“আমাদের স্কুলে কোনো জানলা ছিল না…”

ওসামা আল আজেহ্‌ জেনিনে’র দ্য ফ্রিডম থিয়েটারের ছাত্র। গত কয়েক মাস ধরে সে ও তার সহপাঠীরা সারা ভারত ঘুরে নাটক করেছে JANAM আর ফ্রিডম থিয়েটারের মিলিত উদ্যোগ ফ্রিডম জাঠার অংশ হিসেবে। কলকাতায় তাদের প্রথম শো ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শো-এর আগে কোরাসের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে ওসামা। ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের দায়িত্ব আমাদের।

ফ্রিডম থিয়েটার নিয়ে…

“ফ্রিডম থিয়েটার হল জেনিনে’র রিফিউজি ক্যাম্পের একটা থিয়েটার। প্যালেস্তাইনে যে অল্প কয়েকটা থিয়েটার আছে, এটা তার মধ্যে একটা, আর সবথেকে ভালোগুলোর মধ্যে একটা। ফ্রিডম থিয়েটারে নাটক শেখার স্কুল আছে যেখানে তিন বছর নাটক শেখা যায়, আমি সেই স্কুলের ছাত্র।”

ফ্রিডম থিয়েটারের কাজ…

“আমরা নানা রকম কাজ করি, নানা ফর্মে। আমরা মানুষের থেকে তাদের গল্প সংগ্রহ করি, তারপর সেই গল্প নিয়ে একটা নাটক তৈরি করি, আর প্যালেস্তাইনে আর অন্য জায়গাতেও সেটা মঞ্চস্থ করি। ভারতবর্ষে আমরা একটা পথনাটক করছি। পথনাটক করার অভিজ্ঞতা আমাদের এই প্রথম। এখানে কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম যে ভারতবর্ষের রাস্তার মত একই সাথে অদ্ভুত আর সুন্দর জায়গা বোধহয় পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।”

ভারতবর্ষে ঘোরার অভিজ্ঞতা…

“এটা আমার জীবনের সব থেকে লম্বা ট্যুর, সবথেকে লম্বা জার্নি। এখানে আসার পর আমরা প্রথম দিল্লি থেকে কাজ শুরু করি। খুবই অদ্ভুত ছিল শুরুর দিকে- নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি- আর এসবের মধ্যে আমরা চেষ্টা করছিলাম আমাদের গল্প বলার। প্রায় দেড় মাস ধরে আমরা নাটকটা তৈরি করি- আমরা চাইছিলাম যাতে খুব সহজ ভাবে প্যালেস্তাইনের গল্প মানুষকে বলা যায়। আমরা চাই এখানকার মানুষকে প্যালেস্তাইনের অবস্থার কথা জানাতে- ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে-প্যালেস্তাইনের পরিস্থিতির একটা আংশিক ছবি যাতে ফুটে ওঠে- আমাদের লড়াইয়ের ছবি…”

প্যালেস্তাইনের বর্তমান পরিস্থিতি…

“এই নাটকে আমরা নিজেদের দেখানোর চেষ্টা করেছি। আমরা নানারকম জিনিস ব্যবহার করেছি যা একান্ত ভাবে প্যালেস্তাইনের, আর বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আমাদের কাছে এই জিনিসগুলোর কি মানে। যেমন চাবি, বা কেফিয়ে (মাথায় বাঁধার কাপড়), সন্দুখ (সিন্দুক)- এই ছোট ছোট জিনিসগুলো থেকে একটা ধারণা তৈরি হয় যে প্যালেস্তাইনের ঘরে ঘরে কী থাকে, কিভাবে আমরা লড়াই করি, আমাদের জীবনে এই জিনিসগুলোর ভূমিকা কি। এই প্রথম আমরা একটা পথ নাটক করছি, আর আমরা চাই এই নাটকের মধ্যে দিয়ে সবাইকে প্যালেস্তাইনের পরিস্থিতি বোঝাতে, সবার কাছে প্যালেস্তাইনের কথা পৌঁছে দিতে।”

প্যালেস্তাইনে কাজ করা…

“গত ৬৮ বছর ধরে প্যালেস্তাইন পরাধীন। এখানে মিলিটারি রাজ চলছে। প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক মুহূর্তে আমরা আক্রান্ত হতে থাকি। সারা দেশ জুড়ে ৬০০’র বেশী চেকপয়েন্ট। অনেক রিফিউজি আছেন প্যালেস্তাইনে, আমিও তাঁদের মধ্যে একজন। অনেক বাচ্চা আছে। ফ্রিডম থিয়েটারে আমরা চাই যে তৃতীয় ইন্তিফাদা আসুক। কিন্তু সেটা যেন হয় একটা সাংস্কৃতিক ইন্তিফাদা। আমরা কাজের মধ্যে দিয়ে চেষ্টা করি সচেতনতা তৈরি করতে, মনকে উন্মুক্ত করতে। অক্যুপেশন তো শুধু বন্দুক আর ট্যাঙ্ক দিয়ে হয় না, আমাদের মাথার মধ্যেও এক ধরণের অক্যুপেশন কাজ করে। ফ্রিডম থিয়েটারের ছাত্র হিসেবে আমরা এই মগজ ধোলাইকে রুখে দেওয়ার কাজ করি। আর অন্যদেরও রুখে দাঁড়াতে সাহায্য করি।”

কাজ করার চ্যালেঞ্জ…

“প্যালেস্তাইন একেবারেই ভারতবর্ষের মত নয়। এখানে তুমি একটা ট্রেনে চেপে বসলে, ২৯ ঘন্টা, ২৫ ঘন্টা…বা গাড়িতে উঠে কোথাও একটা চলে গেলে…চলাফেরার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা…প্যালেস্তাইনে সেটা একেবারেই নেই। যেমন, আমি জেনিন ক্যাম্পে লেখাপড়া করি, থাকি বেথেলহেমে। এক ঘন্টার রাস্তা, কিন্তু লেগে যায়ে তিন ঘন্টা, চেকপয়েন্ট পেরোতে হলে আট ঘন্টাও লেগে যেতে পারে। তাই আমি জেনিনে গেলে এক মাস ওখানেই থেকে যাই। কারণ গিয়েই যদি ফিরে আসতে হয়, সেই দিনের অভিজ্ঞতা খুব ভয়ানক হবে। ওরা সব চেকপয়েন্টে দাঁড় করাবে, অপদস্থ করবে, কারণ আমি প্যালেস্তিনিয়ান। শুধু আমার কথা নয়, গোটা প্যালেস্তাইনের ছবিটাই এরকম। সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে। সব গ্রাম বসতি বা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। আমি থাকি দেওয়ালের পাশে। আমি আগে যে স্কুলে পড়তাম, আমার সেই স্কুলে কোনো জানলা ছিল না। কারণ ওরা স্কুলের দিকে গ্যাস বোমা ছুঁড়ত, বন্দুক চালাত, যাতে স্কুলটা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা মনে করি এই অক্যুপেশনের মোকাবিলা করার জন্য শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর অক্যুপেশনের বিরোধিতা করার একটা অস্ত্রও বটে।”

ছেলে-মেয়েরা একসাথে নাটক করে…

“ছেলে মেয়েদের একসাথে কাজ করা নিয়ে কোনো অসুবিধে হবে কি না সেটা জায়গার ওপর নির্ভর করে। কিছু শহর রক্ষণশীল হয়, কিছু শহর হয় না। সাধারণত এটা নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। অক্যুপেশনের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে তো মেয়েরাও লড়ছে। সেই সঙ্গে তারা নিজেদের অধিকারের জন্যও লড়াই করছে। প্যালেস্তিনিয়ান পরিবারে মা আর বোনের জায়গা খুব উঁচুতে, আর এই লড়াইয়ে তাদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

JANAM-এর সাথে কাজ শুরু…

(হেসে) “আমি তো ছাত্র, তাই আমি সবটা জানি না…কিন্তু আমি বলতে পারি যে এই কোল্যাবরেশনটা একটা দুর্দান্ত ব্যাপার। দুটো দল, ঘটনাচক্রে যাদের ইতিহাস খানিকটা একরকম- তারা একে অন্যকে চিনল, কোনো ফান্ডিং ছাড়া, অন্য কোনো অর্গানাইজেশন বা প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়া, নিজেরাই এত বড় মাপের একটা কাজ করল। আসলে দুটো দলেরই মনে হয়েছিল যে মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে তারা একসাথে কাজ করতে পারবে, অন্য কারুর সাহায্য ছাড়াই।”

ভবিষ্যতে আবার…

“নিশ্চয়ই। আমার তো মনে হয় এটা সবে শুরু। এর মাধ্যমে ভারত আর প্যালেস্তাইনের শিল্পীদের পরিচয় হল। আমি আশা করি এটা আরো এগিয়ে যাবে, আর বড় চেহারা নেবে। কারণ আমাদের লড়াইটা তো এক।”

ভারতবর্ষ নিয়ে…

“খুবই কঠিন প্রশ্ন…আসলে প্রত্যেকটা শহর আলাদা, আর খুব দূরে দূরে। আমার মনে হয় ভারতবর্ষ নিজেকে তৈরি করছে এখনো…এই দেশটা পৃথিবীর ভালো দেশগুলোর মধ্যে একটা হয়ে উঠতে পারবে বলে আমার মনে হয়।  ভারতবর্ষে অনেক বড় বড় শহর আছে, অনেক লোক থাকে। এই শহরগুলো কিন্তু সেই মানুষদের জন্যেই হওয়া উচিৎ, কোম্পানিদের জন্য নয়। আমরা ভারতবর্ষের জন্য এটাই চাই- যে সে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। কারণ শহরে যখন দেখি যে মানুষ রাস্তায় শুয়ে আছে তখন কষ্ট হয়…সব সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়…ভারতবর্ষের উচিৎ তার সমস্যাগুলোর সমাধান করা। ভারতবর্ষ কিন্তু বৈচিত্রের অসাধারণ উদাহরণ। দেশটা যত ভালো, দেশের মানুষও ততটাই। আমরা প্রায় তিন মাস হল এখানে আছি, আর আমাদের মনে হচ্ছে যেন বাড়িতে আছি। সেটাই আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ- তোমাদের সঙ্গে থেকে মনে হয়েছে আমরা নিজেদের লোকের সঙ্গেই আছি।”

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

2 Responses to “আমাদের স্কুলে কোনো জানলা ছিল না…”

  1. বলেছেন:

    ধন্যবাদ এই অসাধারন সাক্ষাৎকার টি পড়তে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য

    Like

    • Chorus বলেছেন:

      এরকম সাক্ষাৎকার সবার সামনে তুলে ধরা উচিৎ৷ আমরা সেটাই করতে চেয়ছি৷ ভালো লাগলে আরো অনেকের কাছে সাক্ষাৎকারটি পৌঁছে দিতে সাহায্য করুন৷ ধন্যবাদ৷

      Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s