ইঁদুর দৌড় ও আমাদের সাম্য

লিখেছেন বিহঙ্গ দূত

ছেলেটি গ্রাম মফস্বল থেকে পড়তে এসেছিল শহরে। চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে। বড় হবার স্বপ্ন। ভালো থাকার স্বপ্ন। কিন্তু দৌড় শুরু করার পর বুঝল এ বড় কঠিন ঠাঁই। তার লড়াইকে আপনার বলে ভাবা তো দূর অস্ত, তার লড়াইকে লড়াই বলে স্বীকৃতি দেবার লোকের সংখ্যাও বড় কম। ছেলেটি দুঃখ পেল। কষ্ট পেল। কিন্তু হাল ছাড়লো না। তারপর ছেলেটি বড় হল। বুদ্ধির গোড়ায় হালকা ধোঁয়া ও পাক ধরল। সে কলেজ ইউনিভার্সিটির গণ্ডী টপকাল। সামনে জীবনযুদ্ধ। এ যুদ্ধে ছেলেটির মনে আশা, ভয়, দোলাচল সকলই আছে। যেমন সবার থাকে আর কি! তার  সাফল্যের মুখ চেয়েও বিশেষ কেউ বসে আছে। যেমন থাকে আর কি! দিন যায়, মাস ঘোরে, বছর পার হয়। সময় আর সুবাতাস বয়ে আনেনা। ছেলেটি বিদ্ধস্ত হয়, প্রতি ইন্টারভিউতে রক্তাক্ত হয়। কিন্তু আশা ছাড়েনা। এমনই কোন এক সাধারণ দিনে তারই মত এক বিদ্ধস্ত বন্ধু খবর দিয়ে গেল তারই কোন ক্লাসমেটের সাফল্যের। চোখে একরাশ বিরক্তিময় বিস্ময় নিয়ে। স্বভাবত শান্ত ছেলেটির ধৈর্যের বাঁধ সেদিন ভাঙল। সে চেঁচিয়ে উঠলো তার বিসমকক্ষ পশ্চাদবর্তী বন্ধুটির অন্যায় সাফল্যের বিরুদ্ধে। না, সে ছেলেটি কোন ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। এইমাত্র সাফল্যের মুখ দেখা ওই ছেলেটি ঘটনাচক্রে ভারতবর্ষের অন্তর্গত প্রান্তিক নিম্নবর্গের মানুষদের, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের একজন।

জেনারেল ক্যাটাগরিভুক্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের(পুরুষদের) আলোচিত সবথেকে পপুলার গল্পের আয়োজন বোধকরি এইধাঁচেই ঘোরাফেরা করে। গল্পটি গল্প মাত্র নয়। ইহা বাস্তব। আমাদের চোখে ‘কঠিন বাস্তব’। চলুন, এই গল্প নিয়ে দু’চার কথা আমরাও আলোচনা করি।
প্রথমত; গল্পটিতে ভূমিকা চরিত্র ছেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ জাতীয় হৃদয়বিদারক ঘটনার ভোক্তা ছেলেরাই হয়। কারন এ বঙ্গপ্রদেশে সবথেকে লাথি খাওয়া অংশ নাকি জেনারেল মেল।কোন মেয়ে এ জাতীয় চিন্তাধারার বশবর্তী হচ্ছে কিনা তা জানার প্রয়োজন আমাদের খুব বেশি নেই। কেননা ‘তাদের সমস্যা’ বলে আমরা আরও বড় বড় বিষয়কে চিহ্নিত করেছি। তাছাড়া এ সমাজে বেকার যুবক ছাড়া কেই বা বুঝবে তাদের যন্ত্রনার গুণগত ও মাত্রাগত পরিমান?
দ্বিতীয়ত; ছেলেটি গ্রাম মফস্বল থেকে এসেছিল ভালো থাকার স্বপ্ন নিয়ে, বড় হবার স্বপ্ন নিয়ে। সে স্বপ্নের চলন ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী। সে তার গ্রাম মফস্বলের জীবনে কখনো লড়াইয়ের সম্মুখীন হয়নি একথা জোর দিয়ে বলা যায়না। হয়তো মাত্রাগত পরিমানের তারতম্য ছিল। হয়তো পাশে বাবা মায়ের সস্নেহ এগিয়ে যাবার ধাক্কা ছিল। তা তাকে জোর দিয়েছে আপন পথে দৃঢ় থাকতে। কিন্তু পিরামিডের সুউচ্চ চুড়োয় পৌঁছাবার সাধ তার বেড়ে ওঠার সাথে সাথেই ইনজেক্‌টেড।
তৃতীয়ত; সে পঠনকালে খুব একটা চিন্তিত ছিলোনা তার ওই সদ্য সাফল্য পাওয়া বন্ধুটির বিশেষ আইডেন্টিট টাকে নিয়ে। হয়তো কলেজের ভর্তির সময় দু একবার চোখ কুঁচকে গেছে নাম্বারের পার্থক্য দেখে। ক্লাসে তার জানার বিস্ময়কর স্বল্প পরিধি দেখে বন্ধুমহলে মৃদু গুঞ্জন উঠেছে। কিন্তু তা এমন কিছু না। সুতরাং এই চিন্তিত না থাকার বিষয়টিকে দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ১) সে ওই বন্ধুটির বিশেষ সামাজিক অবস্থান নিয়ে কেনই বা চিন্তিত হবে? বন্ধুকে বন্ধু, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখাতে শেখানোই তো শিক্ষার কাজ। ২) ওই বন্ধুটি কোনভাবেই তার প্রতিযোগিতার আওতাভুক্ত ছিলোনা। সহপাঠীকে প্রতিযোগী হিসাবে ভাবতে শেখানোও তো রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিরই কাজ বটে। কিন্তু পাশার দান উল্টোলো জীবনযুদ্ধের আঙিনাতে এসে। শেখানে শেষ হাসি যদি কখনো ধর্তব্যের মধ্যে না থাকা বন্ধুটি(প্রতিযোগীটি) হাসে তাহলে নিজেকে ডিপ্রাইভড মনে হওয়াটা আশ্চর্যজনক নয়।
এবার বাস্তবোচিত গল্পের আখড়া ছেড়ে কয়েকটা কথা পরিষ্কার করা দরকারি। ভারতবর্ষের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে দাঁড়িয়ে বেকার সমস্যা বহুদিন ধরেই ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তার কারণ হিসাবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জনসংখ্যার বিপুল পরিমান, দুর্নীতি, পরিকাঠামোর পঙ্গুত্ব এসব বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সাথে জাতীয় সংরক্ষণ নীতিও একই কাঠগড়ায় উঠে গেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই সংরক্ষণের যথার্থতা নিয়ে। অনেকে একে ভোট বাক্সের রাজনীতি বলে চিহ্নিত করেছেন। অনেকে আর এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন প্রান্তিক নিম্নবর্গের মানুষদের এই সংরক্ষণ প্রথার মাধ্যমে ইচ্ছা করে প্রান্তিক করে রাখা হচ্ছে। নাহলে তারা এতদিনে সমাজের মূলস্রোতে আসতে পারতো। দুঃখের ব্যাপার এই যে সবকটি ক্ষেত্রেই আম্বেদকরের শরনাপন্ন হওয়া গেছে। এবং ভারতের সংবিধান তুলে দেখানো হয়েছে সেখানে স্পষ্টতই লেখা আছে সময়ের সাথে সাথে, সমাজের ধ্যানধারণা বদলের সাথে সাথ্‌ এবং অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য তৈরি হলে পরে সংরক্ষণের বিষয়টিকে পুনর্বিবেচনা করবার কথা। সুতরাং এ প্রস্তাব ভেবে দেখা স্বাভাবিক বলে অনেকের মনে হতে পারে। কিন্তু তার ভিত্তিপ্রস্থ কি? দলিত, নিম্নবর্গের মানুষদের সমাজে অগ্রসর হবার মাপকাঠি? নাকি অসংরক্ষিত অংশের মানুষদের অর্থনৈতিক সামাজিক বিপন্নতা?

সংরক্ষণ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সুরক্ষার প্রশ্ন নয়, তা দেশের প্রান্তিক জনসাধারণের সামাজিক অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটায় এ কথা যারা মনে করেন তারা স্বাভাবিকভাবে প্রথম প্রশ্নটির ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করবেন। কেননা নিম্নবর্গের সমাজে অগ্রসরতার বিষয়টি গোটা দেশজুড়ে শুধু স্তব্ধ হয়ে আছে বললেও ভুল বলা হবে। বিজেপি সরকারের নীতিগত কল্যাণে তা আরও পশ্চাদপর হচ্ছে। উদাহরণের মাধ্যমে এ বিষয়টি খাড়া করার দরকার পড়ে না। সকলেই বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। আর অর্থনৈতিক পরিস্থতি নিয়ে কথা উঠলে এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সকলেই তার পরিচিত বা অন্য মুখে শোনা কয়েকটি পরিবারের গল্প শোনায় যারা সমাজে অর্থনৈতিকভাবে লব্ধপ্রতিষ্ঠিত এবং সংরক্ষণের আওতাভুক্ত। তারা যেন এক অদ্ভুত অপরাধী যারা ফোকটে দেশের নীতিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সুযোগ সুবিধে হাতিয়ে নিচ্ছে। বহু হাজার বছর ধরে সবরকম সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চুড়োয় বসে থাকা ব্রাহ্মণ সন্তানদের সম্বন্ধে তারা একই মত পোষণ করে কিনা তা জানতে মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে। তাহলে কি এদের চোখে আমরা দু’রকম সংরক্ষিত অংশের কথা পাচ্ছি? এক- যারা সংরক্ষণের সুবিধা নিয়ে শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে মজবুত জমি পেয়েছে। আর এক- যারা সংরক্ষণের আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এখনো পশ্চাদপর হয়ে রয়েছে। যদি তাই হয় তবে উদাহরণের বেলা এই একচোখামির মানে কি বোঝা গেলনা।

মুখোমুখি হওয়া যাক দ্বিতীয় প্রশ্নের। অসংরক্ষিত মানুষদের বড় একটা অংশ অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সন্দেহ তার কারণ হিসাবে সংরক্ষিত মানুষদের বিশেষ সুবিধাকে চিহ্নিত করায়। কেননা তুল্যমুল্য বিচারে যদি বসা যায় তবে দেখা যাবে যে সংরক্ষিত মানুষের সামজিক, অর্থনৈতিক সমস্যা অনেক গুণ বেশি। কিন্তু সে দিক জেনারেল ক্যাটাগরির মানুষ দেখতে বাধ্য নয়। দেশের উন্নতি বলতে যে সামগ্রিকতার ধারণা পাই তা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে খাটেনা। সেখানে আমরা প্রবলভাবে জিততে চাই আয়াশসাধ্য পদটি। কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে চাই আমার এতদিনের পরিশ্রমের, ইনভেস্টমেন্টের ফসলকে। সে যুদ্ধে আমরা বিশেষ কাউকে ছাড় দেবার পক্ষপাতি কেনই বা হব? আমরা তো পিতৃপুরুষের দায় মেটাতে এখানে আসিনি। কিন্তু এইভাবে আমরা, যেখানে প্রত্যেকটি আমি নিজের নিজের মত করে এগিয়ে যেতে চাই, সেই আমরা সামগ্রিক উন্নতির বুলি, সাম্যের অধিকারের বুলি না আওড়াতেই পারি। কেননা এই অগ্রগতির সাথে দেশ পৃথিবী বা যে অংশকেই ধরুন না কেন তার সামগ্রিক উন্নতি সাধনের কোন সংসর্গ নেই। সামগ্রিকতা শব্দটাকে ব্যাখ্যা করা এখানে একটু দরকার হয়ে পড়েছে। প্রবল বিত্তশালী ব্যবসায়ী পরিবারও মহা দানশীল বলে খ্যাতি আছে। তাদের ফ্যাক্টরিতে কাজ করে বহু মানুষ ক্ষুন্নিবৃত্তি ধারন করছে। তাতে কি বলা যায় যে ওই মানুষগুলির সামগ্রিক উন্নতি সাধিত হচ্ছে? সেই কাজ করতে গেলে সবার আগে যা করতে হবে তা হল মালিকের হাত থেকে ক্ষমতা কমিয়ে বন্টিত হতে হবে অধিকারের ভাগ সমস্ত শ্রমিকের কাছে। এই একই সমস্যা এখানেও। বহু যুগের ইতিহাসের অনগ্রসরতাকে এক মুহূর্তে মুছে ফেলে নতুন শুরু করা যায়না। তার দায়, তার শিক্ষা নিয়ে আমাদের চলতে হয়। নতুবা আমাদের কল্পিত সাম্যের ধারণাকে শুধুমাত্র আমার জন্যই কুক্ষিগত করে রাখব।

ফিরে যাই প্রথম দিককার গল্পটিতে। নয়া উদারনীতি ও বিশ্বায়ন যে ইঁদুর দৌড়ের আয়োজন করেছে, তার সাথে জাতীয় সংরক্ষণ নীতি এতটাই বৈপরীত্যমূলক যে একসাথে দুয়ের অবস্থান গড়ে উঠতে পারেনা। এখানে দাঁড়িয়ে আমরা সহমর্মী হতে পারি ‘তার’ দুঃখের, কিন্তু প্রতিযোগিতার মাঠে তাকে ছাড় দেওয়ার কথা ভাবতেও পারিনা। সুতরাং ইঁদুর দৌড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে আমাদের সাম্যের ধারণা ব্যক্তিগত সুবিধা অনুযায়ী  হয়ে ওঠে দিনকে দিন, মানুষ বাঁচে অন্ধকারে।।

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

2 Responses to ইঁদুর দৌড় ও আমাদের সাম্য

  1. পিংব্যাকঃ জুলাই-অগাস্ট ‘১৬ |

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s