আমরা, কিংবা আমাদের জাতিত্বের সংজ্ঞা

আধুনিক রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যে যে একটা জবরদস্তি আছে, এটা অনেক পণ্ডিতই মেনেছেন। ‘স্বদেশী সমাজ’-এর গড়ে ওঠাটাকে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন, রাষ্ট্র সেভাবে গড়ে ওঠে না, এটা যেন অনেক বেশি পুঁজি আর ক্ষমতা দিয়ে দখলীকৃত এক ভূখণ্ড। ক্ষমতা যখন বাড়ে, রাষ্ট্রের আয়তন বাড়ে, জমি আরও দখলীকৃত হয়। ক্ষমতা কমলে ভূমি কমে। বাউন্ডারি বদলায়। বাউন্ডারি বদলালে দেশপ্রেম ব্যাপারটাকে সেইমতো প্রসারিত বা কাটছাঁট করে আনতে হয়। রাষ্ট্রগুলোর গড়ে ওঠার ইতিহাসে এ উদাহরণ আকছার!

রাষ্ট্রচালকরা এটা ভালো বোঝেন বলেই তাঁরা বেশ জবরদস্ত্‌ কোনো একটা কেন্দ্রীয় ‘সত্য’-কে নির্মাণ করে তুলতে চান, যা দিয়ে তাঁর রাষ্ট্রকাঠামোকে বেঁধে রাখা যায়। কেন্দ্রটা যদি বেশ স্পষ্ট করে তোলা যায়, পরিধির লোকজনকে বাগে আনায় সুবিধে হয় আর কী! যেমন ধরুন, হিটলার। তাঁর ‘রাষ্ট্রের’ কেন্দ্রীয় সত্য খুবই স্পষ্ট করে দেগে দেওয়া, জার্মানী হবে বিশুদ্ধ আর্য রক্তের দেশ! যেই দেগে দেওয়া হল, তখন, তার বাইরের যা কিছু, তা-ই বাই-ডিফল্ট হয়ে যায় রাষ্ট্রের সাপেক্ষে ‘মিথ্যে’, তখন তাকে ফৌত করে দিতে গিয়ে আর অকারণ দ্বিধা পিছু টেনে ধরে না। সেজন্যই, ইহুদিরা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, ওরা তো ওই কেন্দ্রীয় সত্যের অন্তর্গত না। ওরা বিশুদ্ধ জার্মান না। সেই জন্যেই কমিউনিস্টদের তিনি মনে করেন অবমানব। সেইজন্যই ‘লেবেনস্রাম’ বা বিশুদ্ধ জার্মান জাতির বাসভূমির জন্য কোনো কাজকেই তাঁর আর অনৈতিক বলে মনে হয় না।

মহাদেব সদাশিব গোলওয়ালকর (১৯০৬-১৯৭৩) রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় সরসংঘচালক। আর.এস.এস-এর আদর্শের যে থিওরিটিক্যাল ভিত্তি তা খুব স্পষ্ট রূপ পেয়েছে এঁরই লেখালেখির মাধ্যমে। তাঁকে সংঘে তাই ডাকা হয় ‘গুরুজি’ নামে। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ভারতরাষ্ট্রের রূপকে একটা তাত্ত্বিক কাঠামোয় ভাবতে শুরু করেন তিনি, সেটাই একটা ঠিকঠাক চেহারা নেয় ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত তার বইতে, We, or Our Nationhood Defined। খুবই ইনফ্লুয়েন্সিয়াল এই বই। অনেকে বলেন এই বইটিই হল আর.এস.এস-এর বাইবেল !

22612408https://www.goodreads.com/book/show/22612408-we-or-our-nationhood-defined

কী আশ্চর্য, এই বইতে ভারতের ‘নেশনহুড’ কে ডিফাইন করতে গিয়ে, ওই কেন্দ্রীয় ‘সত্য’টাকে পাকাপাকিভাবে তৈরি করতে গিয়ে, গোলওয়ালকরের প্রথমেই মনে পড়ল হিটলারের কথা! অবশ্য, এতে আশ্চর্যেরই বা কী আছে! এমনটাই তো হবার কথা ছিল! জোর গলায় বললেন গোলওয়ালকর, “জার্মানী আমাদের দেখিয়েছে জাতি এবং সংস্কৃতির বিভিন্নতাকে একতাবদ্ধ করার চেষ্টাটা আসলে কার্যত অসম্ভব”, আর তাই জার্মানী যেভাবে অবিশুদ্ধ সেমেটিক জাতির ইহুদিদের একেবারে মুছে দেবার (‘purging’) কথা বলে সেটা, “A good lesson for us in Hindustan to learn and profit by”!

অর্থাৎ, হিটলারের কাছ থেকে এ হেন চিত্তচমৎকারী good lessonটি শিখে গড়তে হবে হিন্দুস্তান। ঠিক কেমন হবে তখন সেটা?

২.

বলছি, কিন্তু তার আগে আর একটা জরুরি কথা সেরে নিই। হিটলারের কথা বেশ ফলাও করে শ্রদ্ধার সঙ্গে বইতে বলা হল বটে, কিন্তু হিটলারকে একা গুরু মানলে নানা অসুবিধের একটা হচ্ছে ব্যাপারটায় বড্ড বিদেশী গন্ধ লেগে থাকে। এদিকে মার্ক্সবাদীদের অহরহ গাল দিতে হবে সোভিয়েতের দালাল বলে, ওদিকে হিটলারের গুণপনায় মশগুল হয়ে থাকলে কেমনতর লাগে না? ফলে এই বইতে হিটলারের পাশে আছে ‘ভারতীয় ঐতিহ্য’ও। ভারতের সংস্কৃতির বহু অধ্যায় অকল্পনীয় দ্যুতিময়, তা কে অস্বীকার করবে! ভারতীয় হিসেবে সত্যিকারের গর্ববোধ করার ঐশ্বর্যের কোনো অভাব নেই আমাদের প্রাচীন ইতিহাসে। কিন্তু গোলওয়ালকর তাঁর ‘নেশন’-এর স্বার্থে বেছে নেন সবচেয়ে আগে: মনুসংহিতা! সব ছেড়ে শেষে মনু? মনুসংহিতা থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে গোলওয়ালকর জানান “এতদ্দেশপ্রসূতস্যসকাশাদগ্রজন্মনঃ।/স্বংস্বংচরিত্রংশিক্ষরেন্‌ পৃথিব্যাংসর্বমানবাঃ।।”কী ব্যাপার, না, এই দেশের ব্রাহ্মণের কাছ থেকে সারা পৃথিবীর মানুষ নিজ নিজ চরিত্র শিখবে। তা, শুধু ‘ব্রাহ্মণের’ কাছ থেকেই কেন ? কেননা মনুমহারাজের ভারত একান্তভাবে এবং কুৎসিতভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত, নারীবিরোধী, শূদ্রবিরোধী ভারত। মনুসংহিতার কুখ্যাত অষ্টম বা নবম অধ্যায় থেকে এর নানা ‘আকর্ষক’ উদাহরণ দিতে পারতাম, পুঁথি বেড়ে যাবার ভয়ে বিরত হচ্ছি। কিন্তু যে দ্বিতীয় অধ্যায় থেকে এই শ্লোকটি উদ্ধার করেন গোলওয়ালকর, শুধু সেই দ্বিতীয় অধ্যায়েই চোখ বোলান যদি কেউ তো দেখতে পাবেন এই ঘোষণা যে, “ব্রাহ্মণের নাম শুভসূচক, ক্ষত্রিয়ের বলবাচক, বৈশ্যের ধনবাচক, শূদ্রের নিন্দাবাচক হবে” (মনুসংহিতা ২/৩১) অথবা এই বিশ্লেষণ যে, “নারীদের স্বভাবই হল পুরুষদের দূষিত করা” (২/২১৩)। এ হেন মনুই যখন গোলওয়ালকরের কাছে ‘the first and  greatest law giver of the world’ বলে বিবেচিত হন তখন তাঁর ভারতনির্মাণ পরিকল্পনাটিও আমাদের সামনে অল্পে অল্পে স্পষ্ট হতে থাকে। জন্ম হতে থাকে হিটলার আর মনুতে মেশানো এক অভূতপূর্ব ‘আধুনিক’ ভারতবর্ষের!

৩.

‘নেশন’-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে বিশেষ ভাবে কথাবার্তা বলেছেন গোলওয়ালকর। ধর্ম ও সংস্কৃতি। রেস বা জাতি। আর, ভাষা। পরের দুটো নিয়ে পরে কথা বলছি, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে ওঁর মতটা বুঝে দেখা যাক আগে। প্রথমেই যেটা আপত্তিকর মনে হয় সেটা এই যে, ধর্ম আর সংস্কৃতি কেন থাকবে একই বন্ধনে, জোড়ায় জোড়ায়? ওদুটো কি এক বস্তু নাকি? ধর্ম-নিরপেক্ষ কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকতে পারে না কোথাও? গোলওয়ালকরের বিবেচনায়, না, পারে না। ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যে তফাৎ করা যায় না কোনোমতে। কেন? কেননা, তাঁর মতে ধর্ম আসলে “ব্যক্তি ও সমাজের পার্থিব এবং আধ্যাত্মিক প্রতিটি কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে।” ‘পার্থিব’(‘worldly’) এবং ‘প্রতিটি’(‘every action’) শব্দ দুটোকে যদি একটু মন দিয়ে পড়েন তাহলে বুঝবেন ধর্মের কোন আগ্রাসী চেহারাটা নিয়ে এঁরা কথা বলতে চান। গোলওয়ালকর বলেন, আমি মূল ইংরিজিতেই উদ্ধৃত করছি, “We make war or peace, engage in arts and crafts, amass wealth or give it away, indeed we are born and we die – all in accord with religious injunction”! (বাঁকানো হরফ আমাদের) ধর্মেরই অঙ্গুলিহেলনে চলবে আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু, আমার শিল্প, আমার কবিতা, আমার গান – সব! সমস্যাটাকে অনুগ্রহ করে হিন্দু-মুসলমান প্রেক্ষিতে দেখবেন না, এ একেবারে জীবনবোধের মৌলিক প্রশ্ন, ধর্মকে ঠিক এতখানি সাম্রাজ্যবাদী হওয়ার মওকা আমি আমার জীবনে দেব কি দেব না! আমার পড়াশোনা, আমার গান শোনা বা গাওয়া, আমার লেখালেখি, আমার সিনেমা দেখা বা করা, সব নিয়ন্ত্রণ করবে ধর্ম – তার এতখানি আস্পর্ধা আমি মানব কি মানব না, সেই মৌলিক প্রশ্নটার একটা উত্তর আমাদের সবাইকে স্বাধীনভাবেই খুঁজতে হবে!

বলে রাখা ভালো যে, ধর্ম শব্দটির মূলে আছে ‘ধৃ’ ধাতু, অর্থাৎ ‘ধারণ করা’ এইসব রদ্দি মার্কা সেম্যান্টিক যুক্তি এখানে অচল। ধর্ম শব্দটিকে এই বইতে ‘religion’ অর্থেই ব্যবহার করা আছে, এবং বলা হয়তো বাহুল্য হচ্ছে, বিশেষভাবে হিন্দুধর্ম অর্থেই। নেশন, এই বইতে, সবসময় হিন্দু নেশন।

তা, সেই হিন্দু-নেশনে অ-হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের স্টেটাসটা কী হবে সে কথাটাও এই ফাঁকে খোলসা করে জানানো যাক। কোনো রাখঢাক না-করেই গোলওয়ালকর জানিয়ে দেন :

“হিন্দুস্তানের সব অ-হিন্দু মানুষ হয় হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করবে, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে ও পবিত্র বলে মনে করবে, হিন্দু জাতির গৌরব-গাথা ভিন্ন অন্য কোনো ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে না…অথবা সম্পূর্ণভাবে হিন্দুর এই দেশে তারা থাকবে অধীনস্ত হয়ে, কোনো দাবি ছাড়া, কোনো সুবিধা ছাড়া….। এমনকী তাদের কোনো নাগরিক অধিকারও থাকবে না ।”

হিটলারের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে? ‘হিন্দু’র বদলে ‘আর্যজার্মান’ আর ‘অ-হিন্দু’র বদলে ‘ইহুদী’ বসিয়ে নিলে মনে হবে ‘মাইন ক্যাম্প’ (Mein Kampf) পড়ছি, তাই না?

দুষ্টু সরস্বতীর মতো এখানে বেমক্কা একটা খারাপ প্রশ্ন তোলা যাক । ধরা যাক, আমি একজন বিশ্বাসী হিন্দু। অ-হিন্দু মানুষের ‘নাগরিক অধিকারও থাকবে না’ এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার অধিকার নিয়ে তো আর টানাটানি হচ্ছে না, আমি কোন দুঃখে এত ভাবিত হতে যাব! এইভাবেই ভাবি যদি, তা-ও কি নেশনের এই থিসিসটি নিয়ে কিছু তর্ক করা সম্ভব?

বিলকুল সম্ভব। বস্তুত জরুরি। এক) হিন্দুধর্মের যে অংশ শ্রদ্ধার যোগ্য তাকে শ্রদ্ধা করব নিশ্চয়ই, কিন্তু যা অশ্রদ্ধেয় তাকেও শ্রদ্ধা করে যেতে হবে, এই দাবিকেই বলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। ধরা যাক, শূদ্রবিরোধী নারীবিরোধী কথাবার্তায় ভর্তি বিভিন্ন এবং অসংখ্য ‘হিন্দু’- টেক্সট-এর যে সব অংশ, তা-ও কি শ্রদ্ধেয় বলে মানতে হবে?

দুই) আর-একটা আজব শব্দ হল ‘পবিত্র’। বস্তুত, ‘পবিত্র’ শব্দটাই সবচেয়ে আপত্তিকর, কেননা ‘পবিত্র’ বললেই প্রশ্ন তোলার সব সম্ভাবনাকে খুন করে ফেলা হয়। সত্যিকারের ভারতীয় সংস্কৃতি কিন্তু আমাকে প্রশ্ন করতেই শেখায়। বৈদিক দর্শন প্রস্থানকে আমি শ্রদ্ধা করতেই পারি, কিন্তু তাকে ‘পবিত্র’ মানলে তার বিরুদ্ধে আর কোনো পাল্টা তর্ক তোলার অবকাশ থাকে না। আর তা-ই যদি তুলতে না পারলাম, ভারতীয় দর্শনচর্চারও সেখানে অপমৃত্যু ঘটতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, বেদ-বিরোধী দর্শনপ্রস্থানগুলোর জন্ম কিন্তু ভারতেরই বুকে: সাংখ্য, বৌদ্ধ, লোকায়ত! বেদপন্থীরা বৌদ্ধদের বলেছেন ‘তস্কর’ লোকায়তিকদের বলেছেন ‘রাক্ষস’, লোকায়তিকরা বেদপন্থীদের বলেন ‘ধূর্ত ও ভণ্ড’, কাকে ছেড়ে কাকে ‘পবিত্র’ ভাবি তবে এখন? আমার কাছে এই তার্কিক চরিত্রই ভারতীয় সংস্কৃতির সত্যিকারের মহিমা, অমর্ত্য সেন যাকে বলেন ‘Argumentative Indian’। ‘একতাময়’ ফ্যাসিবাদী একটা রাষ্ট্রগঠনের স্বার্থে একটা একবগ্‌গা ‘পবিত্র’-র ট্যাগ মেরে এই ইতিহাসের সবটাকে মুছে দেবার চক্রান্তটাই এই থিসিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।

৪.

ভারত মানে হিন্দু ভারত, হিন্দু ভারত মানে তার সবচেয়ে মোটা দাগের প্রশ্নহীন ফ্যাসিবাদী সমর্পণধর্মী একটা চরিত্র। এই হল ধর্ম আর সংস্কৃতির চেহারা। এবার বাকি দুটো: জাতি আর ভাষা। জাতি প্রসঙ্গে বিস্তারিত যাননি গোলওয়ালকর। শুধু তার সংজ্ঞায় তিনি জানিয়েছেন জাতি বা Race হল ‘Population with a common origin under one culture’ এবং ভারতরাষ্ট্রকে করে তুলতে হবে এই অর্থে এক-‘জাতীয়’! শ্রদ্ধেয় পাঠক, ধরতে পারছেন কি কতখানি বিপজ্জনক এই সংজ্ঞা ও প্রস্তাব? ‘কমন অরিজিন’? মুসলমান নিশ্চয়ই বাদ, ‘ওদের’ ‘অরিজিন’তো আরবভূমি। খ্রিস্টান বাদ, কেননা ‘ওদের’ও সবার বাপ-ঠাকুরদার জন্ম ভ্যাটিকানের প্রাসাদে। কিন্তু অনার্য হিন্দুরা? তাঁদের কী হবে? আদিবাসী মানুষেরা? দক্ষিণ ভারতীয় অনার্য মানুষেরা? নৃতাত্ত্বিক বিচারে বৈচিত্র্যের লীলাভূমি ভারত। ‘কমন অরিজিন’-এর প্রশ্নটা তুললে যে কী সর্বনেশে বিভাজন ডেকে আনা হয় তা ভাবলেও গা ছমছম করে ওঠে! একে আর্যাবর্ত্যের সাংস্কৃতিক হেজিমনি বললে বড্ড নরম শোনায়, এ একেবারে ক্ষমতার উদগ্র আস্ফালন। আর ওই ‘one culture’! কী কুৎসিত এই কথা! ভারতে দাঁড়িয়ে কালচারাল oneness-এর কথা বলাই যে সবচেয়ে বড়ো ভারতবিরোধী অবস্থান, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই!

ভাষায় প্রশ্নেও যথারীতি ঘুরেফিরে সেই একই কথা! সেই ‘কেন্দ্রীয় সত্য’টির সন্ধান করে ফেরা, যা দিয়ে ভারতকে ডিফাইন করা যাবে। কোনো ‘একটিমাত্র’ সত্য দিয়েই কেন ডিফাইন করতে হবে সে প্রশ্ন খবরদার করা চলবে না। ফলে গোলওয়ালকর বলেই যাবেন যে,  ভাষাগত একতার সূত্রেও ভারতকে বাঁধতেই হবে। আর কোন-সে ভাষা ? না, ‘Language of God’, সংস্কৃত। সংস্কৃত এবং সেই উৎস থেকে আসা ভাষাগুলিকেই ভারতীয় ভাষা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া যাবে। তার বাইরে আর কিছু নয়। মানে, বাদ পড়ল তামিল বা কন্নড়। বাদ পড়ল সাঁওতালি, লেপচা, কুরুখ, টোটো সহ যে শয়ে শয়ে নানা জনজাতির মানুষের ভাষা আছে, তা সব । সংস্কৃতর এই গা রি-রি-করা আধিপত্যবাদ দেখলে প্রাচীনভারতীয় মুনিঋষিরাও মূর্ছা যেতেন! আরবি ফারসির প্রতাপ ঠেকাতেই এই বন্দোবস্ত বোধ করি! তা মনের কথাটা পষ্ট করে বললেই তো হয়। এত তত্ত্ব ফলানোর কী দরকার কে জানে! অবশ্য, বাংলা মারাঠি-সহ সংস্কৃতঘরানার ভাষাভাষী মানুষের খুব বেশি আহ্লাদিত হবার কারণ নেই। কেননা ঠারেঠোরে এই বইতে বলে দেওয়া আছে যে, “Hindi is the most commonly understood and used as a medium of expression between persons of different provinces”, তাই হিন্দির অধীনতামূলক মিত্রতা স্বীকার করেই যে বাকি ভাষাগুলোকে বেঁচে থাকতে হবে সেটা ভালোই বোঝা যায়!

তা, এক দেশ এক জাতি এক সংস্কৃতির স্বার্থে এটুকু করবেন না আপনারা? কিন্তু কেউ যদি এই গোদা আধিপত্য না মানে? ভাষা-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, তার নানাত্ব নিয়ে বাঁচতে চায়? অন্যকে সম্মান দিয়েই স্পেস চায় তার নিজস্ব? ভাষা চায় তার নিজের? সাংস্কৃতিক অধিকার চায় খবরদারিহীন, একান্ত? তখন এই রাষ্ট্রের প্রণেতাটির কাছে তিনি হয়ে উঠবেন “বিশ্বাসঘাতক, অথবা দেশের শত্রু অথবা আর-একটু ভদ্র ভাষায় বললে, ইডিয়ট”!

আমার দেশকে আমি ভালোবাসি বলেই কেন ‘ইডিয়ট’ হয়ে ওঠাটা আজকে বড্ড জরুরি, সেটা বোঝা যাচ্ছে তো এবার?


(এই লেখায় ‘মনুসংহিতা’ প্রসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে সুরেশ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ । We, or Our Nationhood Defined  বইয়ের যাবতীয় অনুবাদ বর্তমান লেখকের।)

*লেখাটি লিখেছেন জয়দীপ ঘোষ। 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

4 Responses to আমরা, কিংবা আমাদের জাতিত্বের সংজ্ঞা

  1. সায়ন্তন সেন বলেছেন:

    অসম্ভব ভালো একটি লেখা ।বৈঠকি মেজাজে এই রকমের যুক্তিচর্চাই আমাদের প্রয়োজন ।মেঁই ক্যাম্প -এর ইহুদিরা গোলওয়ালকরের মুসলমান বটে, তবে কম্যুনিস্ট বিদ্বেষে দুজনের প্রত্যক্ষ মিল নজরে আসে!

    Liked by 1 person

  2. debalina বলেছেন:

    Ki bhishon bhalo ekta lekha..amon sohoj kore lekha ato guruttopurno bishoy..aro chai.

    Like

  3. Sk Hasanujjaman বলেছেন:

    দারুন লেখা।নতুন করে সব কিছু ভাবাতে শুরু করাল।

    Like

  4. ইবলিশ জিয়ারুল বলেছেন:

    পড়ে খুব ভাল লাগলো আর কিছু একটা ঘুর পাক খাঁচ্ছে…

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s