শূন্য অঙ্ক

লিখেছেন শবনম সুরিতা 

সংখ্যার হিসেবেই মূলত রাষ্ট্র-সমাজ চলে। বা বলা ভালো সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়মেই রাষ্ট্র চালানো হয়। আর যারা অনুপাতে কম, নজর এড়িয়ে যায় সহজেই, তাদের জন্য বরাদ্দ রাষ্ট্রনীতির নাম সংরক্ষণ। ইংরেজিতে যার অনুবাদ করলে মোটেও প্রথম অর্থে Reservation হয়না।বরং অর্থ দাঁড়ায় Preservation বা Conservation।এই সংরক্ষণকেই খানিক জোর করে, বুঝিয়ে শুনিয়ে পোষ মানিয়ে ভদ্রতার সাথে রাষ্ট্র নাম দিয়েছে Reservation।

সহজেই ধরে ফেলা যাবে না কিন্ত এই চাল।কায়দা আছে।বুঝতে হবে কথার মারপ্যাঁচের তফাতটা আসলে কোথায়।

ভারতবর্ষে বেশ কিছু প্রজাতির বাঘ ও অন্যান্য প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে।তাই সরকার নানা নিয়ম করেছে  শিকার, প্রাণী-পাচারের বিরুদ্ধে।বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। আবার এদিকে বিজ্ঞান বলে, কোনো ফলে পচন ধরলে বেশি মাত্রায় চিনি বা নুন দিয়ে তাকে আচার বানিয়ে ফেলা যায়।এর প্রক্রিয়াগত নাম খাদ্যসংরক্ষণ।

কিন্ত মানুষের সংরক্ষণ? এও কি সম্ভব? তবে কি মানুষেও পচন ধরে?

পৃথিবীতে কত রকম প্রাণী আছে তা ভালো জানা নেই। কয়েকশো বা কয়েক হাজার হবে হয়ত বা। কে জানে? এত সংখ্যার দৌড়ঝাঁপ মাথায় ঢোকানো আরেক ঝামেলা। তবে মানুষ ছাড়া আর অন্য কোনো প্রাণী যে অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে ভাবিত নয়, এটুকু বুঝতে অঙ্ক লাগেনা। নিজের, নিজের ছানাপোনাদের প্রাণ রক্ষা নিয়ে সব প্রাণীই কমবেশি চিন্তিত, কিন্ত অস্তিত্ব? এ বিষয়ে মানবজাতির একচেটিয়া আধিপত্য।সত্ত্বা, পরিচয়, ইতিহাস- এসব বারবার জানাতে চায় মনুষ্যমস্তিষ্ক ঠিক কতটা অতীত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। খালি পিছনে ফিরতে চায়। রীতিমত বাতিকগ্রস্ত। তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ? কেন? কী চাও? নাম কী? ধাম কী? কাজ কী? একটা মানুষের জীবনকালে (মৃত্যুর পরেও যথেষ্ট) সবচেয়ে বেশি শোনা প্রশ্নের উত্তরগুলিও কেমন যেন বড্ড বেশি অতীতমুখী। শুধু তাই নয়, আগামী নিয়ে যা যা ভাবনা,পরিকল্পনা, তার রাস্তাও ওই অতীতেই খুঁজে ফেরে মানুষ।প্রাণরক্ষার সোজা অঙ্ক তাই এখানে অচল। মানবরাজ্যের জন্য বরাদ্দ অন্য অঙ্ক। জটিল। বর্তমান সংখ্যার চলনেও জ্বলজ্বল করছে তাই অতীতেরই ইতিহাস। চারপাশে ঘুরঘুর করছে সেই একই প্রশ্ন। তুমি কে? তুমি কী? তুমি কোথায়?

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক সোনার কথা। সোনা ভাষাগত পরিচয়ে মালায়ালী, ধর্মগত পরিচয়ে হিন্দু। সোনার বাবা কেরলে জন্মগ্রহণ করা একজন দলিত, যার সাহস হয়নি কখনও জুতো পায়ে গ্রামের উঁচু জাতের লোকের সামনে আসতে। সোনা’র মায়েরা খাঁটি নায়ার ব্রাহ্মণ। অত্যন্ত উচ্চবিত্ত, উঁচু জাতের মেয়ে যখন দলিতের প্রেমে পড়ে বিয়ে করে, স্বভাবতই তখন আর শান্তিতে জীবনযাপন বাস্তবায়িত হয় না। সুতরাং বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে পাড়ি। সোনার বাবা, প্রভাকরণবাবুই তাদের পরিবারে প্রথম ইস্কুলের গণ্ডী পেরিয়েছেন। সরকারী স্কুল-কলেজে পড়ায় সংরক্ষিত আসন পেতে অসুবিধে হয়নি খুব বেশি। শুধু সপ্তাহে পাঁচদিন কলেজ যাবার পথে টিটকিরি শোনা আর গোটা স্কুলজীবন ক্লাসঘরের বাইরে বসে পড়া বোঝার অভ্যেসটুকু রপ্ত করতে হয়েছিল আর কি। সোনার অবশ্য এতকিছু সইতে হয়নি। ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া, ফড়ফড় করে ইংরেজি বলা সবই আর পাঁচটা মেয়ের মতই হচ্ছিল। বাগড়া দিল একটা স্কলারশিপ। আই আই টি-তে পড়াকালীন সোনা একটি স্কলারশিপ লাভ করে ইউরোপে এক বছরের জন্য পড়তে যাওয়ার। স্বাভাবিকভাবেই সে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত। ক্লাসের বন্ধুরাও খুশি। ও বুঝতেই পারল না এর মাঝেও হালকা করে কেউ নাক সিটকোচ্ছে অবলীলায়। মানুষ পচার গন্ধ পেল কি না জানিনা, তবে এটা হাওয়ায় ভাসতে শোনা গেল যে স্কলারশিপটা সোনা হাতিয়েছে নীচু জাত হবার সার্টিফিকেটের জোরে, তার ৮+ জিপিএ বা একগুচ্ছ ইন্টার্নশিপ বা উচ্চমাধ্যমিকে সারা রাজ্যে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হবার জন্য নয়। বললাম না, বর্তমান নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। দৃষ্টি আটকে অতীতে।

ওদের জীবনের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বড় একঘেয়ে। একই প্রশ্নের প্যানপ্যানানি।

তুমি কে? তুমি কী? তুমি কোথায়?

নেহাত দেশটা গণতন্ত্র বলে কিছুটা খ্যাত, তাই কিছু অংশের মানুষকে চিড়িয়াখানা বা জাদুঘরে রাখা এখনও আইনত অপরাধ।অতীত যদিও গল্প শোনায় বর্ণাশ্রমের, তাই শুকনো মুখে হলেও, ব্রাহ্মণ-শূদ্র-জারোয়া-মহিলা-উভলিঙ্গ সবাইকেই সমানাধিকারের দাবীদাররূপে মেনে নিতে হয় আজকের ভারতবর্ষে।সংরক্ষণের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে।কিন্ত যাপনের সমানাধিকারের লড়াই এই দেশে যতটা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট, সংরক্ষিত আসনের জন্য, কোনো অংশে এই লড়াইয়ে কম যায় না সমানাধিকারের সংজ্ঞা স্থাপনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত নানা আন্দোলনও।

সমানাধিকার কী তা কীভাবে বুঝবে মনুর দেশ? এখানে তো দুই ব্যাটসম্যান মাঠে নামে দুই বেশে। ‘লগান’ ছবির মতই একজনের কপালে গেরুয়া টীকা, তো আরেকজনের থুতনিতে দাড়ি।একজন খেলোয়াড় যখন সবে বল হাতে তৈরী উইকেট ফেলবে বলে, অন্য দলের ব্যাটসম্যানের মাথায় আরেক চিন্তা।ছায়া মাড়ালেই জাত-কুল-ধর্ম যাওয়ার ভয়ে তার তখন প্রাণ ওষ্ঠাগত।উইকেট নিয়ে ভাবিত নয় সে মোটেও। ব্যাটে বল ঠেকানোর অধিকার সবাইকে সমানভাবে দেওয়া হল। কিন্ত গোটা দলের জাত হারানোর ভয়ে যে খেলোয়াড় মাঠেই নামার অনুমতি পায়না, কোন সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বিচার করা হবে তার রানরেট? মাথার হিসেব সর্বদাই এক থেকে শুরু হয়। ঘোড়দৌড়েরও তাই। ১…২…৩…৪…আগামীর দিকে এগোয় সংখ্যা।

আর ১-এর যে অতীত? শূন্য? জিরো? গণিতের ইতিহাসে ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ অবদান যে সংখ্যাটি, ঠিক সেখানেই এসে জটলা পাকায় একের পর এক মানুষ। শূন্য থেকে ১-এর দিকে ঠেলে দেওয়াই তখন হয়ে ওঠে সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য। শূন্যের কোঠায় ভীড় জমানো নয়।

কিছু বিজ্ঞজনেরা বলবেন সংরক্ষণ ঢের হয়েছে। জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সময় এসেছে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক দুর্বলতার ভিত্তিতে সমাজকে দেখতে শেখার। একবার বলেছিলাম আমি সোনাকে এই কথাটা। দু’মিনিট চেয়েছিল অপলক আমার দিকে। প্রশ্ন করেছিল তারপর। কোন যুক্তিতে বলে দেব যে শূন্যের কোঠায় অবস্থান আজ অতীত? সংরক্ষণ প্রভাকরণবাবুকে অধিকার দিয়েছিল স্কুলে ভর্তি হবার, ক্লাসে ঢুকতে পারা নিশ্চিত করতে পারেনি। কলেজের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকার করার সুযোগটুকু সোনাও পেয়েছিল। প্রভাকরণবাবুও পেয়েছিলেন একই সুযোগ। কিন্ত উঁচুজাতের স্ত্রী হবার কারণে গ্রামে পাকা দেওয়ালের ঘর তুলতে পারেননি কখনও। ১-এর দিকে হাঁটার সুযোগ পেয়েও আটকে গেছেন সেই শূন্যের ঘেরাটোপের মধ্যেই।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আইন হয়ে গেলেও তাদের শিকার থামানো যায়নি আজও ভারতবর্ষে। গণ্ডারের শিং, হরিণের চামড়া, বাঘের ছাল- এসবের বিক্রির বাজারও সেভাবে পাল্লা দিয়েই বেড়েছে চোরাবাজারে। মজার বিষয়, বন্যপ্রাণীই শুধু নয়, মানুষের শিকারও ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি দেশের সংবিধান। সংরক্ষণ সম্পর্কিত আইন নূন্যতম একটা বাঁশের বেড়া জুগিয়েছে শুধু। ও দিয়ে এখন আর আধুনিক শিকারীদের টেক্কা দেওয়া যায়না। অতীতেও যেত না।

কিন্ত অতীতের একটা স্বপ্ন ছিল। স্মৃতির মধ্যে (ইরানী নন, স্মরণ অর্থে ব্যবহৃত) ঠিক যেমন একটা নেশা আছে, ঠিক তেমন। সেই স্বপ্নে সমানাধিকারের আশা ছিল। কিন্ত ঘুম ভেঙে গিয়ে বর্তমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। আর তখনই বোঝা গেছে যে সংরক্ষণের বর্তমান পরিকাঠামো দিয়ে বাঁশের বেড়ায় প্রাণদান আর সম্ভব নয়। জাত-ধর্ম-লিঙ্গের ভিত্তিতে থেমে থাকলে চলবে না। একই সাথে লড়তে হবে অন্যান্য বিভেদ সৃষ্টিকারী চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

আমরা আসলে এখনও বুঝিনি স্মৃতির (আবারও, ইরানী নন) জোর কতটুকু। ক্রমাগত ভাবে মার খেতে থাকলে একটা সময়ের পর ব্যথাটা মিলিয়ে যায়।শুধু পড়ে থাকে গায়ের ক্ষতচিহ্ন।আর প্রহৃত হবার স্মৃতি।যেন একটা স্ফুলিঙ্গ।তবে সেটাই যথেষ্ট দাবানলের জন্য।আর ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস তো জানেই স্ফুলিঙ্গে আগুন দেবার পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে। মার খাওয়ার স্মৃতি বয়ে বেড়ানো মানুষেরা ঘুরে দাঁড়ালে অঙ্ক কী দাঁড়ায়, তাও ভালো মতই জানা।

অপেক্ষা শুধুই দেখার কে জেতে শেষ অবধি।

আচার না বিচার?

শিকার না স্বপ্ন?

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to শূন্য অঙ্ক

  1. পিংব্যাকঃ জুলাই-অগাস্ট ‘১৬ |

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s