ইতিহাসঃ দু:স্বপ্নের রাত ও স্বপ্নের অফুরান সম্ভাবনা

অনেক দুঃস্বপ্নের রাত অতিক্রম করে সভ্যতার এই কালে এসে উপস্থিত আমরা। কিন্তু এখানে এসেও কি আমরা থিতোতে পেরেছি? রাতগুলো পেরিয়ে এলেও, ভয়াবহ ওই দুঃস্বপ্নগুলো থেকে রেহাই পাচ্ছি না। ভুলতে পারছি না কিছুতেই সেইসব শ্বাসরোধী দৃশ্যাবলী। সভ্যতার এই কালে এসেও আমাদের কলার চেপে ধরছে সারসার অন্ধকূপ, গিলোটিন, গ্যাসচেম্বার! যতই এড়িয়ে চলতে চাইছি সে দুঃস্বপ্ন –ততোই সে পায়ে ধরছে জড়িয়ে। আমাদের জেগে ওঠা হয় না আর! পাতায় পাতায় হিংসার কথা, ধ্বংসের কথা নিয়ে ইতিহাস তাড়া করে প্রতিমুহূর্তে। আমরা ছুটতে থাকি, প্রাণপণ ছুটতে থাকি…

আমরা ছুটতে পারি। পালাতে পারি কি? ইতিহাস থেকে, ইতিহাসের দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠতে চাইলেও, পারছি কি জেগে উঠতে? আদৌ কি সম্ভব জেগে ওঠা? আমি জানি, আমি পালাতে চাইছি! কিন্তু কোথায়? অন্য কোথা? অন্য কোন্‌খানে? ইতিহাস থেকে পালিয়ে ইতিহাস ছাড়া আর কোন স্থানই বা দ্বিতীয় আশ্রয় হতে পারে মানুষের? স্বর্গ? ঈশ্বরের কোল? যেখানে সুখ আর সমৃদ্ধি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই! কোনও দুঃস্বপ্ন নেই! ভিটে মাটি ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার কোনও স্মৃতি নেই! অতীত নেই! ভবিষ্যৎ নেই! এমন শূন্যস্থানে বেঁচে থাকা যায় নাকি? স্বর্গের কল্পনা যদি সত্যিও হয়, তাহলেও মানুষের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা কি সম্ভব? সম্ভব নয়! বেঁচে থাকতে হবে এখানেই। স্বর্গে যাওয়ার অলীক কল্পনা ছেড়ে মানুষ তাই চিরকালই এই জমিনেই নামিয়ে আনতে চেয়েছে স্বর্গকে। চিরকাল আমি, আমরা, মানুষেরা শুধু ইতিহাসের খপ্পড় থেকে পালাতে চেয়েছে, সত্যি!  তবে সম্পূর্ণ নয়। মানুষ ইতিহাস তৈরিও করতে চেয়েছে বারংবার। এই গ্রহের অসংখ্য মানুষের মতোই আমিও ইতিহাসকে স্রেফ ‘দুঃস্বপ্ন’ বলে থেমে যেতে চাই না। বলতে চাই, আমাদের ইতিহাসে ‘দুঃস্বপ্ন’ অবশ্যই আছে, সাথে ‘স্বপ্নের সম্ভবনা’ও আছে অযুত।

ইতিহাসকে কী ভাবে দেখব আমরা? ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়া এক বালক সদ্য নিয়েছে নিউটনের গতি সূত্রের পাঠ। কয়েকদিনের মধ্যেই, স্বাধীন ভারতের এক মুখ্যমন্ত্রীর সৌজন্যে সে বালক গতি সূত্রের ভিন্ন এক ব্যাখ্যাও জানতে পারলো। ২০০১ সালে একটার পর একটা মুসলিম বস্তি তছনছ করে দেওয়ার, গান্ধির রাজ্যে বেলাগাম হিংসা, হত্যার প্রদর্শনী দেখতে পেলো পৃথিবী। স্বাধীন ভারতের বৃহত্তম গণহত্যা সে বালকের বিজ্ঞান পড়ার সাথে মিশে গেল। মিশে গেল কৈশোরের স্মৃতিতে, সত্তায়। ছেলেটি পালাতে চাইল… প্রাণপণে ছুটতে থাকল ১২-১৩ বছরের ইতিহাস থেকে। যেমন ওই বালিকা! রাতারাতি সারা দুনিয়া যাকে চিনে নিয়েছিলো, সেই ফান-থি-কিম-ফু যেমন পালাতে চায়। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে যা ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস’, সেদিনের কিশোরীর কাছে তা নাভিশ্বাস এক দৌড়ের স্মৃতি। নাপামের রাস্তায় দৌড়োচ্ছে মেয়েটি। কাঁদতে কাঁদতে দৌড়োচ্ছে। বিবস্ত্র। দৌড়োতে দৌড়োতে সে শরীর থেকে টেনে টেনে খুলে ফেলেছে জামা কাপড়। যুক্তরাষ্ট্রীয় নাপাম বোমায় ঝলসে যাওয়া ফান-এর সেই ছবি ১৯৭২, ৮ই জুন থেকে নিজেই ইতিহাস। ছোট্ট মেয়েটি আজ বড়ো  হয়েছে। তবুও দৌড়োনো থামেনি তার। ২০০৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছে সে, আজও তাকে হরদম পালাতে হয়। ‘দি নাপাম গার্ল’ পালাতে চায় বোমা থেকে নয়, ছবিটি থেকেই।

napalm image

http://www.today.com/health/napalm-girl-vietnam-war-undergoes-laser-treatment-us-remove-scars-t52336

তবে স্রেফ ভিয়েতনামি কিশোরীই নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস থেকে, আজও, পালিয়ে বেড়াতে হয় খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। এক ফালি দেশের হাতে গোনা স্ট্রিট ফাইটারদের কাছে বিপর্যস্ত হওয়ার স্মৃতি, স্বভাবতই, ‘একমেরু’ এই দুনিয়ার মালিকের নাপসন্দ। ‘সহমত’-এর এই দিনকালেও ‘ওয়াশিংটন’ ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস চায় মুছে ফেলতে। স্বাধীন উপমহাদেশ যেমন চেষ্টা করে দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর। কিংবা বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পরেও এই পৃথিবী পালাতে চাইছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে, পারছে কি! এখন আমার স্মৃতিকে, সত্তাকে, এমনকি ভবিষ্যতকেও বিপন্ন করছে হিটলারি বীভৎসা।

আচ্ছা, এভাবেও তো দেখা যায়, আমার দুঃস্বপ্নের রাত আসলে কারুর কাছে উল্লাসেরও। স্বাধীন ভারতে ’৯২ কিংবা ২০০২ তে জল্লাদের উল্লাসে চাপা পড়ে গিয়েছিল আমাদের সহনশীলতার স্তম্ভ গুলো, বিপর্যস্ত হয়েছিল স্বপ্নের, সম্ভাবনার দিন-রাত। আবার সেইদিনগুলোতেই নিজ ধর্মের প্রবল প্রতাপ আর শ্রীরামের কানফাটানো জয়ধ্বনিতে মুগ্ধ আমাদেরই দেশের কোনো রাষ্ট্রনায়ক নিজেকে গর্বিত অনুভব করেছিল, খুঁজে পেয়েছিল আগামী নির্বাচনের ‘ফিল গুড’ ফ্যাক্টর।  আবার এটাও তো ঠিক, দুঃস্বপ্নের সেই রাতগুলো আমার কাছে আরেক নতুন সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করে দিয়েছিল। সেই দুঃস্বপ্নের রাতে আমাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন নামহীন সেইসব মানুষেরা, দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষকে আশ্রয় দিতে খুলে দিয়েছিলেন নিজের ঘরের হাজারদুয়ারি, বিপদের আশঙ্কা জেনেও। সেইসব পরিচয়হীন মানুষদের স্থান হয়না ইতিহাসের বই-তে। থেকে যান শুধু ‘ইত্যাদি’র বিরাট ব্যপ্ত পরিসরে। সেই অখ্যাত মানুষদের প্রতিরোধকে রাষ্ট্রনায়কেরাও অস্বীকার করতে পারে না বলেই তো চ্যানেলের পর চ্যানেল জুড়ে বানিয়ে যেতে হয় হিন্দু দেবদেবীদের মাহাত্ম্য কাহিনি। যুক্তরাষ্ট্রকে ফাঁদতে হয় র‍্যাম্বর কাল্পনিক গল্প। কাহিনি তৈরি করতে হয় ভিয়েতনামিদের অত্যাচারের। আজও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত মার্কিন চুক্তিকে গোপন করতে হয় আমজনতা থেকে।

আচ্ছা, যদি বলা হয়  ইতিহাস অনেক অনেক মানুষের কোলাহল? তাহলে কি ভুল বলা হবে? অনেক মানুষ, অনেকানেক মানুষ, তাদের অস্ত্বিত্ব, বাঁচা-মরা, স্বর, অসংখ্য-বহুস্বর, এবং আরও অনেক, অনেকানেক কিছু… এসবের এক জটিল বুনন ছাড়া ‘ইতিহাস’-এর আর কীই বা অর্থ হতে পারে? ইতিহাসে মিশে আছে মানুষের কতরকমের দুঃস্বপ্ন! দুঃস্বপ্নের মাঝে, অবধারিতভাবে, থেকে যাওয়া স্বপ্নের সম্ভাবনা। বিপরীতক্রমে স্বপ্নের মাঝেও উঁকি দিয়ে যাওয়া দুঃস্বপ্ন আর স্বপ্নের ভেঙে পড়া! চাবুক খাওয়া শ্রমিকশ্রেণির প্রথম ক্ষমতা দখলের ইতিহাস লেখা হলো ১৮৭১ খ্রিস্টিয় সালে। মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্নপূরণের যে দলিল লেখা হলো সেবছর ১৮ই মার্চ –৭২ দিনেই সে প্যারি কমিউন ধ্বসে পড়লো হুড়মুড় করে। কার্যত স্বপ্নপূরণের ভেতরেই নিহিত ছিলো ২৮শে মের দুঃস্বপ্নের বীজ। কিংবা রাজতন্ত্রকে পরাস্ত করে যেইদিন ক্ষমতা দখল করলেন অলিভার ক্রমওয়েল, সেই দিনের বিজয়ের ইতিহাসেই কি নিহিত ছিলো না পরবর্তি প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা? সবসময়ই, যে কোনও স্বপ্নের মধ্যেই এই ধরনের সম্ভাবনা থেকে যায়। আবার দুঃস্বপ্নের প্রতিটি ছত্রই উদ্ভাসিত হয় স্বপ্নের নতুন নতুন ইশারায়। ক্রমওয়েলের বিজয় চিরস্থায়ী হয়নি। পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো রাজতন্ত্র। একে স্বপ্নভঙ্গ বললেও, মেনে নিতে হয়, এরই মাঝে ঝিলিকও ছিলো ফরাসী বিপ্লবের। ১৯১৭-র বিপ্লব, দুনিয়ায় প্রথম শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পেছনে প্যারি কমিউনের বিপর্যয়ের প্রভাব অস্বীকার করে ফেলা যাবে কি? অর্থাৎ, আপাত স্বপ্নভঙ্গগুলোই স্বপ্নময় ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ধারক। উদাহরণের বাহুল্যে লোভ নেই বলে, সোজা কথায় ‘ইতিহাস’ সম্পর্কে একান্ত নিজের বোঝাপড়া লিখে রাখতে পারি। ক্রমাগত স্বপ্ন থেকে স্বপ্নপূরণে, স্বপ্নপূরণ থেকে স্বপ্নভঙ্গে আর সেই ভয়াবহ বিন্দু থেকে দুঃস্বপ্নের উৎসারে, দুঃস্বপনের সেই ঘূর্ণিতে স্বপ্নের অবিরাম পাক খাওয়ার এক বিপুল আয়োজন ‘ইতিহাস’।

‘ইতিহাস’ বিষয়ে আমার কথা বলার/লেখার অধিকার বা যোগ্যতা আদৌ আমার আছে কিনা তা নিয়ে আমি নিজেই সন্দিহান। নিজের সঙ্গে নিজেরই বলা কথাগুলোকে আপাতত হাজির করলাম। আর শুধু বলতে চাইলাম, ‘ইতিহাস’কে যেকোনোভাবে ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা সকলেরই আছে। কেউ চাইলে ‘দুঃস্বপ্ন’ বলেও দেগে দিতে পারেন অনায়াসে। তবে তর্ক উঠতে পারে সেক্ষেত্রে। তর্ক ওঠারই কথা। কারণ ‘ইতিহাস’-এর মতোন জটিলভাবে বিন্যস্ত এক বিরাট, বিপুল বিষয়ের কোনো একরৈখিক ব্যাখ্যাই অসম্ভব, তার ভেতরের ঘাত-প্রতিঘাত-দ্বন্দ্বকে অবহেলা করে। আমার মতো এক সাধারণ পড়ুয়ার কাছে (কোনও ভাবেই যে কোনও ‘বিশেষজ্ঞ’ অবস্থানের ধারে কাছেও নেই) ‘ইতিহাস’ আদতে এক দ্বন্দ্বের সমাহার। অযুত, অজস্র, অসংখ্য ঘটনা, বিষয় আর প্রবণতার আন্তঃসম্পর্ক, কাটাকুটি, দ্বন্দ্ব, সংশ্লেষের এক অপূর্ব কাহিনি। আমরা এ ‘ইতিহাস’ শুধু যে পড়ি, তাই নয়। ‘ইতিহাস’ বানিয়েই নিই কার্যত আমরা, মানুষেরা। যাপন করি ‘ইতিহাস’।

আমাদের এই অনন্ত খোয়াবনামারই প্রতিশব্দ ‘ইতিহাস’। যাকে কিনা কোরাসও বলা চলে।


লেখাটি লিখেছেন অনল পাল

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s