দেখার যুক্তি

কজিটো এরগো সাম। আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি। আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে দেকার্ত বলেছিলেন জ্ঞান লাভ করার প্রথম পদক্ষেপ হল সব কিছু সন্দেহ করা। সব কিছুকে সন্দেহ করা হয়ে গেলে বাকি থাকে শুধু নিজেকে সন্দেহ করা, অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকেই সন্দেহ করা। সেই কাজটা সেরে ফেলতে পারলে শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকে এমন একটা কিছু যা সন্দেহের অতীত- যে সন্দেহ করছে সে। কে সন্দেহ করছে? দেকার্তের ভাষায় ‘মাইন্ড’, সাদা বাংলায় ‘মন’। কার মন? আমার। মন আছে, অতএব আমিও আছি। দেকার্ত বললেন, এই যে আমি চিন্তা করতে পারি, সেটাই আমার অস্তিত্বের প্রমাণ। পাশ্চাত্য দর্শনে র‍্যাশানালিজম বা যুক্তিবাদের প্রবর্তক দেকার্ত।

দেকার্ত ছিলেন অঙ্কের লোক। তাঁর যুক্তিবাদী দর্শনের বুনোট অঙ্কের ফর্মুলার মতই। শক্ত বাঁধন। কিন্তু তাতেও ফাঁক ছিল। ছিল বাধ্যতামূলক ভাবে ঈশ্বরের অবস্থান। তবে দেকার্তের দোষ-গুণ বিচার করার সাধ্য এই লেখিকার নেই। ইওরোপীয় এই দার্শনিকের থেকে এই লেখার প্রয়োজন তাঁর ঐ একটি কথার, “I think, therefore I exist.”

এখন প্রায় প্রবাদ হয়ে যাওয়া এই কথাটাকে দর্শনের তাত্ত্বিক জগৎ থেকে বের করে আনলে দেখা যাবে যে আমাদের যাপিত জীবনে, দেকার্তের প্রায় চারশো বছর পরেও, কথাটা খুব জরুরি। কী বলছেন দেকার্ত? বলছেন, কোনো কিছুকেই যুক্তি দিয়ে বিচার না করে বিশ্বাস কোরো না। সত্যি বলে মেনে নিও না। এমনকি নিজেকেও না। এ তো শুধু দর্শন পড়ার শিক্ষা নয়, রোজকার শিক্ষা। রোজকার জীবনকে দেখার শিক্ষা। সাহসী শিক্ষা। এমন শিক্ষা যা গোঁড়া ধারণাকে নাড়িয়ে দিতে চায়, হাজার বছরের প্রাতিষ্ঠানিকতায় আঘাত হানতে চায়, চায় উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সমস্ত দিকের জানলা খুলে দিতে। এহেন চাহিদার ফলে কিছু লোকের অসুবিধে হয় বইকি। তাদের ভয় করে। রাগ হয়। গায়ের জোরে যখন জানলাগুলো তারা বন্ধ রাখতে পারে না, তখন তারা গায়ের জোরে জানলা খোলার লোকগুলোকে চুপ করিয়ে দিতে চায়। নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। যুক্তি নামক হাতিয়ারের বদলে কোনো এক আফিমের বশে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায় মানুষকে। তাদের রাষ্ট্রে জ্ঞান মুক্ত নয়, চিত্ত ভয়শূন্য তো নয়ই। তাদের রাষ্ট্রে যে যেখানে যেভাবে যে ভাষায় মানুষকে প্রশ্ন করার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে রাষ্ট্রের হাতে সে খুন হয়ে যায়ে। প্রাতঃভ্রমণ কালীন, প্রাতঃভ্রমণ সেরে বাড়ি ফেরার পথে, বা নিজের বাড়ির দরজার সামনে মুখে কাপড় বাঁধা ছদ্মবেশী রাষ্ট্র অকস্মাৎ গুলি চালায়। একবার, দু’বার, তিনবার, চার বার, পাঁচ বার। কলম থেমে যায়।

কিন্তু সব ফুল কেটে ফেললেও বসন্ত আসে। সহমত প্রকাশিত Republic of Reason: Words They Could Not Kill-এর পেছনের মলাটে পাবলো নেরুদার বিখ্যাতউক্তি।বইটি নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এবং এম এম কালবুর্গি’র কিছু লেখার সংকলন- ইংরেজিতে।২০১৫সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

পানসারে আর দাভোলকারের মত প্রকাশের মাধ্যমের প্রধান ভাষা ছিল মরাঠি।কালবুর্গি’র কন্নড়।আশা করা যায় যে তাঁদের লেখার ইংরেজি অনুবাদের সংকলন আরো অনেক পাঠকের কাছে তাঁদের পরিচিত করে তুলবে।পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক, সেটা প্রয়োজনীয়। এই সংকলনের মধ্যে দিয়ে সহমত চেয়েছে আরো বেশী মানুষের কাছে এই তিন মানুষের ভাবনাকে পৌঁছে দিতে।এই প্রয়োজনীয়তার কারণ কিন্তু এই নয় যে ঘটনাচক্রে এঁরা তিনজনই খুন হয়েছেন।তাঁদের জীবদ্দশাতেও তাঁদের লেখাকে আরো বেশী পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল। এখনও আছে।এই সংকলনের লেখাগুলো বেছে নেওয়ার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে কিনা জানা নেই। দাভোলকারের লেখার মূল বিষয়বস্তু কুসংস্কার এবং তা দূর করার ক্ষেত্রে যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞান-মনস্ক হওয়ার ভূমিকা। পানসারের তিনটি লেখার মধ্যে একটি গান্ধিকে নিয়ে, একটি ‘বহুজন’রাজনীতি নিয়ে, এবং আরেকটি হল বিপ্লবীদের ধর্মের প্রতি কী মনোভাব পোষণ করা উচিৎ সেই নিয়ে। কালবুর্গি’র লেখাগুলো মূলত সাহিত্য নিয়ে।আপাতভাবে দেখতে গেলে এই লেখাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। কিন্তু একটা সুতো তো আছেই।যে সুতোর কারণে আজ ভারতবর্ষে এঁদের নাম এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করা হচ্ছে সেই সুতো। যে সুতো শুধু জীবনে নয়, মৃত্যুতেও তাঁদের বেঁধে রেখেছে, সেই সুতো।যে সুতো ধরে টান মারলে শাসকের আসন খানিকটা টলমল করে ওঠে সেই সুতো।আর সেই সুতোর কারণেই হয়ত এই তিনজনের যেকোনো লেখাই এই সংকলনে স্থান পেতে পারত। প্রশ্নটা আসলে লেখা নির্বাচন করা নয়, লেখার সাথে মানুষের পরিচয় ঘটানো।

হত্যাকারীরা যা আটকে দিতে চেয়েছিল, সেটা যেন আরো বেশী করে ছড়িয়ে পড়ে, সেটাই এই সংকলনের উদ্দেশ্য। সহমত সফল।বইটি’র কিছু ত্রুটি আছে নিশ্চয়ই। যেমন ইংরেজি অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বল।কিন্তু এই দুর্বলতাকে সহজেই উপেক্ষা করা যেতে পারে বইটির মূল উদ্দেশ্যের স্বার্থে। সহমতের কথায় সেই উদ্দেশ্য হল, “What the guns wanted to get at, is something we thought is precious enough to hold together, at least in part. Read on. It’s an act of reason and rebellion, both.”

rr

http://thamizhbooks.com/the-republic-of-reason.html

The Republic of Reason: Words They Could not Kill, Selected Writings of Dabholkar, Pansare & Kalburgi. SAHMAT: New Delhi, 2015. Price: Rs. 120/-


লেখাটি লিখেছেন সর্বজয়া ভট্টাচার্য।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s