নিছকই ‘অসহিষ্ণুতা’?

হেঁসেলে মাংসের গন্ধ। খুন হয়ে গেলেন মহম্মদ আখলাখ। গান্ধির এই দেশে গডসে-পুজোর সমালোচনা করায় খুন হয়ে গেলেন গোবিন্দ পানসারে। যেভাবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে খুন হয়েছেন নরেন্দ্র দাভালকার। যুক্তিবাদী হওয়ার ‘অপরাধে’ এবার হত্যা করা হলো সাহিত্যিক এম. এম. কালবুর্গিকে। কর্ণাটকে।

আসমুদ্রহিমাচল বিক্ষোভ। বিক্ষুব্ধ এই দেশের সংবেদনশীল মানুষেরা একে একে উঠে দাঁড়ালেন। প্রতিবাদে। কোনও কোনও শিল্পী, সাহিত্যিক ফিরিয়ে দিলেন সরকারি পুরষ্কার। ধিক্কার জানালেন। একে একে আরও অনেকে যোগ দিলেন প্রতিবাদীদের দলে। প্রতিবাদ ‘অসহিষ্ণুতা’র বিরুদ্ধে। শব্দটা ইদানিংকালে ভারতের রাজনীতিতে সর্বাধিক চর্চিত। আলোচিত। সম্ভবত খোদ রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা থেকেই এই শব্দটি নতুন মাত্রা পেয়েছে সাম্প্রতিককালে। মিডিয়া লুফে নিয়েছে। বিক্ষুব্ধ বুদ্ধিজীবীরা বারংবার ব্যবহার করেছেন এই শব্দটিই। এই প্রতিবাদীদের দলেই আছেন সাহিত্যিক অরুন্ধতী রায়, তবে তিনি ওই বহুলচর্চিত শব্দটি ব্যবহার করতে রাজি নন। বলেছেন, আজ যা চলছে এই দেশে তা স্রেফ ‘অসহিষ্ণুতা’ নয়। “তারচেয়ে বেশি কিছু”। ঠিকই বলেছেন অরুন্ধতী। নিছক ‘অসহিষ্ণুতা’ বললে কম বলা হবে। ভুল বলা হবে।

কারণ ইহা মামুলি ‘অসহিষ্ণুতা’ নহে। ইহা “তারচেয়ে বেশি কিছু”। কিন্তু কী?

তারচেয়ে বেশি কিছু!

ইউরোপে গত শতকের ২-এর দশকেই ‘ফ্যাসিবাদ’-এর উদ্ভব। শুরুটা ইতালিতে। ১৯২১ সালের মে মাসেই পার্লামেন্টারি নির্বাচনে ফ্যাসিস্টরা বড়ো ধরনের সাফল্য পায়। তারপর বিনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে সেই শক্তি এগোতে থাকে। মানব সভ্যতার সামনে ‘ফ্যাসিবাদ’ যে কতো বড়ো বিপদ তা অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি সেসময়। ৩-এর দশকে তীব্রতা বাড়ে ‘ফ্যাসিবাদ’-এর।  ১৯৩৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান (‘চ্যান্সেলর’) হিসেবে এডলফ হিটলারের নাম ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ব। নাৎসি পার্টির রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর প্রথমদিকে অনেকে ঠিক করে চিনে উঠতে পারেননি বিপদটাকে। চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন রকমের বামপন্থীরাও ভেবেছিলেন, এটা নিছক একটি ‘দমনমূলক’ রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু ‘ফ্যাসিবাদ’, কার্যত, তারচেয়ে বেশি কিছু ছিলো।

১৯৩০–এর দশকের শুরুর দিকে, যখন উঠে দাঁড়াচ্ছে ‘ফ্যাসিবাদ’, এই ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক ব্যবস্থাটির প্রকৃত স্বরূপ তখনও স্পষ্ট করে বুঝে ওঠা যায়নি। ভাবা হচ্ছিলো, ‘ফ্যাসিবাদ’ শ্রেণির উর্ধ্বে একটি শক্তি এবং নিছক একধরনের ‘বোনাপার্টিজম’। বাংলায়, ‘তুঘলকি’ বলা যেতে পারে। ‘ফ্যাসিবাদ’-এর উদ্ভব ও বিস্তৃতির পর একমাত্র আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষ থেকেই ‘ফ্যাসিবাদ’-এর সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপস্থিত করা গেছে। তবে তারজন্যও অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৩৩ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত। ‘কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে’র কার্যকরী সমিতির ত্রয়োদশ প্লেনামে বলা হয়, ক্ষমতায় আসীন ‘ফ্যাসিবাদ’ হলো “ফিনান্স পুঁজির তরফের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদী এবং সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী অংশের সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব।” রোগ চিনে উঠতেই অনেকটা সময় লেগে যাওয়ার ফলে অসুখ আরও বেড়ে গেছিলো সেদিন। ফ্যাসিবাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী লড়াইয়ে নামতে, ফলে, দেরি হয়েছে। ১৯৩৫ সালে মষ্কোতে ‘কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক’-এর সপ্তম কংগ্রেসে একটা পথনির্দেশ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিলো। বলা বাহুল্য, সেই পথে আলো জ্বেলেই পৃথিবীকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করা গেছিলো একদিন।  এই পথনির্দেশ তৈরি করার কাজে যাঁর অবদান সর্বাধিক, নাম তাঁর জর্জি ডিমিট্রভ। বুল্গেরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। ডিমিট্রভ ‘ফ্যাসিবাদ’কে চিহ্নিত করেন, “রাজনৈতিক দস্যুতাবৃত্তির সরকারি সংস্করণ” রূপে।

রাজনৈতিক দস্যুতাবৃত্তির সরকারি সংস্করণ

চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির জয়ের আগে কি এদেশে ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করার চেষ্টা হয়নি? দাঙ্গা হয়নি? ‘মোদি সরকার’ গঠনের আগে কি যুক্তিবাদের গলা টিপে ধরতে চাইতো না ধর্মের কারবারিরা? এদেশে কোনও যুক্তিবাদী খুন হননি কি আগে? আমাদের মত, বিশ্বাস, ভাষা, এমনকি খাদ্যাভ্যাসের ওপরও মৌলবাদীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কি করেনি? অথবা মোদি এণ্ড কোম্পানির সিংহাসন আরোহনের আগেও আমাদের ইতিহাসে গাঁজাখুরি আর বিজ্ঞানে বুজরুকি মেশাতে চায়নি কি হিন্দু তালিবানরা?

সবকটা প্রশ্নের উত্তরই খুব সোজা। এবং জানা। কেন্দ্রে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ পরিচালিত একটি রাজনৈতিক দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেও এই সবই হয়েছে। হতো। আজ যা যা চলছে (যাকে ‘অসহিষ্ণুতা’ বলা হচ্ছে সাধারণভাবে) তার কোনওটিই ভারতবর্ষে অভূতপূর্ব নয়।  যে প্রবনতা একেবারে নতুন তা হলো, হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির সমস্ত কর্মসূচীর প্রতি সরকারের সহিষ্ণুতা। নিছক ‘সহিষ্ণুতাই নয়। মদত। ‘মোদি সরকার’-এর অভিমুখ যে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুসারী, শুধু তাই নয়। কার্যক্ষেত্রে এই সরকারটি পরিচালিতই হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের নির্দেশে। গত আগস্ট মাসের শেষদিকে সরকার পরিচালনা বিষয়ে সংঘ প্রধান মোহন ভাগবতের সাথে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের মিটিং আর কীসের প্রমাণ? খোদ নরেন্দ্র মোদি সেই মিটিংয়ের পর প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে ‘আর এস এসের একজন প্রচারক’ হিসেবে নিজেকে চেনাতে চান। ‘দেশের প্রধানমন্ত্রী’ -এই পরিচয় গৌণ হয়ে যায়। একের পর এক মন্ত্রী, শাসক দলের সাংসদ দাঙ্গাবাজের স্বরে কথা বলেন। তাদের অশ্লীল চিৎকারে জ্যান্ত পুড়ে মরা দলিত শিশুর মৃতদেহে প্রলেপ পড়ে লজ্জার। হত্যা থেকে হত্যায় মাতে হিন্দুনাৎসিরা। আর সেই দস্যুতাকে স্বীকৃতি দেয়, মদত জোগায় স্বয়ং রাষ্ট্র।

রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশবাসীর মুখে ‘দেবভাষা’র লাগাম পরানোর প্রয়াস চলে। ওরা নিয়ন্ত্রণ চায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসের। ‘নৈতিকতা’রও। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতলে হাত রাখার সুযোগ পেয়ে মোহন ভাগবতরা সর্বনাশের দিকে ঘোরাচ্ছেন শিক্ষাব্যবস্থার চাকা। স্কুল, কলেজে যুদ্ধবিদ্যা বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করছে সরকার। ইতিহাস বইয়ের ছত্রে ছত্রে ঢোকাচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রতিককালে দেশের অন্যতম ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব এই প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করেছেন ‘State sponsored distortion of History’ রূপে ।

বাস্তবে শুধু ইতিহাসের বিকৃতির প্রশ্নেই একথা প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে এদেশের শিরায় শিরায় ধর্মের মোড়কে বিষ ইঞ্জেক্ট করার সমস্ত প্রকল্পই, বস্তুত, রাষ্ট্র অনুমোদিত। রাষ্ট্র পরিচালকদের টিকি যখন আর.এস.এস.-এর খুঁটিতে বাধা, তখন এটাই স্বাভাবিকতা।

বিজেপির আঁতুড়ঘর 

গান্ধিহত্যার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার অপরাধে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি  আর.এস.এস.-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশের সরকার। জহরলাল নেহেরু তখন প্রধানমন্ত্রী আর বল্লভভাই প্যাটেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এসময় থেকে আর.এস.এস. মূলত ‘সামাজিক’ ক্রিয়াকলাপের মধ্যেই নিজেকে বেধে রাখতে বাধ্য  হয়। এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য সরকারকে নানাভাবে পিড়াপীড়ি করতে থাকে। সরকারে থাকা কংগ্রেস নেতাদের কাছে আবেদন, নিবেদন করার ক্ষেত্রে আর.এস.এস. নেতাদের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার ছিলো তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধিতা। কারণ কমিউনিস্টরা তাদের মতো কংগ্রেসেরও বিরোধী। ফলে নিজেদেরকে ‘শত্রুর শত্রু’ কংগ্রেসের ‘বন্ধু’ বলেই প্রমাণ করতে চান সংঘ নেতা গোলওয়ারকার। এমনকি, দেশের ‘কমিউনিস্ট বিপদ’ রুখতে গেলে যে নেহেরু-প্যাটেলদের আর.এস.এস.-কে প্রয়োজন, একথাও তিনি বোঝাতে চান সরকারকে। অবশেষে ১৯৪৯-এর ১২ জুলাই আর.এস.এস. শর্তসাপেক্ষে আইনসঙ্গত হয়। উল্লেখ্য এই প্রক্রিয়ায় আর.এস.এস. ও সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন খোদ জি.ডি.বিড়লা। যাইহোক, যেসব শর্তে সরকার নিষেধাজ্ঞা তুল নেয় তার অন্যতম হলো, আর.এস.এস. এখন থেকে প্রকাশ্যে শুধু ‘সাংস্কৃতিক’ ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্রিয়তা সীমাবদ্ধ রাখবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ দেশের ‘রাজনৈতিক’ ক্ষেত্রে আর কোনও কার্যকলাপ চালাতে পারবে না।

এরপরের কয়েকটা বছর দেশে ‘কমিউনিস্ট বিপদ’ সত্যি সত্যি বাড়তে থাকে। ১৯৫২-র নির্বাচনে বামপন্থীরা প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে মাথা তোলে। ’৫৭-তে বামেদের শক্তি আরও বাড়ে। ইতিমধ্যে কেরালায় দেশের প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ত্বাধীন সরকারও গঠিত হয়। দেশে বাড়তে থাকা তথাকথিত ‘কমিউনিস্ট বিপদ’ রোখার জন্য এসময় শাসক শ্রেণি তথা দক্ষিণপন্থী শক্তির নতুন অক্সিজেন দরকার ছিলো প্রবলভাবেই। দরকার ছিলো কংগ্রেসের অন্য একটি দক্ষিণপন্থী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির। প্রয়োজন ছিলো, হ্যাঁ, ভারতীয় জনতা পার্টির। শাসক শ্রেণির রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে করতে, সাধারণ মানুষের সর্বনাশ করতে করতে কোনোদিন যদি কংগ্রেস সরকার দেশবাসীর আস্থা হারায়; তাহলে যেন শাসক শ্রেণিরই অন্য আরেকটি রাজনৈতিক দলকে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে খাড়া করা যায়।  মনমোহন-সরকারকে যদি দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করতে উদ্যত হয় তাহলে যাতে পাবলিকের সামনে স্লোগান হাজির করা যায় ‘মোদি সরকার’-এর।

এই প্রয়োজন মেটাতেই জন্ম বি.জে.পি.-র। দেশে যখন বামপন্থার শক্তি বাড়ছে সেসময়ই (১৯৫১ সালে) গোলওয়ালকার হিন্দুমহাসভার প্রাক্তন নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’ (বি.জে.এস) তৈরির কাজে সাহায্য করেন। সরকারের সাথে চুক্তি অনুসারে সংঘ ‘সাংস্কৃতিক’ কাজেই ব্যাপ্ত থাকে আর রাজনৈতিক কাজের জন্য এই দলটিকে গঠন করে। সেদিনের বি.জে.এস-এরই উত্তরাধিকারী আজকের বি.জে.পি.। এইমুহূর্তে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মুখ্য হওয়া সত্ত্বেও, বি.জে.পি.-র নিজের কোনও তাত্ত্বিক সাহিত্য নেই। আর.এস.এস.-এর তাত্ত্বিক কাঠামোই বি.জে.পি.-র মতাদর্শগত ভিত্তি; এই সমাপতন অত্যন্ত লক্ষ্যণীয়।

মহাত্মার চেতাবনি ওদের মতাদর্শগত ভিত্তি

১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা। পাঞ্জাব শরণার্থীদের জন্য ওয়াঘা শিবিরে আর.এস.এস. কর্মীরা প্রাণপাত পরিশ্রম করছেন পশ্চিম পাকিস্থান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য। প্রসঙ্গত এই উদ্বাস্তুদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু। সেই শিবিরে আর.এস.এস. ক্যাডারদের শৃঙ্খলাবোধ, সাহস আর কঠোর পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন মহাত্মা গান্ধির এক সঙ্গী। অনেকক্ষণ চুপ করে শোনার পর নিজের সঙ্গীর উদ্দেশে গান্ধির উচ্চারণ ছিলো, “ভুলো না যে হিটলারের নাৎসি আর মুশোলিনির ফ্যাসিস্টদেরও ওই একই গুণ ছিলো।” গান্ধিজির এই সতর্কবার্তা সেদিন সেই সঙ্গীটির কানে ঢুকেছিলো কিনা জানি না। তবে আজও যদি তাঁর সাবধানবাণীর তাৎপর্য অনুধাবন না করি, সর্বনাশ রাখার জায়গা থাকবে না আমাদের।

প্রসঙ্গত ডক্টর হেডগেওয়ার ছিলেন আর.এস.এস.-এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪০ সালে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন গোলওয়ালকার। এই গোলওয়ালকারের লেখা “উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড” (১৯৩৮) বইটিকে আর.এস.এস.-এর মতাদর্শগত ইস্তাহার বলা যেতে পারে। তাঁর তাত্ত্বিক রচনার ভিত্তি, স্পষ্টতই, ভি ডি সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’-এর ধারণা। যদিও গোলওয়ারকার সাভারকারের ধারণাকে সম্প্রসারিত করে ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ নামের একটি সম্পূর্ণ তত্ত্ব বানান। ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ স্বভাবতই ‘ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ’ থেকে পৃথক; এবং এর মূল কথা হলো ‘জাতিত্বে’র গর্ব। গোলওয়ারকার আর.এস.এস.-কে যে মতাদর্শগত অবস্থানটি দিলেন তার বুনিয়াদ সরাসরি প্রোথিত ছিলো জার্মান ‘ফ্যাসিবাদে’। “উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড”-এ ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ প্রসঙ্গে লেখক লেখেন, “জার্মানদের জাতিত্বের গর্ব আজ (১৯৩৮ সালে) মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়ে পড়েছে। নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতিকে কলুষমুক্ত করতে জার্মানি গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে সেমিটিক জাতি – ইহুদিদের দেশ থেকে বিতারণ করেছে।… এই শিক্ষা হিন্দুস্থানে আমাদের গ্রহণ করা এবং তার থেকে লাভ করা প্রয়োজন।” হিটলারের শিক্ষা ‘হিন্দুস্থানে’ যথার্থভাবে প্রয়োগ করাটাই আর.এস.এস.-এর উদ্দেশ্য। আর এহেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের হাতে যে রাজনৈতিক দলের লাগাম রয়েছে সেই বিজেপি যে ফ্যাসিস্ট প্রবণতার সরকার চালাবে, এটা তো বিস্ময়ের নয়।

অরুন্ধতী যা বলেছেন, যা বলেননি

সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ফেরত দেওয়ার সময় অরুন্ধতী রায় বলেন, আজ সারাদেশে যে ঘটনাগুলি ঘটছে সেগুলি তাঁর কাছে মোটেই বিস্ময়ের নয়। অপ্রত্যাশিতও নয়। আজ যারা কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন তাদের ক্ষমতা লাভের সময়ই এই পরিস্থিতির আন্দাজ করা গেছে। স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড়ো গণহত্যার নায়ক যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে, কী কী ঘটতে চলেছে সেটা কি তখনই বোঝা যায়নি? হিটলারিয় ইহুদিনিধনের মডেলেই ২০০২ সালে ‘হিন্দুত্বের গবেষণাগার’ গোধরায় মুসলিমনিধনের পুরোহিত নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিচয় ভুলে না গেলেই ‘মোদি সরকার’-এর ফ্যাসিস্ট প্রবণতা চিহ্নিত করতে অসুবিধে হয় না। ছোট্ট একটা বিবৃতিতে অনেক কথাই বলে দিয়েছেন অরুন্ধতী। বলে দিয়েছেন, দেশে আজ যা চলছে তা ‘অসহিষ্ণুতা’র চেয়ে বেশি কিছু। শুধু বলেননি যেটুকু তা হলো, দেশে আজ যা চলছে তা ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন।

ইউরোপের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, ‘ফ্যাসিবাদ’কে চিনে উঠতেই সময় লেগে গেছিলো অনেকটা। আমাদের দেশেও আজই যদি না চিনে উঠতে পারি, বাড়বে বিপদ। ওরা হিটলারের কাছ থেকে শিক্ষা নিক; আমাদের ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। ‘ফ্যাসিবাদ’কে শ্রেণির উর্ধ্বের একটি শক্তি হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। অবশ্যই ‘ফ্যাসিবাদ’-এর সাথে ‘সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু এই রাজনৈতিক শক্তিটির ব্যাপ্তি এটুকুই নয়। আদতে ‘ফ্যাসিবাদ’ ‘সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা’ আর ‘ফিনান্স পুঁজি’র ককটেল। মুমূর্ষু পুঁজিবাদকে গর্ত থেকে তোলার জন্য সেদিন শাসক শ্রেণির এডলফ হিটলার, বিনিতো মুশোলিনিকে  প্রয়োজন ছিলো। ২০০৯-এর অর্থসঙ্কটের পর যখন সারা পৃথিবীর সাথে ভারতের অর্থনীতিও মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখন আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির এদেশে প্রয়োজন ছিলো নরেন্দ্র মোদির। আজ যেমন মার্কিন মুলুকে তাদের প্রয়োজন ট্রাম্পসাহেবকে। ‘ফাসিবাদ’ বিপদে পড়া কর্পোরেটদের সেবায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে নিজেদের অগণতান্ত্রিক চরিত্রের ফলেই। নিজেদের বেপরোয়া, স্বৈরাচারী প্রবণতার সুবাদেই। সাম্প্রতিক আর্থসঙ্কটের সমসময়ে কর্পোরেটদের অফুরান অক্সিজেন জোগানোর জন্য ‘যথেষ্ঠ’ বেপরোয়াভাবে দেশে ‘সংস্কার’-এর অশ্বমেধ ছোটাতে পারেননি মনমোহন সিং। তাঁর প্রথম সরকারের বেশিরভাগ সময়টাই ছিলো বিধি বাম। বামপন্থীদের সমর্থনের ওপর যেহেতু সরকারের অস্তিত্ব টিকে ছিলো, তাই তাঁর সরকারকে বামেদের শর্ত মেনে চলতে হয়েছে। পরের দিকে বামপন্থীদের সমর্থন বা শর্ত কোনটাই যখন ছিলো না, তখনও পার্লামেন্টে ছিলো বিরোধীদের রাজনৈতিক বাধা। তাই প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ৪৯% প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি বীমাক্ষেত্রটিকে কর্পোরেটদের পায়ে সঁপে দেওয়া। আদানি, আম্বানিরা তাই ‘ব্যর্থ’ মনমোহনের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিলো ‘দৃঢ়চেতা’ মোদিকে। কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিলো শাসকশ্রেণির অন্য একটি রাজনৈতিক দলকে। বিজেপি-কে।

যেহেতু মোদির গাইডলাইন গোলওয়ালকার নির্দেশিত ‘হিটলার মডেল’, যেহেতু বিজেপি-র ঐতিহ্য ফ্যাসিস্ট উত্তরাধিকার; ফলত বুকের পাটা ৫৬ ইঞ্চির। ফলত সংসদীয় গণতন্ত্রের সামান্য লজ্জাবস্ত্রটুকুকেও হরণ করা যায় অনায়াসে। বেআব্রু ফ্যাসিস্ট শক্তি সরকার গড়ার প্রথম ৮ মাসে অবলীলায় জারি করে ১০টি অর্ডিনান্স। পার্লামেন্টকে এড়িয়ে লাগু হয় জমি অধিগ্রহণ বিল, যার মাধ্যমে কর্পোরেট/ডেভলপাররা নিজের পছন্দসই যেকোনও জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে কৃষকের সম্মতি ছাড়াই। শ্রম আইন সংশোধনের নামে লুঠ করা হয় দেশের বেশিরভাগ শ্রমিকের অধিকার। ‘রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা অভিযানে’র নামে নিশ্চিত করা হয় শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ। কেড়ে নেওয়া হয় শিক্ষাখাতে সরকারি খরচ। বন্ধ করে দেওয়া হয় একটার পর একটা ফেলোশিপ/স্কলারশিপ।  নয়াউদারনীতির ঘোড়া ছোটে, ছুটতে থাকে লাগামহীন। ফালাফালা হয় দেশের মাটি। গণতন্ত্রের ভিত্তি। আর ইতিহাস পরিষদের দখল নেয় ওয়াই সুদর্শন রাও। কিম্বা ফিল্ম ইন্সটিটিউটের মাথায় চড়ে জনৈক গজেন্দ্র চৌহান। রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে লাগাম পরানো হয় বিরোধীদের নাকে। মুখে ল্যুকোপ্লাস্ট। বারাণাবতের দেশে যতুগৃহে পুড়ে মরে দলিত শিশুরা। কালো, জমাট ধোঁয়া বেরোয় গ্যাসচ্যাম্বারের চুল্লী থেকে। গিনিপিকের বদলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় ব্যবহৃত হয় জ্যান্ত ইহুদি-শরীর। গর্ভ থেকে বের করে আনা হয় ত্রিশূল শীর্ষে গাঁথা ভ্রূণ। সূর্যরশ্মি ঠিকরে পড়ে; চকচক করে জন্মের আগেই মৃত মানুষেরা। চকচক করে দাঁত, নখ বিনিতো মুশোলিনির। আউস্‌ভিৎসের কুঠুরি থেকে আলো এসে পড়ে আমাদের ঘরের উঠোনে…

শ্বাসরোধী এই দৃশ্যাবলীকে, দয়া করে, স্রেফ ‘অসহিষ্ণুতা’ বলে থেমে যাবেন না।


লেখাটি লিখেছেন সৌম্যজিৎ রজক।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s