জয় মা

১.

এবার কি তবে জাতীয়সঙ্গীতকে ব্যান করা হবে? কাম, কিক আউট রবীন্দ্রনাথ ফ্রম ক্যাম্পাসেস। ওই লোকটাই তো জাতীয়তাবাদ নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছে, বই লিখেছে। শুধু দেশে না, জাপানে, আমেরিকায় গিয়ে বলে এসেছে লম্বা চওড়া কথা। বলেছিল, তোমরা যাকে পেট্রিয়ট বল তেমন পেট্রিয়ট আমি নই। বলেছিল, জাতীয়তাবাদ একটা গুরুতর অসুখ। সেই ১৯০১ এ লিখেছিল লোকটা ‘নেশন কী?’ নামের একটা প্রবন্ধ। এখন গুগল করলেই পাওয়া যায় সে লেখা। কী সর্বনাশ। জাতীয়বাদকে মাতলামির সঙ্গে তুলনা করা লোকটার লেখা গানই আমরা গেয়ে এসেছি না জেনে এতকাল? লোকটা এতোবড় দেশদ্রোহী? ওর লেখা বইপত্র পড়ানো হয় বুঝি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে? সে জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে এতো বেয়াড়াপনার বাড়বাড়ন্ত। ওসব আর বরদাস্ত করা হবেনা। ওসব গুরুদেব টুরুদেব হঠাও। আমরা নতুন গুরুদেবের নাম প্রস্তাব করছি। গুরু গোলওয়ালকর।

গোলওয়ালকরের বই কেন পড়ানো হবে না সিলেবাসে? নেশন নিয়েই তো বই আছে ওনার। একেবারে গোড়া থেকে ধরতে হবে। সব ইউনিভার্সিটিতে বাধ্যতামূলক করা হোক গুরুর বই—আরে আগে তো সংজ্ঞাটা জেনে নিতে হবে, কাকে বলে নেশন, জেনে নিতে হবে আমরা কারা, ‘উই’ কাকে বলে, নেশন কী বস্ত, গুরুর বই-এর নাম একেবারে সময়োপযোগীঃ উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড। একেবারে খাপে খাপ।ওখানেই তো বলা আছে হিটলারি পদ্ধতি কতো ভালো, কীভাবে হিটলার সাফসুতরো করেছিলেন দেশটাকে। কীভাবে আমাদেরও দেশ সাফসুতরো করতে হবে, পার্জিং যাকে বলে আর কী। গুরুজির পথেই তো আমরা চলেছি। গুরুজি বলেছিলেন না, এদেশে হিন্দুরা মালিক, ইহুদি আর পার্শীরা অতিথি, খ্রিস্টান আর মুসলমান হল ডাকাত। তো বাড়িতে ডাকাত পড়লে কী করবেন আপনি? অ্যাঁ? কী করবেন? রবীন্দ্র কবিতা পড়বেন? আমি পড়ব না। লাঠি হাতে ডাকাত তাড়াবো। আর তাড়াবার সময় যদি এসব প্রশ্ন তোলেন যে এরা আদৌ ডাকাত কিনা সেটা ভেবে দেখেছ তাহলে মাথার ঠিক থাকবে না কিন্তু বলে দিলাম, তখন আপনাকেও ক্যালাবো। এতোকাল ধরে যা শিখে এসেছি তাকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেবেন, মাজাকি নাকি? ছোটোবেলায় রানাপ্রতাপের কথা ইতিহাস বই-এ পড়েন নি? সেই যে চৈতক ঘোড়ার পিঠে রাণা প্রতাপ ছুটছেন টগবগ টগবগ, কিংবা আফজল খাঁর সঙ্গে মোলাকাতের সময় শিবাজির বাঘনখের কথা মনে নেই? সেই যে জড়িয়ে ধরার ভান করে একেবারে বুকে…আচ্ছা বাঘনখ কোথাও কিনতে পাওয়া যায় না এখন?

দেখেছেন কথা কেমন ঘুরিয়ে দিলেন আপনি, কী বলছিলাম আর কোথায় নিয়ে চলে এলেন। আমি জাতীয়সঙ্গীত নিয়ে কথা বলছিলাম। একটা দেশদ্রোহীর লেখা গান কেন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হবে? জাতীয়তাবাদকে যে রোগের সঙ্গে তুলনা করেছে তাকে নিয়ে মাতামাতি কেন? রবীন্দ্রনাথের নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট চাই। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূর হটো। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কী পড়ানো হবে তা আমরাই ঠিক করে দেব। ট্যাক্সপেয়াররা কি হিন্দু নয়? হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত লাগে এমন লেখা বরদাস্ত করব না। আরে মনে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ তো আসলে হিন্দু ছিলই না। কে একবার বলেছিল বটে ওরা আগে নাকি ব্রাহ্মণ ছিল, পরে বের করে দেওয়া হয়। তারপর তো ওরা হিন্দুধর্ম মানেই নি আর। বেহ্মগিরি করত তারপর। এবার বুঝেছি। ঠিক আছে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমাদের এক হিন্দু কবি চাই। হিন্দুর লেখা গান চাই। পাকিস্তানের জাতীয়সঙ্গীত কার লেখা? মুসলমানের নয়? ওরা কি কোনো অমুসলমানের লেখা গানকে জাতীয়সঙ্গীত বানিয়েছে?

যাদবপুরে নাকি রবীন্দ্রনাথের পারস্য ভ্রমণ নিয়ে লেখা একটা বই পড়ানো হয়। ওখানে লোকটা গীতা নিয়েও আজেবাজে কথা বলেছিল। ইরান-ইরাক নিয়ে প্রশংসা আছে খুব ঐ বইতে, আমাকে বলেছে একজন। সে নাহয় হল, ইরানের পুরনো লোকগুলো তো আর্যই ছিল। পার্শিদের তাই আমরা অতিথি বলি। কিন্তু মুসলমান আরবদের সঙ্গে মাখামাখি করে সব গেল। যেখানে মুসলমান সেখানেই সব ছারখার। আরবরা পারস্য দখল নেবার পর সব ঘেঁটে গেছে। মুসলমান হবার পর পারস্যে বদরক্ত ঢুকে গেছিল তো। সেই পারস্যের প্রশংসা করে কী করে রবীন্দ্রনাথ? গীতার তত্ত্ব নাকি উড়োজাহাজের মতো…ঘাতককে সে তত্ত্ব অনেক দূরে টেনে নিয়ে যায়, যাতে বধ্য ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো মায়া দয়া তার মনকে আচ্ছন্ন না করতে পারে। অর্জুনকে ভগবান কৃষ্ণ নাকি এই রকম উপদেশই দিয়েছিলেন। তার মানে আমাদের গীতা হত্যাকারীকে কৌশল শেখায়? এতো বড় কথা? আমাদের ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে এমন কথা যে বলে তাকে ছেড়ে দেব? মরে গেছে তো কী হয়েছে? সাত খুন মাফ? গীতার অপমান করবে একজন অহিন্দু? ওর জীবনের শেষ গল্পটার নাম জানো? মুসলমানীর গল্প। পুরো লিখতে পারে নি। তার আগেই অক্কা। ওটা একটা ‘খসড়া’ আকারে আছে। সেখানেও মুসলমানদের মহান দেখাবার চেষ্টা করেছে শয়তানটা। তার লেখা গান গাইতে হবে ১৫ আগস্ট? কভভি নেহি। বন্দেমাতরমটাকে জাতীয়সঙ্গীত না করার পিছনেও লোকটার হাত ছিল। বন্দে মাতরম-এ নাকি মুসলমানদের আপত্তি থাকতে পারে, মুসলমানরা বলার আগেই ও বলেছিল। কেন রে ভাই? দেশকে মা মনে করায় অসুবিধে কী আছে? মুসলমানরা নাকি আল্লা ছাড়া কাউকে ‘বন্দে’ বলতে পারবে না। বাস, হয়ে গেল। বন্দে মাতরম বাদ। থাকবি এদেশে, আর বন্দনার বেলায় আপত্তি দেখাবি—ভালো মজা তো? আপত্তি থাকে তো যা না চলে পাকিস্তান কিংবা অন্য কোনো চুলোয়। মুসলমানদের জন্য ওর এতো দরদ ছিল বলেই তো বাংলাদেশ ওর গানকে জাতীয় সঙ্গীত করেছে। বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানে ছিল তখন কী হয়েছিল মনে আছে তো? দিয়েছিল ঠুঁসে। রবীন্দ্রনাথ সব জায়গা থেকে বাদ, গান, আবৃত্তি, জন্ম দিবস সব ব্যান। ভালো করেছিল। আমাদেরও তাই করতে হবে। তারপর বন্দে মাতরম। আহহ্‌ কী সুন্দর গান। শুনলেই মনে হয় মন্ত্র পড়ছি। গায়ে কাঁটা দেয়। ভারতে থাকবি আর এটুকু মন্ত্র পড়বি না? নিজের গানটাকে চালাবার তালে ছিল বোধহয়, তাই বন্দেমাতরমের খুঁত ধরেছিল রবীন্দ্রনাথ।

তোগাড়িয়া সাব বলেছেন সব সমস্যার মূলে আছে আন্ডারওয়ার। ইউরোপীয়রা আমাদের আন্ডারওয়ার পরা শিখিয়ে দুর্বল করে দিয়েছে। আমাদের দেশের ছেলেদের জন্ম দেবার ক্ষমতা কমে গেছে তার ফলে। বলেছেন এখন থেকে ল্যাঙট পরা ধরতে হবে। ল্যাঙটে জন্মদানের ক্ষমতা বাড়ে। আমরা এখন থেকে ল্যাঙট সংস্কৃতি চালু করার চেষ্টা করব। আর মোহনজি জানিয়েছেন আমাদের পতাকার রঙ বদলে দেওয়া উচিত। সাধু সন্নিসীদের দেশ। আমাদের পতাকায় থাকবে খালি গেরুয়া, রঙ দে মোহে গেরুয়া নয়, এ অন্য গেরুয়া। ফলে আমাদের এখন অনেক কাজ। পতাকা বদল করতে হবে, ল্যাঙট পরতে হবে, অনেক সন্তানের জন্ম দিতে হবে, তাদের কয়েকজনকে সেনাবাহিনীতে পাঠাতে হবে, সেনাবাহিনীকে কাশ্মিরে বরফ দেখাতে হবে। কিন্তু সেসবের আগে বদলে ফেলতে হবে জাতীয় সংগীত। প্রথম লাইনেই নাকি জন গণ। গণ শুনলেই কেমন গণহত্যা আর গণ ধর্ষণ মনে আসে। ওটা আবার গান? ফুঃ। চলো বন্দে মাতরম বলে বেরিয়ে পড়ি।

২.

কতোদিকে আমার মা ছড়িয়ে আছেন। কতো উপ-মায় মায়ের চিহ্ন। দেশই বা শুধু কেন? মৃত্তিকাকে কি মা বলেননি আমার পূর্বপুরুষ ও নারীগণ? কিংবা গোটা বিশ্বকে? ভাবেননি ধরণী শব্দের আদলে মায়ের ভূমিকার কথা? তবে কেন শুধু ভারতমাতার কথাই কেবল সোচ্চারে বলতে হবে? বলতে হবে ভারতমাতার জয়? বিশ্ব-মায়ের আর ভারত-মায়ের কোনো সংঘাত কি তবে অবশ্যম্ভাবী? এসব ধারণায় মা-তো কেবল মেটাফর। মায়ের উপ-মাটুকু ছেড়ে যদি বলি ভারতের জয়, চলবে না? উপমায় আপত্তি নেই, আপত্তি জবরদস্তিতে। কেউ কেউ বলছেন আচ্ছা বেশ, মায়ের জায়গায় আম্মি লাগিয়ে নাও, যেন আম্মি বেশ ‘মুসলমান’ আর মা-টি হল ‘হিন্দু’। মুসলমান মৌলবাদীদের মতলব আলাদা, তাঁদের গা-জোয়ারির কারণও বোঝা শক্ত নয়। তাঁদের চেল্লামেল্লি আমাদের নাপসন্দ এবং আপত্তিকর। কিন্তু মূল সমস্যাটির এই মাতা-আম্মি সরলীকরণটিও হাস্যকর খুব। যাঁরা বলছেন তাঁরা যেন জানেন না ভারতের চাইতে ভারতমাতার বয়স কম। ভারত-মাতা ঘটনাচক্রে ভারতের পরে, এই সেদিন, একশ বছরের কিছু আগে জন্মেছেন। আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর। আসল প্রশ্নটি শব্দ বা ধর্মীয় সংস্কারের নয় কেবল, সমস্যাটি মেটাফরের আধিপত্যের। সে মেটাফর যখন হাঁ-মুখ নিয়ে তেড়ে আসে তখন তার সৌন্দর্যের দিকে আর তাকাবার অবসর থাকে কোথায়?

মাতৃভূমি কোনটা হবে সেটা একটা অ্যাকসিডেন্ট। ঘটনাচক্রে অন্যদেশে বেড়াতে গিয়ে আমার জন্ম যদি দেন আমার মা তাহলে কি সেইটে আমার মাতৃভূমি হবে? তবে কি সেই বিদেশ আমার স্বদেশ? খুব গোলমেলে ব্যাপার। আর স্বধর্ম তো সম্পূর্ণই চাপানো। আমার জন্মের আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আমার খোলস। কিন্তু মাতৃভাষার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। হ্যাঁ এক্ষেত্রেও আমার কোনো মতামত নেওয়া হয়নি, এক্ষেত্রেও অ্যাকসিডেন্টালিই আমার ভাষাটা আমার ভাষা হয়েছে। কিন্তু সেই অ্যাকসিডেনটটিতে আমার খানিক ভূমিকা আছে, খানিক নয়, মুখ্য। মাতৃভাষাই আমার প্রথম শিক্ষা, আমার প্রথম অনুকৃতি। মাতৃভাষার মাধ্যমেই আমি যুক্ত হই, বিষয় ও বিষয়ী হই। মাতৃভাষা শিখতে শিখতে আমি শিখতে শিখি। মাতৃভাষার মাধ্যমেই আমি হই, হয়ে উঠতে থাকি। বা বলা ভালো যে ভাষা আমাকে ‘আমি’ বানায়, সেটাকেই বলি মাতৃভাষা। মায়ের ভাষা বলে নয়, মায়ের ভাষা অন্য কিছুও হতে পারে, যে ভাষা আমার জননী, যে ভাষা ‘আমি’র জননী তাইই আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মায়ের ভাষা নয়, মাতৃভাষার ব্যাসবাক্য, আমার প্রস্তাবে, মা যে ভাষা। যে ভাষা আমার চৈতন্যের নির্মাতা তাকেই বলি মাতৃভাষা। আসুন বরং বলা যাক, মাতৃভাষার জয় হোক।

আচ্ছা, হঠাৎ এতো ‘জয় হোক’-এর দরকারই বা পড়ছে কেন? ভালোবাসা জানাবার জন্য কি এখন জয়ধ্বনি দিতে হয়? কোথাও কি তবে হেরে যাচ্ছি আমরা আর ভেতরে ভেতরে সেই হারের সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলে চলেছি, ‘আমরা কোথাও হার মানিনি’, আমরা কোথাও হার মানি না? আর সেকারণেই বাইরে চিৎকার করে বলতে হচ্ছে, জয় হোক? কে জানে…


লেখাটি লিখেছেন  র।জয় মা

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s