রিফিউজি ক্রাইসিস এবং

কোনো দূরারোগ্য ব্যাধি হলে যেমন আমাদের প্রতিক্রিয়া হয়, ঠিক তেমনটাই হচ্ছে আজ যখন আফ্রিকা এবং ‘মিডল ইস্ট’ থেকে রিফিউজিরা ঢোকার চেষ্টা করছেন পশ্চিম ইওরোপে। প্রথমে হয় ডিনায়াল- “এমন কিছু ব্যাপার নয়, কাটিয়ে দেওয়াই শ্রেয়।” তারপর হয় রাগ – “আমার সঙ্গে এমনটা হল? রিফিউজিদের নামে মুসলমান মৌলবাদীরা ঢুকে পড়ছে। ওদের থামাতে হবেই।” তারপর আসে দর কষাকষি – “আচ্ছা, কিছু ‘কোটা’ ঠিক করা হোক। রিফিউজি ক্যাম্প করে দেওয়া হোক ওদের নিজের দেশে।” অতঃপর আসে হতাশা – “আমাদের ইওরোপ ক্রমশ পরিণত হচ্ছে ইওরোপাস্তানে।” এলিজাবেথ কুবলার-রসের ‘Five Stages of Grief’-এর চারটি পর্যায়ের পর যা এখনও দেখা যায়নি তা হল পঞ্চমটি – একসেপ্টেন্স; অর্থাৎ রিফিউজি ক্রাইসিসটা মেনে নিয়ে এই রিফিউজিদের জন্য কোনো সুগঠিত সর্বইওরোপীয় পরিকল্পনা।

তবে করণীয় কি? দু’ধরণের জনমত ওখানে স্পষ্ট। Left Liberal-দের মতে, হাজার হাজার রিফিউজি ভূমধ্য সাগরে ডুবে মরছে- তার জন্য দায়ী ইওরোপ। ইওরোপের উচিত তাদের স্বাগত জানানো (call for open borders)। Anti-Immigrant Populist-রা আবার দাবী দিচ্ছেন নিজেদের জীবনধারা বা জীবনবোধ বজায় রাখতে গেলে এমনটি করা যাবে না। ফরেনাররা নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করুক। এই দুইয়ের কোনো সমাধানই কার্যকরী হতে পারে না। দেশের সীমান্তরেখা হুট করে বললেই তুলে দেওয়া যায় না। আবার অন্যদিকে, আফ্রিকা আর ‘মিডিল ইস্ট’-এর বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরা করতে অক্ষম কারণ পশ্চিম ইওরোপই তাকে পঙ্গু করে দিয়েছে, তাকে বাঁধা দিয়েছে প্রতিনিয়ত। ইরাকের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ আজ ইসলামিক স্টেটের উত্থানের জন্য দায়ী। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারই দুনিয়া জুড়ে মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের অর্থ জুগিয়েছে, অস্ত্র জুগিয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের কার্যসিদ্ধির পর তাদের ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, যেভাবে সি-আই-এ ছুঁড়ে ফেলেছে মুজাহিদিনদের। লিবিয়াকে খোকলা করে দিয়েছে পাশ্চাত্যের এই আগ্রাসী মনোভাব। খৃষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী দক্ষিণ ও ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী উত্তরের মধ্যে যে গৃহযুদ্ধ চলছে আজও মধ্য আফ্রিকায় তার কারণ শুধু সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ বা অসহিষ্ণুতা নয়; তার প্রধান কারণ হল উত্তরের তেলের খনি’র অধিকার নিয়ে। আসলে লড়ছে দুটি দেশ- ফ্রান্স আর চীন; সেই ফ্রান্স, যার জাতীয় নীতিবাক্য- “liberty, equality, fraternity”। কোলতান, কোবাল্ট, ডায়মন্ড, কপার- এই খনিজ বস্তুগুলির দখল পেতে কঙ্গোতে ১৯৯০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে বর্বরতা চলেছে তা অনেকটা চীনের রিপাবলিকে কিং ডাইনাস্টির ধ্বংসস্তূপ থেকে গড়ে ওঠা ‘War Lordism’-এর মতন। সিরিয়া, লিবিয়া, কঙ্গো, সোমালিয়া, ইরাক জাতীয় ‘Failed State’ থেকেই মূলত আসেন রিফিউজিরা। এবং এই রাষ্ট্রগুলি বিকল হয়ে পড়েছে প্রধানত দু’টি কারণে- বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে- যেমন লিবিয়া আর ইরাকে- সরাসরি পাশ্চাত্য আক্রমণের ফলে। এটা খুবই স্পষ্ট যে এই ‘failed state’দের এরকম পরিস্থিতির জন্য দায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত কিছু ক্ষমতাবান দেশের অর্থনৈতিক আগ্রাসন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউ-কে এবং ফ্রান্স যেভাবে পরিকল্পনাহীন সীমান্তরেখা টেনে ‘artificial states’ গঠন করে তারও ফল এই ‘failed states’।

‘মিডিল ইস্ট’-এর সবচেয়ে বিত্তবান দেশগুলি সৌদি আরব, কুয়েত, এমিরেটস, কাতার। এঁদের তুলনায় কম বিত্তবান দেশ, যেমন তুরস্ক, মিশর, ইরান- রিফিউজিদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে সাধ্যমত। কানাডা তার সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে সিরিয়া ও ইরাকের রিফিউজিদের স্বাগত জানিয়েছে। ২৫০০০-এর বেশী মানুষ কানাডাতে থাকতে শুরু করেছেন। সৌদি আরব মুসলমান রিফিউজিদের সোমালিয়া ফেরত পাঠিয়েছে। বিদেশী অনুপ্রবেশকারীদের তারা ঢুকতে দেবে না- এই মৌলবাদী গোঁড়ামি ছাড়া এঁদের ফেরত পাঠানোর আরো একটা কারণ হল আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক জোট। আন্তর্জাতিক স্তরে কেন তাদের বাধ্য করা হল না এই রিফিউজিদের আশ্রয় দিতে?

এই বিত্তবান দেশগুলোতে দাসত্বর প্রচলন আছে। আরব পেনিনসুলা থেকে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক এখানে আসেন যাঁদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধেও নেই। এঁরা পালিয়ে এসেছেন, ১৬ ঘন্টা শ্রম এবং অত্যন্ত নিম্নমানের বাসস্থান এঁদের নিয়তি। ভারতবর্ষেই এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়। আমাদের চোখের সামনেই কাঁটাতার পেরিয়ে আসা কত মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলেন বহুতল শ্মশান, অথচ পাশবিক পরিস্থিতিতে এঁরা বাস করতে বাধ্য হন। সাংহাই, দুবাই বা কাতারের শহরতলিতে কখনো কখনো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে তৈরি কুঠুরিতে এঁদের জীবন কাটাতে হয়। এই ধরণের শ্রমই বিশ্ব পুঁজিবাদের বিস্তারের প্রাথমিক শর্ত। রিফিউজিদের মধ্যে জাঁরা ইওরোপে এসেছেন তাঁরা অনেকেই এই অমানবিক স্ট্রাকচারের মধ্যে দাসে পরিণত হবেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় শ্রমিকদের বদলে তাঁদের কাজে নেওয়া হবে। কর্মচ্যূত হতে পারেন- এই আশঙ্কা থেকে অনেকে Anti-Immigrant Populism-এর নব্যধারার জোয়ারে গা ভাসাচ্ছেন। যে রিফিউজিরা সমুদ্র পেরিয়ে ইওরপে পৌঁছতে পারছেন, তাঁদের চোখে যেন এক অদ্ভুত স্বপ্ন। অনেকে মনে করবেন, হয়তো রিফিউজিরা যৎসামান্যতেই সন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, শুধু খাদ্য আর চিকিৎসা নয়, অন্যান্য দাবীতেও তাঁরা সরব হচ্ছেন। চাইছেন নিজেদের পছন্দমত জায়গায় তাঁদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। তাদের দাবী অন্যায্য নয়। কিন্তু এখনো তাঁদের স্বপ্ন ভাঙতে দেরি আছে। বাস্তবে তো এমন কোনো দেশ নেই যেখানে গিয়ে তাঁরা শান্তি পাবেন।

বিশ্বায়িত অর্থনীতি- এতে পণ্য ঘুরে বেড়াতে পারে সর্বত্র, কিন্তু মানুষ নয়। তাই তৈরি হয়েছে ইওরোপের রিফিউজি ক্রাইসিস। বিশ্ব পুঁজিবাদের দৌলতে তা বাড়তি মাত্রা পেতে পারে অন্যান্য জায়গাতেও। রিফিউজি তৈরি হয় যে কারণে, যে পরিস্থিতিতে, তা রুখতে দরকার আমূল অর্থনৈতিক পরিবর্তন।

সমস্যা হল, সাম্প্রতিককালে ইওরোপের (এবং আমেরিকারও) বিভিন্ন জায়গায় দক্ষিনপন্থী শক্তি’র উত্থান এই পরিবর্তনের পথে একটা বাঁধা। ইওরোপের নানা জায়গায় Anti-Immigrant Populism-কে হাতিয়ার করে ডানপন্থী শক্তিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যেমন ফ্রান্সের ‘ল্য নাশিওন্যাল’। প্যারিস হামলার পর তাঁরা আরো বেশী করে মনে করতে শুরু করেছেন যে সিরিয়ার থেকে আসা সব মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী, অতএব এঁরা দুশমন। ফ্রান্সের একটি দক্ষিণপন্থী দলের নেতা দেশের সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী দলদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্য। সব রিফিউজিরাই ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসবাদী- এই প্রচারের আড়ালে লুকিয়ে আছে ডানপন্থী শক্তিদের প্রকৃত সুবিধেবাদী চেহারা। ইউরোপের জীবনবোধ(way of life) কি এমন যে সেখানে ইসলাম ধর্মবলাম্বী মানুষদের কোনো জায়গা নেই? তবে তো এও ধরে নিতে হয় যে ইউরোপে বহুত্ববাদের কোনো জায়গা নেই। তাই কি জার্মানিতে Schengen Agreement খারিজ করার কথা উঠছে? তাই কি ডেনমার্কে যে রিফিউজিরা আশ্রয় খুঁজতে আসছেন তাঁদেরজমানো পুঁজি,সামাজিক নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে, সরকার কেড়ে নিচ্ছে? এঁদের বিরোধিতা করার জন্যই তাই Left Liberal-দের মতামত পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া ভুল হবে।

সব শেষে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। যারা এখনো ছেলে-মেয়েদের ইস্কুলে যেতে দেয় না, মেয়েদের নীচু চোখে দেখে, বাধ্য করে তাদের কথায় ওঠ-বোস করতে, বাল্যবিবাহের প্রথা আছে এখনো যেখানে- তাদের আশ্রয় দেওয়া কি উচিত হবে? এখন আসলে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় নয়। ইওরোপের বরং ভাবা উচিত কি ভাবে রিফিউজিদের নিরাপত্তা দেবে। আর দেওয়া উচিত নিজের মত করে বেঁচে থাকার অধিকার ব্যবহার করার সুযোগ। শুধু ইওরোপ কেন, গোটা পৃথিবীর উচিৎ এই মানুষগুলির পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। তবেই তো একসাথে লড়াই করা যাবে।


কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অরুন্ধতি রায়, প্রভাত পট্টনায়ক, এলিজাবেথ কুবলার-রস, প্রণব চট্টোপাধ্যায়, স্লাভো জিজেক, লেনিন।

লেখাটি লিখেছেন অভীক মন্ডল।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to রিফিউজি ক্রাইসিস এবং

  1. কদম বলেছেন:

    Left or Right…. These problems can be solved when only n only Humanitism will govern us. Still we want to rule our surrondings by name of religion – because still on 2016 in de name of Religion we possess the right to do anything.

    যাইহোক লেখাটা পড়ে অনেক কিছু জানলাম। জ্ঞ্যনসম্রিদ্ধ হলাম।অনেক কিছু অব্যশ্য ওপর দিয়ে গেছে।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s