মতলবি কাহিনি ও ইতিহাসের ষড়যন্ত্র

সেই ১৮৯৪-এ লেখা কিপলিং-এর কাহিনি ‘Jungle Book’ । হালফিলে ডিসনির চলচ্চিত্রের দৌলতে আবার ফিরে এলো আলোচনায়। শের খানের থাবা থেকে মানুষের বাচ্চা মোগলিকে বাঁচাতে এককাট্টা সকলে। নেকড়ের দল, বাগিরা, ভালু, ডিরেক্টর, প্রোডিউসার থেকে দর্শক পর্যন্ত। সব্বাই। নেকড়ের দলে প্রতিপালিত হয়েও সহজাত প্রযুক্তির সাহারা পায় মুগলি। সক্কলের প্রিয় সে। জঙ্গলের জান। ডিসনির ঝকঝকে গ্রাফিক্সে মোহিত দর্শকও ‘জঙ্গল সন্তান’ মুগলির সাথে হয়ে পড়ে একাত্ম। উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। পারবে কি মোগলি? হারিয়ে দেবে শের খানকে? সুরক্ষিত হবে তো জঙ্গলের ওপর ‘সভ্যতা’র অধিকার?

আসলে এ গল্পে শের খানের না হেরে উপায় নেই। যতই সে জঙ্গলের বাসিন্দাদের মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক মানুষের দ্বারা তাদের কত ক্ষতি হয়েছে আগে, যতই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিক জঙ্গল সন্তান মোগলি কেমন মানুষের থেকেই ধার করে এনেছে আগুন, সে আগুনে কেমন ছারখার হয়ে যাচ্ছে তাদের সাধের জঙ্গল, তবু একা শের খান আর কাঁহাতক যুঝবে! মানুষের, ‘সভ্যের’ বানানো জঙ্গলের কাহিনি। ‘ভিলেন’ শের খানের পরাজয়ের ইতিহাস যদি রচিত নাই হল তবে কোটি কোটি টাকা খরচা করে ডিসনি আর করল কী! শের খানদের বিজয় গাথা বানাতে তার বয়েই গেছে।

ইতিহাস শুধু একটা বিদ্যাচর্চার সুনির্দিষ্ট এলাকা নয়। গল্পে, গানে, কবিতায়, নাটকে, চলচ্চিত্রে, এমনকি শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা সাহিত্যেও বারবার নির্মিত হতে থাকে ইতিহাসের বয়ান। সে নির্মাণে যেমন লেগে থাকে সময়ের ছাপ, তেমনি গভীর ভাবে আঁচড় কেটে রাখে ইতিহাসের পক্ষ। এক পক্ষের বিজয়গাথার দাপট চেপে রাখে আরেক পক্ষের কান্না। কাহিনির জটিল বুনোটে আক্রান্ত আমরা নিজেদের অজান্তেই পক্ষ নিয়ে ফেলি। শৈশবের ‘রাজকাহিনী’ পড়তে পড়তে আমরা পক্ষ নিতে থাকি শিলাদিত্য, বাপ্পাদিত্য, হাম্বির, রাণা প্রতাপদের। আর ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের প্রবল পরাক্রম ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ে গর্বিত হয়ে আড় চোখে তাকিয়ে নিতে শিখি আমারই বেঞ্চে বসা বন্ধু সামিমুলের দিকে। লজ্জায় গুটিয়ে যাওয়া সামিমুলের চোখে খুঁজে নিতে শিখি শত্রুসৈন্যের ছায়া।

ইতিহাসের এই মেরুকরণের প্রতি আশৈশব শ্রদ্ধাশীল হতে শেখানোর জন্য চলে ঢালাও আয়োজন। নির্মিত হতে থাকে নায়ক কিংবা অতি নায়কের কাহিনি। বিশ্বকে বারবার বিধ্বংসী শত্রুর হাত থেকে বাঁচাতে উঠে দাঁড়ায় ক্যাপ্টেন আমেরিকা। তার সুপারহিরো-স্যুটে জ্বলজ্বল করে ইউনাইটেড স্টেটস এ- পতাকা। যতই আপাত মানবিক আচরণ সে করুক না কেন, সমগ্র পৃথিবীকে রক্ষা করার দাবি যতই জোরের সঙ্গে জানাক না, শেষ পর্যন্ত সে আমেরিকারই ক্যাপ্টেন। বিশ্বকে রক্ষা করার ‘পবিত্র দায়িত্ব’ যে আসলে আমেরিকার মাধ্যমেই পালিত হয়ে আসছে, এ ইতিহাস যেন তরুণ দর্শক কিছুতেই ভুলতে না পারে। পাকা বন্দোবস্ত। একবারের জন্যও উঁকি দিতে পারবে না কোন বাঁকাচোরা প্রশ্ন। বরং অস্ত্রের, ক্ষমতার, যুদ্ধের পক্ষই নিতে দেখা যাবে তাকে। নায়ক তো আসলে সেই, যার মাধ্যমে ‘জাতীয় আশা’গুলি মূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই ‘জাতীয় আশা’র আপাত অটুট নির্মাণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে যে সব অবদমিত প্রশ্ন, তার উত্তর নায়ক বা অতিনায়ক দেয় না। বরং সে সব প্রশ্ন যাতে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে আমাদের চিন্তার জগতে তার দেখভাল করাই সুপার হিরোর কাজ। তাই ইসলামিক দেশগুলোতে আমেরিকার ধ্বংসলীলা, অর্থনৈতিক আধিপত্য তো দূরের কথা, আমেরিকার দরিদ্র মানুষের জন্য দরদের চিহ্নটুকুও ক্যাপ্টেনের কাছে আশা করা চলবে না।

শূদ্রের ঘরে বড় হয়ে উঠেছিল মহাভারতের কর্ণ। তাই স্বীকৃতি ছিল না তার। যুদ্ধে, খুন জখমে কতটা পটু সে, উপায় ছিল না তা জানান দেওয়ার। ভালো করে যে শিখে নেবে ক্ষত্রিয় যুদ্ধ কায়দা, সে পথও বন্ধ। তাই একটা ফেক প্রোফাইল বানিয়ে, অজস্র ঢপের সাহারা নিয়ে, শেষটায় জব্বর একটা অভিশাপ খেয়ে তবে ধনুক চালানোয় স্কুল ফাইনাল পাস করল সে। কিন্তু ট্যালেন্ট হান্টে গিয়েও সেই একই চাপ। কুরু-পাণ্ডবের সাজানো বাগানে এমন জংলী ভূত ঢোকে কোত্থেকে! তবু না হয় দূর্যোধনের মার্কেট খারাপ যাচ্ছিল বলে সে যাত্রায় রক্ষা পেয়ে গেল কর্ণ। রক্ষা বলে রক্ষা! একদম সোজা অঙ্গরাজ্যের হেড। আচমকা লেবেলে উঠে যেতে পারল বলেই না কর্ণকে নিয়ে এত চাপান উতোর! কেউ বলে, কর্ণ নিষ্ঠুর। দ্রৌপদীর কাপড় খোলায় মজা নিয়েছিল। কেউ বলে, বীর। মরবে জেনেও পিছু হঠেনি। কেউ বলে, সত্যিকারের সুহৃদ। শেষ পর্যন্ত দুর্যোধনের পক্ষ ছাড়েনি, এমনকি সিংহাসনের লোভেও। কবিগুরু তো লিখেই ফেললেন,

“কুরুপতি কাছে বদ্ধ আছি যে বন্ধনে / ছিন্ন রে ধাই যদি রাজসিংহাসনে , / তবে ধিক্মোরে।”

তার সঙ্গে ‘সূত পুত্র আমি, রাধা মোর মাতা’ বলায় ককটেলটা বেশ ভালোই জমলো। কিন্তু কবিতা হিসেবে যত উন্মাদই আমাদের করে দিক না কেন এই বাক্যগুলো, রাজসিংহাসনে উঠে যাওয়ার পর অনেক বড় বন্ধন যে কর্ণ আগেই ছিন্ন করে দিয়েছিল সে ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে কেন! শূদ্রের ঘরে প্রতিপালিত কর্ণ রাজা না হয় হল, শূদ্রের কোন্‌ দৈন্যদশা ঘোচাতে উপকারে লাগল সে? কুরুক্ষেত্রে পরাজিতের পক্ষ না হয় সে ত্যাগ করল না, কিন্তু আজন্ম পরাজিত, আজন্ম অপাংক্তেয় শূদ্রদের পক্ষ নিয়ে দাঁড়ানোর ইতিহাসও কর্ণের অধরা থেকে গেল। অনেক পরে জয়দেব বসু ‘রাধেয় অধিরত সুত’ কবিতায় লিখলেন,

“লালিত তাদেরই ঘরে যাদের জন্মে কোনো ফলশ্রুতি নেই। শুদ্রের ঐতিহ্য তাই পিছনে আমার। সেসব বিস্মৃত হয়ে কেবল অহংবশে আজ আমি কৌরব মিতা। বাল্যসাথীদের ফেলে রাজন্যের দলভুক্ত, তাদেরই উচ্ছিষ্টে করি বিলাস যাপন। এই পাপে ডুবে যাবে আমার গতির চাকা…” 

কর্ণের ইতিহাস সাক্ষী হয়ে রয়ে গেল পক্ষ নির্মাণের। সাক্ষী রয়ে গেল, ইতিহাস যাদের পিঠে চাবুক চালায়, তাদের কাহিনি নিজের কেতাবে লিখে রাখে না।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিশপ ছিলেন ডেসমণ্ড টুটু। ইউরোপীয় আধিপত্যের কট্টর সমালোচক। তিনি একবার বলেছিলেন, “When the missionaries came to Africa they had the Bible and we had the land. They said ‘Let us pray.’ We closed our eyes. When we opened them we had the Bible and they had the land.’’

ইউরোপ যে শুধু জমিরই দখল নিয়েছিল তা নয়, ইতিহাসও যে কখন আমাদের বেদখল হয়ে গেছিল আমরা খেয়াল করিনি শুরুতে। আজও জ্ঞানচর্চার জগতের বাইরে (অনেক সময় বিদগ্ধ জ্ঞানচর্চার পরিসরেও) দেদার চলে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’, ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ এর মতো কলোনিয়াল শব্দগুচ্ছ। অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রয়োজনে বাইরের দুনিয়াকে দখল করতে বেরোনোর গাল ভরা নাম দিয়েছিল ইংরেজ সাহিত্যিকরা। ‘আবিষ্কার’। ঘটনাচক্রে একটা দ্বীপে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন ডিফো সাহেবের রবিনসন ক্রুশো। প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে একা একটা মানুষের বেঁচে থাকার অসম যুদ্ধের সে এক আশ্চর্য বিজয়গাথা। তারপর, দীর্ঘকাল একলা থাকার পর রবিনসন দেখা পেলেন এক কালো মানুষের। বন্ধুহীন এ দ্বীপে অবশেষে বুঝি মিলল দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মতো কোনো সঙ্গী। কিন্তু ‘বন্ধু’ কই! তিনি তো সেই ‘নেটিভ’ কালা আদমিকে শেখালেন তাঁকে ‘প্রভু’ বলে ডাকতে! অথচ কি আশ্চর্য! আমরা শোষিত পরাধীন দেশের মানুষেরা কি অবলীলায় স্বাভাবিক বলে মেনে নিলাম ডিফোর এই দৃষ্টিকোণ! আপ্লুত হলাম। শুধু তাই নয়, ডিফোদের অনুসরণ করে দিকে দিকে অভিযানে বেরিয়ে পড়ল বাংলা সাহিত্যের অজস্র অভিযান নায়ক, উপনিবেশের দর্শন মস্তিষ্কে লালন করেই।

আসাম আর আফ্রিকার জঙ্গলে অ্যাডভেঞ্চার সাঙ্গ করে ইতিউতি ঘোরার পর বিমল আর কুমার গিয়ে হাজির হল ইনকাদের দেশে। হেমেন্দ্রকুমারের ‘সূর্যনগরীর গুপ্তধন’ এ পেল্লায় সব বিপদকে টেক্কা মারতে মারতে কি ম্যাচোগিরিই না দেখাল তারা। ভেতো বাঙালির ব্যাটা, তবু ধক্‌ কতো তাদের! আগামী প্রজন্ম যে ওদের থেকেই শিখে নেবে ভারতকে ‘বিশ্ব সভায় শ্রেষ্ঠ আসন’ লাভ করানোর প্রত্যয় (সে আসনের তলায় যতই পোকামাকড়ের মতো চাপা পড়ে যাক পেটে কিল মেরে থাকা মানুষ)। হরেক কেরামতি দেখাতে দেখাতে বিমল-কুমাররা সাক্ষাৎ পেল ইনকা সভ্যতার গোষ্ঠীভুক্ত ইক্‌টিনাইকের। বাগ-বিতণ্ডা চলাকালীন ইক্‌টিনাইকের মুখেই আমরা শুনতে পেলাম, “আধুনিক যুগ আমাদের বঞ্চিত করেছে; আমাদের ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য কেড়ে নিয়েছে; তাই আমরা মহা পর্বতের অন্তরালে গহন-বনের অন্তপুরে গোপনে গড়ে তুলেছি এই অজানা সূর্যনগর…”। শের খানের মানুষের প্রতি ঘৃণা আর ইনকাদের সভ্যতার প্রতি ঘৃণার জায়গাটা আদতে একই -দখলদারি। কিন্তু দখলের ইতিহাস তো দখলদারদেরই সম্মানিত করে। বেবাক বকেও সেই ইক্‌টিনাইক্‌কেই তাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে হয় কুমার-বিমলদের। সভ্যতার পায়ের ছাপে ধূসর হয়ে যায় সূর্যনগরী। আর পুরস্কার হিসেবে সভ্যের দলভুক্ত হয় ইক্‌টিনাইক। স্বজাতিদের ভুলতে পারে বলেই জাতে উঠে যায় সে, ঠিক যেন কর্ণের মতোই।

সিংহটা আসলে জানেই না যে রিংমাস্টারের থেকে তার গায়ের জোর বেশি। নেশায় বুঁদ, ঝিমন্ত সিংহের ওঠা বসা, হেঁটে চলে বেড়ানোয় তাই হাততালিতে ফেটে পড়ছে গ্যালারি। জমে উঠছে সার্কাস। থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে রিং মাস্টারের চাবুকের শব্দ। তার প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলেছে সিংহটা অসহায় শিশুর মতো।  কি সুন্দর হেঁটে যাচ্ছে দড়ির ওপর দিয়ে। আবার ঢুকে পড়ছে খাঁচায়। অবাধ্যতাকে কেমন অবলীলায় সামাল দেওয়া যাচ্ছে চাবুকের স্পর্শে।

ইতিহাসটা যে বদলে যেতে পারে একথা জানত না একলব্য। অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী অঙ্কুরেই খতম না করলে শিষ্যের বিজয়গাথা ফিকে হয়ে যাবে এ কথা বুঝেছিলেন অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য। তাই নেহাৎ গুরুদক্ষিণার নাম করেই কেটে নিয়েছিলেন তার বুড়ো আঙুল। তা না হলে মহাভারত অন্য খাতে বয়ে যেত। একলব্যদের আঙুল কেটে নেওয়ার ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে অর্জুনদের গৌরবগাথা। শের খানদের ইতিহাস লেখা হয়না বলেই মোগলিদের জয় পাকাপোক্ত হয়। নয়ত রিং মাস্টারের চাবুক আর দর্শকের হাততালির জমজমাট আসরে সিংহটা একবার যদি তার ক্ষমতা সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠে, বদলে যাবে তামাম সার্কাস।


লেখাটি লিখেছেন সৈকত ব্যানার্জী

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s