জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ নীতি –কিছু কথা

লিখেছেন সৌম্যজিৎ রজক

যদিও ভারতে আফ্রিকা থেকে আসা ছাত্রদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের ঘটনা মূলধারার সংবাদমাধ্যম বেমালুম চেপে যাচ্ছে, তবুও বাস্তবটা পাল্টে যাচ্ছে না। যেমন পাল্টে যাচ্ছে না ‘একমেরু’ এই বিশ্বের জন্নতের আসল ছবিটাও। সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী ফ্যাসিস্টপ্রবনতাওয়ালা সংগঠনগুলোর কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। খোদ পুলিশের হাতেই ২০১৫ সালে মার্কিন মুলুকে ১১৩৪ জন কৃষ্ণাঙ্গ খুন হয়েছেন। ‘ট্রিগার হ্যাপি’ মার্কিন পুলিশ চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ৩১৬ জন কালো চামড়ার মানুষকে খুন করেছে। তবে সেটা আসল খবর নয়। প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী আমেরিকাতে এখনো এমন কিছু মানুষ রয়ে গিয়েছেন যাঁরা নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়ার আগে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পিছুপা হন না। এবং তাঁদের সংখ্যাটা নেহাতই কম নয়। এঁরা স্বভাবতই আওয়াজ তুলেছেন এবং সে আওয়াজ দুনিয়ার অলিতে-গলিতে ছড়িয়েও পড়ছে… ‘BLACK LIVES MATTER’! সকলেই জানেন, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। ২০০২-এর গুজরাটে যেমন ছিলো, তেমনই আজকের আমেরিকা মায় সারা দুনিয়াতেও আছে। ফলে এই স্লোগানটির বিপ্রতীপে কেউ কেউ বড্ড ‘সাম্যে’র পক্ষপাতী। তাঁদের আপত্তি, এই স্লোগানটি কার্যত পক্ষপাতদুষ্ট। কেন স্রেফ কালো মানুষদের জীবনের দাম আছে বলা হবে? কেন সমস্ত মানুষের জীবনের কথাই বলা হবে না? বলতেই যদি হয়, বলতে হবে… ‘ALL LIVES MATTER’! তবেই না মালুম হবে, তুমি প্রকৃতই ‘সাম্যে’র পক্ষে। মানবতার পক্ষে। এহেন ‘সাম্য’পন্থীদের হাবভাব এমন, যেন ‘BLACK LIVES MATTER’ -কথাটা না বললে অসাম্য থাকতো না! যেন তুমি একথা বললে বলেই কালো মানুষদের আলাদা একটা পক্ষ তৈরি হয়ে গেলো! যেন সেটা তৈরি ছিলো না হাজার হাজার বছর ধরেই! তুমি ‘আমরা-ওরা’ না বললে যেন বাস্তবে এরকম কোনও বিভাজন এক্সিস্টই করতো না! এতদিন যেন ‘ALL LIVES’ বড়ো মসৃণভাবে একসাথে বেঁচে ছিলো এই ধরাধামে! আসলে ‘সাম্য’পন্থীরা এভাবে অস্বীকার করতে চাইছেন একটা এমন সত্যকে যা যুগপৎ কঠিন এবং এক্কেবারে সোজা। আসলে সংগঠিতভাবে কালো মানুষদের জীবন বিপন্ন করে তোলা হয়েছে বলেই তো আলাদা করে ‘BLACK LIVES MATTER’-বলার প্রয়োজন পড়ছে। চামড়ার রঙে মানুষে মানুষে দেওয়াল খাড়া আছে বলেই তো একটা বিশেষ পক্ষ বেছে নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ছে। ভারতবর্ষের কলেজে ভর্তির বেলাতেও ঘটনাটা একইরকম। তথাকথিত ‘ইকুয়ালিটি’র ধ্বজাধারীদের দাবি অনুযায়ী, জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যাবস্থাটাই যত সমস্যার মূল। ভাবখানা এমন, যেন এই ব্যবস্থা আছে বলেই যত ‘অসাম্য’! যেন এই ব্যবস্থা না থাকলে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজ করতো এক অখণ্ড ‘সাম্য’ আর ‘সমানাধিকার’! সত্যিই কি তাই করতো নাকি? যতদূর জানা যায়, মহাভারতের কালে আজকের মতো জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিলো না। খেয়াল করে দেখুন, সেদিন কলেজের কয়েকটা আসন মাত্র নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই ছিলো ‘উঁচুজাত’-এর ছেলেদের জন্য সংরক্ষিত। ‘হিরন্যধনুর পুত্র একলব্য নাম’ – দ্রোণাচার্যের কোচিং ক্যাম্পে প্রবেশাধিকারই পায়নি সে। নিজের চেষ্টায় যদিবা তীরন্দাজি শিখলো, অস্ত্র ধরার বুড়ো আঙুলটাই কেটে নেওয়া হলো শেষতক্‌। আসলে আজকে যে জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ চালু আছে তার ফলে যে ‘সাম্য’ আর ‘সমানাধিকার’ লঙ্ঘিত হচ্ছে, এমন দাবি যাঁরা করেন তাঁরা ভুলে যেতে চান একটা এমন সত্যকে যা যুগপৎ এক্কেবারে সোজা এবং নির্মম। আসলে আমরা হাজার হাজার বছর ধরে অসাম্যের জমিনে দাঁড়িয়ে আছি বলেই তো ‘জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা’টা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এই যে বললাম, ‘হাজার হাজার বছর ধরে’! মানে ঠিক কবে থেকে আমরা দাঁড়িয়ে আছি অসাম্যের এই জমিতে? সেই যে আমাদের ‘আদিকবি’ যেদিন রচনা করলেন প্রথম শ্লোকটি আর তর্জনী নেড়ে বলে দিলেন “নিষাদ তুমি প্রতিষ্ঠা পাবে না”; সেই দিন থেকেই বোধহয়।

মোটের ওপর সম্ভবত খ্রিষ্ট পূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে ৪০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে হিন্দু সমাজের বিভিন্ন ‘ধর্মসূত্র’গুলো রচিত হতে থেকেছে। এর আগে থেকেই চতুর্বণের ধারণা চালু ছিলো। শুরুর দিকে গ্রামীণ শিল্পী, কারিগর এবং ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের ছাড়া সমস্ত রকমের কৃষকরাই বৈশ্য সম্প্রাদায়ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই মোটের ওপর হাজার বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে দেখা গেলো, বেশিরভাগ কৃষক (এমনকি যাদের নিজস্ব জমি আছে তাদেরও একটা অংশ)-কে শুদ্র বলে চিহ্নিত করা হতে থাকলো। সোজা বাংলায় তাদের ডিমোশন হলো শুদ্রত্বে। কেবল বড়ো জমির মালিকেরাই বৈশ্য সম্প্রদায়ে টিকে থাকতে পারলো। ‘বড়ো জমি’ মানে কত বড়ো? বাজারে বিক্রি করার মতো উদ্বৃত ফসল উৎপাদিত হয় এমন জমির মালিকরাই কেবল বৈশ্য এখন থেকে। খ্রিষ্টিয় ১ম-২য় শতক নাগাদ সময় থেকেই এই প্রায় হাজার বছরের প্রকল্পটি একটা কংক্রিট কাঠামো পেতে থাকে। চতুর্বণের একটা মজবুত কাঠামোর ভিত্তিতে একধরণের রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্প। যে রাষ্ট্র ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়দের দখলে থাকবে। এই দুই বর্ণকে নিয়ে গঠিত শাসক শ্রেণির সহায়ক শক্তি হবে বৈশ্যরা। ছোট ও প্রান্তিক চাষি, জমিহীন কৃষিশ্রমিক, গ্রামীণ শিল্পী ও কারিগর এবং কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন – তারাই শুদ্র। তাদের দমন আর শোষণের ভিত্তিতে গঠিত এক রাষ্ট্র। গ্রামীন কৃষিভিত্তিক ভারতীয় রাষ্ট্র। যা গড়ে উঠতে থেকেছে চতুবর্ণের নামে চাপিয়ে দেওয়া এক অন্যায় শ্রমবিভাজনকে অবলম্বন করে।

মনুস্মৃতি এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো। শুধু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে শ্রেণি-সমঝোতার নির্দেশ দেওয়াই নয়, মনুস্মৃতিই কার্যত প্রথম ‘স্বকর্ম’কে ‘স্বধর্ম’-এর সমানুপাতিক হিসেবে তুলে ধরলো। একটা সময় অব্দি চতুবর্ণের ব্যাবস্থা চালু থাকলেও তা ছিলো নিছকই এমন এক ধরনের শ্রমবিভাজন – যা জন্ম দ্বারা নির্ধারিত নয়। মানে বৈশ্যের ঘরে জন্মে কেউ যদি জুতো সেলাইকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাইতো তাহলে তার সেই স্বাধীনতা ছিলো। যে মুহূর্তে ‘কর্ম’-এর গায়ে লেপ্টে ‘ধর্ম’ চলে এলো, আমাদের সেই আজাদি আর রইলো না। এবার থেকে ক্ষেতমজুরের সন্তান ক্ষেতমজুর, রাজার ছেলে রাজা আর রাজাই হবে। কুরু-পাণ্ডবের সাথে নিষাদপুত্রের শিক্ষালাভের কোনও সম্ভাবনাই আর রইলো না। শ্রীমদ্‌গীতা তো বলেই দিলো, স্বধর্মে নিধণং শ্রেয়, পরধর্ম এক ভয়াবহ ব্যাপার। এই যে ব্যবস্থা চালু করা হলো এবং সেটি বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকলো… একে কেউ অস্বীকার করবেন কী করে? অস্বীকার না করলে জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ নাকচ করার দাবিই বা করবেন কী করে? ‘ইকুয়ালিটি’র দাবি যে কেউই করতে পারেন, কিন্তু ‘ইকুয়ালিটির’ও যে ইতিহাসসম্মত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত আছে –একথা অস্বীকার করতে পারবেন না।

ভারতবর্ষের জাতিকাঠামো (Caste Structure)-র সাথে গোড়া থেকেই যে শ্রেণি বিভাজন  (Class Division)-এর সম্পর্ক ওতপ্রোত, একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যদিও জাতিকাঠামো আর শ্রেণীবিভাজনের এই সম্পর্ক কখনোই আইডেন্টিকাল নয়। এই দুটো ব্যাপারকে কোনোভাবেই খাপে খাপে মিলিয়ে দেওয়া যাবে না। জাতিকাঠামোর ওপর শ্রেণিসম্পর্কের যেমন একটা প্রভাব ক্রিয়াশীল, তেমনই ভারতবর্ষের বিশেষ প্রেক্ষিতে, শ্রেণিবিভাজনের ওপর জাতিসম্পর্কের প্রভাবও কাজ করে। একই শ্রেণির ভেতরে যেমন জাতিবিভাজন থাকে, বিপরীতক্রমে একই জাতির মধ্যেও থেকে যায় শ্রেণিবিভাজন। একজন ক্ষেতমজুর আর একজন কৃষক যার নিজস্ব ছোট জমি আছে – দু’জনেই শুদ্র হলেও যে দুজনকার শ্রেণিগত অবস্থানের তারতম্য স্পষ্ট। অন্যরকমভাবে, একজন ব্রাহ্মণ আর একজন বৈশ্যের শ্রেণিগত অবস্থান এক হতেই পারে। শ্রেণির বিচারে, অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে দু’জন প্রায় মানুষ সমান সমান হলেও, তাদের মধ্যে জাতি বৈষম্য কাজ করে। করতে পারে অনায়াসে। ধরা যাক, আমাদের ইস্কুলের সেই দু’জন শিক্ষকের কথা। একজন ভূগোল পড়াতেন, অন্যজন ইতিহাস। দু’জনই আমাদের ছোট্ট মফস্‌সল শহরটার একই পাড়ায় থাকতেন। একই টিচার্স রুমে বসতেন পাশাপাশি চেয়ারে। দু’জনকার সামাজিক অবস্থান এবং পে-স্কেলও প্রায় এক। আরেকটা মিল ছিলো দু’জনের। ইস্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রই এই দু’জন স্যারের পড়ানো পছন্দ করতো না। অপ্রিয় কথা সোজা করে বললে বলতে হয়, দুই স্যারের ক্লাসই বেশিরভাগ ছাত্রদের আকর্ষিত করার বদলে বিকর্ষিত করতো। ফলে এই দুই শিক্ষকের সম্পর্কে আমাদের (ছাত্রদের) যাবতীয় মতামত একই রকম হওয়ার কথা। অথচ ইস্কুলের দিনগুলোতে স্পষ্ট দেখেছি, আমদের পাঠশালায় ভূগোলের স্যারটির সম্পর্কে প্রচলিত মতামত ছিলো “ইনি একদম পড়াতে পারেন না” গোছের। অথচ, ইতিহাসের সেই স্যারের কথা উঠলেই ক্লাসে, লাইব্রেরি, খেলার মাঠে ও অন্যত্র আমরা সকলেই প্রায় একমত হয়ে বলে উঠতাম ‘কোটার মাস্টার; তাই পড়াতে পারে না’। শিক্ষকের সাথে ছাত্রদের স্বাভাবিক আচরণেও এই মনোভাব প্রকাশ পেতো ছাত্রদের দিক থেকে। টিচার্স রুমেও যে আমাদের সেই ‘খারাপ পড়ানো’ ইতিহাসের স্যারকে ‘কোটার মাস্টার’ বলে ক্রমাগত খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া হতো না, সে কথা কে বলতে পারে? অর্থনৈতিক বিচারে কোথাও কোনও অসাম্য না থাকলেও জাতির স্টিকারে আমাদের স্কুল, কলেজ, অফিস, কাছারি, পাড়ার মোড়ে এর’ম বৈষম্য আছে। প্রবলভাবেই আছে। ভরপুর আছে। এটা যখন আমাদের বাস্তবতা তখন কেউ কি বলতে পারে, বৈষম্যের ফাটলে প্রলেপ দিতে হলে স্রেফ অর্থনীতির কথাই ভাবা হোক? বললে ভুল হবে। উল্টোটার বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা শুধু বলতে পারি, জাতিকাঠামো আর শ্রেণিবিভাজন – এই দুইয়ের এক জটিল দ্বন্দ্বে দীর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গড়ে উঠতে থেকেছে, গড়ে উঠেছে ভারতবর্ষীয় সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র।

 ‘ইতিহাস’-এর প্রেক্ষিত ছাড়া বর্তমানের জন্য দাওয়াই বাতলানো সম্ভব নয়। তবে কেউ বলতেই পারেন, “সবই তো বুঝলুম কিন্তু ইতিহাসের দোহাই পেড়ে বর্তমানের সমস্যা বাড়ানো কেন বাপু!” ওপরে যা যা বলা হয়েছে সবই তো দেখা যাচ্ছে ‘হাজার হাজার বছর’ আগেকার কথা। এরই মাঝে আচমকা এক মধ্যরাত্রে সারা পৃথিবী যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, এমনই এক মহামুহূর্তে জেগে উঠেছে আমাদের স্বাধীন ভারত। তাছড়া তারও শ’দুয়েক বছর আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি পাল্টে যেতে থেকেছে। যে ‘কৃষিপ্রধান গ্রামীন ভারতীয় অর্থনীতি’ আর তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক ‘ভারতীয় রাষ্ট্র’-এর কথা বলা হচ্ছিলো, তার রঙ রূপ পাল্টাতে থেকেছে। গড়ে উঠতে থেকেছে কল-কারখানা, শিল্পভিত্তিক সব শহর। নিশ্চিন্দিপুরগুলি লোপাট হয়েছে অনিশ্চিন্তে। রেল লাইন পাতা হয়ে গেছে পাণ্ডববর্জিত দেশে। এতদিনে ফিনান্স পুঁজি – তা’ও তো দাপিয়ে বেড়িয়েছে দালাল স্ট্রিট। পাল্টে দিয়েছে, এমনকি, আমাদের ঘরের কাছের কলিন স্ট্রিটের শিরা-উপশিরাও। এসবই সত্য। তবু শেষ সত্য নয়। ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক ২০১৩ সালে ‘All India Survey on Higher Education 2011-’12’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট পেশ করেছে। এই রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার প্রশ্নে ঐতিহাসিকভাবে ‘পিছিয়ে থাকা জাতি’গুলি এখনো কেমন পিছিয়েই আছে। সারা দেশে যখন ১৮-২৩ বছর বয়সীদের ২০% উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, তখন তপসিলী জাতির ক্ষেত্রে সেই হার ১২%। তপসিলী উপজাতির বেলায় মাত্র ৪% আর মুসলিমদের বেলায় ৩%। আজকের ভারতের বাস্তবতা হুবহূ একলব্যের বাস্তবতা নয়। তবে মূলগতভাবে একইরকমের। জাতিভিত্তিক বৈষম্যযুক্ত। এর মানে কি এই যে দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কোনও গুণগত পরিবর্তন ঘটেইনি হাজার হাজার বছরেও? ব্রিটিশের হাত ধরে এদেশে ধনতন্ত্রের আগমন অস্বীকার করবে কে? তবে কিনা ভারতবর্ষে ধনতন্ত্র কোনোদিনই সামন্তবাদকে ধ্বংস করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেনি। আদতে ক্ষমতার স্বার্থে এদেশে সামন্ততন্ত্রের সাথে ধনতন্ত্রের আপোষের ফলশ্রুতিতেই ‘কৃষিভিত্তিক গ্রামীন ভারতীয় অর্থনীতি’ ও তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ‘ভারতীয় রাষ্ট্র’ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি। ফলে সেই রাষ্ট্র যে জাতিকাঠামোকে অবলম্বন করে দণ্ডায়মান জাতিকাঠামোটিও অবিচল। সেজন্যই আমাদের চারপাশে সামন্তবাদী জাতিবৈষম্য টের পাই প্রতিমুহূর্তে। আজও ভারতবর্ষের দলিত, আদিবাসী, তপসিলী জাতিগুলি শিক্ষা ও চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত।

অথচ অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে দেশে জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু আছে। তবুও বৈষম্যের অবসান তো দূর অস্ত, তার ধারে কাছেও পৌছোতে পারিনি আমরা। জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ ঐতিহাসিক কারণেই ভারতবর্ষের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, একথা সোচ্চারে বলেও তাই এই ব্যবস্থাটিকে কিছু অনিবার্য প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে আমাদের। জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থাটি কি এমন কোনও স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা, যা একাই সামাজিক বৈষম্য ঘোচাতে সক্ষম? প্রতিষ্ঠিত জাতিকাঠামোটি যে আদতে উৎপাদন সম্পর্কের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একথা বিস্মৃত হলে প্রচলিত রিজার্ভেশন পলিশিকে একমাত্র দাওয়াই বলে বোধ হতে পারে। জাতিকাঠামোটিকে উৎপাদন সম্পর্ক নিরপেক্ষ একটি বিষয় হিসেবে কল্পনা না করলে, শ্রেণিসংগ্রামকে নাকচ করে একধরনের বিশুদ্ধ ‘দলিত মুক্তি আন্দোলন’-এর কথা বলা যেতে পারে না। বস্তুত গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাত থেকে উৎপাদনের হাতিয়ার (জমি) কেড়ে মুষ্টিমেয়র হাতে কুক্ষীগত করার স্বার্থেই এই জাতিকাঠামো খাড়া করা হয়েছে। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত না দেশে আমূল ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকেরা (যারা শুদ্র হিসেবে চিহ্নিত) জমির মালিকানা পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বস্তুগত জীবনের কোনও গুণগত পরিবর্তন ঘটবে না। এখনো ঘটেনি। সেজন্যই দলিত পরিবার থেকে আসা ৯২% স্কুল ছাত্র আজও স্কুলে পানীয় জল পায় না। তাদের অভিভাবকেরা যেভাবে পায়নি জমির মালিকানা। ভারতবর্ষের মতো দেশে উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার জমি। জমির মালিকানা পাওয়ার মাধ্যমেই এই অংশের মানুষের বস্তুগত জীবনের বদল ঘটতে পারে। দেশের যেখানে যেখানে কিছুটা পরিমানেও ভূমিসংস্কার হয়েছে, সেখানে সেখানে সামাজিক বৈষম্য কিছুটা করে হলেও কমেছে। পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণই ধরা যেতে পারে। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৬% আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত। এরাজ্যে আংশিক ভূমিসংস্কারের ফলে জমিপ্রাপকদের ১৮% আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। আমূল না হলেও, এই আংশিক ভূমিসংস্কারের প্রতিফলন সামাজিক ক্ষেত্রে পড়েছে, তা মালুম হবে ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীনস্ত ‘Bureau of Planning, Monitoring and Statistics’-এর ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘Statistics of School Education 2011-’12’ শীর্ষক রিপোর্টটি দেখলে। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে এনরোলমেন্টের প্রশ্নে তপসিলী উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্তদের হার (Gross Enrollment Ratio in class I-XII for ST) ৯১%। আংশিক ভূমিসংস্কারের ফলে জমিপ্রাপকদের প্রায় ৩৭% তপসিলী জাতিভুক্ত। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগের প্রশ্নে তপসিলী জাতির হার (Gross Enrollment Ratio in class I-XII for SC) ৯৯%। শুধু জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমেই সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে ফেলা মুশকিলই নয়, নামুমকিন। আমূল ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদনের হাতিয়ারের ওপর পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষের অধিকার ছাড়া, তাদের জীবনের বস্তুগত মানোন্নয়ন ছাড়া সমস্যা সমাধানের কোনও উপায় নেই। জাতিগত সংরক্ষণের ব্যবস্থাটি একটি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’। অবশ্যই আপৎকালীন।  ‘সামাজিকভাবে অনগ্রসর অংশের মানুষের জন্য’ একটি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ চালু আছে মানে নিশ্চিতভাবেই সমাজে একদল মানুষ ‘সামাজিকভাবে পিছিয়ে’ আছে। ফলে চিরকাল এই ব্যবস্থা টিকে থাকুক, এটা কাঙ্খিতও নয়। এই ‘বিশেষ ব্যবস্থা’র প্রয়োজনীয়তা যাতে লোপ পায়, সেটাই কাম্য। যদি কেউ প্রকৃতই সাম্য ও সমানাধিকারের পক্ষে হন, তাহলে নিসন্দেহে তিনি জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের বিরোধিতা না করে, জাতিভিত্তিক বৈষম্যযুক্ত এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করবেন।

পুনশ্চঃ অজস্র বিনিদ্র রাতের আমার পড়াশুনো আর ব্যাপক পরিশ্রম ও অধ্যাবসায় সত্বেও আমার থেকে কম নম্বর পাওয়া কোনও প্রতিযোগী যদি স্রেফ ‘কোটার জোরে’ আমায় টপকে চাকরি পেয়ে যায়, তাহলে ওই ‘ইতিহাস সম্মত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত’ কিংবা অন্য কোনও জটিল সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাই আমার হতাশাকে কমাতে পারবে না। একথা হয়তো সত্যি। কিন্তু আমার হতাশা কি ঐ ‘কোটার জোরে’ চাকরি পাওয়া আমার প্রতিযোগীর উত্তরাধিকারসূত্রে বঞ্চিত হতে থাকার চলমান ইতিহাসকে ঢেকে দিতে পারবে? পারবে না। তাহলে? আমার হতাশা আর আমার প্রতিযোগীটির বঞ্চিত হতে থাকার ‘অতীত ও ভবিতব্য’ –দুইই তো সত্যি। দুইই তো প্রখর। এখন কি আমাদের তবে নিক্তিতে মাপতে হবে, কার প্রখরতা দু’আউন্স বেশি? ‘প্রতিযোগী’ শব্দটাকে প্রশ্ন করাটাই কি এই ভয়ঙ্কর ধাধা থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজতম রাস্তা নয়? দেশের সংবিধান ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা জাতিগুলি থেকে আসা নাগরিকদের জন্য এক সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে। ঐতিহাসিক কারণেই করেছে। নাহ্যতই করেছে। কিন্তু দেশের সংবিধান ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এবং ‘সবার জন্য কাজ’-এর অধিকারকে ‘মৌলিক অধিকার’-এর স্বীকৃতি দেয়নি। একথা ঠিক যে, জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ জরুরি। একথাও ঠিক যে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। উপরন্তু কার্যক্ষেত্রে বিভিন্ন নতুন সমস্যার জন্মও দিতে পারে এই ব্যবস্থা। পুরোনো এবং নতুন সব ধরনের সমস্যার সমাধানই সম্ভব একমাত্র ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এবং ‘সবার জন্য কাজ’-এর গ্যারান্টির মাধ্যমেই। ‘আমূল ভূমিসংস্কার’ এবং ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ও ‘সবার জন্য কাজ’-এর গ্যারান্টি… এই প্রতিটি দাবি আদায়ই সম্ভব একমাত্র উৎপাদন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ সামাজিকীকরণের মাধ্যমে। এই পথে ক্রমমুক্তি, এই পথে আলো জ্বলুক আমাদের দেশে।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ নীতি –কিছু কথা

  1. পিংব্যাকঃ জুলাই-অগাস্ট ‘১৬ |

  2. আইভি আদক (দাস) বলেছেন:

    “পুনশ্চঃ অজস্র বিনিদ্র রাতের আমার পড়াশুনো আর ব্যাপক পরিশ্রম ও অধ্যাবসায় সত্বেও আমার থেকে কম নম্বর পাওয়া কোনও প্রতিযোগী যদি স্রেফ ‘কোটার জোরে’ আমায় টপকে চাকরি পেয়ে যায়, তাহলে ওই ‘ইতিহাস সম্মত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত’ কিংবা অন্য কোনও জটিল সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাই আমার হতাশাকে কমাতে পারবে না। একথা হয়তো সত্যি। কিন্তু আমার হতাশা কি ঐ ‘কোটার জোরে’ চাকরি পাওয়া আমার প্রতিযোগীর উত্তরাধিকারসূত্রে বঞ্চিত হতে থাকার চলমান ইতিহাসকে ঢেকে দিতে পারবে? ” কিন্তু এই সংরক্ষণ তো আরো নতূন নতূন ক্ষভেরও জন্ম দিচ্ছে। সংরক্ষনের ক্ষেত্রে পারিবারিক আর্থিক অবস্থা বোধ হয় নজর দেওয়ার দরকার হয়ে পড়েছে। না হলে যে বা যারা ছেঁড়া ট্যানা পরে প্রায় ভিখিরি চেহারায় বেঁচে আছে তাদের অবস্থার উন্নতি হওয়া তো অসম্ভব। আমার চারপাশে তো তাই দেখছি।

    Like

  3. সৌম্যজিৎ রজক বলেছেন:

    আইভিদি, একথা অস্বীকার করে যাওয়ার ক্ষমতা কারো নেই৷ সত্যি সত্যিই সংরক্ষণ কিছু নতুন ক্ষতেরও জন্ম দেয়৷ সেকথা বলতে চেয়েওছি৷ এজন্যই সংরক্ষণ কোনও স্বয়ংসম্পূর্ণ দাওয়াই হতে পারে না৷ পারেনি৷ সার্বজনিন অবৈতনিক শিক্ষা এবং শিক্ষান্তে সার্বজনিন কাজ — এর দাবিটা সেজন্যই প্রাসঙ্গিক৷ শিক্ষা ও কাজের অধিকার— সংবিধানে এখনও ‘মৌলিক অধিকার’-এর তালিকাভুক্ত নয়৷ সবার জন্য শিক্ষা এবং শিক্ষান্তে কাজের গ্যারান্টিই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান৷ সংরক্ষণ নয়৷ শেষ পর্যন্ত একথাই বলতে চেয়েছি৷
    পুনশ্চ: মতামতের জন্য ধন্যবাদ৷ এবিষয়ে আরও গভীর চর্চা, আলোচনা, প্রয়োজনে তর্ক-বিতর্ক শুরু হোক৷ হওয়াটা জরুরি৷

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s