লালকমল-নীলকমল

লিখেছেন অভীক মন্ডল

এ কলকাতার মধ্যে আর একটা কলকাতা– ইক্‌বালপুর। শুয়োর ও মানুষ গাদাগাদি বসবাস করে।দু’জনেই দিন গোণে। কাল কে হালাল হবে কেউ জানে না। কখনো সরকারি উড়ালপুলের তলায় চাপা পড়ে, বা বস্তি উচ্ছেদে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যাই শেষ পন্থা ভেবে, কখনো বা Eviction Notice-এর জন্য, কখনো বা অনাহারে, প্রতিটা দিনই মৃত্যুর অপেক্ষা। এরকম নানান ভারতবর্ষের মতোই এক ভারতবর্ষ পেরিয়ার- ফুলে- আম্বেদকারের মহারাষ্ট্রের রামাবাই কলোনি।১৯৮৫ সালের ছবি “Bombay our city”- র দৃশ্য দিয়ে পরিচালক আনন্দ পট্টবর্ধনের “জয় ভীম, কমরেড” তথ্যচিত্রের পথচলা শুরু। সেখানে ভিলাস ঘোগড়ে- এক বিপ্লবী গায়ক গান গাইছে।পরের frame-এই ভেসে উঠছে তার মৃতদেহ।১১ই জুলাই, ১৯৯৭, ১০ জন দলিতকে হত্যা করা হয় রামাবাই কলোনিতে। এর প্রতিবাদে আত্মহত্যা করেন ঘোগড়ে। কে এই ভিলাস ঘোগড়ে? নিছকই আত্মহত্যা নাকি খুন? কাশ্মীরের সমস্যার মতোই ঘোগড়ের মৃত্যু সাদা-কালো-তে দেখা ভুল হবে। পরিচালকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঘোগড়ে ‘আহ্বান নাট্য মঞ্চ’ নামক এক নকশাল সংগঠনের দলিত নেতা। ১১ই জুলাই সকালে রামাবাই কলোনিতে বাবাসাহেব আম্বেদকারের গলায় চটির মালা পড়ানো দেখে, বিক্ষুব্ধ দলিতদের এক দল Eastern Express Highway-র রাস্তা রুখে দেয়। ঘন্টাখানেক পরে পুলিশের এক কনভয় এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। ক’দিন পরেই ঘোগড়ে মুলুন্দ-এর সিদ্ধার্থ নগরে আত্মহত্যা করেন।ভিলাস-এর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত ও বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকেই। অথচ এক দলিতের আত্মহত্যায় অবাক হবার তো কিছুই নেই! সেই সময়ে মহারাষ্ট্রের BJP-শিব সেনা সরকার দলিতহত্যায় পারদর্শিতা লাভ করেছে। মনুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা দেশকে মুক্তি দেবে এই নিম্নজাত, নিম্নশ্রেণীর হাত থেকে; এদের নির্মম হত্যাই তখন তাদের কর্মকাণ্ড, বর্তমানেও। এছাড়াও দলিত নেতাদের নিষ্ক্রিয়তার ফলে/ অকর্মণ্য মনোভাবের ফলে পীড়িত, দমিত শূদ্র জাত আত্মহত্যাই তো করবে। এটাই তো স্বাভাবিক! তবে কেন বিস্মিত হওয়া ঘোগড়ের মৃত্যুতে? ঘোগড়ে তার বিপ্লবী গান ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। ‘আহ্বান নাট্য মঞ্চ’-এর নকশাল দলিত নেতা ঘোগড়ের মৃত্যুর পর কমরেডদের “লাল সেলাম” তার ভাগ্যে জোটেনি। বরং শেষ যাত্রায় শোনা গেছে তার জাতের, তার শ্রেণীর মানুষের “জয় ভীম” ধ্বনি।আম্বেদকারের মৃত্যুর পর এক দশক দলিত রাজনীতিতে তেমন কোনো বিবর্তন লক্ষণীয় নয়। তবে তার পরেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের African-American এক সেনাদল “Black Panthers”-এর আদলে গড়ে ওঠা “Dalit Panthers”-এর হাত ধরে দলিত সাহিত্য এক নতুন দিশা পেল। Panthers-দের লড়াকু মেজাজ ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড দলিতদের মহারাষ্ট্রের নকশাল আন্দোলনের খানিকটা কাছে নিয়ে আসে। সেই নকশাল আন্দোলন যা Parliamentary Communist আন্দোলন থেকে ততদিনে নিজেই ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। Dalit Panthersদের আদর্শগত কিছু ত্রুটির ফলে সেই সংগঠন কোনো চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি ঠিকই, তবে এই সংগঠনটির দৌলতে নকশাল আন্দোলনে দলিতরা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবলম্বন করে। ৮-এর দশকে যখন নকশালরা আবার একত্রিত হচ্ছে, তাদের mass-organization গঠন করছে, তখন বহু দলিত যুবক/যুবতী তাতে যোগ দিয়েছেন।Mainstream/parliamentary communist দলগুলির থেকে আলাদা এক কর্মসূচী হওয়ার ফলে আন্দোলনে দলিতদের কাছে টানতে সক্ষম হয়েছিল এই নকশাল সংগঠনগুলো। কারণ দলিতদের ধারণা ছিল যে চিরকাল এই parliamentary বামপন্থী দলগুলো caste issue-কে যথাযথ প্রাধান্য দেয়নি। এমনকি দলিত আদিবাসীরা যে মূলত এক Anti-feudal শক্তি হয়ে উঠতে পারে এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে– এই ধারণাটিও বোধ হয় দলগুলির কাছে অস্পষ্ট ছিল বহুদিন। যদিও বলা বাহুল্য, যে শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়া এই জাতপাতের, বর্ণ-বৈষম্যের অবসান বাস্তবিকভাবেই অসম্ভব। যখন এক দলিত তার জাতের সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে শ্রেণি সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়, আরো অন্যজাতের নীচু শ্রেণির মানুষের সঙ্গে, একত্রে, একসাথে প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, তখন মাঝেমাঝে সে দলিতদের মধ্যে Marxist বলে লাঞ্ছিত হয়, বামপন্থীদের কাছে Ambedkarite বলে বাদ পড়ে, এবং রাষ্ট্রের কাছে নকশাল বলে নিপীড়িত হতে থাকে, এবং অবশেষে তার জন্মসূত্রে লাভ করা জাতের সত্ত্বা/পরিচিতির দিকেই তাকে ঠেলে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়– এই নিষ্ঠুর এবং জটিল বাস্তবের কথাই পট্টবর্ধন ‘জয় ভীম, কমরেড”-এর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, দলিতদের, দমিতদের, পীড়িতদের গানবাজনা সহযোগে। এতদিন পট্টবর্ধনের অনেক ছবির মুক্তির জন্য তাকে কোর্ট-কাছারিতে অনেক সময় নষ্ট করতে হয়েছে। শোষক রাষ্ট্র, মেহনতী মানুষের সর্বস্ব লুঠ করা মেরুদণ্ডহীন সরকা্‌র অবশেষে হার মেনে তার ছবি দেখানোর অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে “জয় ভীম, কমরেড” তথ্যচিত্রের জন্য এমন কোনো harassment-এর মধ্যে দিয়ে পরিচালককে সৌভাগ্যবশত যেতে হয়নি।হয়তো রাষ্ট্র আগেই নিজের হার মেনে নিয়েছিল এক্ষেত্রে।

স্বল্পশিক্ষিত এক দলিত, মুলুন্দের হাই স্কুলের এক পিওন, ঝুপড়িতে বসবাসকারী ভিলাস তার বিপ্লবী গান গাওয়ার সমস্ত আবেগ নিয়ে দলিত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দলিতদের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে যেটুকু বাড়তি রোজগার হত, সেই কতিপয় টাকার তোয়াক্কা না করে ‘আহ্বান নাট্য মঞ্চ’-এর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জোয়ারে পুরোপুরি গা ভাসিয়ে দেয় ভিলাস। অথচ এটা recognise করা তো দূরের কথা, তার Ambedkarite background-এর ফলে দল তাকে খানিকটা সন্দেহের চোখেই দেখত। আর আদর্শগত দিক থেকেও, ইংরেজিতে শিক্ষিত, ইংরেজি বলা উঁচু শ্রেণি/জাত এর লোক(যারা, নিজেদের De-classed হয়েছে বলেই মনে করত) যারা ‘আহ্বান’-এর প্রধান মুখ/নেতা ছিল, তাদের romantic- superficiality নিয়েও ভিলাসের একটা আপত্তির জায়গা ছিল। Proletariat-এর দৈনন্দিন জীবনের কষ্টের মধ্যে থেকে উঠে আসা গান গাইত ভিলাস। সেই গান বিপ্লবী না হলে, আর কোন্‌ গানই বা বিপ্লবী গান হতে পারে! Marx, Lenin, Engels, Stalin, Mao-এর পাশাপাশি ভিলাসের অফিসের দেওয়ালে যাদের ছবি টাঙানো ছিল, তাঁরা হলেন Tilak, Chapekars, Phadke, Chitapawan-রা – যারা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব করেছিলেন, যাদের Ambedkarite-রা Social reactionary বলে মনে করে।

মার্কসীয় ভাষায় “base” আর “superstructure” বলে দুটো শব্দ আছে। আচ্ছা জাত-পাতের সমস্যাটা ঠিক “superstructure”-এর সমস্যা কি? নাকি base-এর? নাকি দুটোরই? ভারতবর্ষের মতন একটা দেশে যেখানে প্রতিনিয়ত দলিত বলে মানুষকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, এরকম এক বাস্তবে তাকে শুধু “superstucture”-এর সমস্যা বলা চলে কি? De-caste না হলে কি De- classed হওয়া সম্ভব? Caste-এর সমস্যা তো শুধুমাত্র Touch-me-not-ism নয়, আরও হাজার একখানা সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে তার manifestation ঘটে। সর্বক্ষণ তাকে বুঝে নিয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ভিলাস ঘোগড়ে, যিনি Ambedkarite ছিলেন, de-caste হয়ে Marxist, Leninist হলেন, অতঃপর, তাঁর বর্জন করা Ambedkarite background-এর সাপেক্ষে তাকে কেন সন্দেহের চোখে দেখত দল? তিনি তো শ্রেণি সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন,তবে কেন তাঁকে ‘আহ্বান’ থেকে বহিষ্কৃত করা হল? সে ধাক্কা ভিলাস কখন সামলে উঠতে পারেননি। রামাবাই কলোনির হত্যাকান্ডের পর ভিলাস তাই নীল স্কার্ফ গলায় জড়িয়ে আত্মহত্যা করে,লাঞ্ছনায়,অপমানে,কষ্টে এবং সরকারের (বিজেপি-শিবসেনা) দলিত হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে।শেষ চিঠিতে ভিলাস লিখে গেছেন রামাবাই কলোনির ভূমিপুত্রদের সেলাম, Ambedkarite ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক। শেষ মুহূর্তে, মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট দল ‘আহ্বান নাট্য মঞ্চ’- এর একজন কর্মী কেন তাঁর  Ambedkarite দলিত Identity-র ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেন? সত্যিই, আমাদের এবং নানান বামপন্থী সংগঠনগুলোর তা ভেবে দেখা উচিৎ।  তা না করে তাঁর স্কার্ফের রঙ নীল না বেগ্‌নি- তাই নিয়ে তর্ক চলল বেশ কয়েকদিন। ভিলাসের অন্ধ্রপ্রদেশের এক দলিত কমরেড গাদার ভিলাসকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এই তথ্যচিত্রে বলেছেন কীভাবে ভিলাস তাঁর তেলেগু গানগুলোকে মারাঠি আর হিন্দিতে সাবলীলভাবে অনুবাদ করেছেন।

“সুজলম্‌ সুফলম্‌ ইসি দেশ মে

রোটি মাংগে কিঁউ রে ভাই?”

 রামাবাই কলোনির হত্যাকান্ডের রচয়িতা ছিল বিজেপি-শিবসেনা সরকার। মনোহর কদম হলো সেই পুলিশকর্তা যে ১১ই জুলাই অনায়াসে গুলি চালিয়েছিল। ক্ষোভে ফেটে পড়ে দলিতরা। আন্দোলনও হয়। তাদের মধ্যে ভাই সাঙ্গারে–ই মূল বক্তব্য রাখেন – মনুর আদেশেই কদমের এই হত্যালীলা।কোর্টে কেস ওঠে। সরকারের দাবি দলিতরা ১১জুলাই হাইওয়েতে একটা তেলের ট্যাঙ্কার পোড়ানোর চেষ্টা করে, তা রুখতেই গুলি চালানো হয়। সঙ্গে তারা একটি Doctored Video-ও কোর্টে পেশ করে। উল্টোদিকে আন্দোলনরত  দলিত ও Civil Rights Activist-দের দাবী কদম-এর সাজা হোক, খুনের ন্যায়বিচার চাই। ছকটা একটু চেনাচেনা ঠেকছে না? কিছুদিন আগেও জে এন ইউ সংক্রান্ত কিছু Doctored video দেখিয়ে দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদের জিগির তুলেছিল বিজেপি। যাইহোক, এক্ষেত্রে আন্দোলনের চাপে সরকার কদম-কে দোষী সাব্যস্ত করতে বাধ্য হয়। যদিও সাস্পেন্সনের পর জেল যাওয়ার বদলে কদম-কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, অতঃপ্‌র, এক সপ্তাহ বাদে Bail-এ ছাড়া পায় এবং পরে চাকরিতে তার পদোন্নতিও হয়।দশ বছরের বেশি সময় ধরে লড়ার পর অবশেষে কদমের শাস্তি হয়। সরকার খুব স্বাভাবিক ভাবেই কদমকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। নইলে যে তাদের নোংরা রাজনৈতিক দাবা খেলার এক গুরুত্বপূর্ণ মোহড়া হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তবে ভাই সাঙ্গারে-র কথাতেও আধা সত্যই প্রস্ফূটিত হয়। আসলে শুধু মনুর আদেশেই এই হত্যালীলার রচনা – এটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। যে কোনো রাষ্ট্রের সরকারের হওয়া উচিৎ ধর্ম-সম্পর্কহীন। কিন্তু সরকার যখন কঠোর ভাবে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুত্ববাদী তখন তার থেকে খারাপ  আর কি-ই বা হতে পারে! তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী সরকা্র তার মেশিনারি ব্যবহার করেই এই হত্যা কান্ড রচনা করেছে। কাছের বন্ধু ঘোগড়ের মৃত্যুর পর পরিচালক বদ্ধপরিকর ছিলেন যে আইনি বিচার ব্যবস্থায় তার সুবিচার না হওয়া অব্দি তিনি ছবিটা রিলিজ করবেন না। অবশেষে তাই ২০১১তে তথ্যচিত্রটি মুক্তি পায়।

কোর্টের দৃশ্য ও কোর্টের সামনে আন্দোলনরত দলিতদের মুন্ডন, পুলিশের লাঠিচার্জ, এবং তারপর পুলিশ ভ্যানের সামনে দিয়ে দলিত জাতেরই এক ঝাড়ুদারের রাস্তায় পড়ে থাকা কাটা চুল পরিষ্কারের দৃশ্যগুলি তৎকালীন মহারাষ্ট্রের এক নিঁখুত বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আমাদের মর্মাহত করে,লাঞ্ছিত করে। যারা দৈনন্দিন আমাদের বাথরুম-ড্রেন পরিষ্কার করে্ন, তাও আমাদের বিদ্রুপ লাঞ্ছনা সহ্য করেন, একদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে, তাঁরা যদি সমস্বরে ‘ গন্দেমাতরম্‌’ বলে ওঠে তাহলে সত্যি খুব ভুল হবে কি? নাকি তখনও বলবেন দেশের খাবে, দেশের পড়বে, আবার দেশকে গালিও দেবে! বেইমান নেমকহারাম অকৃতজ্ঞ কোথাকার!

নামদেও ধসল, বিখ্যাত দলিত সাহিত্যিক,  Dalit Panthers-এর এককালীন কর্মী তাঁর সমস্ত ইজ্জত জলাঞ্জলি দিয়ে শিবসেনার বাল ঠাক্‌রের ছত্রছায়ায় চলে এলেন অনায়াসে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাল ঠাক্‌রে বলছেন মুসলমানদের খুন করার কথা, খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছেন শ্রীকৃষ্ণ কমিশনকে, আর পিছনে দাঁড়িয়ে নামদেও ধসল গভীর মনোযোগসহ তাঁর কথা শুনছেন। অথচ এই শিবসেনাই ’৭২-এর ওরলি দাঙ্গায় তার কমরেড ভগবান যাদবকে খুন করে। শুধু ধসল কেন, আর এক দলিত নেতা যোগেন্দ্র কাওয়াদেও বিকিয়ে গিয়েছিলেন বিজেপির কাছে। বলে ফেলেছিলেন মোদির পদ্ম আসলে বাবা সাহেবেরই পদ্ম । মোদিই নাকি পরিত্রাতা, যে মহারাষ্ট্রকে গুজরাটে পরিণত করবে। অবশ্যই ডেভেলপমেন্ট মানেই কিছু দলিত হত্যা, কিছু মুসলমান হত্যা, একটা গোধরা কান্ড বা অন্তত একটা খায়েরলাঞ্জি ম্যাসাকার । প্রিয়াঙ্কা ভুতমাঙ্গে- একে দলিত তায় মহিলা। তাকে ধর্ষন না করলে কীভাবে ধর্ম পালন করবে এক সবর্ণ পুরুষ?

পুরুষতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, নিও-লিবারাল অর্থনীতির যুগে মৃত্যু কীভাবে এতো সহজ একটা দৈনন্দিন সত্য হয়ে উঠল? ধসলদের মত অজস্র দলিত নেতা কীভাবে যাদবের হত্যাকারীদের সাথে এত সহজে হাত মিলিয়ে নিল? কীভাবে আজও শহর- গ্রামের রাস্তায়-রাস্তায়, ফ্রান্স, বাংলাদেশ, ইস্তানবুল, কাশ্মীরের ঘটনার প্রতিবাদে আমরা গর্জে উঠছি না? কীভাবে গোধরা কান্ডের পরও নরেন্দ্র মোদির দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০১৪-এ ক্ষমতা দখল করল? আসলে উত্তরটা খুব সহজ। আমরা, যারা সুবিধা ভোগী, নিজের সুবিধা বুঝে নিই সব সময়, আমরা পক্ষ নেব কেন? নিজের পক্ষ নিজেই বানিয়ে নেব! নিও-লিবারাল অর্থনীতি আমাদের শেখায় কেবল নিজের জন্য বাঁচতে। তাতেও বিশেষ অসুবিধে ছিল না, যদি না আমার খুব ভালো থাকা অন্য কারুর ক্ষতি করে। আমি উচ্চবিত্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু পুরুষ, তাই, রাষ্ট্রও যদি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয় তাহলে ক্ষতি কী? আমাদের ভালো থাকার জন্য বুঝতে পারি অনেককেই মরতে হবে। আসলে সমস্যা একটাই মন্ত্রিমশাই। “ এই ভুবনের বিকেলবেলায়, জন্মভূমির পায়ের কাছে সন্ধ্যা নেমে আসার মতো” ওদেরও  খুব বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে – তার কী করা?

নয়ের দশকে মন্ডল কমিশনে নথিভূক্ত অনেক শূদ্রজাত-ই ন্যায্যভাবে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু আজও বোধহয় দলিতদের প্রতি আমাদের ঘৃণা, লাঞ্ছনা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং সংরক্ষণের ফলে বুঝি তা বাড়তি মাত্রাই পেয়েছে। তাই বোধহয় সংরক্ষণকে আরো জোর দিয়েই আপাতত সমর্থন করা উচিত। অন্তত ততদিন অব্দি যত দিন না জাতিভেদের অবসান ঘটে সম্পূর্ণ ভাবে। আম্বেদকার বা মার্ক্স,লেনিন,স্তালিন, মাও সব কথাই যে ভারি চমৎকার বলেছিলেন তা তো নয়! তবে অবশ্যই তাঁদের কর্মকান্ড ও বক্তব্যের যুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ। আম্বেদকারাইট ও লেফ্‌টিস্‌ট আন্দোলনগুলো অনেক ক্ষেত্রে হয়তো ভুল, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো দু’ধারার মধ্যে পারস্পরিক বিবাদ আছে, তবু এই দুই আন্দোলনের মধ্যেই যে বিপ্লবের রসদ লুকিয়ে আছে তা অনস্বীকার্য। মহারাষ্ট্রের এক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কবীর কলা মঞ্চ’ তার উদাহরণ। যখন তাদের গানের মাধ্যমে সংগঠনটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, প্রতিবাদী এই সংগঠনটিকে আটকানোর ফন্দিও আঁটা ছিল সরকারের। নাৎসি জার্মানিতে যেভাবে গোয়েবেলসের প্রোপ্যাগান্ডা চলত, একই ভাবে, মহারাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদী সরকার ‘কবীর কলা মঞ্চ’কে একটি মাওবাদী সংগঠন ঘোষণা করল। তাতে দলিতরা খানিকটা সরে এল দলটির কর্মকান্ড থেকে। এবং সরকারের বন্দুকের নলের তাড়া খেয়ে তারা আত্মগোপন করতে বাধ্য  হল। গ্রেপ্তার হল কেউ কেউ। যদিও সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ আছে যে কেবল মাওবাদী বলে কাউকে গ্রেপ্তার করা চলবে না, যদি না সে কোনো অপরাধ করে থাকে। তবু সেই থেকেই এই সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য সুধীর ধাওয়ালে জেলে বন্দি। আরেক পলাতক কর্মী শীতল সাথে। তথ্যচিত্রে তাঁর মা নারীশিক্ষার বিষয়ে কিছু কথা ছাড়াও বলেন, শীতলরা ‘বন্দুকের নলই শক্তির উৎস’ – এই ধারায় বিশ্বাসী নয়। তারা কেবল চেয়েছিল তাদের বাদ্যযন্ত্র ও বিপ্লবী গানের মাধ্যমে দলিত সমস্যার খানিকটা সমাধান করতে। সরকারের শোষণের বিরোধিতা করার জন্য তারা বেছে নিয়েছিল সাবিত্রীবাই ফুলের দেখানো পথটিকেই । শুধু তাই নয়, সরকারের ও পুলিশের লাঞ্ছনা শীতলের মাকে দমিয়ে রাখতে পারে নি, এতোটাই ছিল মেয়ের আদর্শের প্রতি তার বিশ্বাস।

JaiBhimComrade1

বিশ্বায়নের যুগে দলিতদের জীবন যাত্রার মান কীভাবে, কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে- এই বিষয়টি পরিচালক ‘জয় ভীম, কমরেড’-এর মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন। সাম্প্রতিককালে হায়দ্রাবাদের ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা, মহারাষ্ট্র বা গুজরাটে গো হত্যার গুজব রটিয়ে দলিত হত্যা, দলিত মহিলাদের ধর্ষণ- এজাতীয় ঘটনা আকছার ঘটছে। আসলে নানা অজুহাত দেখিয়ে সরকার তার আসল মতলবটা ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে – কখনো ইতিহাস বিকৃত করে, কখন ভুঁয়ো জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে। মনুর ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রে ভারতবর্ষকে পরিণত করার কাজ বহু বছর ধরেই এই হিন্দুত্ববাদীরা করে চলেছে, তবে ২০১৪-র পর তা বেশ জোর কদমেই চলছে। এই পরিস্থিতিতে আনন্দ পট্টবর্ধনের তথ্যচিত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ এক হাতিয়ার এই একরোখা ধর্মস্থাপনের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। পট্টবর্ধন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে উনি এখনো বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখেন, এখনও আশা করেন বামপন্থীরা আবার আন্দোলনরত হবে, তাদের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে তারাই পারবে এই জটিল পরিস্থিতির সমাধান করতে। তথ্যচিত্রে সব ছাপিয়ে ভেসে ওঠে সর্বহারাদের গান, লাঞ্ছিতের হাহাকার, বস্তি-ঝুপড়ির বাজনা, হা-দারিদ্রের লড়াই । এই কলতান হলো তাদের অক্লেশে অস্তিত্ব রক্ষার/ সম্মান রক্ষার লড়াইয়ের জয়ধ্বনি। এই লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। জয় ভীম, কমরেড।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

2 Responses to লালকমল-নীলকমল

  1. পিংব্যাকঃ জুলাই-অগাস্ট ‘১৬ |

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s