সাম্য, ন্যায় ও সংরক্ষণ

লিখেছেন অনল পাল

কোনো গৌরচন্দ্রিকা না করেই শুরু করা যাক। সম্প্রতি সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ভাইরাল হওয়া দুটি ছবি/কার্টুন সকলেরই চোখে পড়ে থাকবে।

কার্টুন ১- একটা জলের পাইপ। কলের মুখটা খোলা, সেখান থেকে জল পড়ছে। সেই জল পান করছে এক ব্যক্তি। ছবিতে বোঝা যাচ্ছে সে বেশ নাদুসনুদুস (যে কিনা জল খেয়ে ফুলে গেছে, ফেটেও পড়তে পারে যেকোনো সময়)। তার জামায় লেখা SC/ST। আর কিছুটা দূরে ঐ কলের পাইপের ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে জল পড়ছে। সেই জল চাতকের মতো পান করছে রোগাসোগা এক ছেলে। যে সাধারণ/ অসংরক্ষিত ক্যাটেগরির।

কার্টুন ২- তিনটি ছেলে(পরীক্ষার আগে) লেখাপড়া করছে। একটি ছেলের সামনে বইয়ের সমুদ্র,তাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। অপর ছেলেটির সামনে যৎসামান্য বই। বেশ শুয়ে বসেই পড়ছে। তিন নম্বর ছেলেটির সে সবের বালাই নেই। লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই। মনে হয় সে ঘুমাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, প্রথমজন সাধারণ ক্যাটেগরির ছাত্র, দ্বিতীয়জন SC ক্যাটেগরির শেষজন ST।

ছবি/কার্টুন দুটি এ কথা বলে দিচ্ছে সংরক্ষিত ছেলে-মেয়েরা বিপুল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে।যা কিনা অন্যায়, বৈষম্যমূলক। সাধারণ/অসংরক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীদের(মূলত ছাত্রদের, এখানেও ছাত্রীরা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পায়। মানে সাধারণ ছেলেরা সবচেয়ে অভাগা!) বিপুল অধ্যাবসা করতে হয় চাকরি পেতে গেলে বা কোথাও ভর্তি হতে গেলে।বাকিদের সে সবের বালাই নেই।অর্থাৎ ‘অ-সাম্য’, ‘অ-ন্যায়’ চলছে।

সত্যি অন্যায় চলছে। ছবি গুলোর কথা খেয়াল রাখলে সেকথা বলতে হয়।স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কী ভাবে অসাম্য-বৈষম্য কে প্রশ্রয় দিতে পারে? ফলত সাম্য, ন্যায়, বৈষম্য নিয়ে তর্ক ওঠা স্বাভাবিক। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমস্ত নাগরিকের প্রতি সমমনোভাব পোষণ করবে এটাই কাঙ্ক্ষিত।কিন্তু চাকরি ও শিক্ষায় সংরক্ষণ সেকথা বলছে না।

ন্যায় কাকে বলে? বা ন্যায় বলতে আমরা কী বুঝি? বাংলায় ন্যায় শব্দটা বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।ন্যায্যতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। Justice অর্থে তা ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত ন্যায় শব্দটি  Justice অর্থে ব্যবহার করে থাকেন, যার সঙ্গে অন্যায়,সামাজিক ভাবে কাঙ্ক্ষিত নয় এমন কিছু ধারণার বিরোধের সম্পর্ক। ন্যায়ের সঙ্গে সামাজিক ও নৈতিকতার প্রশ্ন যুক্ত আছে। ন্যায় বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত দেবার ধৃষ্টতা নেই আমার। আমার কাছে ন্যায়ের ধারণা তৈরি হওয়া একটা যুক্তির কথা বলতে পারি। ইতিহাস, প্রতিবেশ, পরিপ্রেক্ষিত নিশ্চিত ভাবেই থাকবে, সংরক্ষণ(তথাকথিত অসাম্য তৈরিতে) বলবৎ করার ক্ষেত্রে। কোনো একটি বিশেষ পক্ষ/ পরিপ্রেক্ষিতের নিরিখে ন্যায়ের ধারণা তৈরি হয় না। বস্তুত, বিভিন্ন পক্ষের(পক্ষ,স্বপক্ষ, বিপক্ষ) ভিন্ন ভিন্ন ধারণার সংশ্লেষে/অভিঘাতে/বিবাদে একটা ধারণা তৈরি হয়। যা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক-ঐতিহাসিক পরিস্থিতির নিরিখে ন্যায়ের ধারণার জন্ম দেয়। একেই সাধারণত ন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়ে বড়ো অভিযোগ বৈষম্যের,অসাম্যের। উপরে উল্লেখ করা কার্টুনটির দিকে খেয়াল রাখলেই সে কথা বোঝা যাবে। কীভাবে একাংশের ছাত্র-ছাত্রী/চাকুরিজীবী দিনের পর দিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে চলেছেন। যোগ্যতার নিরিখে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও , মেধাবী হওয়া সত্ত্বে তাঁরা বিশেষ একটি সরকারী নীতির কারণে দুর্দশার মধ্যে পড়েছন। মেধা-যোগ্যতায় তুলনামূলক নিচের অংশ কীভাবে সুযোগ পেয়েই যাচ্ছে। এই সরকারী নীতি কার্যত একাংশের তোষণ করে চলেছে। একেই তো অসাম্য বলে চিহ্নিত করা যায়। আচ্ছা সাম্য কাকে বলে? যেখানে সকলের সমান সুযোগ পাবে, সকলের বিকাশের জন্য সম-সুযোগ সুবিধা থাকবে,তাই তো সাম্য। শেষে এক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যোগ্য ব্যক্তি/ব্যক্তিরা জিতবে/পড়বে/চাকরি করবে। মানে যোগ্যতমের সাফল্য। কথাটা ডারউইনীয় ঠেকল। সাম্য বলতে আমরা এটাই বুঝি।

এবার সাম্য ধারণাটির শর্তগুলোকে একটু নেড়ে ঘেঁটে  দেখি কী দাঁড়ায়। শর্তগুলো এরকম- এক, সকলেই সমান সুযোগ পাবে। (অর্থাৎ প্রতিযোগিতায় কেউ কোনো বাড়তি সুবিধা পাবে না)। দুই, সকলের বিকাশের(অর্থাৎ বড়ো হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে) সম-সুযোগ সুবিধা থাকবে। এই শর্ত গুলো পূরণ হলেই সাম্য। যদি এই শর্তগুলো পূর্ণ না হয়? তাহলে? তাহলে কী একাধিক প্রতিযোগিতার প্রয়োজন? সাম্য প্রসঙ্গে কেউ কেউ প্রয়োজনের কথাকে উল্লেখ করে থাকেন। একথায় মার্ক্সের কথা মনে পড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাম্য নির্ধারিত হয় প্রয়োজনের খাতিরে। আচ্ছা আমার প্রয়োজন কে ঠিক করে দেবে? রাষ্ট্র,সরকার? কীভাবেই সে ঠিক করবে? সে প্রয়োজন বলতে যা বোঝে, সেটাই কী আমার প্রয়োজন? নাকি তার বাইরে আমার কিছু কথা থাকতে পারে? রাষ্ট্র,সরকারের পক্ষে প্রতিটি ব্যাক্তি বিশেষে নিরিখে প্রয়োজন নির্ধারণ আদৌ সম্ভব? কীভাবে ঠিক হয় প্রয়োজনের ? কোন নীতির ভিত্তিতে? ইতিহাস,আর্থ-সামাজিক অবস্থানের নিরিখে? সেখানে ধর্ম-লৈঙ্গিক-ভৌগোলিক-আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে সরিয়ে রাখা সম্ভব?

সংরক্ষণ নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ –মেধার সঙ্গে আপোষ করা হচ্ছে, মানে মধ্যমেধা/নিম্নমেধার লোকজন সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। মেধার অবনতি হচ্ছে। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অথচ সাধারণ ক্যাটেগরির ছেলে-মেয়েরা কোনো সুযোগ পাচ্ছেনা। পিছিয়ে পড়া অথচ,আর্থিক ভাবে সচ্ছল ছেলে-মেয়েরা সুযোগ পেয়েই চলেছে। যেটা কিনা পক্ষপাত দুষ্ট। সংরক্ষণ নিয়ে হাজারো অভিযোগের মধ্যে এই দুটো প্রবণতাই মূখ্য।

আচ্ছা মেধা কাকে বলে? কীভাবেই বা মেধার সৃষ্টি? এরকমটা বলা হয়ে থাকে,মেধা/প্রতিভা ঐশ্বরিক বিষয় কারও কারও মধ্যে এই গুণ জন্ম থেকেই থাকে। যে গুণে সে বাকিদের থেকে পৃথক।এমনও বলা যেতে পারে মেধা তো জিনের কিছুটা অদল্বদলে ঘটে যাওয়া ঘটনা। শুধু কী তাই? মেধা খরিদ করা যায়বাজার থাকে।অস্বাভাবিক ঠেকছে কথাটা। আমার আর্থিক-সামাজিক প্রতিপত্তির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মেধার্জ্জনের সুযোগ গুলো কি নেই বাজারে?পাওয়া যায় না! হলফ করে অস্বীকার করতে পারি আমরা? কখনো প্রশ্ন ওঠে না বাজারি মেধা নিয়ে।নাকি মেধাও দীর্ঘদিনের,প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পূর্বপুরুষের,সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ফসল? মোদ্দা কথা হল, আমার মেধাবী হওয়ার পেছনে দীর্ঘকালীন জ্ঞানচর্চার অবদান, সভ্যতার বিরাটা সময় পর্ব জুড়ে সুবিধা পাওয়া, বিরাট অংশের মানুষের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঋণকে কী অস্বীকার করা যায়? নাকি মেধা মানে অনুশীলন, অধ্যবসা। কার্যত, মেধা শানিত,সুরক্ষিত, পরিশীলিত অনুশীলন ও অধ্যবসা ব্যতিত। তর্ক চলতেই পারে মেধার জন্ম কীভাবে? কী করে একজন/কয়েকজন মেধাবী হন অন্যদের থেকে। সে তর্ক আপাতত মুলতুবি থাক। একটা প্রদীপের শিখা জ্বলছে, জ্বলেই চলেছে। তার আলো আমাদের আলোকিত করছে। সেই আলোর বিচ্ছুরণে আমারা মুগ্ধ। তার পাশে থাকা কয়েকটি শিখা নিভে গেছে কিছুটা জ্বলে। আলোকিত শিখার ঔজ্জ্বল্যে খেয়াল করি নি ঐ শিখাটির চারপাশে ঘিরে থাকা কাচের বলয়টাকে। বাকি শিখাগুলো নিভে গেছে, বলয়ের অভাবে। মনে হতেই পারে মেধা,সংরক্ষণ প্রসঙ্গে আলো,প্রদীপ, কাচের বলয়ের কথা কেন? কিছুই নয় পাতা ভরানোর ফন্দি,আর ঘুলিয়ে দেওয়ার ধান্দা। মেধাও ঐ উজ্জ্বল প্রদীপ শিখাটার মতো। যে জ্বলে একাকি, বলয়ের সুরক্ষায়। মেধার বিকাশ-প্রকাশ সম্ভব তখনই, যখন কিনা সে বলয় যুক্ত। একাকি মেধা অসহায়, ব্যর্থতা অনিবার্য।

সংরক্ষণের পেছনে থাকা যুক্তিটা অনেকটা এরকমের। সভ্যতার দীর্ঘ বঞ্চণার ও নিপীড়ণের কারণের জাত-পাত,আর্থ-সামাজিক, লৈঙ্গিক, ভৌগোলিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোকে একটু বলয়ের সুরক্ষা আনা। যাতে করে সে কিছুটা আলোকিত হবার ও করার সুযোগ পায়। যাকে কেউ এক কলমের খোঁচায় মেধার সাথে আপোষ, মেধার অবনমন বলে দেগে দিতেই পারেন, বলতেই পারেন ঘোর অসাম্য চলছে। সেই অভিযোগকারীদের মেধা, বিদ্যা নিয়ে ঘোর সংশয় আমারতো থাকবেই।

একথার পর আরেকটা প্রশ্ন উঠবে। আমার কোন এক পূর্বপুরুষের শোষণ বঞ্চণার দায় আমি কেন নেব? ঠিকই তো। সে অত্যাচারের দায় তাদের, তার জন্য আমাকে শাস্তি পেতে হবে কেন? সেই ভেড়া আর নেকড়ের গল্পটার মতন- পূর্বপুরুষের জল ঘোলা করার জন্য সে নেকড়ের খাদ্যে পরিনত হয়। বিষয়টা বোধ হয় এতটা সলর নয়। পূর্বপুরুষের,  সভ্যতার বিরাটা সময় জুড়ে চলা অত্যাচারের দায় ভাগ আমি নেব না ঠিক কথা। সত্যি সে দায় আমার উপর বর্তায় না। আর সে দায়ের জন্য আমাকে অভিযুক্ত করারটাও অসমীচীন। এই বক্তব্যে সহমত। আমরা ‘টিনের তলোয়ার’-এর একটা দৃশ্যের কথা মনে করি। ময়না(শঙ্করী) প্রিয়নাথের সঙ্গে চলে যেতে চায়। বীরকৃষ্ণ দাঁর রক্ষিতা হওয়াকে ঘেন্না করে। বেনিবাবু বলে এ ময়না আমার সৃষ্টি। আমি তাকে যা দিয়েছি সব কিছু ছেড়ে দিতে পারবে সে? যদি তা পারে তাহলে নির্দ্ধিধায় চলে যাক।পূর্বপুরুষের অনাচারের দায়ের অভিযোগে উত্তরপ্রজন্মকে অভিযুক্ত করা । কিন্তু সে বিপুল সুবিধা,সুযোগ, জ্ঞানচর্চায় অধিকারী হওয়া, কৌলিন্যের জোরে মেধাকে শানিত করা, সুরক্ষিত রাখার উপাদান গুলোকে টেনে ছিঁড়ে ফেলে টিনের তলোয়ারের ময়না হওয়া সম্ভব ? আচ্ছা, অভিযোগের দায় আমি নিলাম না, গুণগুলোই নিলাম। সে গুণ কী আমায় শেখায় শুধু আমার কথা ভাবতে? নির্লজ্জ, অশ্লীল ভাবে এটা বলতে যে আমি আমার যোগ্যতায় এখানে এসেছি। অমুক করেছি বলতে। অধিকারের সমতা বা সুযোগের সমতা নয়, অপমানের অসম্মানের সমতার শিক্ষা কী দেয় নি সভ্যতা আমাদের!

আর একটা কাল্পনিক ঘটানার স্মরণাপন্ন হই।এর আগে আমরা সাম্য অসাম্য নিয়ে বেশ কয়েকটা কথা বলেছিলাম। এবার একটু পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।ধরা যাক, আপনি/আমি(যারা কিনা কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী এবং চাকরী প্রার্থী), উসেইন বোল্ট,একজন শ্রমিক কিংবা কৃষক ও মহিলা(যাঁরা ঘরেই থাকতে বাধ্য হন) এক দৌড় প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি। কে জিতবে? চোখ বন্ধ বলে দেওয়া যায় বোল্ট। কেন? এই প্রশ্ন অনর্থক, বিরাট প্রতিভা(মানে মেধা আর কি)। আচ্ছা আর একটা প্রতিযোগিতার কথা ভাবা যাক। ঐ তিন জনই কলেজের পরীক্ষায় বা চাকরির পরীক্ষায় মুখোমুখি কে জিতবে!?(মানে চাকরি পাবে বা পড়া সুযোগ পাবে।) আমি/আপনি, কারণ আমরা লেখাপড়া করি। বোল্ট খেলে আর বাকিদের তো সে সবের বালাই নেই, সুযোগ নেই। আর একটা যোগ্যতা/মেধার পরীক্ষার কথা ভাবা যাক, মাঠে চাষ করতে কিংবা কারখানায় লোহা পেটাতে পাঠানো হয়েছে। কি হবে কল্পনা করুন। কে বেঁচে থাকবে(মানে জিতবে আর কি)? নিশ্চিত ঐ কৃষক/শ্রমিকটি। কেন? উনি/ওনারা ঐ বিশেষ কাজে বিশেষজ্ঞ। শিখেছেন, অভ্যাস করেছেন। ঐ কাজে তাঁদের মেধা(যদি তাকে মেধা বলার, মেধা আমাদের থাকে তো) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। শেষ একটা প্রতিযোগিতার কথা ভাবা যাক, ঘরকন্নার প্রতিযোগিতা যদিও এই প্রতিযোগিতা বড়োই নির্মম, নির্দয়। কি হবে? নাই বা বললাম। এবার আমরা ফিরে যাই সাম্য দ্বিতীয় শর্তটির কাছে- প্রত্যেকের প্রকাশের ও বিকাশের সম সুযোগ-সুবিধা। বোল্ট দৌড়ের জন্য যে অধ্যবসা, অনুশীলন করেছে বাকিরা তা করে নি বা সুযোগ ও পাই নি, আর লেখা পড়ার ক্ষেত্রে আমি/আপনি যে সুযোগ পেয়েছি, তা পেলে ঐ কৃষক/শ্রমিকটি বা মহিলাটি হয়তো আমাদের পাশের বেঞ্চে বসতো। আর চাষ করা কিংবা লোহা পেটানোর জন্য যে অনুশীলন,পরিশ্রম করেছে বঞ্চণা,ঘৃণা,শোষণ জুটেছে তার কোন তাই আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। ফলত,এই প্রতিযোগিতা অর্থহীন, অবাস্তব।এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এটা কোন প্রতিযোগিতা হল। প্রতিযোগিতা তো তাকেই বলে যেখানে সম-সুযোগপ্রাপ্তদের লড়াই হয়,সেই মহাভারতের যুগ থেকেই একথা চলে আসছে। অথচ আজ আমরা নির্দ্বিধায় আহ্বান করছি অসম প্রতিযোগিতার, যাতে করে নিশ্চিত করতে পারি জয়, আর বলতে দিতে পারি তুমি অযোগ্য…তোমার সংরক্ষণও অনেকটা সেরকম। শোষণের দীর্ঘ ইতিহাসে বঞ্চিত,ঘৃণিত মানুষ গুলোকে একটু সুযোগ দেওয়া। সম পর্যায়ভুক্ত করার চেষ্টা। যা আপাতদৃষ্টিতে বৈষম্যমূলক, আদতে সাম্য নামক ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত। যা ব্যক্তিবিশেষের নিরিখে অন্যায়, বৈষম্যমূলক – সামগ্রিকতার নিরিখে প্রয়োজনীয়।

সংরক্ষণ নিয়ে এরকম একটা অভিযোগ, সংরক্ষণের ফলে অনেকাংশের সাধারণ ক্যাটেগরির ছাত্র,যারা আর্থিক ভাবে প্রান্তিক তারা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর উলটো দিকে আর্থিক ভাবে সচ্ছল কিন্তু কিন্তু সংরক্ষিতরা সুযোগ পেয়েই চলেছেন। অস্বীকার করা যায় না এ অভিযোগ। মানে সংরক্ষণের নীতির মধ্যে কোথাও একটা সমস্যা রয়েই গেছে। তাহলে কী সংরক্ষণ শুধুমাত্র অর্থনীতির প্রশ্নে হওয়া উচিত? ভারতবর্ষের মতো দেশে সামাজিক, জাত-পাত, লৈঙ্গিক, আঞ্চলিক, ভৌগোলিক সমস্যা সরিয়ে রেখা সম্ভব? তাহলে কি সংরক্ষণের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রশ্নটিকে যুক্ত করা প্রয়োজন? যারা সংরক্ষণ নিয়ে এই প্রশ্নটি তোলেন আমরা নিশ্চিত তাঁরা বাকি প্রশ্নগুলোকে অস্বীকার করবেন না। দাবি অর্থনৈতিক বিষয়টি বিবেচনা করা। সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অংশ ছাড়াও মহিলা, সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়, উঃ-পূঃ ভারতের মানুষেরা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে থাকেন। কেন পান? বিশেষ কিছু সামাজিক, পারিবারকেন্দ্রিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক কারণে এঁরা বাকি অংশের বেশ কিছুটা পেছনে। শুধুই আর্থিক প্রশ্নে এই সব সমস্যার সমাধান কার্যত অসম্ভব। দাবি এমনযে টাকা থাকলেই যেন সব সমস্যা উবে যাবে। এখন প্রশ্ন হল সংরক্ষণকে কীভাবে দেখব? কীভাবে বিচার করব? আমার ব্যক্তিগত অবস্থানের বিচারে নাকি সামগ্রিকতার নিরিখে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন/অবস্থান থেকে সংরক্ষণ কারুর কাছে অন্যায়, কারুর কাছে একটেরে, কারুর কাছে অপ্রয়োজনীয়, কারুর কাছে সুবিধা ভোগের রাস্তা, আবার কারুর কাছে প্রয়োজনীয়(অধিকার ও সম্মানের প্রশ্নে, টাকা ও সম্পত্তির বিচারে নয়)। এতো ব্যক্তি অবস্থানের নিরিখে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম তৈরি করতে হবে। যা অবাস্তব। উপায়? অনেকের পাশে থাকা, অনেকের স্বার্থ বোঝা, বহুর দিকে তাকাতে শেখা।

এখন সংরক্ষণ শব্দটিকে যে অর্থে, প্রেক্ষিতে প্রয়োগ করা করা হয় তা একটু ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। অর্থাৎ কাউকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে, সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, বিকশিত করা হচ্ছে। সেই দিক দিয়েসংরক্ষণের খুব কাছাকাছি, আত্মীয় শব্দ সুরক্ষিত। যার মধ্যে রক্ষা শব্দটির ঝোঁক উপস্থিত। আমাদের আগে বলা কাচের বলয় ঘেরা প্রদীপ শিখার মতো, যে যাবতীয় ঝড়-ঝাপটার আঘাত থেকে সতর্কতা সঙ্গে রক্ষিত। সভ্যতার, ইতিহাসের বিভিন্ন সময় পর্বে জ্ঞান,বিদ্যা, সংস্কৃতি বিশেষ কয়েকজনের জন্য রক্ষিত, কুক্ষিত(মানে কুক্ষিগত আর কি)- তখন সংরক্ষণ শব্দটাকে ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন প্রেক্ষিতে দেখা জরুরি বলে মনে হয়।আদপে এই যুগের সংরক্ষিত জনগণ-ই বহু হাজার বছর একলব্যের ভূমিকা পালন করেছে, সংরক্ষণ করেছে দেব, ব্রাহ্মণের স্নেহ ধণ্য অর্জুনদের। নায্যতা দিয়েছে অন্যায়কে, অসাম্যকে। আজ যখন ‘ওদের’সুরক্ষার কথা সামনে আসছে, তখন আওয়াজ উঠছে এ অসাম্য, অন্যায়। পাছে তাদের সুরক্ষিত, সংরক্ষিত, কুক্ষিত(কুক্ষিগত)স্থান গুলো সকলের হয়ে যায়। তারাই সংরক্ষিত, সুরক্ষিত, বলয়ের সাহায্যের জ্বলে চলা প্রদীপ শিখা – ভয় পাচ্ছেন ঔজ্জ্বল্য হারানোর।

অধিকারের সমতা নয়, সম-সুযোগের সমতা নয়,যোগ্যতার সমতা নয়, আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত অপমানের, অসম্মানের সমতার। যাদের নিচে রেখেছি এতো কাল, তাদের অপমানে সমান হওয়া অধিকারী হতে হবে। ছাড়াতে হবে অনেক কিছু, না হলে সাম্য আসবে- শ্মশানের সাম্য। শেষ পর্যন্ত ওদের কাছে আমাদের কী ঋণ রয়ে গেছে তা টের না পেলে, ওরা আমাদের থেকে কতটা বঞ্চিত তা টের না পেলে অসাম্য ও অন্যায় থেকে মুক্তি হবে না আমাদেরও। ঘৃণা, বঞ্চনা, বিদ্রুপ, শোষণেরও যে ঋণ থাকতে পারে তা না বুঝলে, আমাদের মানুষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to সাম্য, ন্যায় ও সংরক্ষণ

  1. পিংব্যাকঃ জুলাই-অগাস্ট ‘১৬ |

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s