প্রতিবাদের ভাষা: নারী শরীর ও প্রাতঃকৃত্য

সন ১৯৭৩, লাতিন আমেরিকা— পিনোশের ডিক্টেটরশিপ চলছে। হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক মানুষ। রাষ্ট্র চুরি করছে তাদের, খুন করছে কারণ তারা ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। রাষ্ট্র স্বভাবতই পিতৃতান্ত্রিক হওয়ার ফলে এই অ্যান্টি-ফ্যাসিস্টদের বাড়িতে ফেলে আসা কান্নারত মা, আত্মীয়া, বান্ধবী, প্রেমিকাদের তাদের কমরেড বলে চিহ্নিত করতে পারেনি।  স্বজনদের উপর ঘটে যাওয়া অকথ্য অত্যাচারের প্রতিবাদে, তাদের হদীস পাওয়ার দাবীতে এই মহিলারা রুখে দাঁড়ান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, ইতিহাস এদের আরপিয়েরিস্তা বলে চেনে। এইভাবে শুরু হল মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত এক যুগান্তকারী আন্ডারগ্রাউন্ড আন্দোলন, আরপিয়েরিস্তা মুভমেন্ট। ওঁরা নানারকমের রঙিন কাপরের টুকরো (আরপিয়েরা) জুড়ে জুড়ে নিজেদের গল্প বুনতেন। যে সূচ-সুতো মহিলাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে যুগের পর যুগ ধরে শুধুমাত্র তা ‘নারীসুলভ’ বলে, সেই একই সূচ-সুতো তারা ব্যবহার করলেন রাষ্ট্রীয়, পিতৃতান্ত্রিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে।

সন ২০০৪, মণিপুর— মনোরমার ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, আফস্পা কর্মীদের বিরুদ্ধে পথে নামলেন একদল উলঙ্গ নারী, ব্যানারে লেখা আছে: “ভারতীয় সৈন্য আমাদের ধর্ষণ করো”।

এই দুই ক্ষেত্রেই প্রতিবাদের অস্ত্র নারী শরীর। লাতিন আমেরিকায় যে নারীর হাত, আঙুল অস্ত্র হিসেবে বেছে নিচ্ছে তাদের পরাধীনতার, একাকীত্বের সখী সূচ-সুতোকে, সেই নারী শরীর, মণিপুরে, প্রায় তিন দশক পর, অত্যন্ত রাগে গায়ের আচ্ছাদন খুলে ফেলছে, চরম অন্যায়ের প্রতিবাদে। আসলে, নারী শরীর নিজের স্বেচ্ছায় নিজের শরীরকে পণ্যায়িত করলে, উলঙ্গ করলে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বুঝতে পারেনা, তার ঠিক এইসব চিৎকার কুড়িয়ে, ইতিহাসে না-খুঁজে পাওয়া সব নীরবতা আগলে তৈরি হয়েছে থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তকের নতুন প্রযোজনা ‘প্রাতঃকৃত্য’।
মঞ্চে প্রথমেই দেখা যায় পাঁচটা প্রায় উলঙ্গ শরীর নিথরভাবে দাঁড়িয়ে আছে বেশ খানিকক্ষণ, দর্শকরা আসেন, তারা নিজেদের সিটে বসেন, মঞ্চে উপস্থিত মেয়েগুলো নড়ে না একচুলও। তাদের লিঙ্গ নির্ধারণ করা যায়না গোটা পারফর্মেন্সের পরও। ষ্টেজ ডিজাইন ও লাইট ডিজাইনও সেইভাবেই করেছে জয়রাজ, বাবুন দা ও বৈজয়ন্ত। তাদের চুল দিয়ে আবৃত মুখগুলো ঠিক কিরকম দেখতে তা ঠাওর করা যায়না। তাদের এই নীরবতা কাটে না কালুয়াদা’র উত্তাল ঢাকের শব্দে—আমরা দাঁড়িয়ে থাকি পৃথিবীর সেই সবকটা মানুষের জন্য যারা আজও পরাধীন। তালের সাথে নাচতে না পারার যন্ত্রণা রিহার্সালের গোঁড়ার দিকে শতাক্ষির চোখে দেখেছিলাম, শ্রুতিদির শরীরে দেখেছিলাম। আসলে এই না পাওয়ার, না পারার যন্ত্রণাই তো কিছু মানুষকে বঞ্চিত করে আর কিছু মানুষকে করে প্রিভিলেজড্‌—এতদিন আমি এই কথা শুধুমাত্র থিওরিতে বুঝেছিলাম, সেদিন প্রত্যক্ষ করলাম। আপার ক্লাস, আপার কাস্ট হওয়ার ফলে আমাদের রোহিথের মত মরিয়া হয়ে সুইসাইড করে পারফর্ম করতে হয়নি প্রথম ও শেষবারের মত, আমরা বারবার সুযোগ পাচ্ছি, পাই, ‘প্রাতঃকৃত্য’ করার।
২১শে ফেব্রুয়ারি মঞ্চে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে জয়দা ব্যাকস্টেজে খবর দিল সোনি সোরির মুখে একদল হিন্দুত্ববাদী অ্যাসিড ছুঁড়েছে—প্রথম শো ঘোষিতভাবে আমরা সোনির উদ্দেশ্যে করি, প্রচণ্ড রাগে, কান্নায়। বস্তার থেকে এক বোনের খবর কি করে সেইদিন অ্যাকাডেমিতে নৃত্যরত পাঁচ পেত্নীর ( অনিন্দ্যদা* তার সমস্ত লেখায় আমাদের এই বলেই সম্বোধন করেন ) কানে এসে পৌঁছল তা কে বলতে পারে? রাষ্ট্র তো একেবারেই নয়! রাষ্ট্র বুঝতে পারবেনা এমন সমস্ত ভাষা, ভালোবাসা, স্মৃতি, ছোঁয়া, অনিশ্চয়তা যদি আমরা আমাদের শরীরের দ্বারা তৈরি করতে শুরু করি তাহলে কেমন হয়? পুরুষের শরীর নয়, নারীর স্বেচ্ছায় পণ্যায়িত করা শরীর, যাকে পিতৃতন্ত্র দু’চোখে সহ্য করতে পারেনা।
পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা করতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ক্যাম্পেন হোক, একটা ছেলের রাস্তায় ব্রা পড়ে হাঁটা হোক অথবা রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে অকপটে নিজের ভালোবাসার সাথিকে চুমু খাওয়া— এইসবরকম বিপ্লবী, সাহসী ভাষাকে ক্ষেদিয়েছে এই সমাজ, এই আন্দোলনগুলোতে সামিল থাকা প্রত্যেকটা মানুষকে ভিক্টিম ব্লেমিং-এর শিকার হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। এই সমস্ত ভাষাই বস্তুতঃ “নারীসুলভ”, এতে মাচিজমো নেই, আছে একটা স্যানিটারি ন্যাপকিন, একটা ব্রা, একটা চুমু। সালমান খান বা দেবের শিখিয়ে দেওয়া ম্যাস্কুলিনিটির কোন ছোঁওয়া এতে নেই। এই ছিটকে যাওয়া ক্যুইয়ার মানুষগুলো ‘প্রাতঃকৃত্য’-এর বীজ ছড়িয়েছিল অনেক আগে।
‘প্রাতঃকৃত্য’ শব্দের অর্থ বাঙালি পাঠককে আর আলাদা করে বলে দিতে হবে না, জানি। কিন্তু ‘প্রকৃত নারীর’ যে চিত্র টিভিতে, বলিউডে, টলিউডে দেখানো হয় তাতে সেই চরিত্রগুলো হাঁচি দেওয়া, বাতকর্ম করা, প্রাতঃকৃত্য করার মত স্বাস্থ্যকর কাজগুলো আদৌ করেন কিনা তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ থেকে যায়। এমনকি ভারতের আপামর জনতা তাতে বিশ্বাসই করেন না বলেই লেখকের ধারণা। যে কারণে ‘কুইন’ ছবিতে কোন এক দৃশ্যে একটা নারী চরিত্রের স্প্লিট সেকেন্ডের জন্য ঢেকুর তোলার কথা প্রবন্ধে উদ্ধৃত করতে হয় কনটেম্পোরারি ভারতীয় মেনস্ট্রিম চলচ্চিত্রে নারীবাদী ভাষার কিঞ্চিৎ ছোঁওয়া খুঁজতে গিয়ে।
‘কুইন’ তো বহুত দূর কি বাত! বলিউড ভারতের আমজান্তাকে এন্টারটেন করে মুন্নিকে বদনাম করে, আনারকলিকে ডিস্কোতে পাঠিয়ে, পিতলের তৈরি দুনিয়ায় সোনায় গড়া বেবি ডলের নেমে আসার স্বপ্ন দেখিয়ে। এমতাবস্থায়, এই মার্কেটে খেলতে নামলে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত নাচ জানতে হবে, গোবিন্দার মত পেলভিক থ্রাস্ট্‌ জানতে হবে, নয়তো পাবলিক কিনবে কেন? আমাদের ক্যাম্প চলাকালীন বাজেশিবপুর ক্লাবঘরে রাখা ইয়া বড় টিভিস্ক্রিনে তাই একবেলা করে আমরা নানারকম বলিউড গান ও নাচ দেখেছি দিনের পর দিন। শিখেওছি অনেক কিছু। শিখেছি যে আমাদের নাঙ্গানাচের সাথে টিভিতে দেখানো নাঙ্গানাচের পার্থক্য আছে বিস্তর, না শুধুমাত্র গেজের পার্থক্য নয়; স্কিলের পার্থক্য ও।
এর অর্থ হল মানুষ যে স্বভাবতই খাজা, মিডিওকর কাজ গ্রহণ করে তা নয়, যুৎসই অল্টারনেটিভের অভাবে এবং সেই অল্টারনেটিভের লভ্যতার অভাবে তাকে গ্রহণ করতে হয়, পুঁজিবাদ বাধ্য করে তাকে, পিতৃতন্ত্র বাধ্য করে, বাধ্য করে তার দীনতা, শ্রেণিবৈষম্য, তার জাত। মুলতঃ এই কারণেই থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তকের বাকি সবকটা প্রযোজনার মত ‘প্রাতঃকৃত্য’-এর ও টিকিটের কোন নির্ধারিত মূল্য নেই, আমজান্তাই ঠিক করবে তার মূল্য এবং এই মূল্য নির্ধারণের মধ্যে দিয়ে সে যোগদান করবে ‘প্রাতঃকৃত্য’-এর গোটা প্রসেসে, যে প্রসেসে সামিল প্রত্যেকটা মানুষ বিশ্বাস করে ন্যায় ও সাম্যে।
বলিউডের ‘রোটি-কাপড়া-মাকান-অউর মা’, টলিউডের ‘বৌ গেলে বৌ পাবি, মা গেলে মা পাবি না’, বিজেপি-সঙ্ঘ পরিবারের ‘ভারত মাতা কি জয়’ বা টি.এম.সি-র পরিচয় সঙ্কটজাত সোশ্যালিস্ট প্রোপাগান্ডার অন্তর্গত ‘মা মাটি মানুষ’ রেটরিক আদতে একই কথা বলে। এই সবকটা শক্তিই শুধু চেষ্টা করে কি করে নারীশরীরকে চালনা করবে, কখনও বেটি বাঁচিয়ে, কখনও বাপের সাথে সেলফি তুলিয়ে, বা সাইকেল বিকিয়ে, রাত দশটার পর উইমেন্স হস্টেলের দরজা আটকিয়ে, পাবে মহিলাদের পিটিয়ে, অথবা জিন্স পরতে, চাউমিন খেতে, ফোন ব্যবহার করতে বারণ করে। এই সিচ্যুয়েশানে, জুডিথ বাটলারের বিখ্যাত উক্তি “জেন্ডার ইজ পারফর্মেটিভ”-এর কথা মনে পড়ে যায়। তা জেন্ডার যদি পারফর্মেটিভই হয় তাহলে প্রিয়াও শতাক্ষিকে কোলে তুলে পাক খেতে পারে, শ্রীজিতাও প্রিয়াকে চুমু খেতে পারে, আর আরেকখানা আম্বেদকারের জন্য ওয়েট না করে, পারফর্মেন্সের শেষে শ্রুতি ছিঁড়ে ফেলতে পারে বামুনের পৈতে। মঞ্চে ‘পুরুষালি’ বা ‘মেয়েলি’ বাইনারির মৃত্যু হয়  নারীশরীরের অসীম ক্ষমতার প্রদর্শনীতে, ট্রান্সের মাধ্যমে আমরা কখনো ক্যুইয়ার, কখনো হিজড়ে, কখনো নারী, কখনো পুরুষ, কখনো অন্যকিছু, অন্যকেউ—কোন যোনি নির্ধারণ করে দেয় না আমাদের লিঙ্গ, সত্ত্বা। শরীরের ভাষা বেছে নেয় তার শব্দ।

স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের অ্যানার্কা ফেমিনিস্টরা যে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন তার ছবি আজও আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কুর্দি ফাইটারদের রাইফেলে, নিয়মগিরির দংরিয়া মহিলাদের হাতের লাঠিতে প্রতিফলিত হয়। ‘প্রাতঃকৃত্য’ পৃথিবী জুড়ে হেরে যাওয়া মানুষের স্বাধীনতার জন্য চালিয়ে যাওয়া এই সমস্ত রকম লড়াইয়ের পরিভাষাকে মান্যতা দিয়ে শব্দের ক্ষেত্রে নিস্তব্ধতাকে বেছে নেয়, অর্থহীন শ্লোক বেছে নেয় নাগরিক আচারের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে। যে আচারে আসলে সর্বদাই ভয় লুকিয়ে থাকে ছিট্‌কে পড়ার। প্রতিবাদের ভাষার কোন ডিজাইন হয় না। যেমন অসমিয়া লেখক তেমচুলা অ তার নভেলে একজন ধর্ষিতার কথা লিখেছেন, তাকে যখন মিলিট্যান্টরা ধর্ষণ করছে তখন সে হঠাৎ গান করতে শুরু করে—চূড়ান্ত ভায়লেন্সের মুখে করা যেকোনো শব্দ, নিস্তব্ধতা, অভিব্যক্তি প্রতিবাদী এবং ‘প্রাতঃকৃত্য’ সেই সমস্ত ভাষাকে জানায় লাল সেলাম।

* অনিন্দ্য সেনগুপ্ত বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক।


লেখাটি লিখেছেন দেবারতি সরকার।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to প্রতিবাদের ভাষা: নারী শরীর ও প্রাতঃকৃত্য

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s