হ্যাশট্যাগের আত্মপরিচয়

“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/ সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।” স্নিগ্ধ নদী, ধূম্র পাহাড়, আকাশ তলে মেশা হরিৎক্ষেত্র, ধানের ওপর ঢেউ খেলে যাওয়া বাতাস — এই তো আমার দেশ। আমার জন্মভূমি। ছোটবেলায় আমরা কেউ কেউ শিখেছি গানটা। গানের শুরুতে পেয়েছি আমাদের পৃথিবীর পরিচয়, তারপর জেনেছি, সেই পৃথিবীর মধ্যে একটা দেশ আছে, সবার থেকে ভালো সেই দেশ, সবার সেরা, স্বপ্ন দিয়ে যা তৈরি হয়েছে, স্মৃতি যাকে ঘিরে রেখেছে। গাইবার সময় হয়ত আমাদের কারুর কারুর গর্বে বুক ফুলে উঠেছে, হয়ত ওঠেনি, সে কথা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ সেই একটা বাক্য যা গানটিতে বারবার ফিরে আসে, আর উচ্চারণে প্রধান হয়ে ওঠে একটা শব্দ — ‘আমার’। আমাদের অজান্তেই, সুরের চলনের ফেরেই হবে বোধহয়, আমরা জোর দিয়ে ফেলি ওই শব্দটিতে। একবার নয়, দু’বার নয়, তিনবার ফিরে আসে এই বাক্য প্রতিটি স্তবকের শেষে, আর ফিরে আসে ওই শব্দ আর তার ওপর দিয়ে ফেলা অহেতুক জোর।

আর সেই যে দেশটা আমার হয়ে গেল, অমনি আমাকে আর ভাবতে হল না দেশটা আর কারুর হল কি না। আমি যা যা অধিকার নিয়ে, অধিকার জাহির করে, যে নিরাপত্তায় এই দেশে বেঁচে আছি, অন্য কেউ তা করতে পারল কি না, ‘আমার দেশ’ আর কেউ বলতে পারল কি না, তাই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা আমার রইল না। আমার দেশ, আমার দেশপ্রেম তাদের ছাড়াও দিব্যি টিকে রইল।

দেশ এবং দেশপ্রেমের এই যে ধারণা তা আমাদের কেউ শিখিয়ে দেয় না। শিখিয়ে দেয় না মানে, হাতে ধরে কেউ বোঝায় না এই কথাগুলো। আমাদের চারপাশ থেকে, টিভি’র পর্দা থেকে, পপ্যুলার গান-কবিতা থেকে, ক্ষেত্র বিশেষে ইতিহাস বই থেকেও আমরা এই দেশপ্রেমের পাঠ নিজেরাই গ্রহণ করে থাকি। বরং এর উল্টো পথে হাঁটার শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি সচেতন ভাবে। দেশ এবং দেশপ্রেমের এই সংকীর্ণ ধারণাকে বর্জন করি সচেতন ভাবে। দেশ তখন আমাদের কাছে আর শুধুমাত্র এক টুকরো জমি নয়। স্বপ্ন দিয়ে তৈরি নয়। স্মৃতি দিয়ে ঘেরা নয়। অন্য কিছু। কী সেটা?

এই প্রশ্নের একটা খুব সহজ উত্তর হয়। মানুষ। দেশ আসলে মানুষ দিয়ে তৈরি হয়, মানুষই তৈরি করে দেশ। কিন্তু মানুষ বললেই তো আর হল না। কতরকম মানুষ বাস করেন এই দেশে। কত ভাষার, কত ধর্মের, কত মতের। সেই ছোটবেলায় ইতিহাসে পড়ানো হত ভারতবর্ষের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের কথা। কত গর্ব করে বলা হত বিভেদের মাঝে মহামিলনের কথা! সেই তখন থেকেই কিন্তু আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হত যে আমরা সবাই এক নই। ঠিক। ঠিক শেখানো হত এত দূর অব্দি। মুশকিলটা হত তার পরে। ছোটবেলায় আমার একটা কাঁথা ছিল, নানা কাপড়ের টুকরো একসাথে সেলাই করে তৈরি। কোনোটা লাল, কোনোটা হলদে, কোনোটা নক্সা করা, কোনোটা ছাপা। কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে সেই জুড়ে গেল, অমনি তৈরি হয়ে গেল শীতের আশ্রয়। বিভেদের কথা বলার পরের ধাপে দেশ সম্পর্কেও এরকম একটা ধারাণাই দেওয়া হত আমাদের। মানুষ আলাদা, কিন্তু দেশটা এক। এমন একটা কাঁথা যার তলায় আমরা সবাই এঁটে যাব।

যাবও হয়ত এঁটে, কিন্তু একটা কাঁথার তলায় এতজন থাকার তো নানা অসুবিধে আছে। যেমন, কিছু মানুষ পাবেন কাঁথার ধারের দিক। গা থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। আর কিছু মানুষ থাকবেন মাঝামাঝি, বেশি আরামে, বেশি উষ্ণতায়। ছোটবেলায় নেওয়া ইতিহাসের পাঠকে যখন আমরা প্রশ্ন করতে শিখি, তখন এই বাস্তবটা পরিষ্কার হতে থাকে আস্তে আস্তে। বুঝতে পারি যে “দেশ সবার” এই বাক্যের পরে একটা অংশ আছে যা উহ্য থেকে যায়। দেশটা সবার, কিন্তু কারুর কারুর একটু বেশি। ঐক্যের ধারণা’র মধ্যে এই অসাম্যের ধারণার কোনো জায়গা থাকে না। ঐক্যের এই ধারণা আসলে কাঁথার ধারের ওই মানুষদের উষ্ণতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে যায়, তাঁদের আরো খানিকটা দূরে ঠেলে দিতে চায়। ‘আমার জন্মভূমি’ উচ্চারণের সঙ্গে ঐক্যের এই ধারণার কোনো গুণগত ফারাক আসলে নেই।

এই উচ্চারণের, এই ঐক্যের বিরোধিতা করার একটা উপায় হল কাঁথার ধারে থাকা ওই মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো যাদের রাষ্ট্র ক্রমাগত কাঁথার প্রান্তের দিকে সরিয়ে দিচ্ছে, দিতে চাইছে। কিন্তু কী ভাবে পাশে দাঁড়ানো যায়? জে এন ইউ-এর খবর শুনে, বাস্তারে সোনি সোরির খবর শুনে, বা হায়দ্রাবাদের খবর শুনে আমার সত্যি সত্যি একেক সময়ে ওই জায়গাগুলোতে পৌঁছে যেতে ইচ্ছে করেছে। পারিনি। বেশির ভাগ সময়ে আমরা পারি না। তাহলে? এই ক্ষেত্রে, দেখা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমি অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়া বলতে মূলত ফেসবুকের কথাই বলছি। কী ভূমিকা পালন করছে সে? যেখান থেকে আর কোনো ভাবে খবর আসছে না, সে খবর দিচ্ছে। শেয়ারের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সেসব খবর। নিজের মতামত প্রকাশ করার অন্যতম হাতিয়ার ফেসবুক অনেক দিন ধরেই ছিল। এখনো আছে। আর পাশে দাঁড়ানো? হ্যাঁ, ফেসবুকের দৌলতে সেটাও সম্ভব। সহজ। #StandwithHyderabad বা #StandwithJNU জাতীয় হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন প্রতিবাদী স্বর। আমরা সবাই জানি, এই প্রতিবাদ প্রতীকী। কিন্তু আবেগের জোয়ারে সেই জানাটা কখনো চাপা পড়ে যায় হয়ত। ফেসবুকের দুনিয়ায়, যেখানে মিনিটে কয়েক শো রকমের ভিন্ন খবর আপনার চোখের সামনের মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া, কিন্তু ভুল। আমরা সবাই যদি মনে করে নিই কোনোদিন যে প্রতিবাদের জন্য ফেসবুকই যথেষ্ট, তাহলে তো একদিন মিছিলে হাঁটতে ভুলে যাব আমরা। ভুলে যাব একসাথে পথ হাঁটতে। একসাথে লড়াই করতে। আমরা একা হয়ে যাব।

আসলে দুনিয়াটাই এরকম। পাঁচিল। পাঁচিলের ওপারে বাড়ি। বাগান। দোকান। পার্ক। বাইরে বেরোনোর দরকার পড়ে না। বেরোলেও গাড়ির জানলা তোলা। কানে হেডফোন। আঙ্গুল আর চোখ ফোনের দিকে। কর লো দুনিয়া মুঠ্‌ঠি মে। আর দুনিয়াই যখন হাতের মুঠোয়ে তখন চারপাশে তাকানোর আর দরকার কী? ভারতবর্ষ ডিজিটাল হবে, দুনিয়া সবার হাতেই চলে আসবে। সত্যি কী এটাই লক্ষ্য আমাদের? গায়ের কাপড় সবার না জুটুক, স্মার্ট ফোন সবার জন্য? গোটা পৃথিবী থাকবে হাতের তালুতে, কিন্তু পা থাকবে একটাই জায়গায়? একটু হেঁটে দেখতে ইচ্ছে করে যদি? যদি ইচ্ছে করে ঘুরে আসতে? আমাদের চলাফেরা তাহলে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে মোবাইলের স্ক্রিনে? তার বাইরে আর বেরোতে পারব না আমরা? বেরোতে পারব না — এই ভয়ানক প্রশ্নের চেয়েও ভয়ানক একটা প্রশ্ন আছে আসলে, তাহলে কী একদিন বেরোতে চাইবই না আমরা? যিনি দু’বেলা ঠিক মত খেতে পান না, তাঁর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে তাঁর ভাত চাইবার অধিকারটুকু কী কেড়ে নেওয়া হবে? আর আমরা সবাই ডিজিটাল ভারতবর্ষের নাগরিক বলে আবার একধরনের ভ্রান্ত ঐক্যের ধারণা আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে?

আমাদের চারপাশ থেকে আমাদের  বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চেষ্টা আর আমাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেয় ফেসবুক। কারণ এতে তারই লাভ। ফেসবুকে ‘গ্রুপ’ বলে একটা জিনিস আছে বটে, কিন্তু মোটের ওপর ফেসবুকের অস্তিত্ব নির্ভর করে আমাদের এককত্ব জাহির করার ওপরে। “আমি আমার মত”- এ শুধু বাংলা ট্যাবলয়েডের ট্যাগলাইন নয়, ফেসবুকের চালিকাশক্তির মূলমন্ত্র। আমাদের আমিত্বকে প্রদর্শন করার হরেক তরিকা  ফেসবুক প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে হাজির করে, আর আমরাও এই সুযোগ পেয়ে বিগলিত হয়ে পড়ি। প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রেও তাই। আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমি চারটে লিঙ্ক শেয়ার করেছি। দুটো ছবি পোস্ট করেছি। একটা স্টেটাস আপডেট দিয়েছি। সবই আমি। আমি প্রতিবাদ করছি আমার ঘরে বসে, ফোন কিংবা ল্যাপটপ থেকে। আমার আশেপাশে কেউ নেই। প্রতিবাদ জানানোর ওই মুহূর্তটাতে আমি আসলে একা। তাই আমার প্রতিবাদের ভাষাতেও প্রাধান্য পাচ্ছে ‘আমি’। ফুটে উঠছে আমার একা হয়ে যাওয়া। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

২০১৫ সালের নভেম্বর মাস। প্যারিস শহরের বিভিন্ন জায়গায় গর্জে উঠল সন্ত্রাসবাদীদের বন্দুক। বোমা ফাটল। ১৩০ জন প্রাণ হারালেন। ফেসবুকে শুরু হল হ্যাশট্যাগ #JeSuisParis। আমি প্যারিস। আমি প্যারিস? আমার শরীর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হচ্ছে গুলির আঘাতে? চোখের সামনে কেউ লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে, আর উঠছে না? আমায় দখল করে নিচ্ছে একদল লোক যারা নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে আমার ক্ষতি করতে চায়? না। হয়ত আরো খারাপ কোনো ঘটনা ঘটছে আমার সঙ্গে। হয়ত কিছুই ঘটছে না। যাই হোক না কেন, তার সঙ্গে প্যারিসে যা ঘটেছে তার তুলনা করা কী খুব দরকার? আক্রান্তের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কী নিজেকেও একইরকম ভাবে আক্রান্ত বলে ঘোষণা করা খুব জরুরি? আক্রান্ত না হলেও? আর কোন প্যারিস আমি? আইফেল টাওয়ার আর নত্রে দাম সজ্জিত? মোনালিসা’র সংরক্ষক? প্রেমের শহর প্যারিস? নাকি অপারেশন চামালের প্যারিস? ১৫ই নভেম্ভর  প্যারিস সিরিয়া’র আল রাক্কাতে বোমা ফেলে। রাক্কার সাধারণ মানুষ এই এয়ার স্ট্রাইকে মারা জাননি বলে জানা গেছে। কিন্তু আল জাজিরা’র একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, রাক্কা’র মানুষ এক দুঃস্বপ্নের শহরে বাস করেন। নিজের দেশে ISIL-এর একনায়কত্ব, অত্যাচারী শাসন। আর মাথার ওপরে ঘুরপাক খায় আমেরিকা, রাশিয়া, বা ফ্রান্সের বোমারু বিমান। বোমার বদলে বোমা। সন্ত্রাসবাদের বদলে পাল্টা সন্ত্রাসবাদ। অহিংসায় আস্থা না রেখেও বলা যায়, এই প্রক্রিয়ায় সন্ত্রাসবাদকে থামানো সম্ভব নয়। এত কথা যদিও সেদিন আমার মাথায় আসেনি। যখন কিবোর্ডে আমার আঙ্গুল টাইপ করছে ওই তিনটি শব্দ, তখন আমার চোখের সামনে হাহাকারের ছবি, অসহায়তার ছবি। তাই তখন আমার ভাবার দরকার নেই আর যে ফ্রান্সের সরকার আমেরিকার সাথে হাত মিলিয়ে সিরিয়া আর ইরাকে দীর্ঘ দিন ধরে বোমা ফেলছে। ভাবার দরকার নেই সন্ত্রাসবাদ কী ভাবে তৈরি হয়, কে তৈরি করে সন্ত্রাসবাদীকে। এখন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই খবর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া যে প্যারিসের ঘটনায় আমি কতটা শোকাহত। জানানো দরকার, আমিই প্যারিস। আর অন্যরা? তারাও প্যারিস, আলাদা আলাদা করে। যদিবা ‘আমি প্যারিস’ বলার তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা মেনে নেওয়া যায়, একবারও কারুর মনে হল না যে বলি “আমরা সবাই প্যারিস”?

একই কথা একটু অন্যরকম ভাবে বলা যায় আরেকটি হ্যাশট্যাগ নিয়েও। বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে হবে। নতুন শতকের গোড়ার দিকে শুরু হল ‘মুক্ত-মনা’ নামের একটি প্রয়াস। যিনি শুরু করলেন তাঁর নাম অভিজিৎ রায়। জন্ম বাংলাদেশে। পরে আমেরিকাতে থাকতে শুরু করেন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সস্ত্রীক বাংলাদেশে ছিলেন। ঢাকা’র একুশে বইমেলা থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাঁদের আক্রমণ করা হয়। রিক্সা থেকে টেনে ফেলে দেওয়া হয় রাস্তায়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় অভিজিৎএর মাথায়। তাঁর স্ত্রীর কাঁধে আঘাত লাগে। কেটে ফেলা হয় বাঁ হাতের আঙ্গুল। সেই রাতে হাসপাতালে অভিজিৎ মারা যান। কেন খুন হতে হল অভিজিৎ-কে? মনে রাখা দরকার, তাঁর দুটি নাগরিকত্বের মধ্যে একটি বাংলাদেশের। এমন এক দেশ যেখানে ইসলামের বিপক্ষে কোনো কথা বললে, ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বললে, নাম উঠে যায় হিটলিস্টে। জেলে যেতে হয়। মরে যেতে হয়। অভিজিৎ ব্যতিক্রম নন। বাংলাদেশের অন্য ব্লগাররা খুন হয়েছেন, জেল খেটেছেন। বলতে পারেন, বলতেই পারেন, আপনিও অভিজিৎ। আপনাকে মুসলিম মৌলবাদীরা খুনের হুমকি না দিলেও নিশ্চয়ই আপনি অভিজিৎ। আপনি হয়ত নিশ্চিন্তে স্টেটাস আপডেট দিচ্ছেন, কেউ কিছু বলছে না, মারছে না, খুন তো করছেই না, আপনি তাও অভিজিৎ। বা হয়ত আপনার ইনবক্সেও আসছে আশঙ্কাজনক মেসেজ। ধমকাচ্ছে কেউ আপনাকে। রাস্তায় বেরোলে, আপনি বেশ টের পাচ্ছেন, কেউ মাপছে। আপনার কথোপকথনে আড়ি পাতছে কেউ। আপনার মনে পড়ে যাচ্ছে অভিজিৎ-এর কথা। হয়ত বা নিলয়ের কথা। তাই আপনি বলছেন #আমিওঅভিজিৎ বা #আমিওনিলয়। কিন্তু আপনি কী একবার ভেবে দেখবেন না, যে আপনি যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তা আপনার কোনো ব্যক্তিগত ব্যাধির লক্ষণ নয়, আমাদের সময়ের লক্ষণ। প্রতিনিয়ত তো দেখছি আমরা কী ভাবে প্রতিবাদী কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। শাসক এবং তার ভাষ্যের বিরুদ্ধে যারা গলা তুলছে, পথে নামছে, তাদের থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যেমন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে, চিরকালের জন্য থামিয়ে দেওয়া হয়েছে রোহিথ ভেমুলাকে। এ এস এ’র ছাত্র নেতা রোহিথ। ফেলোশিপ বন্ধ। তার বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। একটি ছবির স্ক্রিনিং আটকে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করা যাবে না। প্রতিবাদ করলে, নিজের প্রাপ্য ফেলোশিপের টাকা চাইলে, শাসক অসন্তুষ্ট হয়। সাস্পেন্ড করে। বলে হস্টেলে ঢুকতে পারবে না। ক্যান্টিনে খেতে পারবে না। আপ্পা রাও-এর আর দোষ কী? হাজার হাজার বছরের সংস্কারের বীজ তাঁর রক্তেও গোপনে অঙ্কুরিত হয়। অত্যাচারীর, শোষকের, শাসকের বংশধর তিনি। দলিতের ওপর সেই অত্যাচারের ইতিহাসকে তিনি বর্জন করতে পারেননি। হয়ত করতে চাননি। তাই পাঁচজন দলিত ছাত্রের ক্যান্টিনে খাওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় যখন, তখন আমাদের মনে পড়ে যেতে বাধ্য যে এখনো ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে দলিতদের অধিকার নেই ব্রাহ্মণদের পাশে বসে আহার করার। হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিথ ও তাঁর বন্ধুরা তাঁবু তৈরি করলেন, শুরু হল অনশন। প্রায় দু’সপ্তাহ অনশন চলার পর, জানুয়ারি’র ১৭ তারিখ রোহিথ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। রোহিথ যে ভারতবর্ষের বাসিন্দা, আমরা অনেকেই সেই ভারতবর্ষের কথা কল্পনাও করতে পারব না। রোহিথের ভারতবর্ষে যে অত্যাচার আছে, যে অনাচার আছে, যে বিভেদ আছে, যে ভারতবর্ষে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে করতে রোহিথকে বেঁচে থাকতে হয়েছিল, যে ভারতবর্ষে শেষপর্যন্ত তিনি খুন হয়ে যান, সেই ভারতবর্ষের খোঁজ আমরা পাই খবরের কাগজের পাতায়, প্রবন্ধে, রোহিথের সুইসাইড নোটে। সেই ভারতবর্ষে আমাদের অনেককেই থাকতে হয় না। দলিত হয়ে বেঁচে থাকা এই দেশে কীরকম তা আমরা অনেকেই জানি না। জানবও না কোনোদিন। আমরা তাই রোহিথ বলে যদি দাবী করি নিজেদের, যেমন হয়ত করেছিলাম কেউ কেউ, তাহলে তা রোহিথের প্রতি, ইতিহাসের প্রতি, লড়াইয়ের প্রতি অসম্মান করা হবে। কাঁথার একদম মাঝখানে থেকে, তার সিংহ-ভাগ দখল করে যদি আমি বলি আমার গায়ে কাঁথা নেই, তাহলে যাদের গা থেকে কাঁথা সত্যি সরে যাচ্ছে, তাঁদের প্রতি অবিচার করা হবে। আমি রোহিথ নই, আমরা সবাই রোহিথ নই। কিন্তু আমরা সবাই রোহিথের সাথী হতে পারি তাও। আমরা তার লড়াইয়ে সামিল হতে পারি।

তখন আমরা আর একা নই। তখন আমরা সেই স্লোগানের উত্তরাধিকারের প্রতি সুবিচার করি, যে স্লোগান আমার নামের পাশে সবসময় বসায় তোমার নাম।


লেখাটি লিখেছেন সর্বজয়া ভট্টাচার্য।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s