Prophets Facing Backward: পাঠ প্রতিক্রিয়া

ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান নিয়ে মীরা নন্দার বই Prophets Facing Backwards। এই সময়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং অতীতে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এই বইয়ের আলোচ্য বিষয়। যে হিন্দু জ্ঞানতত্ত্ব ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের আধুনিক সংস্কৃতির নিন্দা করে, লেখিকার যুক্তির বুনোট তীব্র ভাবে তার সমালোচনা করেছে।

বইটি শুরু হয় বিকল্প হিন্দু আধুনিকতা সম্পর্কে একটি আলোচনা দিয়ে। জেফ্‌রি হার্ফকে অনুসরণ করে মীরা নন্দা একে চিহ্নিত করেছেন প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা হিসেবে। এই প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা যুক্তির ধারণাকে পরিত্যাগ করে গ্রহণ করে আধুনিক প্রযুক্তিকে। অন্য ভাবে বলতে গেলে, প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রকল্পকে সাহায্য করে বা সেই প্রকল্পের চাহিদা তৈরি করে। নন্দার মতে আধুনিক প্রযুক্তি ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির হাতই শক্ত করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবর্তকরা (নন্দার ভাষায় যাঁরা ‘প্রফেট’ বা ধর্মপ্রবর্তক) ধর্মীয় রাজনৈতিক হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগ্রামকে সুদৃঢ় করছে। এখানে এসে মীরা নন্দা দু’টি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। নন্দার কথায়, ভারতের রাজনীতির মঞ্চে এই দুই ঘটনা ছিল নাটকীয় মোড়। প্রথমটি হল ১৯৯২ সালে’র ঘটনা – আডবাণীর রথযাত্রা দিয়ে যার শুরু এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে যার শেষ। দ্বিতীয় ঘটনা ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক শক্তি পরীক্ষা। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পারমাণবিক বিস্ফোরণের সপক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিল। বলেছিল গীতায় অ্যাটম বোমা সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী রয়েছে।

একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করে না। বরং তারা চেষ্টা করে আধুনিক বিজ্ঞানকে হিন্দু ধর্মের পরিভাষার অন্তর্ভূক্ত করতে। এভাবে তারা আসলে প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চান। ধর্ম এবং বোমার ও ‘প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ’ এবং প্রাচীন সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার প্রকল্প-এর এই আশ্চর্য মেলবন্ধনের মূলে রয়েছে ভারতবর্ষে Enlightenment Movementএর ব্যর্থতা। মীরা নন্দার মতে রামমোহন, বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ, গান্ধী প্রমুখের মত রেনেসাঁসের প্রবর্তকরা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে বারবার টেনে এনেছিলেন জাত্যাভিমানের প্রসঙ্গ, ঔপনিবেশিক প্রভুত্বের সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন সনাতন সংস্কৃতি। এর ফলে বিজ্ঞানের সাথে মিশে গেছিল হিন্দু আধ্ম্যাতবাদ। এঁরা বলতে শুরু করলেন, আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম বৈদিক বিজ্ঞান থেকে। বৈদিক বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করা আরো জোরদার হল এক অতিসরলীকৃত যুক্তির মাধ্যমে – বলা হল, আধুনিক বিজ্ঞান এসেছে পাশ্চাত্য সভ্যতার হাত ধরে। মীরা নন্দা এই প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের কথা বলেছেন। বিবেকানন্দই প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় হিন্দুত্ববাদকে পড়েছিলেন। মীরা নন্দার কলমে রেনেসাঁস সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণা হঠাৎ পালটে যায়। রেনেসাঁসের কঠোর সমালোচনা করেছেন নন্দা কারণ তাঁর মতে ঔপনিবেশিক ভারতের Enlightenmentএর ধারণা দিয়েই গঠিত হয়েছে আজকের হিন্দু জাতীয়তাবাদ।

মীরা নন্দা আরো বলেছেন যে সেক্যুলারাইজেশনের দুর্বলতা আসলে প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতার বিকাশের একটি কারণ। তিনি মনে করেন ভারতবর্ষে সেক্যুলারাইজেশন শেষ বিচারে নিতান্তই ভারতীয় এবং পাশ্চাত্যের সেক্যুলারাইজেশনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর কোনো যোগ নেই। ইওরোপে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বিভাজন ভারতবর্ষে ঘটেনি। বরং ভারতবর্ষের সংবিধান রাষ্ট্রকে ধর্মের ব্যাপারে নাক গলানোর অধিকার দেয়। বাস্তবে সাম্যের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না এবং হিন্দুত্ত্ব/ হিন্দু ধর্ম অনেক সময়েই রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। পোস্ট মডার্নিস্টদের বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে মীরা নন্দা মনে করছেন পাশ্চাত্য ধর্ম নিরপেক্ষতার উদ্বৃত্ত নয়, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আসলে মদত পায় ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা থেকেই। ধর্মীয় ব্যাপারে রাষ্ট্রের নাক গলানো ধর্ম এবং রাজনীতির এক অদ্ভুত এবং অবাঞ্ছিত মিশেল তৈরি করে।

আরো উল্লেখযোগ্য হল এই যে মীরা নন্দা দেখিয়েছেন কী ভাবে পোস্ট মডার্নিস্ট এবং Social Constructivist আলোচনা আসলে বৈদিক বিজ্ঞানের ধারণাকে সাহায্য করেছে। পোস্ট মডার্নিস্ট-কে নন্দা চিহ্নিত করেছেন এমন একটি ধারণা হিসেবে যা আধুনিকতার ভরকেন্দ্র Enlightenmentএর বিরোধিতা করে। পোস্ট মডার্নিস্টরা সার্বজনীন সত্যের ধারণা সম্পর্কে সন্দিহান আর তাদের এই সন্দেহের সমালোচনা করেছেন মীরা নন্দা। সার্বজনীন সত্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে পোস্ট মডার্নিস্টরা অনেক সময়ে স্থানীয় ঐতিহ্য/ সংস্কৃতির ওপর বেশি জোর দিয়ে ফেলেন। এই স্থানীয় ঐতিহ্য/ সংস্কৃতি অনেক সময়েই যুক্তির পরিসরের বাইরে থাকে বা যুক্তির পরিসরের বাইরে চলে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়। এই যুক্তি অনুসরণ করে ভারতে বিজ্ঞানের সমালোচকরা, বিশেষত নব্য-গান্ধিবাদীরা চেয়েছেন ‘ভারতীয়’ ধারায় Social Scienceএর বিকাশ। মীরা নন্দা শেষ অব্দি বলতে চেয়েছেন যে বিজ্ঞান সম্পর্কে পোস্ট মডার্নিস্ট সমালোচনা এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কাছে শাপে বর হয়েছে যারা বিকল্প হিন্দু জ্ঞানতত্ত্ব প্রবর্তন করতে উদ্‌গ্রীব।

nanda image

Meera Nanda, Prophets Facing Backward: Postmodern Critiques of Science and Hindu Nationalism in India, Rutgers University Press, 2003. price-270 INR.


লেখাটি লিখেছেন অর্নব রায় ও দীধিতি রায়।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s