JENIN থেকে JANAM

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে প্যালেস্তাইন আর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থা একদম আলাদা। এমনকি, দুই দেশের ইতিহাসকে খানিকটা বিপরীতধর্মী বলেই মনে হবে। একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করা ভারতবর্ষ, যা গত সত্তর বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবেও পরিচিত, অন্যদিকে প্যালেস্তাইন, যে গত সত্তর বছর ধরে লড়াই করছে এক চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যাবস্থার বিরুদ্ধে, যে শাসনব্যাবস্থা প্যালেস্তাইনের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে তাদের নিজেদেরই দেশে। কিন্তু ভারতবর্ষের অবস্থা যদি একটু খতিয়ে দেখা যায় তাহলে একটা অন্য দৃশ্য ফুটে উঠবে। প্যালেস্তাইনের সঙ্গে একই দাঁড়িপাল্লায় ভারতবর্ষকে চাপালেই বোঝা যাবে যে ভারতবর্ষে ‘গণতন্ত্র’ ও তার ধারণা খুব সরলরৈখিক নয়। একবার মণিপুরের দিকে, মণিপুরের ইতিহাসের দিকে, কাশ্মীরের দিকে, বা সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে একটা প্রশ্ন উঠে আসতে বাধ্য – এ কার গণতন্ত্র? ঠিক যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষ স্বৈরাচারী ইসরায়েলি শাসনব্যাবস্থাকে প্রশ্ন করছে – এ কার দেশ?
এই প্রশ্নগুলো যখন সামনে আসে আর তাদের উত্তরগুলো কিছুটা ইতিহাসবোধ আর কিছুটা তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন আর এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না কী করে প্যালেস্তাইনের একটি রাজনৈতিক নাটকের দলের সঙ্গে ভারতবর্ষের একটি রাজনৈতিক নাটকের দলের এত মিল। প্যালেস্তাইন আর ভারতের এই দুই দলের বক্তব্য বা মতামত যে অনেক ক্ষেত্রে এক শুধু তা নয়, দুই দলই একইরকম ট্র্যাজেডি’র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে। দল দুটি’র প্রতিষ্ঠাতারা, সফ্‌দর হাশমি (১৯৮৯এ) এবং জুলিয়ানো মের খামেস (২০১১তে) খুন হন। প্যালেস্তাইনের জেনিন শহর থেকে The Freedom Theatre ভারতবর্ষে JANAMএর (Jana Natya Manch) সাথে কাজ করতে আসে কোনো সরকারি বা কর্পোরেট অনুদান ছাড়া, শুধুমাত্র তাদের মনের জোর আর মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে। তারা একসঙ্গে একটা নাটক তৈরি করে, সারা দেশ ঘুরে শো করে। তাদের পার্থক্যগুলোকে তারা সরিয়ে দেয়, দিতে পারে, তাদের মিলের স্বার্থে।
নাটকটার তারা নাম দেয় “হামেশা সামেদা”। আর্‌বি শব্দ ‘হামেশা’ এখন ভারতের বহু ভাষায় ব্যবহৃত, প্রচলিত। ‘সামেদা’ শব্দটি ততটা পরিচিত নয়। ‘সামেদা’ শব্দের উৎপত্তি আর্‌বি ‘সুমুদ’ শব্দটি থেকে যার অর্থ ‘দৃঢ়’। দুটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে নাটকটির বাংলা নাম দেওয়া যেতে পারে ‘চিত্ত যেথা স্থির’। নাটকটির ভাষ্যের সংখ্যা একাধিক। অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ন্যারেটিভ নিয়ে তৈরি। বিচ্ছিন্ন বলেই অনেক কথা অনেক সময়ে অনুচ্চারিত থেকে যায় নাটকে, (কারণ অনেক কথা বলার আছে, কারণ ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সংখ্যা বড্ড বেশী) আর সেই না-বলাটাই ধাক্কা দেয় বেশী; দর্শককে আহ্বান জানায় তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুন্যস্থান ভরাট করতে। এই নাটকে আছে ‘সন্দুখ’ বা সিন্দুকের গল্প – ঘর-ছাড়ার ঘর-না-থাকার চিহ্ন — যা সেই চিরন্তন ঘর-ছাড়া বয়ে বেড়ায় — যেখানে থামে সেখানে খোলে, আবার গুছিয়ে নিয়ে পথে বেরোয়। ‘ঘর’ শব্দটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। ঘর যেন অনেক দূর দিগন্তে কেঁপে কেঁপে ওঠা মরিচীকা, যে কখনো ডাক দিতে ভোলে না। এমন এক ডাক যাতে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই।
received_10208686583100247
বিচ্ছিন্ন ভাষ্যগুলোকে একসাথে বেঁধে রেখেছে কয়েকটা গান — কখনো রাগের, যুদ্ধের; কখনো শোকের, বেদনার — আর বেঁধে রেখেছে কয়েকটি দৃশ্য — জেরা করার, নিপীড়নের, হত্যা’র। আর এই সবেতেই মিশে আছে তীক্ষ্ণ শ্লেষ। এগিয়ে চলে দৃশ্য, আর দর্শককে টেনে নিয়ে আসে তাদের কুশন-মোড়া স্বাচ্ছন্দ্যের কিনারায়, তাদের নাড়া দেয়, তাদের সম্মিলিত বিবেকে আঘাত করে, তাদের নৈতিকতাকে, ন্যায়ের বোধকে পক্ষ নিতে বাধ্য করে। ভাষ্যের জায়গা নেয় বয়ান।
নাটকের উপান্ত দৃশ্যে আমরা সাক্ষী হই এক ভয়ানক ঘটনার। দেখি, ইসরায়েলের ট্যাঙ্ক গুলিবর্ষণ করছে তার নিজের দেশের বাসিন্দাদের ওপর — প্যালেস্তাইনের সেই মানুষদের ওপর যাঁদের প্যালেস্তাইনে থাকার অধিকারটুকু মিলেছিল, হোক সে থাকা নিজভূমে পরবাসী’র মতই। হঠাৎ একটা পুতুল ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে JANAM-JENINএর সুযোগ্য সাথী কাঠ্‌কথার (যার পরিচালক অনুরূপা বসু) কোনো এক সদস্যের হাতের জাদুতে, আর ট্যাঙ্কের দিকে তাক্‌ করে প্রথম ঢিলটা সে-ই ছোঁড়ে।
received_10154076258962953
ট্যাঙ্ক পিছু হঠতে বাধ্য হয়। শুরু হয় শেষ গান, উড়তে শুরু করে প্যালেস্তাইনের ব্যানার, পতাকা। কিন্তু এখানেই খেল খতম্‌ নয়। আচমকা মঞ্চে প্রবেশ করেন ‘পরিচালক’, তাঁর হারিয়ে যাওয়া অভিনেতার খোঁজে। প্যালেস্তাইনের এক অভিনেতা রেগেমেগে ধমক দেন, “নাটক হো গ্যয়া!” বক্তব্য পেশ করা হয়ে গেছে, আর্ট আর প্রতিবাদের হাতে হাত মিলিয়ে কথা বলা হয়ে গেছে। দুই কমেডিয়ান প্রস্থান করে, আর বাকিরা মাথা নীচু করে গ্রহণ করে দর্শকের অভিবাদন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহ তখন হাততালিতে ফেটে পড়ছে।
ফয়সল আবু আলহাইজা, এই নাটকের সহ-পরিচালক (The Freedom Theatreএর পক্ষ থেকে, JANAMএর পক্ষ থেকে ছিলেন সুধান্বা দেশপান্ডে)  নাটক তৈরির কাজ চলাকালীন Newsclick/ Indian Writer’s Forumকে একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “আইডেন্টিটি অনেকগুলো আলাদা টুকরোর মতো। আমাদের আর্টের মধ্যে দিয়ে, আমাদের কাজের মধ্যে দিয়ে আমরা চেষ্টা করি সেই টুকরোগুলকে এক জায়গায় জড় করে একটা আস্ত চেহারা তৈরি করতে।তাকে মঞ্চে উপস্থিত করতে। আমরা বলতে চাই, তুমি যেরকম, সেরকম ভাবেই আমরা তোমায় মেনে নেব। স্বাধীনতা মানে ‘তুমি যেমন, তেমন থাওকতে পারার স্বাধীনতা’।” আসলে আমাদের সবার সত্ত্বাই খন্ডিত, আর সবসময়ে এই টুকরোগুলোর যোগফল মোটের চেয়ে বেশী। প্যালেস্তাইনের চেকপোস্টে গোলমাল, নিউ ইয়র্ক শহরে প্রতিকূল রাজনৈতিক আবহাওয়ার দোহাই দিয়ে অ্যালান রিক্‌ম্যানের প্যালেস্তাইন বিষয়ক নাটক বন্ধ করা , লাহোরের কম্যুনিটি পার্কে আত্মঘাতী বোমা মানব ,  ভারতের এক দলিত ছাত্রের শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে থেকে যাওয়া শুধু তার  সুইসাইড নোট… এই সবকিছু এক বৃহত্তর সমষ্টি’র অন্তর্গত। আমরা সবাই সেই সমষ্টির অংশ, আর তার দায়িত্ব আমাদের সকলের।
received_10154076258942953
লেখাটি লিখেছেন  সুদীপ্ত চ্যাটার্জি
Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s