। বারবার এই নাটকের মঞ্চনের ওপর বিধিনিষেধ জারি হয়েছে।

%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%8c%e0%a6%aa%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a7%a9

এরপর ২০০৪ সালে মণিপুরে সেনারা মনোরমা দেবীকে ধর্ষণ ও খুন করে। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে মণিপুর। মহিলারা ইম্ফলের রাস্তায় প্রকাশ্যে নগ্ন হয়ে হেঁটে প্রতিবাদ জানান। সামনের ব্যানারে লেখা থাকে-  “RAPE US, KILL US ! INDIAN ARMY”

কানহাইলালজী এই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন চার বছর আগেই, তাঁর নাটকটির  ওপর জারি হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা-  প্রতিবাদ অশালীন ও অশ্লীল ঠেকেছিল সেসময়ে। যে ঘটনা ন্যক্কারজনক, তা অশালীন নয়, যে ঘটনা অমানবিক তা অশ্লীল নয় !!

কানহাইলালজীর অভিনেতা-অভিনেত্রীরা দেহ সঞ্চালনে দক্ষ, জোরালো শরীরীভাষায় দর্শকের সঙ্গে যোগ স্থাপন করতে পারে, নৈপুণ্যে। মঞ্চসজ্জার প্রতি তাঁর বিশেষ টান নেই। অ্যাক্ট্রর্স বডি তাঁর কাছে সমস্ত সাজ- সজ্জা , ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপকরণ। যখন রয়েছে হাত, পা, চুল, চোখ, নাক, কান , একটি রক্তমাংসের দেহ ও একটি সতেজ সজীব মন, তাই কি যথেষ্ট নয়? । অভিনেতার মনকে তিনি নরম কাদার তাল হতে পরামর্শ দেন। যেমন ইচ্ছা আকার দেওয়া যাবে, সামান্য স্পর্শেই দাগ পড়বে সূক্ষ্ম অনুভূতির।

বাদল সরকারের অভিনয় প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ‘Psycho-Physical exercises’ –কে কানহাইলালজী গ্রহণ করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল – মণিপুরী ছেলেমেয়েরা স্বভাবতই অনেক বেশি অ্যাথলেটিক , নারী-পুরুষ সম্পর্কেও রয়েছে সহজতা। তাই মণিপুরী নাট্যচর্চায় এই পদ্ধতির দরকার নেই। অভিনেতাদের তিনি শিক্ষা নিতে বলেন প্রকৃতির কাছ থেকে। কান্ দিয়ে দেখার চেষ্টা করো, চোখ দিয়ে শোনার। এ বাক্য কবি ও কবিতাপাঠকদের খুব পরিচিত মনে হতে পারে। তিনি বলেন – ‘Movements (of body) have to be like waves’। আন্দোলন সমুদ্রের ঢেউ-এর মতো। হাঁটু অথবা পিঠ , যে কোনও জায়গাই হয়ে উঠতে পারে বডি-এনার্জির উৎস । ধরা থাকবে ছন্দে। উপলব্ধি, সীমাহীনতার। ঢেউ ভেঙে পড়ার পরও তার অন্তরের স্পন্দন রইবে ক্রিয়াশীল।

কানহাইলালজীর নাটকের শো শেষ হয়। কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তের, প্রতিটা অ্যাকশনের, প্রতিটা তরঙ্গের এই যে অন্তরের স্পন্দন , বহুবছর পরও, বহাল রয়েছে, থাকে।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s