“When the keys are found, the walls will crumble into pathways”

জন নাট্য মঞ্চ, সংক্ষেপে JANAM। প্রতিষ্ঠা ১৯৭৩। প্রথম পথনাটিকা ‘মেশিন’ ১৯৭৮-এ। আরো কিছু নাটক তাঁরা করেন- ‘হাল্লা বোল’, ‘অউরত’, ‘ইয়েহ দিল মাঙগে মোর গুরুজি’ ইত্যাদি। নারীর অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, শ্রমিক আন্দোলন, জাত-ধর্ম-বর্ণ বৈষম্য ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই দলের নাটকগুলির কেন্দ্রবিন্দু। সুধন্বা দেশপান্ডে এই দলের সদস্য। ২০১৫ সালে তিনি দলের পক্ষ থেকে প্যালেস্তাইন যান। সেই বছরের শেষ থেকে এই বছরের প্রথম মাস অব্দি JANAM এবং প্যালেস্তাইনের The Freedom Theatre-এর মিলিত উদ্যোগে সারা ভারত ঘুরে একটি নাটকের অভিনয় করছে দুই দল। নাটকের নাম ‘হামেশা সামিদা’। পরিচালনা করেছেন দেশপান্ডে এবং প্যালেস্তাইনের দলের ফয়জ্‌ল আবু আলহাইজা। সেই সূত্রেই তাঁদের কলকাতায় আসা ২১শে জানুয়ারি।  সেই সুযোগে সুধন্বা দেশপান্ডের সাথে কথা বলেছে কোরাস…  ইংরেজি থেকে বাংলা  অনুবাদের দায়িত্ব আমাদের। 

JANAM আর The Freedom Theatre-এর একসাথে কাজ করা শুরু হল কিভাবে?

আমরা Arna’s Children নামের একটি তথ্যচিত্র দেখেছিলাম, জুলিয়ানো মের-খামেস পরিচালিত। ছবিটি তার মা আর্নাকে নিয়ে যিনি জেনিন রিফিউজি ক্যাম্পে ‘স্টোন থিয়েটার’ নামের একটা নাটকের দল নিয়ে কাজ করতেন। সেই তথ্যচিত্র থেকে প্রথম এদের কথা জানতে পারি। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা’র সময়ে ইসরায়েলের সৈন্যবাহিনী স্টোন থিয়েটার ধ্বংস করে দেয়। যে বাচ্চারা এই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা অনেকে মারা যায়, অনেকে মিলিট্যান্ট হয়ে যায়। আর্না ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান- এভাবেই ছবিটা শেষ হয়। ছবিটা আমাদের যেমন গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল, তেমনই অনুপ্রাণিত করেছিল খুব। ধ্বংসের সামনে দাঁড়িয়েও কিভাবে থিয়েটার করা যায়, এই তথ্যচিত্র তার সাক্ষী। কিছু বছর পর, আমাদের এক বন্ধু জেনিনে গিয়ে একটি থিয়েটার দেখেন। তাঁর কথা শুনে আমরা আরও খোঁজ-খবর করি। জানতে পারি জুলিয়ানো আরো দু’জনের সঙ্গে মিলে ওখানে ফ্রিডম থিয়েটার তৈরি করেছে। আমরা জুলিয়ানো-কে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তার উত্তর দেওয়ার সুযোগ জুলিয়ানো বোধহয় পায়নি। তার আগেই তাকে খুন করা হয়। ঠিক একই ভাবে জন নাট্য মঞ্চ হারিয়েছিল সফ্‌দর হাসমি-কে। সেই হারানোর ব্যথা দুটো দলই জানত। দল, রাজনীতি, আমাদের সৃষ্টিশীলতা- এই সবকিছু’র পথে সফ্‌দরের মৃত্যু একটা বিরাট ধাক্কা। তাই, জুলিয়ানো’র মৃত্যুর খবর পেয়ে আমাদের মনে হয়েছিল যেন আমরাও খুব কাছের একজনকে হারিয়েছি। এর পরের ঘটনাগুলোকে একটা series of chances বলা যেতে পারে। আমাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়, একে অন্যের কাজের কথা শুনি, ইউটিয়ুবে পরস্পরের কাজ দেখি। এক বছরের মধ্যে আমাদের যোগাযোগ অনেকটাই বেড়ে যায়। গত জানুয়ারিতে ওদের কয়েকজন এখানে আসে, এপ্রিলে আমি প্যালেস্তাইন যাই, অগাস্টে ওরা আবার আসে। এভাবেই পথচলা শুরু।

প্যালেস্তাইনে গিয়ে ভারতবর্ষের সঙ্গে ওখানকার কোনো মিল খুঁজে পেয়েছিলেন?

আসলে এটা বলা মুশকিল। পৃথিবীতে প্যালেস্তাইনের মত আর কোনো দেশ বোধহয় নেই। অক্যুপেশনের ফলে ওখানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা ভারতবর্ষে বসে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। আমি বলছি না যে এই দেশে কোনো সমস্যা নেই, এই দেশ স্বর্গরাজ্য। এখানেও কাশ্মীর বা নর্থ-ইস্টে গেলে আর্মি’র উপস্থিতি প্রায় সবসময় টের পাওয়া যায়। কিন্তু তাও, প্যালেস্তাইনে ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম। আবার প্যালেস্তাইনের মধ্যেও একেক জায়গায় পরিস্থিতি একেকরকম। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের বড় একটা অংশ, জেরুসালেম, গাজা- প্রতিটি জায়াগা’র অবস্থা আলাদা। গাজাতে অবশ্য আমরা যাওয়ার অনুমতিই পাব না। তাই মিল কোথায় এটা বলা শক্ত। তবু কিছু জায়গায় খুব মিল- যেমন দু’দেশের মানুষের আতিথেয়তা, প্রতিকূলতার মুখে তাদের দৃঢ় ভাবে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, প্রতিদিনের জীবন-যুদ্ধে হার না মানা মানুষের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা।

এই সময়ে, যখন ভারত-ইসরায়েল অর্থনৈতিক জোট আরো পোক্ত হচ্ছে, তখন JANAM আর দ্য ফ্রিডম থিয়েটার একসাথে কাজ করছে। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

দেখো, স্বাধীনতা আন্দোলনের পর আমাদের যে পথে এগোনোর কথা ছিল, বর্তমান সরকার দুর্ভাগ্যবশত ঠিক তার উল্টো পথে চলছে। রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, নেহরু থেকে কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধী পর্যন্ত সবাই প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছেন। যেহেতু ভারতবর্ষ নিজে একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশ, এই সমর্থন তো স্বাভাবিক। কিন্তু নয়া-উদার অর্থনীতির যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে; ফলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যারা বন্ধু দেশ, তাদের সঙ্গেও ভারতের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। বিদেশ-নীতি কিছুটা রদবদল করে তাই ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরো মজবুত হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে রাষ্ট্রপতি এবং বিদেশ মন্ত্রী ইসরায়েল গেছেন। এই প্রথম ভারতবর্ষের কোনো রাষ্ট্রপতি ইসরায়েল গেলেন। শোনা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীও নাকি যাবেন। এসব তো গেল সরকারের কথা। কিন্তু এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, সাধারণ মানুষ কী ভাবছেন। আমার মনে হয় ভারতের অনেক মানুষ প্যালেস্তাইনের আন্দোলনের সমর্থক। কারণ প্যালেস্তাইনের লড়াই ন্যায্য লড়াই, শান্তির জন্য লড়াই, সাম্যের জন্য লড়াই। প্যালেস্তাইনের মানুষ যে যুদ্ধবাজ, হিংস্র তা তো নয়। তাদের লড়াই হিংস্র শাসকের বিরুদ্ধে। আর আমার মনে হয়, শুধু ভারতবর্ষ কেন, পৃথিবীর সব জায়গার সমস্ত স্বাধীনতা-প্রেমী, গণতান্ত্রিক মানুষেরই উচিৎ এই লড়াই সমর্থন করা। হামাস, ফাতে, PFLP, DFLP ইত্যাদি বামপন্থী সংগঠন, একটি কম্যুনিস্ট পার্টি, NGO, সিভিল সোসাইটি’র নানা দল- এই সব থাকা সত্তেও প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা সংগ্রাম আসলে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, আমাদের সেটা বুঝতে হবে। এটি একটি অ-সাম্প্রদায়িক, সেক্যুলার সংগ্রাম। আর এখানেই ভারত আর প্যালেস্তাইনের মিল। এখান থেকেই আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, বিশেষত এই সময়ে যখন সমাজে ডানপন্থী শক্তিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, সমাজকে জাত, বর্ণ, ভাষা, ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই আমরাই যে শুধু প্যালেস্তাইনের সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানাবো, তাই নয়, উল্টোটাও দরকার। কারণ ওদের থেকেই আমাদের শিখতে হবে। আমার মনে হয় যে যার মধ্যে কিছুটা মনুষ্যত্ব আছে, সে প্যালেস্তাইনের সংগ্রামের সমর্থক হবেই।

JANAM আর দ্য ফ্রিডম থিয়েটার-এর এক সঙ্গে কাজ করার ভবিষ্যৎ কোনো পরিকল্পনা…?

ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবছি না। এই মুহূর্তে আমরা এই ঐতিহাসিক কোল্যাবরেশনের শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে আমরা ৯টা রাজ্যে নাটক করেছি। ভারতবর্ষের মধ্যে সব মিলিয়ে ১১টা শহরে ৩০টারও বেশী শো করা হয়ে যাবে আমাদের। হাজার হাজার মানুষ যাঁরা নাটক দেখতে এসেছেন, তাঁদের ছাড়া মিডিয়ার মারফত আমরা আরো অনেকের কাছে পৌঁছতে পেরেছি। দুটো আলাদা ভাষার ব্যবধান অতিক্রম করা তো সহজ কাজ নয়। যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁদের অনেকেই একটি সম্পূর্ণ অন্য ভাষায় কথা বলেন। এঁরা সবাই ফ্রিডম থিয়েটারের ছাত্র, বয়স কম, ভীষণ এনার্জেটিক, খুব সৃজনশীল, আশাবাদী। আর এটাই আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ফয়জ্‌ল আর আমি একসাথে নাটকটা পরিচালনা করেছি। এটা বলা যতটা সোজা, করা ততটা নয়। একসাথে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। কিন্তু ভাষার পার্থক্য, অভিজ্ঞতা না থাকা- কাজ করতে গিয়ে কখনো এগুলো সমস্যা হয়ে ওঠেনি। কাজ করতে করতে আমাদের মধ্যে একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। ফয়জ্‌লের সাথে, ভারত অ প্যালেস্তাইনের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে হিন্দি আর আর্‌বি এই দুই ভাষা নিয়ে একটা নাটক গড়ে তোলার অনুভূতি ঠিক কিরকম তা বলে বোঝাতে পারব না। সে এক অদ্ভুত ভালো লাগা।

এটা কি নাটকে কোনো নতুন ধারা বলে আপনার মনে হয়?

আমার তা মনে হয় না। আমরা চেষ্টা করেছি যেন নাটকটা খোলা জায়গায় করা যায়। আজকের নাটকটা যদিও হলের মধ্যে হবে, কিন্তু নাটকটা যখন আমরা বাঁধছিলাম, তখন খোলা জায়গাতে করার পরিকল্পনা নিয়ে বাঁধা হয়েছিল। ২৫ মিনিটের নাটক। ছোট হওয়ার দৌলতে যেকোনো পরিস্থিতিতেই দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে। দুটো ভাষা ব্যবহার করা প্রসেনিয়ামে আকছার ঘটলেও, পথ-নাটকের ক্ষেত্রে এই উদাহরণ খুব একটা দেখা যায় না। ভারতীয় দর্শক যে ভাবে আর্‌বির মত একটা অপরিচিত ভাষাকে নিজের ভাষার মত সম্মান আর ভালোবাসা দিয়েছে তাতে আমি খুব খুশি।

নাটক করার সময় কোনোরকম বাধা পেয়েছেন? কোথাও থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে?

বলবার মত তেমন কিছু ঘটেনি…


প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানাতে এবং ভারত-প্যালেস্তাইনের বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় করতে এপ্রিল মাসে প্যালেস্তাইন যাবে JANAM। আবার একসাথে নাটক করবে।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s