ইতিহাস, ঐতিহাসিক এবং …

“কুসকোর প্লাসা দে ওয়াকাইপাতাতে তুপাক আমারু এবং তার সহচরদের নিষ্ঠুর ভাবে অত্যচার করে খুন করা হল। তার জিভ ফেলা হল, দুটো হাত এবং দুটো পা চারটে ঘোড়ার সাথে বেঁধে টানা হতে লাগল, যাতে  অঙ্গগুলো শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফাঁসির মঞ্চে তার মাথা কেটে ফেলা হল, তার সমস্ত উত্তরাধিকার চতুর্থ প্রজন্ম পর্যন্ত বিলুপ্ত ঘোষণা করা হল ।”

মেক্সিকোর সর্ব্বৃহৎ মেসি্যানিক বিপ্লবের নেতা মেস্তিসো প্রধান তুপাক আমারুর শেষ পরিনতিকে এইভাবেই বর্ণনা করেছেন এদুয়ার্দো গালেয়ানো তার Open Veins of Latin America গ্রন্থে। একটি মহাদেশের সাড়ে পাঁচশ বছরের ইতিহাস তিনি তুলে ধরেছেন এই বইটিতে। তিনি তুলে ধরেছেন একটি মহাদেশের বঞ্চনা, শোষণ, অত্যাচারের বৃত্তান্ত। ঐতিহাসিক ইতিহাসের অংশ কিনা ? এই বিষয়ে আলোচনা, তর্ক , বিতর্ক পরিসর রয়েছে । আপাতত; সেই আলোচনা আমরা যাচ্ছি না। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই আমরা চেষ্টা করি এই বৃহৎ আলোচনায় কিছু সংযোজন করতে। সেই প্রসঙ্গেই উপরোক্ত উদ্ধৃতি এবং এদুযার্দো গালোয়ানোর প্রসঙ্গ।

আমেরিকা মহাদেশের বিস্তীর্ণ বনভূমি থেকে সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত অবাধ ঔপনিবেশিক লুন্ঠন এবং পরবর্তী পুঁজিবাদী লুন্ঠন ও ভূমিপুত্রদের গণহত্যার জ্বলন্ত উপাখ্যান পাওয়া যায় গালোয়ানোর জবানিতে। লিখছেন, “আমেরিকা ছিল বিশাল সাম্রাজ্য, এর পুনঃমুক্তি ছিল অসম্ভব ও সন্দেহজনক। দেশীয়দের বিরুদ্ধে উন্মাদ অভিযান ছিল আসলে বিজেতাদের, নতুন পৃথিবীর সম্পদের প্রতি লালসা। মেক্সিকো বিজয়ের স্থপতি, এরনান কোরাতসের সাবি বেরনাল দিয়াস দেল কাস্তিউ লিখছেন যে তাঁরা আমেরিকায় এসেছেন “ ঈশ্বরের এবং সম্রাটের সেবা করার জন্য এবং নিজেরা ধনী হওয়ার অভিপ্রায়ে।” এরনান কারাতসের বিজয় থেকে শুরু করে জেনারেল মোরৈসের লুন্ঠন অভুতপূর্ব ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন গালোয়ানো এই বইতে। ঔপনিবেশিক পুঁজির বিরুদ্ধে আমেরিকার কৃষকদের লড়াই তার থেকে ভালোভাবে কেউ ব্যাখ্যা করেন নি। সাদা চামড়ার প্রভুদের হাতে লাল চামড়ার অন্ত্যজ ভূমিপুত্রদের নিয়মমাফিক গণহত্যা- পোতসির রুপোর খনি গুলোতে কোকার নেশায় আচ্ছন্ন ইন্ডিয়ান শ্রমিকদের যন্ত্রণা ও লড়াই-এর দীর্ঘ ইতিহাস – ব্রাজিল, চিলি, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলার জঙ্গলে আফ্রিকার কালো ক্রীতদাসদের লড়াইকে, গালোয়ানো মিলিয়ে দিয়েছেন গোটা পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে।

ঔপনিবেশিক যুগের অবসানে বণিক পুঁজি ও শিল্প পুঁজির নিয়ন্ত্রণ গৌরবময় বলিভিয়ান বিপ্লবকে ব্যর্থ করে এবং নবগঠিত লাতিন আমেরিকার ছোটো ছোটো দেশগুলোকে নিজের আখের গোছানোর যন্ত্রে করে তোলে। গালোয়ানো দেখাচ্ছেন কীভাবে পান্ডো ভিয়ার নেতৃত্বে মেক্সিকান কৃষকরা নিরলস সংগ্রাম চালিয়েছেন পুঁজির নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। লড়াই করে স্পেনীয় শক্তিকে লাতিন আমেরিকার মানুষ মহাদেশ ছাড়া করেছিল; সেই মরণপন সংগ্রামের লিপিকার গালোয়ানো। কিন্তু স্বাধীনতা এল না। স্পেনের প্রভুদের জায়গা নিল বড়ো জমির মালিক আর বড়ো ব্যবসায়ীরা। ‘উদারনীতি’-র প্রলেপ দিয়ে যে বুর্জোয়া সংবিধানের জন্ম হয়েছিল লাতিন আমেরিকায় তার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পুঁজিবাদের বিকাশ। অন্য দিকে যে ছিল আন্তর্জাতিক পুঁজির সেবাদাস। তিনি বলছেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের ইতিহাস অর্থনৈতিক, সামাজিক, জাতীয় নৈরাশ্য ও এক বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। নতুন নতুন সীমানায় বিভক্ত হয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হল লাতিন আমেরিকা। তার একদা এক সংস্কৃতির ধারণাকে ব্যঙ্গ করে। এর পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন এই বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে  সংগ্রামরত জনতার গৌরবময় ইতিহাস। হোসে আর্তিগাসের নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার গাউচো, উভিয়ান্দের সংগ্রামময়, জমির স্বাধীনতার সংগ্রামের । যার হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল লাতিন মহাদেশের প্রথম ভূমি সংস্কার আর যাকে অবদমিত করতে মন্তেভিদিওর দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল পর্তুগীজ জেনারেল লেরকেকে। বিদ্রোহ অবদমিত হল। কিন্তু “ মুক্ত জমি মুক্ত মানুষ ”-এর ধারণা ছড়িয়ে পরল লাতিন আমেরিকায়, যার পুনরুজ্জীবন ঘটল মেক্সিকোয় এমিলিয়ানো সাপাতার হাত ধরে। সেট মেক্সিকো যেখানে গালেয়ানোর কথায় জেলখানা, ব্যারাক আর গীর্জা প্রস্তুত ছিল ইভিয়ান্দের ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধন করার জন্য। কারণ তারা নাকি ছিল স্বভাবত ‘অলস মাতাল এবং চোর’ যাদের ঋণের নাগপাশে জড়িয়ে ক্রীতদাস করে রাখা হয়েছিল ইউবাতানে হেনেকেন চাষে, ভাটরোনাসিওনালে তামাক চাষে, ফল বাগিচায়, রাবার, কফি, আখের ক্ষেত্রে ভেরাক্রুম, ওযাদ্ধাকা এবং মোয়ালেসে। একনায়ক পোরফিরিও দিয়াসের হাত ধরে মেক্সিকোয় মার্কিনিকরণ ঘটেছিল। যাকে মদত যোগাত ওয়াল স্ট্রীট আমেরিকান কর্ডেজ ট্রাস্ট মায়া ও ইয়াকি ইন্ডিয়ানদের ধবংশ করে দিল। তাদের হেনেকেন আবাদে নিয়ে গিয়ে। কন্সেন্ট্রেসেন ক্যাম্প, মানুষ কেনে বেচার ধান্দা শুরু হয়েছিল সেখানে। লেখকের ভাষায় প্রতিশোধের পালা শুরু হল ১৯১০, কৃষক নেতা এমিলিয়ানো সাপাতার নেতৃত্বে দক্ষিণ মেক্সিকোর আপামর কৃষক সশস্ত্র বিদ্রোহে জ্বলে উঠল। দিয়াসের পতন হল। বিপ্লবের কাঁধে ভর করে ফ্রান্সিস্কো মাদেরো ক্ষমতায় এসে বিপ্লবকেই টুঁটি চিপে মারতে উদ্যত হলেন। আবার চলল সংগ্রাম সাপাতা আর পাঞ্চো ভিটরার নেতৃত্বে, বিপ্লব জয়ী হল। কিন্তু আবারও মার্কিনি মদতে নব নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ভেনুস্তিয়ানো কায়রারসার ভূমিসংস্কারের নীতি ধবংস করল তারই পারিষদবর্গরা। পাঞ্চো ভিটরাকে খুন করা হল। সাপাতা ধরা পড়লেন বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। মার্কিনি পুঁজির দাসদের গুলিতে ঝাঁঝরা হল তার শরীর। কিন্তু তারপরও লেখক বলছেন, “ বেঁচে রইল বিপ্লব, বেঁচে রইলেন জাপাতা, বেঁচে রইল এক রূপকথা, দক্ষিণে পাহাড় থেকে পাহাড়ে একাকি লাফিয়ে চলে একটা বাদামি রঙের ঘোড়া ”।

 এইভাবে গালেয়ানো একদিকে সাম্রাজ্যবাদী ও বণিক পুঁজির লুন্ঠনের বর্ণনা যেমন দিয়েছেন তেমনি অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে লাতিন মহাদেশের সংগ্রামরত বুভুক্ষু জনতার বিপ্লবের বীর গাথা রচনা করেছেন। দেখিয়েছেন লাতিন মহাদেশের জল-জমি- জঙ্গল- খনিজের বীভৎস লুন্ঠন লীলা কীভাবে বিশ শতকেও চলতে থাকে আর পাশাপাশি চলতে থাকে প্রতিরোধ। চিলির তামা শ্রমিকদের সংগ্রাম,মার্কিনি আন্তর্জাতিক কর্পোরেশন ও সি আই এ-র ষড়যন্ত্রের কাহিনি-সাল্ভাদোর আট্রেন্দ্রের বীর গাথা থেকে কিউবার মুক্তি। তিনি কিউবান বিপ্লবের মূল্যায়ণ করে লিখলেন – “তবুও সাড়ে চারশ বছরের নৃশংসতার কাঠামো ভেঙ্গে কিউবার নবজন্ম সূচিত হয়েছে এক উদ্যমে যার ভিতর দিয়ে শত বাধার বিরুদ্ধে প্রকাশ পেয়েছে তার শক্তি, অদম্য মনবল আর সুখের সন্ধান ”। বস্তুত, ঐতিহাসিক ইতিহাসের অংশ হবেন কিনা তা তার নিজের ব্যক্তি চিন্তার সিদ্ধান্ত গালেয়ানো লাতিন মহাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়েই তা লিপিবদ্ধ করেছেন। যার পংক্তিতে পংক্তিতে ফুটে উঠেছে লাতিন মহাদেশে মানুষের যন্ত্রণা, সংগ্রামের কাহিনি। যার সাথে আমরা একাত্ম করতে পারি ভারতের জল-জমি- জঙ্গলের অধিকারের জন্য লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাসকে। এভাবেই ঐতিহাসিক হিসেবে সংগ্রামী হিসেবে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। যার পরিণতি হয় Open Veins of Latin America মতন আখ্যানগুলি। লাতিন আমেরিকা বা গালোয়ানোর প্রসঙ্গ তুলে আনা এটা দেখানোর কারণেই যে লাতিন মহাদেশের সাড়ে পাঁচশ বছরের ইতিহাস হচ্ছে একটা নিবিড় শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস, আপনি চান বা না চান। এবং এই নিবিড় শ্রেণি সংগ্রাম আরও নিবিড়তর হয়েছে গালোয়ানোর লেখনিতে। গালোয়ানো তার লেখনির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিবর্তন এবং সেট প্রক্রিয়ায় শ্রেণি সংগ্রামের অবদানের অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। ঠিক এই মেলবন্ধন এবং ছবি আমরা দেখি ওয়াল্টার রডনি -এর How Europe Underdeveloped Africa গ্রন্থে। যেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আফ্রিকায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের লুন্ঠন ও বানিজ্যলীলাকে বর্ণনা করেছেন। এবং দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজির স্বার্থে আফ্রিকা মহাদেশকে দাস ব্যবসায়ীদের মনুষ্য লুন্ঠন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। একি ভাবে হার্বাট অ্যাপথেকার -এর লেখনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিগ্রোদাসদের নিরন্তর বিদ্রোহের চিত্র মার্কিনি মহানুভবতার ছবিকে ভেঙ্গে খানখান করে দেয়। এবং একই ভাবে হাওয়ার্ড জিন তার People’s History of The United States– গ্রন্থে মার্কিনি ও ইউরোপীয় বিজেতাদের বিরুদ্ধে দেশীয় আমেরিকানদের সংগ্রাম, দাস মালিকদের বিরুদ্ধে নিগ্রো দাসদের সংগ্রাম, ইউনিয়ানপন্থী ও শ্রমিকদের পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীদের সংগ্রাম ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে অ্যাফ্রো-আমেরিকানদের সংগ্রামের এক নিরবচ্ছিন্ন উপাখ্যান রচনা করেছেন। প্রসঙ্গত, এরা কেউই ঐতিহাসিকের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব ’ এড়িয়ে যান নি। যদিও এর বিপ্রতীপ ধারণা ও ধারা বর্তমানে ব্যাপক ভাবে দৃশ্যমান, যা হয় খুব সচেতন ভাবে এর ঐতিহাসিক একাত্বিকরণের প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে গেছে বা তাকে ইতিহাসের ধারা বা দায়িত্ব হিসেবে মানতেই চায় নি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এই ক্ষেত্রে ইতিহাস ও ঐতিহাসিকের একে অপরের অংশ হয়ে ওঠা্র প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হয়েছে যার ফল স্বরূপ ব্যর্থ হয়েছে প্রকৃত ইতিহাসকে তুলে ধরতে।

 প্রাপ্তি স্বীকার

Eduardo Galeano, Open veins of Latin America.

Walter Rodney, How Europe Underdeveloped Africa.

Herbert Apthekar, American Negro Slave Revolts.

Howard Zinn, Peoples History of the United States.


লেখাটি লিখেছেন সন্দীপ মুন্সী

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s