সিনেমা না সত্যাগ্রহ?

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে Golden Bear প্রাপ্ত এবং এবারের (২০১৫) কলকাতা সংস্করণের বিশেষ আকর্ষণ ‘ট্যাক্সি’ -র সবথেকে বড় কৃতিত্ব বোধহয় তার অস্তিত্ব। কারণ ইরানের Islamic Revolutionary Court ২০১০ সাল থেকে ছবি’র পরিচালক জাফার পানাহি’র ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যার মেয়াদ কুড়ি বছর। এই কুড়ি বছরে তিনি পরিচালনা করতে পারবেন না। চিত্রনাট্য লিখতে পারবেন না। সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন না। দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এই একই আদালত পানাহিকে ছ’বছরের হাজতবাসের সাজা দিয়েছিল এই অভিযোগে- “Assembly and colluding with the intention to commit crimes against the country’s national security and propaganda against the Islamic Republic.”

নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে পানাহি অবশ্য তিনটি ছবি পরিচালনা করেছেন, এবং প্রতিটি ছবিকেই পাচার করা হয়েছে ইরানের বাইরে, দেখানো হয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র উৎসবে। ২০১১ সালে, নিজের ফ্ল্যাটে তাঁর গৃহবন্দী জীবনের ছবি পানাহি তুলে ধরেন একটা আই ফোন আর ডিজিটাল ক্যামকর্ডারের সাহায্যে, ‘This is not a Film’ নামক ছবিতে। ২০১৩ সালে পরের ছবি ‘পর্দে’ বা ‘Closed Curtain’ এর শ্যুটিং হয়েছিল পানাহি’র ক্যাস্পিয়ান সাগরের ধারের বাড়িতে; ছবির এক প্রধান চরিত্র (সহ-পরিচালক কাম্বুজিয়া পার্‌তোভি অভিনীত) ক্রমাগত ঘরের সব পর্দা টেনে দিতে বলে শাসকের নজরদারি এড়ানোর জন্য।

‘ট্যাক্সি’ অবশ্য খোলা জায়গায়, তেহরানের রাস্তায় শ্যুট করা হয়েছে। তাঁর ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে ব্যঙ্গ করে পানাহি নিজেকে দিয়েছেন, পরিচালক নয়, ট্যাক্সি-চালকের ভূমিকা। ট্যাক্সির সামনের দিকে একটা ক্যামেরা লাগানো আছে। এতেই রেকর্ড হতে থাকে আরোহীদের পারস্পরিক এবং পানাহি’র সঙ্গে কথোপকথন। এক কৌতূহলী যাত্রীর প্রশ্নের উত্তরে চালক বলেন, এটিচুরি রুখবার উপায়।

Taxi Teheran norsk plakat

http://www.arthaus.no/kommer/article1213777.ece

এটা যেন সিনেমা নয়; সত্যাগ্রহ। প্রতিটি ফ্রেম শাসককে প্ররোচিত করে; বুড়ো আঙ্গুল দেখায় শুধু কন্ঠরোধকারী ধর্মীয় অনুশাসনকেই নয়, এই ধারণাকেও যে আইনের জুজু দেখিয়ে আর্টকে থামিয়ে দেওয়া যায়।

যে কারণে লেখার প্রথম দিকে ‘বোধহয়’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম তা হল এই যে পানাহি’র সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব শুধু ছবিটা তৈরি করাই নয়, এই পরিস্থিতে এমন একটা ছবি তৈরি করা যেটা চলনসই নয়, অসাধারণ। ‘ট্যাক্সি’তে সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলোর কারণে ইরানিয়ান সিনেমাকে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে একটা বলে মনে করা হয়। যেমন, ধোঁয়াশা এবং সাটেল্‌টির চমৎকার ব্যবহার- সেন্সরের পাশ কাটানোর জন্য যা খুব গুরুত্বপূর্ণ, ধীর গতি- যা ছবির ভেতরে ঢুকে যেতে দর্শককে সাহায্য করে, সংলাপ একই সঙ্গে দৈনন্দিন অর্থে স্বাভাবিক, আবার গভীর, অনবদ্য শিশু অভিনেতা, এবং বিষয়- যা ইউনিভার্সাল, কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে বিশেষ স্থানের, বিশেষ সময়ের অনুষঙ্গ।

ধোঁয়াশা মূলত একটি প্রশ্নকে ঘিরে- ছবিটি ফিকশ্যন, নাকি ডক্যুমেন্টারি? আরোহীরা আসল, নাকি অভিনেতা? যে ছবি ঘোষিত ভাবে যেকোনো একটি, সেটা একটা ভালো ছবি হতেই পারে, যদিও খানিকটা ‘গিমিকি’ বা একঘেয়েহয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যে ছবি দুটোর একটাও না, তা সাধারণের সীমা ছাড়িয়ে অসাধারণ হয়ে ওঠে। পানাহির সাফল্য, তিনি অল্প অল্প করে সন্দেহকে তার জাল বিছোতে দিয়েছেন। সিনেমার শুরুতে আমরা যে দু’জন আরোহীকে দেখি তাদের মধ্যে অপরাধ ও শাস্তি বিষয়ক কথোপকথন ক্রমশ হয়ে ওঠে বামপন্থা এবং তার বিপরীত অবস্থান সংক্রান্ত একটি অতি পরিচিত তর্ক। সময় যত এগোতে থাকে, আরোহীরাও তত অ-সাধারণ হয়ে উঠতে থাকে। টাক-মাথা, ভুঁড়িওয়ালা, পাইরেটেড ডিভিডি বিক্রেতা ওমিদ পানাহিকে চিনতে পারে এক পুরনো ক্রেতা হিসেবে; বাইক দুর্ঘটনায় আহত দম্পতি’র মধ্যে স্বামীটি হাসপাতাল যাওয়ার পথে পানাহির ফোনে রেকর্ড করে তার উইল; দুই বুড়ি দাবী করে বেলা বারোটার মধ্যে চেশমে আলি’র ঝর্ণায় দুটো সোনালী মাছ না ছাড়তে পারলে তারা মরে যাবে।

panahi

http://deadline.com/2015/02/berlin-film-festival-winners-2015-awards-ceremony-winner-list-1201373679/

এই দুই বুড়িকে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দিয়ে পানাহি তাঁদের জন্য আরেকটি ট্যাক্সি ডেকে দেন; আসলে পানাহি রাস্তা চেনেন না বলে এই জীবন-মরণ সমস্যার দায়িত্ব তিনি নিতেই চান না। তাছাড়া তাঁর ভাগ্নি হানা অপেক্ষা করে আছে স্কুলের সামনে (পানাহির দ্বিতীয় ছবি ‘আয়েনেহ’-এর আয়দা মহম্মদখানির মত), আর পানাহির সেখানে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। (ভাগ্যিশ পানাহি বিশ্বমানের পরিচালক, কারণ ট্যাক্সি চালক হিসেবে তাঁর দক্ষতা নিয়ে মন্তব্য না করাই ভালো। আমার হিসেবে শুধু প্রথম দুই আরোহীই তাদের গন্তব্যে পৌঁছয়)। হানা’র উচ্ছল আর চট্‌পটে স্বভাব তাকে সহজেই করে তোলে এই ছবির সবথেকে ভালো উপাদান। তার আবির্ভাব ছবিতে একটা নতুন শক্তি যোগ করে। বন্ধু বা পরিবারের সদস্যরা মাঝখানে কথা বললেও, পানাহির সাথে তার কথোপকথন যথেষ্ট ধারালো, তার বুদ্ধি স্বতঃস্ফূর্ততার মুখোশ বজায় রেখে যতটা ক্ষুরধার হওয়া সম্ভব, ততটাই।

hana

http://www.nziff.co.nz/2015/auckland/tehran-taxi/

হানা’র সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ছবিটা একটা মোড় নেয়, হয়ে ওঠে আরো প্রকট ভাবে রাজনৈতিক। হানাকে তার স্কুল থেকে একটা প্রজেক্ট করতে দেওয়া হয়েছে; তাকে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানাতে হবে। কিন্তু হানা’র শিক্ষিকা এর সঙ্গে যোগ করেছেন অনেক শর্ত। এই শর্ত না মেনে ছবি বানালে তা নাকি ‘ডিস্ট্রিবিউট’ করা যাবে না, অর্থাৎ প্রকাশ্যে দেখানো যাবে না, প্রদর্শন করা যাবে না। যেমন, কখনোই দেখানো যাবে না চারপাশের ভয়ানক বাস্তবের ছবি; হিজাবের অসম্মান করা যাবে না। প্রায় একই ধরনের নিয়ম মেনে চলতে হয় ইরানের পেশাদার পরিচালকদের যদি তাঁরা চান যে তাঁদের ছবি ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং ইসলামিক গাইডেন্সের (পানাহি’র যারা চক্ষুশূল এবং পানাহি যাঁদের) স্বীকৃতি পাক। শেষ আরোহী হলেন বিখ্যাত মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবী নাস্‌রিন সতৌদেহ্‌। কেউ জেল থেকে ছাড়া পেলে, বা কাউকে কারাবন্দী করা হলে তার পরিবারবর্গকে সতৌদেহ্‌ গোলাপ ফুল দেন, সেই জন্যে হানা’র কাছে তিনি “Lady of the Flowers”। পানাহির মত এনাকেও কুড়ি বছর প্র্যাকটিস করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পেয়েছেন ছ’বছরের কারাদন্ড। একাধিক অনশন ধর্মঘট করেছেন। এখন তিনি চলেছেন জেলে বন্দী এক মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে (এখানে পানাহি’র তৃতীয় ছবি ‘অফসাইড’-এর কথা মনে পড়তে বাধ্য। সেখানে যেমন মেয়েরা ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য শাস্তি পেয়েছিল, বাস্তবে এই মেয়েটি সাজা পেয়েছে ভলিবল ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য।) যে নিজে একটি অনশন ধর্মঘট শুরু করেছে। পানাহি এবং সতৌদেহ্‌ আলোচনা করতে শুরু করেন অনশন নিয়ে, রাষ্ট্র কী নির্মম ভাবে অনশন দমন করার চেষ্টা করছে সেই নিয়ে, এবং এই পরিস্থিতির মধ্যে রাষ্ট্রকে প্রতিহত করার জন্য যে অসীম সাহস দরকার, সেই নিয়ে।

একই রকমের সাহস পানাহিরও দরকার হয়, এইভাবে ক্রমাগত আয়াতোল্লাহ্‌-দের হেয় করে যাওয়ার জন্য। ভাবতে ভয় করে, আর কতদিন তিনি পারবেন, কতদিন তাঁকে পারতে দেওয়া হবে।গোটা ছবি জুড়ে মাঝেমাঝেই পানাহি নার্ভাস হয়ে চারিদিক দেখতে থাকেন। সতৌদেহ্‌ জানতে চাইলে বলেন, “দেখার আগেই একটা গলার স্বর শুনতে পেলাম। মনে হল, গলাটা চিনি। জেলে আমাকে যারা জেরা করেছিল, গলাটা তাদের মতন।” তবে যদ্দিন সম্ভব হবে, শাসককে তিনি প্ররোচিত করবেনই। সমালোচনা করবেন ইসলামিক রাষ্ট্রের শাসনব্যাবস্থা’র, এবং সিনেমার শক্তিকে ব্যবহার করে যাবেন যাতে; যাদের গলার আওয়াজ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাদের কথা আরো জোরে, আরো দূরে ছড়িয়ে পড়ে, শোনা যায়। “আপনার যা করার, আপনি তা করুন”, সতৌদেহ্‌ পানাহিকে বলেন, ক্যামেরাকে একটি গোলাপ উপহার দিতে দিতে। সেই ফুলকে দেখিয়ে উনি বলেন, “এটা সিনেমা’র মানুষের জন্য, কারণ সিনেমার মানুষদের ওপর ভরসা করা যায়।” (“This is for the people of the cinema, because the people of the cinema can be relied upon.”)

nasrin


লেখাটি লিখেছেন অযাচি চক্রবর্তি।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s